বেতালপঞ্চবিংশতি: চতুর্থ গল্প

সেকালে ভোগবতী নগরে অনঙ্গসেন নামে একজন রাজা ছিলেন। চূড়ামণি নামে তাঁর একটি আশ্চর্য শুকপাখি ছিল। পাখিটি রাজার সঙ্গে সঙ্গেই থাকত এবং তার গুণের অন্ত ছিল না । সে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সঠিকভাবে বলতে পারত !
একদিন রাজা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি যদি তিনকালের কথা জান, তবে বল তো আমার কার সাথে বিয়ে হবে?
চূড়ামণি বললো, মহারাজ, মগধ দেশের রাজা বীরসেনের একটি সুন্দরী ও সুলক্ষণা কন্যা আছে, তাঁর সঙ্গেই আপনার বিয়ে হবে । নাম চন্দ্রাবতী।

রাজা অনঙ্গসেন চূড়ামণির কথার সত্যতা পরীক্ষা করার জন্য রাজদৈবজ্ঞ চন্দ্রকান্তকে ডেকে এ বিষয়ে তাঁর মতামত জানতে চাইলেন। চন্দ্রকান্তও গণনা করে ঐ একই কথা বলায়, রাজা এক বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ ব্রাহ্মণকে মগধরাজের কাছে দূত হিসেবে পাঠালেন বিয়ের সম্বন্ধ পাকা করতে ।
এদিকে চন্দ্রাবতীরও মদনমঞ্জরী নামে একটি সারি ছিল। সেও তিন কালের কথা বলতে পারত। চন্দ্রাবতী সারিকে জিজ্ঞাসা করলেন, সারি, বল তো আমার মনের মত যোগ্য পাত্র কোথায় আছে?
সারি বললো, রাজকুমারী, ভোগবতী নগরের রাজা অনঙ্গসেনের সাথেই তোমার বিয়ে হবে।

এই ঘটনার অল্পদিন পরেই অনঙ্গসেনের দূত মগধরাজের কাছে উপস্থিত হয়ে তাঁর আগমনের কারণ রাজার কাছে বললেন। রাজা খুশিমনে এই প্রস্তাবে সম্মত হলেন এবং অনেক দ্রব্যসামগ্ৰী দিয়ে বিয়ে পাকা করতে এক ব্রাহ্মণকে তাঁর সঙ্গে পাঠালেন ।

এরপর ভাল দিন দেখে অনঙ্গসেন মগধে এসে চন্দ্রবতীকে বিয়ে করে নিজের রাজধানীতে ফিরে গিয়ে সুখে দিন কাটতে লাগলেন।
চন্দ্রাবতী যখন তাঁর শ্বশুরবাড়ি ভোগবতীতে আসেন তখন তাঁর অতি প্রিয় সারি মদনমঞ্জরীকেও সঙ্গে এনেছিলেন ।
একদিন অনঙ্গসেন ও চন্দ্রাবতী নানা বিষয়ে আলোচনা করছিলেন; তখন রাজা রাণীকে বললেন, দেখ, আমরা যখন বিয়ে করে সুখী হয়েছি তখন আমার ইচ্ছা আমাদের প্রিয় পাখিদেরও বিয়ে দিই। তাহলে তারাও আমাদের মত সুখী হবে। রাজার ইচ্ছায় শুক ও সারিকে বিয়ে দিয়ে একই খাঁচায় রাখা হলো |
একদিন দুই পাখিতে তর্ক শুরু হলো ; সারি বললো, পুরুষরা বড়ই স্বার্থপর, মিথ্যাবাদী, অধৰ্মী এবং খুনি। সেইজন্য পুরুষদের আমার মোটেই ভাল লাগে না !
শুক রেগে বললো, মেয়েদের কথা আর বলো না। তারাও অত্যন্ত চপলা, মিথ্যা কথায় পটু আর লোভী ।
উভয়ের এই তর্ক শুনে রাজা বললেন, তোমরা মিছেমিছি তর্ক করে তিক্ততার সৃষ্টি করছ কেন?
সারি বললো, মহারাজ, এ তর্ক মিছিমিছি নয়, পুরুষরা যে কত বড় অধৰ্মী তা আমার জানা আছে। শুনুন তবে একটা গল্প বলি।

ইলাপুরে মহাধন নামে একজন বণিক বাস করতেন। বিয়ের পর একটিও সন্তান না হওয়ায় বড়ই দুঃখে দিন কাটে মহাধনের। অবশেষে বেশী বয়সে একটি ছেলে হওয়ায় তাঁর আনন্দের সীমা রইল না।
তিনি পুত্রের নাম রাখলেন নয়নানন্দ। পরম যত্নে বাবা মা তাকে মানুষ করতে লাগলেন । পুত্রের যখন পাঁচ বছর বয়স হলো তখন লেখাপড়া শেখার জন্য একজন শিক্ষক নিযুক্ত করলেন।
কিন্তু নয়নানন্দের স্বভাব মোটেই ভাল না। ছোটবেলা থেকেই সে খারাপ ছেলেদের সঙ্গে মিশতো, লেখাপড়ায় ছিল অমনোযোগী। অনেক বদ অভ্যাস শিখল এবং মুখে খারাপ কথা ছাড়া ভাল কথা ছিল না। বয়সের সঙ্গে এই দোষগুলিও বাড়তে লাগলো |
যথাসময়ে মহাধনের মৃত্যু হলো। বাবার মৃত্যুতে অতুল ঐশ্বর্য নয়নানন্দের হাতে এসে পড়ায় সে দু’হাতে টাকা ওড়াতে লাগলো। টাকা কেবল খরচই হচ্ছে, উপার্জন হচ্ছে না কিছুই। এইভাবে চললে রাজাও একদিন ফকির হয়-- নয়নানন্দও দুর্দশায় পড়ল। সব টাকা শেষ হয়ে গেল।

এই অবস্থায় ইলাপুর ত্যাগ করে রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে একদিন চন্দ্রপুরে তার বাবার বন্ধু হেমগুপ্তের কাছে গিয়ে বললো, কয়েকটা জাহাজ নিয়ে সিংহল দ্বীপে বাণিজ্য করতে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ প্রবল ঝড় ওঠায় আমার সমস্ত জাহাজ জলে ডুবে যায়। কোনপ্রকারে একখণ্ড কাঠ সম্বল করে ঢেউয়ের সঙ্গে তীরে এসে আছড়ে পড়লাম। ভাগ্য সহায় ছিল তাই কোনরকমে প্রাণে বেঁচে গেছি।
এই বলে সে কয়েকফোঁটা চোখের জল ফেললো । সব ঘটনা শুনে হেমগুপ্তের বড়ই মায়া হলো । তিনি নয়নানন্দকে পরম আদরে নিজের কাছে রেখে দিলেন।

হেমগুপ্ত একদিন মনে মনে ভাবলেন, কন্যা রত্নাবতীর জন্য একটি সুপাত্রের তো অনেকদিন ধবেই খোঁজাখুঁজি করছি কিন্তু মনের মত পাত্র পাচ্ছি না। সদ্বংশজাত এবং প্রচুর টাকার মালিক এই ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেওয়াই ভাল ।
স্ত্রীকে তার মনের কথা খুলে বলায় স্ত্রীও খুশি হয়ে মত দিলেন। ছেলেটিকে তাঁর খুবই পছন্দ।

হেমগুপ্ত তাঁর কন্যার সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব করলে নয়নানন্দ সঙ্গে সঙ্গে সে প্রস্তাবে রাজি হলো। তারপর ভাল দিন দেখে রত্নাবতীর সঙ্গে নয়নানন্দের বিয়ে হলে ; বিয়ের পর উভয়ে পরম সুখে দিন কাটাতে  লাগল।
এইভাবে কিছুদিন চলবার পর নয়নানন্দের এই একঘেয়ে জীবন আর ভাল লাগলো না। আগেকার সেই উচ্ছৃঙ্খল দিনগুলিই তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকতে লাগলে । সে তার স্ত্রীকে বললো, দেখ, অনেকদিন থেকে আমি দেশ ও আত্নীয় ছাড়া হয়ে এখানে আছি । আমার একবার দেশে যাওয়া উচিত। তুমি বাবা মাকে মত করিয়ে আমাদের যাওয়ার ব্যবস্থা করে দাও।
হেমগুপ্ত ও তাঁর স্ত্রী জামাইয়ের এই প্রস্তাবে খুশি হলেন। এমনটিই তো হওয়া উচিত। জামাই চিরজীবন শ্বশুরের কাছে থাকবে এ আশা করা ঠিক না। তাঁরা রাজি হলেন এবং শুভ দিনে মেয়ে জামাইকে বিদায় দিলেন। আর মেয়ের সঙ্গে দিলেন অনেক অলঙ্কার ও ধনরত্ন ।
কিছুটা পথ চলার পর এক গভীর বন পড়ল পথে। নয়নানন্দ স্ত্রীকে বললো, দেখ এই বনে দস্যুর ভয় আছে, পালকিতে যাওয়া
নিরাপদ নয়, আমরা পালকি ছেড়ে দিয়ে গরিবের বেশে হেঁটে যাই আর তোমার যত অলঙ্কার আছে একটা পুটলি বেঁধে আমাকে দাও । গরিবের বেশে গেলে দস্যুরা আমাদের সন্দেহ করবে না। শহরে গেলে আবার সব অলঙ্কার পরে নেবে ।

রত্নাবতী খুব সরল মেয়ে। সে সব অলঙ্কার নয়নানন্দকে দিয়ে দিল ; নয়নানন্দ সঙ্গের লোকজন ও পালকি বাহকদের বিদায় দিয়ে গভীর বনের মধ্যে দিয়ে চলতে লাগলো। যেতে যেতে বনের মধ্যেই একটি কুয়োর মধ্যে বত্নাবতীকে ঠেলে ফেলে দিয়ে সমস্ত অলঙ্কার ও ধনরত্ন নিয়ে পালিয়ে গেল ।
রত্নাবতী সেই নির্জন বনে কুয়ের মধ্যে পড়ে বাবা মার নাম করে জোরে জোরে চীৎকার করে কাঁদতে লাগলো ।
একজন লোক সেই বনের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে কান্না শুনে কুয়োর মধ্যে চেয়ে দেখে পরমা সুন্দরী একটি স্ত্রীলোক কাঁদছে। লোকটি অনেক কষ্টে রত্নাবতীকে কুয়ো থেকে উপরে তুলে জিজ্ঞাসা করলো, তুমি কে? এই ভয়ঙ্কর বনের মধ্যে তুমি এলেই বা কি করে ?
রত্নাবতী প্রকৃত কারণ গোপন করে বললো, চন্দ্রপুরের হেমগুপ্ত বণিক আমার বাবা, আমার নাম রত্নাবতী। স্বামীর সঙ্গে শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছিলাম কিন্তু এখানে আসার পর কয়েকজন দস্যু আমার সব অলঙ্কার নিয়ে আমাকে এই কুয়োর মধ্যে ফেলে দিয়েছে আর আমার স্বামীকে তারা মারতে মারতে নিয়ে গেছে ।
রত্নাবতীর দুঃখের কথা শুনে লোকটিরও মনে দুঃখ হলো। দয়ালু লোকটি রত্নাবতীকে তখনই তার বাবা মার কাছে পৌঁছে দিল ।
সেখানেও রত্নাবতী প্রকৃত ঘটনা গোপন করায় বাবা মা ও আত্নীয়রা রত্নাবতীর দুঃখে খুবই কাতর হলো। জামাইয়ের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা চিন্তা করে তারা কাঁদতে লাগলো। বাবা হেমগুপ্ত মেয়েকে আবার অলঙ্কার তৈরী করে দিলেন।

এদিকে নয়নানন্দ দেশে ফিরে স্ত্রীর অলঙ্কার বেচে দিয়ে জুয়া এবং মদে অতি অল্পদিনের মধ্যেই সব শেষ করে ফেললো । সে আবার দুর্দশার মধ্যে পরায় ঠিক করলো শ্বশুরবাড়ি গিয়ে আবার কিছু অর্থ হাতিয়ে পালিয়ে আসবে। তার স্ত্রীর প্রতি যে ব্যবহার সে করেছে তা নিশ্চয়ই শ্বশুরবাড়ির কেউ জানতে পারে নি। মনে মনে এই কুমতলব এটে একদিন সে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে হাজির হলো ।
সেখানে পৌছে প্রথমেই দেখা হয়ে গেল রত্নাবতীর সঙ্গে । নয়নানন্দ স্বপ্নেও ভাবে নি যে তার স্ত্রী বেঁচে আছে, তাই তাকে দেখে সে চমকে উঠলো ।
তখন রত্নাবতী বললো, তুমি কিছু ভেব না, আমার বাড়ির কেউ প্রকৃত ঘটনা জানে না। আমি সকলকে বলেছি দস্যুরা আমার সব গয়নাপত্র নিয়ে আমাকে কুয়োর মধ্যে ফেলে তোমাকে ধরে নিয়ে গেছে! তোমার জন্য বাবা মা খুবই চিন্তায় আছেন, তোমাকে দেখলে তাঁরা খুব খুশি হবেন। তুমি যেন আবার আমাকে ফেলে পালিয়ে যেও না।
স্ত্রীর কথা শুনে নিশ্চিন্ত হলো নয়নানন্দ। এতদিন পরে জামাইকে দেখে শ্বশুর শ্বাশুড়ি দু'জনেই খুব আনন্দিত হলেন। জামাইকে ফিরে পেয়ে বাড়িতে যেন উৎসবের ধূম পড়ে গেল।
কিন্তু সেই রাত্রেই ছোরা মেরে ঘুমন্ত স্ত্রীকে হত্যা করে, তার সব গয়না নিয়ে নয়নানন্দ দূর দেশে পালিয়ে গেল ।

গল্প শেষ করে সারি বললো, মহারাজ, যা বললাম তা আমার নিজের চোখে দেখা ! সেই থেকে পুরুষদের উপর অত্যন্ত অশ্রদ্ধা ও অবিশ্বাস জন্মেছে আমার |


রাজা হেসে বললেন, ওহে চুড়ামণি, এবার তুমি বল কেন তুমি মেয়েদের উপর এত বিরক্ত এবং তাদের দেখতে পার না ।

তখন শুক তার গল্প শুরু করল।
কাঞ্চনপুরে সাগরদত্ত নামে এক বণিক ছিলেন। তাঁর ছেলে শ্ৰীদত্ত ছিল রূপে গুণে ও স্বভাবে সকলের প্রশংসার যোগ্য। অনঙ্গপুরের সোমদত্ত বণিকের কন্যা জয়শ্রীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের কিছুদিন পর শ্রীদত্ত বাণিজ্য করতে বিদেশে গেলে স্ত্রী জয়শ্রী তার বাবার কাছে গিয়ে থাকল।
অনেকদিন চলে গেল কিন্তু শ্ৰীদত্ত বিদেশ থেকে না ফেরায় জয়শ্রী অধৈর্য হয়ে উঠল। অন্য মেয়েদের মত তার ভাগ্যে কি ঘরসংসার নেই ?
একদিন তার প্রিয় সখীকে মনের কথা প্রকাশ করলো। সখী বললো, ধৈর্য ধর । ভগবান মুখ তুলে চাইলে তুমি তোমার স্বামীকে ফিরে পাবে।

জয়শ্রী কিন্তু সখীর এ কথায় সন্তুষ্ট হতে পারলো না। সেই সময় একজন রূপবান ও সুবেশ যুবক ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিল। জয়শ্রীর মনে হলো, এর সঙ্গে যদি আমার বিয়ে হতো তবে আমি কতই না সুখী হতাম !
যত দিন যেতে লাগল জয়শ্রীর মন ততই তার স্বামীর উপর বিরূপ হতে লাগল ।
কিছুদিন পর শ্রীদত্ত বাণিজ্য শেষ করে শ্বশুরবাড়ি ফিরে এল। অনেকদিন পর জামাইকে পেয়ে সোমদত্ত ও তাঁর স্ত্রী খুবই খুশি হলেন, কিন্তু জয়শ্রী মোটেই খুশি হলো না ।

রাত্রে শাশুড়ি জামাইকে খেইয়ে দাইয়ে শুতে পাঠিয়ে পরে মেয়েকেও পাঠিয়ে দিলেন। জয়শ্রীর এতে ইচ্ছা না থাকলেও মায়ের কথা ফেলতে পারল না। শ্ৰীদত্ত স্ত্রীকে বিদেশ থেকে তার জন্য আনা সুন্দর সুন্দর জিনিস উপহার দিতে গেল কিন্তু সে মুখ বেঁকিয়ে সে সব জিনিস ছুঁড়ে ফেলে দিল। তখন শ্ৰীদত্ত খুবই অসন্তুষ্ট হয়ে অগত্যা শুয়ে পড়ল এবং ক্লান্ত থাকায় ঘুমিয়েও পড়ল।


তখন জয়শ্রী সেইসব ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া অলঙ্কার ও শাড়ি পড়ে সেই গভীর রাতে একলা বেরিয়ে পড়ল। সেই সময় এক চোর কাছেই লুকিয়ে ছিল। এত রাতে দামী গয়না পরে একটি স্ত্রীলোককে বাইরে বেরিয়ে যেতে দেখে সে তার পিছু নিল। বেগতিক দেখে জয়শ্রী তার সখীর বাড়ি গেল।
সেদিন রাত্রে সেখানে সেই যুবকটি অতিথি হয়েছিল। কিন্তু একটি বিষাক্ত সাপ তাকে কামড়ে দিলে সে মারা গেল। জয়শ্রী সেই মৃতদেহের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল।

কাছেই শিরীষ গাছে একটা ভূত ছিল। সে এই সব কাণ্ড দেখে মেয়েটির উপর খুবই রেগে গেল। মনে মনে বললো, এরকম মেয়েকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া উচিত। তখন সে যুবকের মৃতদেহের মধ্যে ঢুকে হঠাৎ লাফিয়ে উঠে জয়শ্রীর নাকের ডগাটি দাঁত দিয়ে কেটে নিয়ে আবার গাছে গিয়ে চড়ল। চোরটি এমন তাজ্জব ব্যাপার দেখে তো থ !

এতক্ষণে জয়শ্ৰী বুঝতে পারল যে যুবকটি মৃত। সে তখন তার প্রিয় সখীর কাছে গিয়ে সমস্ত ঘটনা বললো। সখীকে বললো, বল আমি এখন কি করি? এ অবস্থায় আমি বাবা মার কাছে যাই কিভাবে? আর এর কারণই বা কি বলব ? বিশেষ করে আমার স্বামীটিও আজ উপস্থিত। এই সঙ্কট অবস্থায় মৃত্যু ছাড়া আমার আর পথ নেই, তুমি আমাকে বিষ এনে দাও তাই পান করে আমি বিপদ থেকে উদ্ধার পাই। এই বলে সে কপাল চাপড়াতে লাগল।
সব শুনে জয়শ্রীর সখী চিন্তা করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর জয়শ্রী বললো, আমি একটা ভাল উপায় বের করেছি। ভেবে দেখ কেমন হবে। আমি এই অবস্থায় ঘরে ঢুকে চীৎকার করে কাঁদতে আরম্ভ করব। আমার কান্না শুনে সকলে ছুটে এসে কারণ জানতে চাইলে বলব, আমার স্বামী অকারণে ক্রোধে অন্ধ হয়ে আমাকে অনেক মেরেছে এবং দাঁত দিয়ে আমার নাকের ডগা কেটে নিয়েছে।
জয়শ্রীর নাক দিয়ে ঝড়ঝড় করে রক্ত পড়তে লাগল। সে তাড়াতাড়ি সেখান থেকে বেরিয়ে পড়ল ।
ছুটতে ছুটতে স্বামী যে ঘরে শুয়ে আছে সেই ঘরে গিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল, ও মা গো, ও বাবা গো, এ কেমন স্বামীর হাতে আমাকে দিয়েছ গো, খুনেটা যে আমার নাক কেটে নিয়েছে গো !
জয়শ্রীর কান্না শুনে বাড়ির সকলে ছুটে এল সেই ঘরে। দেখল মেয়ের নাক কাটা, সমস্ত গা ও কাপড় রক্তে ভেসে যাচ্ছে । তখন সকলে ব্যস্ত হয়ে এর কারণ জিজ্ঞাসা করতে লাগল।
গোলমাল শুনে বেচারী জামাইয়ের ঘুম ভেঙ্গে গেছে ইতিমধ্যে। সে ভ্যাবাচেকা খেয়ে চুপটি করে বসে আছে। জয়শ্রী তার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললো, ঐ খুনে আমার এই দশা করেছে। ~ পরদিন সকালেই শ্বশুর তাকে কোটালের হাতে সঁপে দিলেন। তারপর তাকে বিচারপতির সামনে দাঁড়াতে হলো। বিচারপতি জয়শ্রীর কথাই বিশ্বাস করলেন এবং শ্রীদত্তকে শূলে দিতে আদেশ দিলেন। । 
চোরটার কিন্তু মানবতাবোধ ছিল । সে বিচারালযের অদূরেই দাঁড়িয়ে সমস্ত দেখছিল। বিনা অপরাধে একটি লোকের শান্তি হচ্ছে দেখে সে । বিচারকের সামনে এসে বললো, হুজুর, আপনি সবকিছু না জেনেই এই নিরপরাধ ব্যক্তিকে শাস্তি দিচ্ছেন। আমার অনুরোধ, আপনি ন্যায় বিচার করুন। এই দুষ্ট মেয়েটির কথা বিশ্বাস করবেন না।

বিচারক তখন চোরের কাছে প্রকৃত ঘটনা জানতে চাইলেন। চোরের কথামত জয়শ্রীর সখীর বাড়িতে লোক পাঠালেন সত্য যাচাই করার জন্য। যখন তারা সত্যি সত্যি সেখানে মড়া মানুষটিকে দেখতে পেল আর জয়শ্রীর নাকের কাটা ডগাটিও নিয়ে এল তখন বিচারক চোরের কথাই সত্য বলে মেনে নিলেন এবং জয়শ্রীর মাথা মুড়ে, ঘোল ঢেলে, উল্টো গাধায় চড়িয়ে শহরময় ঘোরাতে আদেশ দিলেন। শ্রীদত্তকে অন্যায়ভাবে হেনস্থা করার জন্য পুরস্কারদানে তাকে সন্তুষ্ট করলেন।

গল্প শেষ করে শুক বললো, তবেই বুঝুন মহারাজ, কেন আমি মেয়েদের পছন্দ করি না।
গল্প শেষ করে বেতাল বিক্রমাদিত্যকে জিজ্ঞাসা করলো, এবার বল তো মহারাজ কে বেশী খারাপ ? নয়নানন্দ না জয়শ্রী?

বিক্রমাদিত্য বললেন, আমার মতে দুইজনই সমান !
ঠিক উত্তর পেয়ে বেতাল রাজার কাঁধ থেকে নেমে শ্মশানে ফিরে গিয়ে গাছে ঝুলে রইল। বিক্রমাদিত্যও ছাড়বার পাত্র নন, তিনিও সঙ্গে সঙ্গে তাকে গাছ থেকে নামিয়ে কাঁধে ফেলে আবার চলতে আরম্ভ করলেন ।
বেতালও তার পঞ্চম গল্প শুরু করল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য