বত্রিশ পুতুলের উপাখ্যান: ২য় উপাখ্যান

   পরদিন আবার যখন ভোজরাজ সিংহাসনে বসার জন্য দ্বিতীয় পুতুলের মাথায় পা দিয়েছেন, অমনি সেই পুতুল জীবন্ত হয়ে বললো, মহারাজ, আমার নাম প্রভাবতী, আপনার যদি বিক্রমাদিত্যের মত ধৈর্য গুণ থাকে তাহলে আপনি এই সিংহাসনে বসুন। ভোজরাজ বললেন, সেই বিক্রমাদিত্যের কি রকম ধৈর্যগুণ ছিল তা আমায় বল ।
   পুতুল বললো, মহারাজ, একবার রাজা বিক্রমাদিত্য রাজ্যপালন করতে করতে চরদের বললেন, তোমরা পৃথিবী ভ্রমণে বের হও, এবং যেখানে যত আশ্চর্য জিনিস দেখবে আমার কাছে এসে বলবে। আমি তখনি সেখানে যাব।
   চররা চারদিকে বেরিয়ে পড়ল। কিছুদিন পর এক চর এসে বললো, মহারাজ, চিরকূট পাহাড়ের কাছে এক তপোবনে একটি দেবালয় আছে। সেখানে পাহাড় থেকে পরিষ্কার জলের ধারা নেমে আসছে। এই জলে স্নান করলে সব পাপ দূর হয়ে যায়। আর সেখানে একজন ব্রাহ্মণ আছেন। তিনি রোজ হোমকুণ্ডে আহুতি দিচ্ছেন। কত বছর যে তিনি এ কাজ করছেন কেউ জানে না। রোজ কুণ্ডের ধারে ছাইয়ের টিপি হয়ে থাকে। তিনি কারো সাথে কথা বলেন না। এরকম আশ্চর্য জিনিস আমি কোথাও দেখি নি।
   ব্যাপারটা শুনে রাজার খুব কৌতুহল হল। তিনি চরের সাথে সেখানে গেলেন। সেখানে গিয়ে তাঁর আনন্দের সীমা রইল না । তিনি বললেন, এই স্থানটি অতি পবিত্র। এ রকম স্থানেই দেবী জগদম্বা থাকেন। এ রকম স্থান দেখলেও পুণ্য হয়।
   তারপর রাজা সেই আকাশ থেকে নেমে আসা জলে স্নান করে দেবীকে প্রণাম করলেন । তারপর সেই ব্রাহ্মণের কাছে গিয়ে বললেন, আপনি কত বছর এই পূণ্য কাজ করছেন?
   ব্রাহ্মণ বললেন, যে সময় সপ্তর্ষিমণ্ডল রেবতী নক্ষত্রে ছিল, সেই সময় থেকে আমি এই হোম করছি। এখন সপ্তর্ষিমণ্ডল অশ্বিনী নক্ষত্রে অবস্থিত। এই কাজে আমার একশ' বছর পূর্ণ হয়ে গেছে কিন্তু তবুও দেবতা আমার প্রতি খুশি হলেন না।
   রাজা বিক্রমাদিত্য এই কথা শুনে স্বয়ং দেবতাকে স্মরণ করে সেই হোমকুণ্ডে নিজে আহুতি দিলেন। তাতেও দেবতা প্রসন্ন হলেন না । তখন বিক্রমাদিত্য বললেন, দেবী, তোমায় প্রসন্ন করার জন্য আমি আমার এই মাথা তোমায় নিবেদন করলাম। এই বলে তিনি যখন নিজের গলায় খড়গ বসাতে যাবেন আমনি দেবী তাঁর হাতটি ধরে বললেন, রাজা, আমি প্রসন্ন হয়েছি। তুমি বর চাও ।

   রাজা বললেন, দেবী, এই ব্ৰাহ্মণ বহুকাল ধরে এখানে হোম করছেন তবু তুমি কেন এর প্রতি প্রসন্ন হচ্ছ না? আমার উপরই বা এত শীঘ্র প্রসন্ন হলে কেন?
   দেবী বললেন, রাজা, এই ব্ৰাহ্মণ হোম করছে ঠিকই কিন্তু এর তেমন কোন একাগ্রতা নেই, সেইজন্য আমি প্রসন্ন হতে পারি নি। শাস্ত্রে আছে — আঙ্গুলের ডগা দিয়ে যে জপ করা হয় বা যে জপ ব্যস্তভাবে করা হয় সে সবই বিফল হয় । দেখ, কাঠে, পাথরে বা মাটির পুতুলে দেবতা বাস করেন না, মনের ভাবেই দেবতা থাকেন।
   রাজা বললেন, দেবী, যদি আমার উপর প্রসন্ন হয়ে থাক তাহলে এই ব্রাহ্মণের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ কর ।
  দেবী বললেন, রাজা, তুমি পরোপকারী গাছের মত নিজে কষ্ট সহ্য করে অন্যের পরিশ্রমের ফল পূর্ণ করছ । শাস্ত্রে আছে, গাছ কঠিন রৌদ্রতাপ সহ্য করে পরকে ছায়া দেয়, পরের উপকারের জন্য ফল দান করে। পরের উপকারের জন্য নদী বয়ে যায়, পরের উপকারের জন্য গভীরা দুধ দেয়। সুতরাং পরের উপকারের জন্যই এ জীবন। যে পরোপকার করে তার জীবন সার্থক হয় ।
   এইভাবে রাজার প্রশংসা করে দেবী ব্রাহ্মণের মনোবাসনা পূর্ণ করলেন। রাজাও নিজের নগরে ফিরে এলেন ।
এই বলে পুতুল ভোজরাজকে বললে, মহারাজ, আপনার যদি এমন ধৈর্য আর একাগ্রতা থাকে তবে আপনি এই সিংহাসনে বসুন।
   রাজা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য