মেরী শিশু-- জার্মানের রূপকথা

এক সময় প্রকাণ্ড একটা বনের কাছে থাকত এক কাঠুরে আর তার বউ । তাদের একমাত্র সন্তান-তিন বছরের একটি মেয়ে । ভারি গরিব তারা। রোজ রুটিও জুটত না। ভেবে পেত না মেয়েটিকে কী করে খাওয়াবে। কাঠুরে এক সকালে বনে গেছে তার কাজে । দুর্ভাবনায় নুয়ে পড়েছে তার শরীর। সে কাঠ কুপিয়ে চলেছে—এমন সময় ভারি সুন্দরী ছিপছিপে লম্বা একটি মেয়ে এসে দাঁড়াল তার সামনে। মাথায় তার জ্বলজ্বলে তারার মুকুট । মেয়েটি বলল, “আমি ভাজিন মেরি, শিশু যিশুর মা । তুমি গরিব আর অভাবী লোক । তোমার মেয়েকে এনে দাও । তাকে আমি মানুষ করব । তারও মা হব ।” আদেশ শুনে কাঠুরে তার মেয়েটিকে এনে দিল ভাজিন মেরির কাছে । তিনি তাকে সঙ্গে করে স্বর্গে নিয়ে গেলেন । মেয়েটি সেখানে খুবই আদর-যত্নে থাকে । তার মাখন-মাথানো রুটিতে চিনি, তার জন্য মিষ্টি দুধ আর সরবত, পোশাক তার সোনার, দেবশিশুরা তার খেলার সঙ্গী ।
যখন তার চোদ্দো বছর বয়েস ভাজিন মেরি তখন একদিন তাকে ডেকে বললেন, “শোনো বাছা, অনেকদিনের জন্যে বেরুচ্ছি । স্বর্গের তেরোটা দরজার চাবি তোমার কাছে রইল। তাদের মধ্যে বারোটা খুলে সেখানকার ধন-দৌলত দেখতে পার । কিন্তু খবরদার । তেরো নম্বরের ঘরটা খুলবে না। এই ছোট্টো চাবি সে-ঘরটার। ঘরটা খুললেই অশান্তিতে পড়বে ”
কথা শুনবে বলে কাঠুরের ছোটো মেয়েটি কথা দিল । ভাজিন মেরি চলে যাবার পর, সে বেরুল স্বর্গের প্রাসাদের ঘরগুলো দেখতে । এক-এক দিন এক-একটা ঘর সে দেখে বারোটা ঘর দেখা তার শেষ হল । সেই বারোটার প্রত্যেকটা ঘরেই সে দেখল এক-একজন দেবদূতকে । তাদের সর্বাঙ্গ দিয়ে যেন জ্যোতি বেরুচ্ছে । কাঠুরেমেয়ে আর তার সাঙ্গপাঙ্গ দেবশিশুরাও মোহিত হয়ে গেল । বাকি তখন শুধু সেই নিষিদ্ধ দরজাটা। সেটার মধ্যে কী আছে দেখার জন্য কাঠুরে-মেয়ের দারুণ কৌতুহল হল । তার খেলার সঙ্গী দেবশিশুদের বলল, “দরজার সবটা খুলব না। খানিক ফাঁক করে শুধু উঁকি মেরে দেখব—কী আছে ৷”
দেবশিশুরা বলে উঠল, “না-না। দরজা খোলা অন্যায় হবে। ভাজিন মেরি তোমায় বারণ করেছিলেন । দরজা ফাঁক করলে ফ্যাসাদে পড়বে ।” মেয়েটি আর কোনো কথা বলল না । কিন্তু কী আছে না দেখে মনে তার শান্তি নেই। দেবশিশুরা ঘুমিয়ে পড়লে সে ভাবল, “আমি তো এখন একা । এখন লুকিয়ে উঁকি মেরে দেখলে কে আর জানছে ।” চাবিটা বার করে ঘরটার তালা সে খুলল। আর দরজা খুলতেই তার চোখ গেল ধাঁধিয়ে । ঘরে জ্বলজ্বলে আগুনের মধ্যে বসে রয়েছেন ঈশ্বরের ত্রিমূতি—পিতা, পুত্র এবং পবিত্র আত্মা । মুহুর্তের জন্য ভয়ে, ভক্তিতে, শ্রদ্ধায় অবশ হয়ে গেল তার সমস্ত শরীর । তার পর সেই আগুনের মতো মেঘ স্পর্শ করার জন্য সে বাড়িয়ে দিল একটি আঙুল । সঙ্গে সঙ্গে তার আঙুলের ডগা হয়ে গেল সোনা । আর তার পরেই দারুণ ঘাবড়ে দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দৌড়ে পালাল সে । কিছুতেই তার বুকের ধুকপুকুনি আর থামে না । হাজার ধুলেও, হাজার রগড়ালেও যায় না তার আঙুলের ডগার সোনা।

অল্প কদিন পরেই ভাজিন মেরি ফিরে এলেন । কাঠুরের মেয়েকে ডেকে চাবিগুলো তিনি ফেরত চাইলেন । চাবির গোছা তার হাতে দেবার সময় ভাজিন মেরি মেয়েটির চোখের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, “তেরো নম্বরের দরজাটা খুলেছিলে ?” মেয়েটি বলল, “না।” ভাজিন মেরি তখন তার বুকে হাত দিয়ে বললেন, “তোমার বুক যে ভারি ধ্বকধবক করছে।” তিনি জানতেন মেয়েটি তার আদেশ না মেনে দরজা খুলেছিল । তাই আবার প্রশ্ন করলেন, “সত্যি বলছ খোল নি ?” দ্বিতীয়বার মেয়েটি বলল, “না ।” পবিত্র আগুনের ছোয়ায় মেয়েটির যে আঙুল সোনা হয়ে গিয়েছিল সেটি তখন ভাজিন মেরির চোখে পড়ল । সঙ্গে সঙ্গে তিনি বুঝলেন তাঁর প্রিয়পাত্রী পাপ করেছে । তৃতীয়বার তিনি প্রশ্ন করলেন, “খুলেছিলে ?” আর তৃতীয়বার মেয়েটি উত্তর দিল, “না ।” তখন ভাজিন মেরি বললেন, “তুমি আমার আদেশ মান নি । তার ওপর আবার মিছে কথা বলছ । স্বর্গে থাকার যোগ্য তুমি নও।”
কাঠুরের মেয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। জেগে দেখে নীচের পৃথিবীতে সে রয়েছে এক গহন বনে । সে চেস্টা করল চীৎকার করে কাঁদতে । কিন্তু গলা দিয়ে কোনো স্বর বেরুল না । লাফিয়ে উঠে চেস্টা করল ছুটে পালাতে । কিন্তু যেদিকেই যায় দেখে কাটার ঘন ঝোপঝাড় । সেই নির্জন জায়গায় একটা ছিল অনেক কালের গাছ । সেটার গুড়ি ফাঁপা । সেটাই হল তার থাকার আস্তানা । রাতে সেখানে সে ঘুমোয় । ঝড়ে-জলে সেখানে নেয় আশ্রয় । ভারি কষ্টে তার দিন কাটে । স্বর্গের আরাম আনন্দের কথা, দেবশিশুদের সঙ্গে খেলা করার কথা মনে পড়লে আমুরি-কুমুরি হয়ে কাঁদে । খাবারের মধ্যে সেখানে শুধু শাক-পাতা আর বুনো বেরি । সেগুলো জোগাড় করতে তাকে বহু হাঁটাহাটি করতে হয়। শরতে গাছের ঝরাপাতা আর বাদাম মাটি থেকে কুড়িয়ে এনে সে জমিয়ে রাখে। শীতকালে বরফ পড়ার সময় সেই বাদাম সে খায় আর ছোট্টো অসহায় জন্তর , মতো ঝরাপাতার মধ্যে সেধিয়ে ঠাণ্ডায় জমে মৃত্যুর হাত থেকে প্রাণ বাঁচায় । কিছুদিনের মধ্যেই তার পোশাক কুটিকুটি হয়ে খসে-খসে পড়তে থাকে । তার পর সূর্য উঠলে, গরম সোনালী রোদে চারি দিক ভরে গেলে কোটর থেকে বেরিয়ে গাছতলায় সে বসে থাকে লম্বা চুল দিয়ে নিজের সমত্ত শরীর ঢেকে । এইভাবে কাটতে থাকে বছরের পর বছর। জীবনের দুঃখকষ্ট হাড়ে-হাড়ে সে অনুভব করতে থাকে।
একদিন—গাছে গাছে যখন সবুজ কচি পাতা—সেদেশের রাজা সেই বনে এলেন মৃগয়ায় । ঘোড়া থেকে নেমে তরোয়াল দিয়ে ঝোপঝাড় কেটে পথ করে একটা হরিণকে তিনি তাড়া করে যেতে লাগলেন । যেতে যেতে পৌছলেন যেখানে কাঠুরের সেই সুন্দরী মেয়েটি বসেছিল তার রেশমের মতো পাতলা সোনালী চুলে সর্বাঙ্গ ঢেকে । থমকে দাঁড়িয়ে ভারি অবাক হয়ে মেয়েটিকে তিনি দেখতে লাগলেন । তার পর প্রশ্ন করলেন, “কে তুমি ? এই নির্জন জায়গায় একলা কেন বসে ?” মেয়েটি কিন্তু উত্তর দিল না, কারণ মুখ খুলতে সে পারে না । 
রাজা প্রশ্ন করলেন তার সঙ্গে তার দুর্গে যেতে সে রাজি কি না । মেয়েটি ঘাড় হেলিয়ে জানাল--রাজি। নিজে ঘোড়ায় তাকে তুলে নিয়ে  রাজা এলেন নিজের বাড়িতে । দুর্গে পৌছে তিনি আদেশ দিলেন মেয়েটিকে নিখুঁত সুন্দর পোশাকে সাজাতে । তাকে দিলেন অজস্র উপহার। কাঠুরের মেয়ের কোনোকিছুরই অভাব রইল না। মেয়েটি কথা বলতে পারে না। কিন্তু তার রূপেগুণে মুগ্ধ হয়ে কিছুকালের মধ্যেই রাজা তাকে বিয়ে করলেন ।

বছর খানেক বাদে রানীর একটি ছেলে হল । রাতে একলা যখন সে বিছানায় শুয়ে, ভাজিন মেরি এসে বললেন, “এখন স্বীকার করবে সেই নিষিদ্ধ দরজাটা খুলেছিলে বলে ? সত্যি কথা বললে তুমি মুখ খুলতে পারবে, তোমার কথা বলার ক্ষমতা আবার ফিরিয়ে দেব । কিন্তু এখনো পাপ করে একগুঁয়ের মতো অস্বীকার করলে তোমার ছেলেকে নিয়ে যাব ।” রানী উত্তর দেবার ক্ষমতা পেল, কিন্তু জেদ তার গেল না । বলল, “না, নিষিদ্ধ দরজা খুলি নি ।” উত্তর শুনে তার কোল থেকে নবজাত শিশুকে নিয়ে ভাজিন মেরি অদৃশ্য হলেন ।
পরদিন সকালে সেই শিশুকে দেখতে না পেয়ে লোক ফিসফিস গুজণ্ডজ শুরু করে দিল । গুজব রটল রানী রাক্ষসী, নিজের ছেলেকে খেয়েছে । রানীর কানে সব কথাই এল । কিন্তু নিজের হয়ে কোনো কথা বলতে পারল না । কারণ কথা বলার ক্ষমতা তার নেই। রাজা কিন্তু লোকের কথায় কান দিলেন না। কারণ রানীকে তিনি খুব ভালোবাসতেন ।
পরের বছর রানীর দ্বিতীয় ছেলে জন্মাল । রাতে ভাজিন মেরি আবার তার কাছে এসে বললেন, “এখন স্বীকার করবে সেই নিষিদ্ধ দরজাটা খুলেছিলে বলে ? সত্যি কথা বললে তুমি মুখ খুলতে পারবে, তোমার ছেলে আর তোমার কথা বলার ক্ষমতা আবার ফিরিয়ে দেব । কিন্তু এখনো পাপ করে একগুঁয়ের মতো অস্বীকার করলে তোমার এ-ছেলেকেও নিয়ে যাব ।” আবার রানী উত্তর দিল, “না, নিষিদ্ধ দরজা খুলি নি ।” উত্তর শুনে তার কোল থেকে নবজাত শিশুকে নিয়ে ভাজিন মেরি অদৃশ্য হলেন।
পরদিন সকালে সেই শিশুকে দেখতে না পেয়ে লোকে এবার বেশ জোর গলাতেই বলাবলি করতে লাগল-রানী তাকে খেয়ে ফেলেছে।
রানীর বিচারের দাবি করলেন রাজার মন্ত্রীরা । কিন্তু রানীকে এতই ভালোবাসতেন রাজা যে কারুর কথাতেই কান দিলেন না । মন্ত্রীদের বললেন সে কথা আবার উচ্চারণ করলে তাদের প্রাণদণ্ড দেবেন ।
পরের বছর রানীর কোলে এল ফুটফুটে ছোটো একটি মেয়ে । রাতে তৃতীয়বার ভাজিন মেরি তার কাছে এসে বললেন, “আমার সঙ্গে এসো ।” রানীর হাত ধরে স্বর্গে এনে তিনি তাকে দেখালেন তার আগের দুই ছেলেকে । তারা হাসিতে কুটোপাটি হয়ে বল নিয়ে খেলছিল । দেখে রানীর আনন্দ আর ধরে না । তখন ভাজিন মেরি বললেন, “এখন তোমার মন গলেছে তো ? নিষিদ্ধ দরজাটা খুলেছিলে বলে স্বীকার করলে তোমার দুই ছেলেকে ফিরিয়ে দেব।” কিন্তু তৃতীয়বার রানী উত্তর দিল, “না, নিষিদ্ধ দরজা খুলি নি।” ভাজিন মেরি তখন আবার তাকে পৃথিবীতে ফেরত পাঠিয়ে তার তৃতীয় শিশুকে নিয়ে নিলেন ।
পরদিন গুজবটা চারি দিকে ছড়িয়ে পড়ল । প্রজারা জোর গলায় বলত লাগল—রানী যে রাক্ষসী তাতে আর কোনো সন্দেহ নেই, তার বিচার হওয়া দরকার । রাজা আর মন্ত্রীদের মুখ বন্ধ করতে পারলেন না । রানীর বিচারের জন্য সভা ডাকা হল । রানী কোনো কথা বলতে বা নিজের পক্ষ সমর্থন করতে পারল না । তাই বিচারে স্থির হল তাকে পুড়িয়ে মারা হবে । রানীকে একটা খুঁটিতে বেঁধে তার চারি দিকে স্তুপাকার করা হল কাঠ । আগুনের শিখা লকলক করে উঠল । আর হঠাৎ রানীর উদ্ধত গর্বিত হৃদয় গেল গলে । আন্তরিক অনুতপ্ত হয়ে সে ভাবল, “মরবার আগে যদি দোষ স্বীকার করতে পারতাম ! যদি বলতে পারতাম দরজাটা খুলেছিলাম।” সঙ্গে সঙ্গে তার গলায় স্বর ফিরে এল । রানী চেঁচিয়ে উঠল, “হ্যা মেরিমাতা— খুলেছিলাম ।” দেখতে দেখতে আকাশ থেকে বৃষ্টি নেমে আগুন নিভিয়ে ফেলল। রানীর চারি দিকে জ্বলজ্বল করতে লাগল একটা জ্যোতি । ভাজিন মেরি নেমে এল । তার দু’পাশে রানীর দুই ছেলে, কোলে নবজাত ছোট্টো মেয়েটি ।
সদয় স্বরে তিনি বললেন, “পাপী পাপ স্বীকার করলে তাকে ক্ষমা করা হয়।” রানীকে তিনি ফিরিয়ে দিলেন তার তিনটি সন্তান আর কথা বলার ক্ষমতা আর জীবনভর আনন্দ ।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য