৯. হেকিম রায়ান, উজির ও বাদশা উনানের গল্প

অনেক কাল কাগে রুম দেশ নামে সুন্দর এক নগরী ছিল। সেখানে খুব শক্তিশালী এক সুলতান রাজত্ব করতেন। সৈন্য সামন্ত, চাকর-চাকরানী আর ধন সম্পদের কোন কিছুরই অভাব ছিল না তাঁর। কিন্তু দুঃখ তার একটাই ছিল, সুলতানের সারা গায়ে কুষ্ঠ রোগ ছিল। অনেক ডাক্তার, কবিরাজ দেখিয়েও তার রোগ ভাল হল না।
এক সকালে সুলতানের দরবারে এক বৃদ্ধ হাজির হল। সবাই তাকে রায়ান হেকিম বলে জানত। নানা ভাষায় তার অগাধ জ্ঞান ছিল। দরবারে হাজির হয়ে সুলতানকে সালাম করে বলল, ‘হুজুর, আমি আপনার রোগের কথা শুনে এসেছি। আমি আপনার রোগ সারিয়ে তুলতে পারব। কিন্তু আপনাকে অনুরোধ করতে আমার ভরসা হচ্ছে না। আপনি এদেশের সুলতান। মস্ত বড় লোক। আমার সঙ্গে আপনার চেনা-জানা নেই। আমার দেওয়া ঔষধ আপনি কি ভরষাতে খাবেন!”
সুলতান বললেন, “নাই বা থাকল তোমার সাথে আমার চেনা-জানা। আমার রোগ যদি তুমি সারিয়ে তুলতে পার তবে তোমাকে অনেক ধনদৌলত পাবে। কেবল তুমিই নও, তুমি মরে যাবার পরও তোমার পরিবার প্রতিমাসে রাজদরবার থেকে বেতন পাবে। আর আমার দরবারের প্রধান পারিষদ করে রাখব তোমাকে।”  সুলতান এবার একটা বহুমূল্যবান শাল হেকিম রায়ানকে উপহার দিলেন।
-- ‘আমার ওপর ভরসা রাখতে পারেন জাঁহাপনা। আমার ঔষধ আপনার রোগ সারিয়ে তুলবেই।’, হেকিম রায়ান বললেন।
--‘তবে কাল থেকেই চিকিৎসা শুরু কর।’, জাঁহাপনা বললেন।
হেকিম রায়ান গাছগাছড়া নিয়ে বসে গেল ঔষধ বানাতে। একটা ঔষধ বানিয়ে একটা ফাঁপা বাঁশের লাঠির মধ্যে তার কিছু অংশ ঢুকিয়ে দিল তারপর লাঠিটার মুখ বন্ধ করে দিল। বাকি অংশটুকু আর একটা ফাঁপা বাঁশের চোঙের মধ্যে রেখে দিল। এবার একটা ফাঁপা বল তৈরী করে তার মধ্যে কিছুটা ঔষধ ঢুকিয়ে দিল।

হেকিম এবার লাঠি এবং বলটি নিয়ে সুলতানের দরবারে হাজির হল। সেগুলো সুলতানের হাতে তুলে দিয়ে বলল-- ‘জাঁহাপনা, এদুটো দিয়ে আপনাকে পোলো (একটা বিশেষ ধরনের খেলা। অনেকটা হকি খেলার মতো। শুধু পার্থক্য  হল এই খেলাতে খেলোয়ার ঘোরার পিঠে চড়ে থাকে) খেলতে হবে। শরীর ঘেমে গেলে বেশী করে পানি দিয়ে গোছল করে ফেলবেন। ব্যস, আর কিছুই করতে হবে না। এটাই আপনার রোগের চিকিৎসা। এতেই আপনার রোগ সেরে যাবে।’ হেকিম রায়ানের চিকিৎসা বিধান অনুযায়ী সুলতান উনান তাঁর সভার মন্ত্রী, উজির, সেনাপতি প্রভৃতিদের নিয়ে মাঠে গেলেন। তারপর ঘোড়ার পিঠে চড়ে পোলো খেলা শুরু করলেন। খেলতে খেলতে যখন সুলতানের সারা শরীর দিয়ে ঘাম ঝরতে লাগল তখন সুলতান খেলা বন্ধ করে প্রাসাদে ফিরে এলেন। ঠান্ডা পানি দিয়ে ভাল করে গোছল করলেন।
রাতে সুলতানের খুব ভাল ঘুম হল। সকালে হেকিম রায়ান সভায় আসতেই সুলতান আনন্দিত কন্ঠে বললেন, ‘হেকিম সাহেব, তোমার ঔষুধ আমার শরীরটাকে অনেকটাই ভাল করে দিয়েছে। আরাম বোধ করছি।’ সুলতান খুশি হয়ে রায়ানকে প্রচুর উপহার দিলেন।

মাঠে খেলয়াররা পোলো খেলছে
হেকিম রায়ানের পরামর্শ মত সুলতানের চিকিৎসা চলছে। এদিকে আস্তে আস্তে তাঁর শরীরের কুষ্ঠের দাগগুলি মিলিয়ে যেতে লাগল। রোজই সকালে রায়ান দরবারে উপস্থিত হলে প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে সুলতান উনান তাকে খুশি করেন।

সামান্য এক হাকিমকে দুহাতে উপহার দেওয়াটা উজিরের সহ্য হল না। দরবারে উজিরের সম্মান সবচেয়ে বেশি ছিল একদিন। কিন্তু আজ তাঁর জায়গায় সবচেয়ে বেশি সম্মান পাচ্ছে হেকিম। অসহ্য একেবারেই অসহ্য। উজির ভেতরে ভেতরে জ্বলতে লাগলেন।

পরদিন সকালে হেকিম রায়ান দরবারে এলে সুলতান উনান সিংহাসন থেকে উঠে তারাতারি করে হাকিমের দিকে এগিয়ে গেলেন আর তাঁকে হাতে ধরে নিয়ে এসে নিজের পাশে বসালেন। এরকম সম্মান শুধু উজিরেরই প্রাপ্য। সুলতানের এ্ররকম কান্ড দেখে রাজদরবারের অনেকেই রাগ করল।

ঈর্ষান্বিত উজির রাগে দুঃখে আপমানে ফুঁসতে লাগলেন। আর নিজেকে সংযত রাখতে পারলেন না।  ফ্যাকাসে মুখ করে সুলতানকে সালাম দিয়ে বললেন,--‘জাঁহাপনা আল্লাহ তা’য়ালার কাছে আপনার সুখী ও দীর্ঘ জীবন কামনা করি! আপনার কাছে একটা ইচ্ছা ছিল। যদি অনুমতি দেন তবে বলতে পারি--’
--কি? কি সে-ইচ্ছা? যা বলতে চাইছেন তা বিনা বাধায় বলতে পারেন।
‘যে ব্যক্তি শ্রদ্ধার সঙ্গে বকশিস গ্রহন করে না, শ্রদ্ধার লেশমাত্রও যার মধ্যে নেই তাকে দান করার অর্থই হচ্ছে অযোগ্যকে ও অপাত্রে দান করা’
সুলতান উনান রেগে উঠলেন--‘আবোলতাবোল কথা না  যা বলতে চাইছেন, তা স্পষ্ট করে বলুন। কে সে শ্রদ্ধাহীন ব্যক্তি? কাকে দান করে আমি বোকামির কাজ করেছি।?’
উজির এবার মনে সাহস অবলম্বন করে, হাকিমের দিকে অঙ্গুল নির্দেশ করে বললেন, ‘এই সেই দানের অযোগ্য ব্যক্তি। এরকম বেইমান সারা দুনিয়াতে দ্বিতীয় আর একজন আছে কি না সন্দেহ। আপনি যেভাবে মুক্ত হাতে ধন দৌলত এই ব্যক্তির কাছে দান করছেন তাতে শীঘ্রই আপনার রাজকোষ শূণ্য হয়ে যাবে।

সুলতান উনান ধমক দিয়ে উঠলেন--‘মুখ সামলে কথা বলবেন! আপনার সাহস তো কম নয়! আমার কাজের সমালোজনা করছেন!’ আর কার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন তা হয়ত আপনি নিজেও জানেন না। হেকিম সাহেব আমার জীবন ফিরিয়ে দিয়েছেন। তা না হলে এতদিনে হয়ত আমার আশ্রয় হত গোরস্থানের মাটির তলায়। উপকারীর ঋণ শোধ হয় না। আমার বশ্বিাস, আমার রাজ্যটা তাঁর হাতে তুলে দিলেও তাঁর প্রাপ্যের চেয়ে কমই দেওয়া হত। আসলে আপনার মনে আছে শুধু ঈর্ষা। তাই এরকম কথা আপনি বলতে পারলেন।’

সুলতানের এমন কথা শোনার পর উজির মাথা নিচু করে চুপ করে রইলেন। হেকিম রায়ান সুলতানের অনুমতি নিয়ে দরবার কক্ষ ত্যাগ করলেন।

গল্প বলতে বলতে বেগম শাহরাজাদ দেখল, প্রাসাদের বাইরের বাগানে আলো দেখা যাচ্ছে। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। তখন সে গল্প বলা বন্ধ করল।

দুনিয়াজাদ আনন্দে বলে উঠল,‘দিদি, তোমার মুখের গুল্প যতই শুনি ততই যেন শুনতে মন চায়।’

বেগম শাহরাজাদ হেসে বলল, যদি জীবন বাঁচা তবে কাল আরো সুন্দর সুন্দর গল্প শোনাব। বাদশা মনে মনে বললেন,‘এমন সুন্দর সুন্দর গল্প শোনার লোভে অন্তত একে আরো কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য