মোগলি : দ্য জঙ্গল বুক | পর্ব-২ |

   এক সময় নিজের মনেই বলে উঠল, আরে! এ তো মানুষের কচি বাচ্চার কান্নার শব্দ। শিশুটা এই জঙ্গলে এলো কী করে?
   জঙ্গলের শেষ প্রান্তে ফসলের ক্ষেতের ওপারে মানুষের গ্রামেও রীতিমত যাতায়াত আছে বাঘিরার।
   সেই সূত্রে মানুষের চাল-চলন, স্বভাব একেবারে অজানা নয় তার।
   মানুষের গলা থেকে বেরিয়ে আসা অনেক শব্দের সঙ্গেও সে বিলক্ষণ পরিচিত; শিশুর কান্নার শব্দ ভাষাহীন ধ্বনি মাত্র হলেও সেই ধ্বনিতে মিশে থাকে শিশুর মনের অনেক ভাব অনুভব। সেই অনুভবের স্পর্শ কী জানি কি করে দোলা জাগলো কাল প্যান্থার বাঘিরার মনে ।

   কিছুক্ষণ কান পেতে শব্দটা শুনে সে যেন নিজেকেই শুনিয়ে বলে উঠল, সর্বনাশ। এ যে খিদের কান্না। এ সময়ে খাবার না পেলে কাঁদতে কাঁদতে যে মারা পড়বে বাচ্চাটা। আহা রে!
   বলতে বলতে চঞ্চল হয়ে উঠল বাধিরার দৃষ্টি।

   পিঠময় নুয়ে থাকা লোমের ওপর খেলে গেল একটা অদ্ভুত ঢেউ। দু’একবার ইতস্ততঃ করে হঠাৎ ঝুপ করে গাছ থেকে মাটিতে লাফিয়ে নেমে পড়ল বাঘিরা।
   হাওয়ায় বার কতক নাক টেনে টেনে কিসের গন্ধ শুকল।
   তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে চলল কান্নার শব্দটাকে অনুসরণ করে।
   বঘিরা যদি জানতে পেত যার দিকে সাগ্রহে কৌতুহল ও সহানুভূতি নিয়ে সে এগিয়ে চলেছে, তার সঙ্গে ভবিষ্যতে তাকে কতটা জড়িয়ে পড়তে হবে তাহলে হয়তো বুনো স্বভাবটাই এসময়ে তার মধ্যে সবার আগে কাজ করত ।
   একে বিদঘুটে শব্দ। তার ওপর সেই শব্দটা মানুষের বাচ্চার গলা থেকে বেরনো।
   এর পর পিঠটান দেওয়াই তো রীতি । 
   দু’-পেয়ে মানুষকে সব জানোয়ারেরই ভয়। তবে বাচ্চাটা মানুষের হলেও শিশু তো বটে। তার দিক থেকে ভয়ের কিছু নেই বুঝতে পেরে আর কান্নাটা যে খিদের তা ধরতে পেরেই নির্ভাবনায় সেদিকে পা বাড়াল বাঘিরা।
   কাছে গিয়ে দেখল, না, আশপাশে কোন বয়স্ক মানুষ নেই। গাছের নিচেই গোড়া ঘেসে একটা ছোট্ট ধামায় ন্যাকড়া জড়ানো শিশুটা শুয়ে হাত-পা ছুড়ছে আর পরিত্রহী চিৎকার করছে।
   ক্ষুধার্ত শিশুর কান্নার তীক্ষ্ণ শব্দটা যেন বুকে এসে বিঁধতে লাগল বাঘিরার। সে স্থির করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বাচ্চাটার দিকে।
   তার মাথায় তখন ভাবনা চলছে-এখুনি মানুষের গ্রামে নিয়ে যেতে না পারলে তো এটাকে বাঁচানো যাবে না। কিন্তু এখান থেকে সব চেয়ে কাছের গ্রামটাও যে কয়েকদিনের পথ। আমি এখন কি করি!
   বনের হিংস্র পণ্ড নিজের অজান্তেই বাঁধা পড়ে গেল মানব শিশুর টানে। বাঘিরা ভেতরে ভেতরে বড়ই অস্থির আর উতলা হয়ে উঠল ।
   সে বুঝতে পারছিল, খিদেয় কাতর শিশুটা শিগগিরই খাবার কিছু না পেলে একেবারেই মারা পড়বে।
   মানুষ অথবা পশু সব শিশুরই খিদের কান্নার ভাষা বুঝি একই। তাই সেই কান্না শুনে আর স্থির থাকতে পারছে না বাঘিরা।
   সে দ্রুত ভাবতে শুরু করল, এই সময় মানুষের গ্রামে একে নিয়ে যাওয়ার কথা চিন্তা করা বৃথা। এখুনি এর খিদে মেটাতে পারে এমন কে আছে আশপাশে-জান চেনার মধ্যে !
   আবার কেবল চেনা-জানা হলেই তো হবে না, তাদের ঘরে বাচ্চা থাকা চাই, যেই বাচ্চা মায়ের বুকের দুধ খায়।
   মানুষের খোকার এখন ভরপেট দুধ চাই। 
   ভাবতে ভাবতে সহসা খুশিতে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল বঘিরার।
   হ্যাঁ, মনে পড়েছে—কাছেই তার পরিচিত একটা নেকড়ে পরিবার থাকে। কিছুদিন আগেই তাদের ঘরে নতুন বাচ্চাও এসেছে।
   পরিবারের কর্তা রামা-সে হল বাবা-নেকড়ে। কথাটা মনে পড়ার পর আর মূহূর্ত মাত্র দেরি করল না বাঘিরা এগিয়ে গিয়ে ন্যাকড়া জড়ানো ধামার একটা দিক আলতো করে কামড়ে ধরে বাচ্চা শুদ্ধ সেটাকে মাটি থেকে তুলে নিল।
   বাচ্চাটা তখনো গলা-চিড়ে কেঁদে চলেছে।
   ধামাতে নাড়া পড়া মাত্র মূহুর্ত কয়েকের জন্য তার কান্নার বেগ কমে এলো। স্পর্শের আশায় ক্ষণিকের জন্য কান্না থামাল।
   কিন্তু তেমন কোন ছোঁয়া না পেয়ে আবার সে আগের মতই চিৎকার করে কাঁদতে আরম্ভ করল। ঘন ঘন ছোট লাফ দিয়ে ঝোপ-ঝাড় ডিঙিয়ে অদূরে পাহাড়ের একটা ছোট গুহার মুখে এসে দাঁড়াল বাঘিরা।
   এই গুহাতেই থাকে নেকড়ে রামা তার বৌ আর বাচ্চাদের নিয়ে।
   গুহার ভেতরে সরাসরি ঢুকে পড়ল না বাঘিরা। কিংবা হাকড়াকও কিছু করল না।
যেমনি আলতো করে সতর্কভাবে মুখে করে এনেছে বাচ্চার ধামাটা তেমনি সতর্কতার সঙ্গেই সেটাকে গুহার মুখের কাছে মাটিতে নামিয়ে রাখল। বাঘিরা জানে, মায়ের মনের দিক থেকে সকলেই এক ।
   সে মানুষই হোক আর জন্তুই হোক। মায়েদের কাছে সব শিশুই সমান—সে নিজের সন্তানই হোক আর অন্যের সন্তানই হোক।
   যে-কোন মায়ের কাছে যে-কোন শিশুকে রেখেই নিশ্চিন্ত হওয়া যায়।
   রামার বৌ-মা-নেকড়ের কানে মানুষের বাচ্চাটার খিদের কান্না পৌছলে সে কিছুতেই স্থির থাকতে পারবে না । মায়ের মন কেঁদে উঠবে নিশ্চিত। 
   মা-নেকড়ে ঠিক বাচ্চাটাকে খাওয়াবার ব্যবস্থা করবে।
   শিশুটার কান্নার বিরাম নেই। বড় বেশি খিদে পেয়েছে যে ।
   ধামা নামিয়ে রেখেই দ্রুত পায়ে পিছিয়ে গিয়ে ঝোপের ভেতরে গা-ঢাকা দিল বাঘিরা। কিন্তু চোখ ধরে রাখল গুহার মুখের দিকে। কান রইল সজাগ প্রহরীর মত—অন্য কোন জন্তুর অতর্কিত আবির্ভাবের আশঙ্কায়। বাবা নেকড়ে রামার সম্পর্কে রয়েছে তার খানিকটা শঙ্কা ।
  রামা এমনিতে বড়ই ভাল। কিন্তু বড় খুঁতখুতে স্বভাবের। মানুষের বাচ্চাটাকে দেখে যদি সন্ধিগ্ধ হয়ে পড়ে!
  মানুষদের তো জঙ্গলের জন্তুর বন্ধু ভাববার সুযোগ পায় না বড় একটা। তাই মনে থাকে তাদের ভয় আর সন্দেহ।
শত্রু ভেবে বাচ্চাটাকে আঁচড়ে কামড়ে দেয়া রামার পক্ষে অসম্ভব তো নয়।
   তাই বাচ্চাটাকে ঠিক জায়গায় এনে ফেলতে পেরেছে জেনেও বঘিরা পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারল না। কান সজাগ করে ঘাড় উঁচিয়ে ঝোপের পাতার ফাঁকে মাথা জাগিয়ে গুহার মুখের দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
   কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটল ঘটনাটা। রামা হঠাৎ ব্যস্তভাবে ছুটে এলো গুহার বাইরে। ধামাটার কাছ বরাবর এসে থমকে দাঁড়িয়ে সন্দিগ্ধভাবে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ।
   তারপর পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে ধামার গায়ে নাক ঠেকিয়ে শুকে শুকে দেখতে লাগল। একরকম প্রায় পেছন পেছনই এসে জুটল রামার বউ-মা-নেকড়ে।

   কেঁদে কেঁদে বাচ্চাটা নিশ্চয় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।তাই তার কান্নায় আগের মত জোরালো ভাবটা এখন অনেকটাই কম। কিন্তু কান্নার বিরাম নেই। 
   মা-নেকড়ে সোজা গিয়ে দাঁড়াল ধামাটার একপাশে ।
   রামার দিকে তাকিয়ে গভীর গলায় বলল, তোমার এখানে কি? মানুষের খোকা এ তো দেখেই চিনতে পারছ, তার আবার অত শোকাশুকির কি আছে ?
   রামা থতমত খেয়ে অপরাধী অপরাধী মুখ করে দু'পা পিছিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, না-মানে এই তো —দেখছিলাম আর কি
   বেশ করেছ, এবারে নিজের কাজে যাও। অমন কচি বাচ্চা--আহা, কেঁদে কেঁদে গলা শুকিয়ে গেল--

   বলে মা-নেকড়ে নাক বাড়িয়ে বাচ্চাটার গায়ের গন্ধ শুকল দু'বার। তারপর বিশেষ কিছু ভাবনা চিন্তা করল না ধামাটার একমাথা কামড়ে ধরে তুলে নিয়ে চলে গেল গুহার ভেতরে।
   রামা হতভম্বের মত কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর সে-ও একসময় গুটি গুটি পায়ে গুহায় গিয়ে ঢুকল।
   বাঘিরা আড়ালে দাঁড়িয়ে সবই দেখতে পেল। এবারে এতক্ষণ বাদে তার স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল।
   যাক, মানুষের বাচ্চাটার একটা হিল্লে তো করা গেল। খিদেয় আর কষ্ট পাবে না--অযত্ন অবহেলায় অসহায় ভাবে জঙ্গলে পড়ে থেকে তাকে মরতে হবে না ।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য