যাকে যেমন দেখবেন, সেও তেমনি দেখবে

রাজ্যের লোকেরা তার সম্বন্ধে কী ধারণা পোষণ করে, তা পর্যবেক্ষণ করতে একদিন বাদশা আকবর বীরবলকে সঙ্গে নিয়ে ছদ্মবেশে বেরিয়ে পড়লেন।
অবশেষে রাজপথ ছাড়িয়ে গ্রামের পথ পেরিয়ে ক্রমশ তারা জঙ্গলের পথ দিয়ে এগিয়ে চললেন। পথে একটি কাঠুরিয়াকে জঙ্গলের পথ দিয়ে যেতে দেখে আকবর বীরবলকে বললেন,‘লোকটার সাহস তো খুব। আমার অনুমতি ছাড়াই সে জঙ্গলে কাঠ কাটে। এ-কথা তো ভাল নয়, এর একটা ব্যবস্থা করতে হবে। কেউ যেন বিনা অনুমতিতে জঙ্গল থেকে কাঠ কাটতে না পারে।”
আকবর মনে মনে ক্রুদ্ধ হলেন কাঠুরিয়ার প্রতি, কিন্তু তিনি মনের ভাব গোপন করে কাঠুরিয়াকে ডেকে বললেন,‘তুমি কি জানো না আজ বাদশা আকবর মারা গেছেন, যাঁর জঙ্গল থেকে তুমি কাঠ চুরি করে কাটতে যাচ্ছ।’
এই খবর শুনে কাঠুরিয়া তার কুঠার তুলে ধেই ধেই করে নাচতে লাগল। আনন্দের আতিশয্যে সে বলল, বাদশা মারা যাওয়ায় আমাদের মতো গরিবদের খুবই ভাল হল। সম্রাট আমাদের শত্রু ছিলেন। তার কড়া শাসনে আসলে আমাদের দুৰ্গতির সীমা ছিল না ; বাদশা মরলেন ভালই হল, পৃথিবীর এক পাপ বিদায় হল। আমরা এবার মনে আনন্দে কাঠ কেটে সংসার চালাব।’
কাঠুরিয়ার কথা শুনে গভীর হয়ে গেল আকবরের মুখ। তিনি কোনও কথা না বলে বীরবলকে নিয়ে জঙ্গলের পথে পা চালালেন। দূরে তাঁর নজরে পড়ল, একটা বুড়ি মাথায় ঘাসের বোঝা চাপিয়ে আস্তে আস্তে যাচ্ছে। বুড়ির ওপর আকবরের খুব মায়া হল।

তিনি বীরবলকে বললেন, দুবেলা অন্নসংস্থান করতে এই বুড়ির কী পরিশ্রমটাই না সারাদিন করতে হয়। কোমরটা তার বেঁকে গেছে। এসব খেটে খাওয়া অসহায় বয়স্কা মেয়ে-ছেলেদের জন্য আমি রাজ তহবিল থেকে মাসোহারা দেওয়ার ব্যবস্থা করব—এটা আমার অত্যন্ত জরুরি কর্তব্য। তুমি গিয়েই বিল পেশ করতে ভুল করবে না।’

দেশের বাদশা সম্বন্ধে এই বুড়ি কী ভাবে, তা জানার জন্য আকবরের ভীষণ কৌতুহল হল। বুড়ির কাছে গিয়ে তিনি তাকে দাঁড় করিয়ে বললেন, তুমি জানো না, আজ বাদশা আকবর মারা গেছেন, আমরা এখনি দেখে এলাম।

বুড়ি এ-কথা শুনে মাথার ঝুড়ি মাটিতে ফেলে দিয়ে হাউহাউ করে কেঁদে উঠল। ওমা কী সর্বনাশ হল! আমাদের বাদশা যে আর আমাদের মধ্যে নেই! কী হবে গো। তার মতো দয়ালু বাদশা আর কোনওদিন হবে না। কত দানধান তিনি করতেন। আমাদের বাদশার যে দয়ার সীমা ছিল না! এবার আমাদের নির্ঘাত না খেয়ে মরতে হবে।’

আকবর এরপর বীরবলকে নিয়ে রাজপ্রাসাদের দিকে রওনা দিলেন। মনের মধ্যে অনেক চিন্তা করতে করতে চলেছেন। অনেক ভেবেচিন্তে তিনি যেতে যেতে বীরবলকে জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার বলো তো, দু'জন লোক আমার সম্বন্ধে দু’রকম মত পোষণ করল! আমার আচরণের মধ্যে কি সামঞ্জস্য নেই? তোমার কী মনে হয়?
বীরবল উত্তর দিলেন, জাঁহাপনা, আপনি যাকে যে দৃষ্টিতে দেখবেন সেও আপনাকে একই দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখবে, অর্থাৎ আপনি যার প্রতি খারাপ মনোভাব পোষণ করবেন সে আপনাকে খারাপ দৃষ্টিতে দেখবে, আর যাকে আপনি ভাল চোখে দেখবেন সে আপনাকে ভাল দৃষ্টিতে দেখবে। এটাই দুনিয়ার নিয়ম হুজুর।
বীরবলের এই কথায় আপন কর্মকৃতির ফল উপলব্ধি করে আকবর অভিভূত হয়ে বীরবলের পিঠ চাপড়িয়ে বললেন, ‘তোমার কথাই ঠিক বীরবল |’

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য