বত্রিশ পুতুলের উপাখ্যানঃ গোড়ার কথা

   বিক্রমাদিত্য ক্রমে খুবই শক্তিশালী হয়ে উঠলেন। তাল বেতাল সঙ্গে থাকায় কেউ আর তাঁর সমকক্ষ হতে পারল না। আন্তে আস্তে তিনি সমগ্র পৃথিবীর রাজা হয়ে উঠলেন ।
   বিশ্বামিত্র মুনি একবার কঠোর তপস্যা শুরু করেন। এই তপস্যা ভঙ্গের জন্য দেবরাজ ইন্দ্র রম্ভা ও উর্বশীকে ডেকে বললেন, তোমাদের মধ্যে যে বিশ্বামিত্রের তপস্যা ভাঙতে পারবে তাকে আমি অনেক পুরস্কার দেব।
   রস্তা ও উর্বশী দু'জনেই বললো, প্রভু, আমিই সবচেয়ে ভাল নাচি, আমাকেই পাঠান মুনির তপস্যা ভাঙাতে ।
   তখন ইন্দ্র পড়লেন মহা সমস্যায়। কারণ দুজনেই নাচে গানে সমান, কাকে ছেড়ে কাকে পাঠাবেন! আর দু'জনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কে তাই বা কি করে বোঝা যাবে ?
   বিক্রমাদিত্য নামে এক রাজা আছেন। তিনি সমস্ত বিদ্যায় পারদর্শী-তিনিই পারবেন এর মীমাংসা করতে ।
  নারদের কথায় দেবরাজ  তাঁর সারথি মাতলিকে পাঠালেন বিক্রমাদিত্যকে নিয়ে আসার জন্য। বিক্রমাদিত্য তখনি তার সাথে এলেন। সভা খুব সুন্দর করে সাজানো হল। প্রথম দিন রম্ভা আর দ্বিতীয় দিন উর্বশী নাচ দেখাল।
বিক্রমাদিত্য উর্বশীকে বিজয়ী ঘোষণা করলেন। দেবরাজ এর কারণ জানতে চাওয়ায় তিনি বললেন, হাত ও পা যার সমানভাবে চলে সেই নাচে শ্রেষ্ঠ । উর্বশীর নাচে এই গুণগুলি ছিল।
   বিক্রমাদিত্য নাচের সম্বন্ধে যে ব্যাখ্যা দিলেন তাতে দেবরাজ খুবই খুশি হয়ে তাঁকে অনেকরকম পোশাক আর অপূর্ব রত্নখচিত এক সিংহাসন উপহার দিলেন। সিংহাসনে বত্ৰিশটা পুতুল আছে, তাদের মাথায় পা রেখে সেই সিংহাসনে বসতে হয়।
   বিক্রমাদিত্য সেই সিংহাসন নিয়ে উজ্জয়িনীতে ফিরে এলেন। তারপর শুভ দিন দেখে সিংহাসনটি প্রতিষ্ঠিত করে তার উপর বসে রাজ্যপরিচালনা করতে লাগলেন ।
   এরপর বহুবছর কেটে গেছে। একদিন উজ্জয়িনীতে ভূমিকম্প, দাবানল, ধূমকেতু--এই সব দেখা দিতে লাগল। পণ্ডিতরা বললেন, এর মানে রাজার খারাপ সময় এসেছে।
   বিক্রমাদিত্য বললেন, আমি একবার তপস্যা করে ভগবানকে সন্তুষ্ট করি । ভগবান আমায় বলেন, তোমার তপস্যায় আমি সন্তুষ্ট হয়েছি, তুমি অমরত্ব বর চাও। আমি বললাম, ভগবান, যখন কোন আড়াই বছরের মেয়ের ছেলে হবে, তার হাতেই যেন আমি মরি। ভগবান আমাকে ঐ বর দিলেন। সুতরাং বুঝতে পারছেন এ জিনিস হওয়া কখনো সম্ভব নয়।
   কিন্তু পন্ডিতেরা নিশ্চিন্ত হতে পারলেন না। বললেন, মহারাজ, আপনি বরং একবার খোঁজ নিয়ে দেখুন এমন কোন ছেলে আছে কিনা।
   কিন্তু বললেন, মহারাজ, আপনি বরং একবার খোঁজ নিয়ে দেখুন এমন কোন ছেলে আছে কিনা !
   বিক্রমাদিত্য তখন বেতালকে ডেকে হুকুম দিলেন ঐ ধরনের কোন ছেলে আছে কিনা খোঁজার জন্য।
   বেতাল ঘুরে এসে খবর দিল, মহারাজ, প্রতিষ্ঠান নগরে এক ব্রাহ্মণের বাড়িতে এমন একটি অদ্ভুত ছেলে দেখেছি। ছেলেটির নাম শালিবাহন, আর তার বাবার নাম শেষ নাগ। ব্রাহ্মণ বললো, তার মেয়ের বয়স যখন আড়াই বছর, তখন ঐ ছেলেটি জন্মেছিল।
   বিক্রমাদিত্য অমনি তলোয়ার হাতে প্রতিষ্ঠান নগরের দিকে চললেন । সেখানে শালিবাহনকে দেখে তলোয়ার নিয়ে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। অমনি শালিবাহন তাঁকে এক লাঠির বাড়ি মারলো। সেই বাড়ির আঘাতে বিক্রমাদিত্য একেবারে উজ্জয়িনীতে এসে পড়লেন । তার কিছুদিন পরেই তিনি মারা যান ।
   বিক্রমাদিত্যের সিংহাসন শূন্য, কারণ তাঁর কোন ছোলপুলে ছিল না। সবাই হায় হায় করতে লাগল। জানা গেল দু’মাস পরে এক রাণীর ছেলে হবে । তখন মন্ত্রীরা রাজার প্রতিনিধি হয়ে রাজ্য চালাতে লাগলেন। সিংহাসন খালিই রয়ে গেল ।
   একদিন রাজসভায় দৈববাণী হলো, হে মন্ত্রীবৃন্দ, এই সিংহাসনে বসার উপযুক্ত কোন রাজা পৃথিবীতে নেই, তাই এই সিংহাসন কোন পবিত্র জায়গায় রেখে দেওয়া হোক |
   সেই মত কাজ করা হলো। মন্ত্রীরা সিংহাসনটি একটা পবিত্র জায়গায় রেখে দিলেন। ক্রমে তার উপর ধূলো বালি জমতে জমতে একেবারে মাটির নীচে চাপা পড়ে গেল। সবাই তার কথা একেবারে ভুলে গেল।
   এই ঘটনার পর অনেক বছর কেটে গেছে । উজ্জয়িনীতে তখন ভোজরাজ রাজত্ব করছিলেন। যেখানে সেই পবিত্র সিংহাসনটি রাখা হয়েছিল সেখানে এক ব্রাহ্মণ শস্যক্ষেত তৈরি করলেন । অনেক শস্য হলো । উচু জায়গায় একটি মাঁচা তৈরি করে পাখিদের তাড়িয়ে শস্য রক্ষা করতেন ব্রাহ্মণ ।
   একদিন ভোজরাজ রাজকুমারদের সঙ্গে নিয়ে সেই ক্ষেতের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ব্রাহ্মণ মাঁচার উপর থেকে বললেন, মহারাজ, এই ক্ষেতে প্রচুর শস্য উৎপন্ন হয়েছে, আপনি সৈন্যসামন্ত নিয়ে এসে যেমন খুশি গ্রহণ করুন, অশ্বগুলিকে শস্যদানা খেতে দিন। আপনি অতিথি হিসাবে আজ এখানে উপস্থিত হয়েছেন বলে আমার জন্ম সার্থক।
রাজা ব্ৰাহ্মণের এই কথা শুনে সৈন্যসহ ক্ষেতের মধ্যে ঢুকলেন । তখন ব্রাহ্মণ মাঁচা থেকে নেমে এলেনে। তারপর রাজাকে বললেন, মহারাজ, কেন এমন অধাৰ্মিকের মত কাজ করছেন? আপনি ব্রাহ্মণের এই ক্ষেতটি নষ্ট করলেন । কেউ অন্যায় করলে যেখানে আপনি তার বিচার করেন সেখানে আপনি নিজেই অন্যায় কাজ করছেন।
   রাজা ব্ৰাহ্মণের কাছ থেকে এই সব ভৎসনা শোনার পর যেই ক্ষেতের বাইরে গেলেন অমনি ব্ৰাহ্মণ পাখি তাড়াবার জন্য সেই মাঁচার উপর গিয়ে উঠলেন। আবার রাজাকে সম্বোধন করে বললেন, মহাবাজ, যাচ্ছেন কেন? এই ক্ষেতে এবার প্রচুর শস্য হয়েছে, আপনার ঘোড়াগুলোকে যতখুশি খেতে দিন।
ব্রাহ্মণের এই কথা শুনে রাজা আবার অনুচরসহ সেই ক্ষেতের মধ্যে ঢুকলেন। আর ব্রাহ্মণও সেই মাঁচা থেকে নেমে এসে আবার আগের মত কথা বলতে লাগলেন।
তখন রাজা মনে মনে চিন্তা করলেন, এই ব্ৰাহ্মণ যখন মাঁচাতে ওঠেন তখন এর শুভবুদ্ধির আবির্ভাব হয়, আবার যখন ঐ মাঁচা থেকে নেমে আসেন তখন এ অন্য মানুষ। একবার ঐ মাঁচাতে উঠে দেখি ব্যাপারটা কি ।
   রাজা মাঁচাতে উঠলেন। তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে উপলব্ধি করলেন, জগতের দুঃখ দূর করা কর্তব্য, সকল ব্যক্তিরই দারিদ্র্য দূর করা কর্তব্য, আমার রাজ্যে একজনও দরিদ্র থাকবে না। দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন অবশ্য কর্তব্য। রাজা বুঝলেন এই স্থানটি খুবই পবিত্র ।
   কি করে এই ক্ষেতের মহাত্ম্য জানা যায় এই চিন্তা করে ব্ৰাহ্মণকে ডেকে বললেন, ওহে ব্ৰাহ্মণ, ক্ষেত থেকে তোমার কি পরিমাণ উপার্জন হয় ?
   ব্ৰাহ্মণ বললেন, মহারাজ, আপনার মত বিচক্ষণ ব্যক্তিকে আর কি বলব। আপনি যা ভাল মনে করবেন তাই ঠিক হবে 
   তারপর রাজা সেই ব্রাহ্মণকে প্রচুর ধনরত্ন দিয়ে সন্তুষ্ট করে ক্ষেত খোড়ার আদেশ দিয়ে গেলেন। এক মানুষ সমান খোঁড়া হলে একটি সুন্দর পাথর দেখা গেল। তার নীচে নানা রত্ন খচিত অতি সুন্দর দেখতে একটি সিংহাসন ! সিংহাসনে বত্ৰিশটা পুতুল রয়েছে। সিংহাসন দেখে রাজা ভোজরাজ খুব খুশি। রাজধানীতে নিয়ে যাবার জন্য সিংহাসনটিকে ওঠাতে গেলেন, কিন্তু কিছুতেই ওঠানো গেল না।
   রাজা তখন মন্ত্রীকে বললেন, ব্যাপারটা কি, সিংহাসন তো উঠছে না ?
   মন্ত্রী বললেন, রাজন, এই সিংহাসন বলি, হোম ও পূজা না দিলে উঠবে না। 
   তাঁর কথা শুনে রাজা ব্রাহ্মণদের ডেকে তাঁদের বিধানমত সমস্ত অনুষ্ঠান করলেন। তখন সেই সিংহাসন হালকা হয়ে উঠে আসতে লাগল।
   রাজা মন্ত্রীকে বললেন, এই সিংহাসনকে কিছুতেই তোলা যেত না, কিন্তু আপনার বুদ্ধিবলেই এটা সম্ভব হলো। সত্যি বুদ্ধিমানদের কাছে থাকাও পরম সৌভাগ্য ।
   মন্ত্রী বললেন, মহারাজ, যে নিজে বুদ্ধিমান নয়, আবার অন্যের বুদ্ধিও নেয় না, তার সর্বনাশ হয়। আপনি বুদ্ধিমান হয়েও অন্যের কথা শোনেন, সুতরাং আপনার কোনদিনই কোন অসুবিধা হবে না।
   মন্ত্রীর কাজই হল রাজাকে সুবুদ্ধি দিয়ে সৎপথে চালনা করা। রাজা যদি কোন অন্যায় কাজ করতে যান, তাকে বাধা দেওয়াও মন্ত্রীর কর্তব্য। যেমন নন্দরাজমন্ত্রী বহুশ্রুত রাজার ব্রহ্মহত্যা বন্ধ করেছিলেন।
   ভোজরাজ বললেন, কেমন করে?
   মন্ত্রী বললেন, তবে শুনুন সেই কাহিনী ।
   বিশালা নগরীতে নন্দ নামে এক রাজা ছিলেন। সমস্ত বিরোধী রাজাকে তিনি নিজের অধীন করে একচ্ছত্র রাজ্য স্থাপন করেছিলেন। সেই রাজার পুত্রের নাম ছিল জয়পাল। মন্ত্রীর নাম বহুশ্রত ও স্ত্রীর নাম ভানুমতী ।
  ভানুমতীকে তিনি অত্যন্ত ভালবাসতেন। তাঁকে ছেড়ে এক মুহূর্তও থাকতে পারতেন না। যখন তিনি সিংহাসনে বসতেন ভানুমতীকে বসাতেন তাঁর পাশে ।
   মন্ত্রী একদিন রাজাকে বললেন, মহারাজ, আপনার কাছে আমার একটা আবেদন আছে।
   রাজা বললেন, বল । মন্ত্রী বললেন, মহারাণী ভানুমতী সভায় আপনার পাশে বসেন, শাস্ত্রকারেরা কিন্তু বলেন এটা অনুচিত। রাজা বললেন, সবই জানি, কিন্তু কি করব, ভানুমতীর প্রতি আমার অনুরাগ প্রবল, একে পরিত্যাগ করে ক্ষণকালও আমার পক্ষে থাকা সম্ভব না |
   মন্ত্রী বললেন, তাহলে এক কাজ করুন। চিত্রকরকে ডাকিয়ে এনে তাকে দিয়ে মহারাণীর একটা ছবি আঁকিয়ে নিন। সেই ছবি সব সময় চোখের সামনে রাখুন।
   মন্ত্রীর কথা রাজারও মনে ধরল। তখনই চিত্রকরকে ডাকা হল। চিত্রকর এলে তাকে বললেন, তুমি ভানুমতীর একটা ছবি এঁকে দাও । ঠিক যেন তাঁর মত হয়।
   চিত্রকর বললো, মহারাজ, আমি তাঁকে একবার সামনাসামনি দেখতে পেলেই হুবহু একে দিতে পারব।
   চিত্রকরের কথামত রাজা ভানুমতীকে এনে চিত্রকরকে দেখালেন। চিত্রকরও রাণীকে দেখে ভালকরে একটা ছবি এঁকে এনে রাজাকে দেখালেন। রাজা ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে চিত্রকরকে উপযুক্ত পুরস্কার দিলেন।
   একদিন রাজগুরু শারদানন্দ এসে ভানুমতীর ছবি দেখে চিত্রকরকে বললেন, ওহে চিত্রকর, ভানুমতীর সব লক্ষণগুলিই এঁকেছ কিন্তু একটি ভুল থেকে গিয়েছে।
   চিত্রকর বললো, কি ভুল হয়েছে বলুন।!
শারদানন্দ বললেন, ভানুমতীর বাম পায়ে তিলের মত একটি চিহ্ন আছে, তুমি সেটিকে বাদ দিয়েছ। বাস্তবিকই রাণীর পায়ে ঐ রকম একটা তিল আছে।
   রাজা কিন্তু এই কথা শুনে খুব রেগে গেলেন। মন্ত্রীকে ডেকে বললেন, মন্ত্রী, শারদানন্দ রাণীকে অপমান করেছেন । কারণ রাণীর পায়ে কেমন তিল আছে সেটা চিত্রকরকে বলা তার উচিত হয় নি। আমি ওঁর প্রাণদণ্ডের হুকুম দিলাম। তুমি তার ব্যবস্থা কর ।
   মন্ত্রী আর কি করেন! রাজ আদেশে তিনি শারদানন্দকে বধ্যভূমিতে নিয়ে গেলেন। তখন শারদানন্দ নিজের মনে বললো, মানুষের পূর্বের কোন পুণ্য থাকলে বিপদে তাকে রক্ষা করে।
   মন্ত্রী মনে মনে চিন্তা করলেন, এ সত্য হোক বা মিথ্যা হোক, আমি কেন ব্ৰহ্মহত্যা করে পাপের ভাগী হই ? এটা করা ঠিক হবে না। এই কথা ভেবে তিনি শারদানন্দকে নিজের বাড়ি নিযে গিয়ে মাটির তলার একটি ঘরে লুকিয়ে রেখে এসে রাজাকে বললেন, মহারাজ, আপনার আদেশ যথাযথ পালন করা হয়েছে।
   এই ঘটনার কিছুদিন পর রাজকুমার মৃগয়া করার জন্য বনে যাত্রা করলেন । যাত্রার সময় নানা অশুভ লক্ষণ দেখা গেল। অকালবৃষ্টি, বজ্রপাত, উল্কাপাত। মন্ত্রীর পুত্রের নাম বুদ্ধিসাগর । তিনি বললেন, কুমার জয়পাল, আজ আর মৃগয়ায় যেয়ে কাজ নেই, অনেক অশুভ লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
   কুমার জয়পাল বললেন, এইসব কুসংস্কারে আমার বিশ্বাস নেই।
   মন্ত্ৰীপুত্র বললেন, বুদ্ধিমানরা কিন্তু এগুলোকে মেনে চলেন। শাস্ত্রে আছে – যিনি বুদ্ধিমান তিনি বিষ সেবন, সাপের সঙ্গে খেলা, সাধুদের নিন্দা ও ব্ৰাহ্মণদের কখনও হিংসা করবেন না ।
   মন্ত্রীপুত্র এত করে বোঝালেও রাজকুমার তার কথা না শুনে মৃগয়ার উদ্দেশে যাত্রা করলেন।
   যাইহোক, রাজকুমার বনে গিয়ে অনেক হিংস্র পশু বধ করলেন। একটি কৃষ্ণকায় হরিণ দেখতে পেয়ে তার পিছু ধাওয়া করলেন এবং গভীর বনে প্রবেশ করলেন। হঠাৎ খেয়াল হল তিনি একা, সঙ্গে কোন সৈন্য নেই। যাকে ধাওয়া করে গভীর বনে প্রবেশ করেছিলেন সেই হরিণও অদৃশ্য। রাজকুমার এক ঘোড়ায় চড়ে চলতে লাগলেন। কিছুদূর গিয়ে একটি সরোবর দেখতে পেলেন । সেখানে ঘোড়া থেকে নেমে ঘোড়াকে একটা গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে সেই
   গাছের নীচে সবে বসেছেন এমন সময় ভীষণাকৃতি এক বাঘ সেখানে এসে উপস্থিত হলো। সেই ভীষণাকৃতি বাঘকে দেখে ঘোড়া তার সর্বশক্তি দিয়ে দড়ি ছিড়ে নগরের পথে ছুটল। রাজপুত্রও দারুণ ভয় পেয়ে কাঁপতে কাঁপতে ঐ গাছে গিয়ে উঠলেন। কিন্তু সেই গাছে ছিল একটা ভালুক। ভালুককে দেখে রাজপুত্র আরও ভয় পেয়ে গেলেন। 
   ভালুক বললো, তোমার কোন ভয় নেই, আমি এই গাছে বাস করি, তুমি আমার অতিথি। তুমি আমার শরণ নিয়েছ, সুতরাং আমি তোমার কোন ক্ষতি করব না। এই বাঘও তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। 
   ভালুকের আশ্বাস পেয়ে রাজপুত্র খুশি হলেন। বাঘ কিন্তু সেখান থেকে চলে না গিয়ে ঐ গাছের নীচেই বসে রইল। 
   সূর্য গেল অস্তাচলে। অন্ধকার নেমে এল ঐ বনে। সারাদিনের শ্রমে ক্লান্ত রাজপুত্রের দু'চোখে নেমে এল ঘুম। আর বসে থাকা সম্ভব হচ্ছে না তাঁর পক্ষে। ভালুক তখন তাঁকে বললো, নিদ্রাঘোরে গাছ থেকে পড়ে গেলে তোমার বিপদ হবে, তুমি বরং আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমোও। 
   অগত্যা রাজপুত্র ভালুকের কোলে মাথা রেখে বেশ আরামেই ঘুমিয়ে পড়লেন। বাঘ তখন ভালুককে সম্বোধন করে বললো, ওহে ভালুক, এই ব্যক্তি আবার কোনদিন শিকার করতে এসে আমাদের বধ করবে। এ আমাদের শক্র, একে কেন রক্ষা করছ? একে তুমি নীচে ফেলে দাও। একে খেয়ে আমি এখান থেকে চলে যাই।
   ভালুক বললো, এ যে চরিত্রের লোকই হোক, আজ আমার শরণাগত হয়েছে, তাই একে রক্ষা করা আমার পবিত্র কর্তব্য। শরণাগতকে বধ করলে মহাপাপ হবে।
   একসময় রাজপুত্রের ঘুম ভাঙল। তখন ভালুক রাজপুত্রকে বললো, আশা করি তোমার ক্লান্তি দূর হয়েছে। এখন আমি একটু ঘুমিয়ে নিই, তুমি সাবধানে থেক। এই কথা বলে ভালুক নিশ্চিন্তমনে ঘুমিয়ে পড়ল।
   এই সময় বাঘ রাজপুত্রকে সম্বোধন করে বললো, রাজকুমার, এই ভালুককে বিশ্বাস করো না। নখই এর অস্ত্র । শাস্ত্রে বলেছে, তীক্ষ্ণ নখ যাদের, তাদের বিশ্বাস করতে নেই, এদের বিশ্বাস করলে বিপদে পড়তে হয়। এই ভালুক আমার হাত থেকে তোমাকে রক্ষা করে ও নিজেই তোমাকে খাওয়ার মতলব করেছে--সেই কারণেই তোমার সঙ্গে এমন ভাল ব্যবহার করে তোমার মন জয় করার চেষ্টা করছে। সুতরাং এই সুযোগে তুমিই বরং ওকে নীচে ফেলে দাও, ওকে খেয়ে আমি চলে যাই।
তিনি ভালুককে যেই ঠেলে ফেলে দিয়েছেন অমনি পড়তে পড়তে গাছের ডাল ধরে ফেলে নিজেকে রক্ষা করল ভালুক ।
এবার রাজপুত্র ভয় পেয়ে গেলেন । ভালুক বললো, ওরে পাপিষ্ঠ, ভয় পাচ্ছ কেন? যেরূপ কর্ম করেছ তার ফল তোমাকে ভোগ করতেই হবে। এখন থেকে তুমি ‘সসেমিরা’ বলতে থাক আর পিশাচ হয়ে এই বনে ঘুরে বেড়াও ।
   সসেমিরা মানে সংকট অবস্থা ।
   এদিকে রাত ভোর হয়ে যাওয়ায় বাঘ এবং ভালুক দু’জনেই সেখান থেকে চলে গেল ।
রাজপুত্রও পিশাচ হয়ে বনে বনে ঘুরতে লাগলেন আর অনবরত ‘সসেমিরা’ বলতে লাগলেন।
   রাজপুত্রের ঘোড়া নগরে ফিরে গেল। নগরের লোকরা শূন্য ঘোড়া দেখতে পেয়ে রাজাকে ব্যাপারটা জানাল |
রাজা মন্ত্রীকে ডেকে বললেন, মন্ত্রী, কুমার যখন মৃগয়া করতে যাত্রা করেছিল তখন অনেক কুলক্ষণ দেখা গিয়েছিল। কিন্তু কুমার সে সব গ্রাহ্য করে নি, এখন তার ফল ফলল। নিশ্চয় কুমারের কোন বিপদ হয়েছে, আমি এখনই বনে যাব কুমারকে খুঁজতে ।
   মন্ত্রী বললেন, কুমারকে খুঁজে বের করাই এখন আমাদের একমাত্র কর্তব্য । চলুন, আমিও আপনার সঙ্গে যাব ।
কুমার যে পথে বনে গিয়েছিলেন সেই পথে সপারিষদ রাজা ও মন্ত্রী যাত্রা করলেন।
   তাঁরা অবাক হয়ে দেখলেন বনের মধ্যে ‘সসেমিরা’ বলতে বলতে পিশাচ হয়ে রাজপুত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে। রাজপুত্রের এই অবস্থা দেখে খুবই দুঃখ পেলেন রাজা। যাইহোক, রাজপুত্রকে নিয়ে নগরে ফিরে এসে যথোপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন। অনেক অভিজ্ঞ চিকিৎসক চিকিৎসা করলেন কিন্তু কোন চিকিৎসাতেই রাজপুত্র সুস্থ হলেন না।

রাজা তখন মন্ত্রীকে বললেন, এ সময় যদি শারদানন্দ জীবিত থাকতেন তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি রাজপুত্রকে সুস্থ করে তুলতেন । হায়! তাঁকে বধ করে কি অপরাধই না আমি করেছি। কোন কাজ করার আগে ভেবে চিন্তে না করলে পরে দুঃখ পেতে হয়।
   রাজা তখন ঘোষণা করে দিলেন, যে আমার  কুমারকে সুস্থ করতে পারবে তাকে অর্ধেক রাজত্ব দেব।
   বাড়িতে এসে মন্ত্রী শারদানন্দকে সব কথা  বললেন। সব শুনে শারদানন্দ বললেন, মন্ত্রীবর, আপনি রাজার কাছে গিয়ে বলুন, আমার একটি  কন্যা আছে, রাজপুত্র যদি তার সঙ্গে দেখা করেন তবে সেই কন্যা রাজপুত্রের আরোগ্যের উপায় বের  করবে।
 রাজা সপরিষদ মন্ত্রীর বাড়িতে এসে উপস্থিত  হলেন। রাজপুত্ৰও ‘সসেমিরা’ বলতে বলতে তাঁদের  সঙ্গে এলেন ।
   শারদানন্দ তখন পর্দার পেছন থেকে বললেন, যে বিশ্বস্ত তাকে বঞ্চনা করার মধ্যে কি নৈপুণ্য আছে? কোলের মধ্যে যে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে তাকে হত্যা করার মধ্যে কি পৌরুষ আছে?
এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ‘সসেমিরা’-র 'স' বাদ দিয়ে কেবল সেমিরা শব্দ উচ্চারণ করতে লাগলেন রাজপুত্র।
   তখন শারদানন্দ বললেন, সেতুবন্ধ রামেশ্বর ও গঙ্গাসাগরে গেলে ব্ৰহ্মহত্যার পাপ থেকে মুক্তি হতে পারে। কিন্তু যে ব্যক্তি মিত্রদ্রোহী, কোথাও তার মুক্তির সম্ভাবনা নেই।
   এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ‘সসে’ পরিত্যাগ করে কেবল 'মিরা' শব্দ বলতে লাগলেন রাজপুত্র।
শারদানন্দ তখন বললেন, যতদিন না মহাপ্রলয় উপস্থিত হয় মিত্রদ্রোহী, কৃতঘ্ন ও বিশ্বাসঘাতক ব্যক্তিকে ততদিন নরকে থাকতে হয়।
এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে কুমার ‘সিসেমি’ পরিত্যাগ করে কেবল 'রা’ শব্দ উচ্চারণ করতে লাগলেন |
শারদানন্দ তখন বললেন, মহারাজ, কুমারকে যদি সুস্থ করে তুলতে চান তবে ব্রাহ্মণদের দান করুন আর দেবতাদের আরাধন করুন !
একথা শোনার পর আবার সুস্থ এবং স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলেন কুমার! ভালুকের সঙ্গে তিনি যে ব্যবহার করেছেন—সব খুলে বললেন।
   তখন রাজা বিস্মিত হয়ে বললেন, কন্যা, তুমি কি করে ভালুক ও বাঘের কথা জানলে ?
   তখন পর্দার আড়াল থেকে শারদানন্দ বললেন, দেবতার কৃপায় আমার জিহ্বায় সরস্বতী সব সময় বাস করেন। তাই আমি সবকিছু জানতে পারি, যেমন জেনেছিলাম রাণী ভানুমতীর পায়ের তিল ।
   এই কথা শুনে রাজা পদটি সরাতেই শারদানন্দকে দেখতে পেলেন। তখন রাজা এবং অন্যান্য সকলে শারদানন্দকে প্ৰণাম করলেন।
   রাজা মন্ত্রীকে বললেন, মন্ত্রী, এখন একথা পরিষ্কার বুঝলাম যে সৎ সংসর্গে বাস করাই প্রত্যেকের কর্তব্য ! সৎ সংসর্গে বর্তমান এবং ভবিষ্যতের বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। আজ আমার পুত্র তোমার বুদ্ধির জন্যই রক্ষা পেল ।
   এইভাবে রাজা মন্ত্রীর উপর সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে পুরস্কৃত করলেন। রাজগুরুর আশীর্বাদ নিয়ে রাজ্য শাসন করতে লাগলেন।
   ভোজরাজকে এই গল্প শুনিয়ে মন্ত্রী বললেন, যে রাজা মন্ত্রীর পরামর্শ মত চলেন তিনি দীর্ঘায়ু হয়ে অনেকদিন রাজত্ব করেন।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য