মোগলি : দ্য জঙ্গল বুক | পর্ব-৩ |

   তার কর্তব্য ঠিক শেষ হল কিনা বুঝতে পারছিল না বাঘিরা। মানুষের বাচ্চার কান্না এখন আর তার কানে আসছে না। নেকড়ে-মায়ের কোলে শুয়ে নিশ্চয় সেটা এখন দুধ খাচ্ছে। আরো কিছুক্ষণ ঝোপের আড়ালে গা-ঢেকে থেকেই নেকড়ের গুহার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
   না, উদ্বিগ্ন হবার মত কিছুই আর তার নজরে পড়ল না।
   একসময় ঝোপ থেকে বেরিয়ে এসে লাফ দিয়ে একটা গাছের ডালে উঠে বসল বাঘিরা। নিজের মনেই বলল, থাক এখানেই। মাঝে মাঝে এসে দেখে যেতে হবে কেমন থাকে।
   গাছে গাছে লাফিয়ে বাঘিরা জঙ্গলে অদৃশ্য হয়ে গেল ।
   নেকড়েরা এমনই জীব যে প্রয়োজন হলে একটা ডিমকে একটুও না ভেঙে অনায়াসে মুখের মধ্যে রাখতে পারে। এমনি সতর্ক আর সাবধানী তারা। মা-নেকড়ে তার চারটে বাচ্চা যেখানে গুটিসুটি মেরে শুয়ে ঘুমোচ্ছিল সেখানে এসে ধামাটা মুখ থেকে নামাল ।
তারপর দুটো চোয়াল দিয়ে শিশুটার পিঠটাকে চেপে ধরল। শিশুটার নরম চামড়ায় দাঁতের একটা আঁচড়ও পড়ল না।
অনায়াসেই শিশুটাকে তুলে এনে নেকড়ে-মা তার বাচ্চাদের একপাশে নামিয়ে রাখল।
   কান্না তখনো চলছে। কিন্তু সেই কান্না কিছুক্ষণের মধ্যেই বন্ধ হয়ে গেল যখন নেকড়ে-মা শিশুটার পাশে শুয়ে তাকে নিজের বুকের দুধ খাওয়াতে আরম্ভ করল ?
   নেকড়ে-মা বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে স্নেহের সুরে বলে উঠল, একটুও ভয় পায়নি। কত ক্ষুদে-কেমন ন্যাংটো আর মাথায় চুল কত কমG
   রামা এসে কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে তার বউ এর কথাটা শুনল। বলল, ও যে অন্য বাচ্চাগুলোর খাবারই খাচ্ছে—
   নেকড়ে-মা বলল, পেট-ভরা খিদে নিয়ে এসেছে-আমাদের বাচ্চাদের সঙ্গেই ও মিলেমিশে থাকবে। দেখ দেখ, এর মধ্যেই কেমন একটা বাচ্চাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে।
   খুঁতখুঁতে রামা বলল, কিন্তু মানুষের বাচ্চাকে এভাবে পালন করা নিয়ে যদি দলে কথা ওঠে—
   নেকড়ে-মা বলল, সে তখন দেখা যাবে। জানতো মানুষ আর তার বাচ্চারা খুব জ্ঞানী হয়। বড় হয়ে এই বাচ্চাটা আমাদের অনেক কাজে আসবে। কোন নেকড়ে মা কি কোন দিন গর্ব করে বলতে পেরেছে যে একটা মানুষের বাচ্চা তার বাচ্চাদের সঙ্গে বড় হয়েছে? আমি সেই কাজটাই করব ।
   নেকড়ে-বাবা এবারে সামনের পা ভেঙ্গে আধাছুবনি পেতে বসে বলল, কিন্তু যে মানুষরা এটাকে এখানে রেখে গেছে তার একদিন ঠিক খুঁজে খুঁজে এসে নিয়ে চলে যাবে।
   দুধ টানতে টানতে মানুষের বাচ্চাটা একসময় ঘুমিয়ে পড়ল। নেকড়ে-মা নাক দিয়ে ঠেলে ঠেলে তাকে একপাশে কাত করে দিল।পরে বলল, নিয়ে গেলে যাদের বাচ্চা তাদের কাছেই বড় হবে, সে তো ভাল কথা ! সেই দিনটা আসার আগে পর্যন্ত পুঁচকেটা আমার বাচ্চাদের সঙ্গেই থাকবে- খেলবে- তুমি আছ আমি আছি—দুজনে মিলে দেখেশুনে রাখব। এ নিয়ে এত ভাবনা চিন্তার কি আছে ?
   মানুষের ছেলে মোগলি সেই দিন থেকে নেকড়ে মায়ের কাছেই থেকে গেল।
   দেখতে দেখতে সময় কেটে গেল। এক এক করে দশ-দশটা বর্ষ পার হয়ে গেল। মোগলি এখন দশ বছরের বালক। তার বালক হয়ে ওঠার আগেই নেকড়ে বাচ্চারা হয়ে উঠল এক একটি প্রাপ্তবয়স্ক নেকড়ে। মোগলিকে তারা দাদা বলে ডাকে।
   মোগলি তার চার নেকড়ে ভাইকে সঙ্গে নিয়ে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়, খেলা করে, শিকার ধরে।
   জঙ্গলের অধিবাসীদের জীবনে যতরকম দুর্ঘটনা ঘটতে পারে সে সবেরই এখন মোকাবিলা করতে শিখেছে মোগলি ।
   নেকড়ে-বাবা সব কিছু তাকে শিখিয়ে দিয়েছে। চেনা-জানার কাজটা সে জেনেছে কতক নেকড়ে মায়ের কাছেও।
   জঙ্গলে এমন সব শব্দ আছে যা শুনতে এক রকম কিন্তু অর্থটা অন্যরকম।
   কোন শব্দের কি অর্থ সেসব মোগলির আর জানার বাকি নেই।
  ঘাসের প্রতিটি শব্দ, বাতাসের নিঃশ্বাস, মাথার ওপর কাক-শকুন আর পেঁচাদের প্রতিটি ডাক, এমন কি জঙ্গলের জলাশয়ের জলে ছোট মাছের লাফিয়ে পড়ার শব্দ পর্যন্ত-সব কিছুর অর্থ মোগলি শিখে নিয়েছে।


   গত দশ বছর ধরে সে একটু একটু করে বড় হয়ে উঠেছে আর একটু একটু করে নেকড়ে-বাবা তাকে সেসব শিখিয়ে দিয়েছে।
   মোগলি যেমন সাঁতার কাটতে পারে, ঠিক ততটাই পারে গাছ বেয়ে উঠতে। একটা গাছের ডাল ধরে সে নাগাড়ে আধাঘণ্টা ঝুলতে পারে। জোড়-কদমে ছুটে চলা হরিণ বাচ্চাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে এগিয়ে যেতে পারে-এমন কি হোঁৎকা চেহারার নীল রঙের বুনো শুয়োরের পিঠেও সে সওয়ার হতে পারে। মোটকথা মোগলি এখন জঙ্গলের সব রকম দুর্ঘটনা থেকে মোটামুটি নিরাপদ ।
   সাপ, পাখি বা পশু কেউ আর তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।
   গাছে চড়া কাজটা কেমন করে করতে হয়, সেটা মোগলিকে দেখিয়ে দিয়েছে কাল প্যান্থার বাঘিরা।
   সব কিছু বুঝবার মত বয়স হবার আগে থেকেই বাঘিরা মোগলির সঙ্গী হয়েছে। সেই প্রথম দিন, বাঘিরা যেদিন ছোট্ট মোগলিকে নেকড়েদের গুহার মুখে রেখে গিয়েছিল, তারপর থেকে মাঝে মাঝেই সে জঙ্গলের পথ ধরে এসে হাজির হত গুহার মুখে ।
   নেকড়ে-বাবা বা নেকড়ে-মার সঙ্গে দেখা হলে সে মোগলির খবরাখবর নিত। কখনো ছোট্ট মোগলিকে তার মোলায়েম থাবার পিঠ দিয়ে আদর করে যেত ।
   মোগলি যখন সারা গায়ে কাদা মেখে টুকরো টুকরো পাথর ছুড়ে খেলা করত তার নেকড়ে ভাইদের সঙ্গে বাঘিরা অনেক দিনই সেই সময় এসে মোগলিকে পিঠে তুলে নিত। জঙ্গলের গলিঘুঁজি ধরে খুশিমত ঘুরে বেড়াত আর গল্প শোনাত ।

সেই সময়ই একদিন গাছে ওঠার কায়দাটা বাঘিরা মোগলিকে শিখিয়ে দিয়েছিল। প্রথম প্রথম মোগলি ভালুকের মতই খুব ধীরে ধীরে গাছে উঠত। বাঘিরার কায়দা রপ্ত করে অল্প ক'দিনের মধ্যেই সে গাছে ওঠায় দড় হয়ে উঠেছে।
   সাহসে ভর করে হনুমানের মতই একডাল থেকে ঝুল খেয়ে আরেকটা ডালে স্বচ্ছন্দে চলে যেতে শিখেছে।
কেমন করে বোঝা যায় গাছের কোন ডালটা পচা, আর কোন ডালটা শক্ত, কোন গাছে সাপ থাকে, দুপুরবেলা বাদুর ম্যাঙ বিরক্ত করলে তখন তাকে কি বলতে হয়, ঝিলের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে জলচর সাপদের কি বলে সতর্ক করে দিতে হয়—এসবের শিক্ষা জঙ্গলে ঘোরার ফাকে ফাঁকে মোগলিকে শিখিয়ে দিয়েছিল বাঘিরাই।
   আরো একটা মস্ত বিষয় শেখানো হয়েছিল মোগলিকে। জঙ্গলের কোন প্রাণীই বিরক্ত হওয়াটা পছন্দ করে না। কোন আগন্তুককে দেখলেই তারা তাকে তাড়া করে।
   পশুদের প্রত্যেকেরই শিকারের জন্য নিজ নিজ এলাকা ভাগ করা থাকে।
যখনই জঙ্গলের কোন প্রাণী নিজের এলাকার বাইরে শিকার ধরতে যায় তখনই তাকে বারবার শিকারের ডাক ডাকতে হয় যতক্ষণ তার কোন পাল্টা জবাব না আসে।
   আগন্তুককে বলতে হয়, আমি ক্ষুধার্ত, আমাকে শিকার করতে দাও।
   সেই ডাক শুনে, যার এলাকা তার জবাবটা আসে এই রকম, শিকার ধরতে পার, খাবার জন্য কেবল, মজা করার জন্য নয়।
   আগন্তুক প্রাণীর শিকারের ডাক মোগলি শিখেছিল বাঘিরার কাছে।
নেকড়ে ভাই চারটে মোগলিকে খুবই ভালবাসত। সেই অতটুকুন বয়স থেকে তারা একসঙ্গে বড় হয়ে উঠেছে। একসঙ্গে খাওয়া, শোওয়া, খেলাধূলা, শিকার ধরা-সব কিছুতে কোন একজনকে কেউ বাদ দিত না । কেবল নেকড়ে ভাইরাই নয়, নেকড়ে দলের সব বাচ্চারাই মোগলিকে পছন্দ করত। তারা ছিল মোগলির প্রিয় বন্ধু। হুটোপটি দৌড়ঝাঁপ করার সময় জঙ্গলের পথে নেকড়েদের পায়ে অনেক সময় কাঁটা ফুটে যেত। আর ছিল চোর-কাঁটা-এগুলো চামড়ায় লেগে তাদের খুবই কষ্ট ভোগ করাত।
   মেগলি নেকড়েদের এই দুর্ভোগ থেকে বাঁচাত। সে তাদের পা থেকে কাটা তুলে দিত, গায়ের লোম থেকে চোর-কাঁটা বেছে পরিষ্কার করে দিত।
   মোগলির সবচাইতে ভাল লাগত, বাঘিরার সঙ্গে গভীর বনের মধ্যে গিয়ে সারাটা দিন ঘুরে কাটাতে আর ঘুমোতে আর রাত হলে বাঘিরা কেমন করে শিকার ধরে সেটা দেখতে।
নেকড়ে-মা মোগলিকে বাঘিরার হাতে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকত। সে জানত, বাঘিরা মোগলিকে ভালবাসে। তার সঙ্গে থাকলে মোগলির কোন বিপদ হবে না।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য