চাঁদুর হাতে হ্যারিকেন -- উল্লাস মল্লিক

চাঁদুর চাঁদি গরম। বিশ্বকাপ এভাবে হাতে হ্যারিকেন ধরিয়ে দেবে আগে জানলে সে বিশ্বকাপটারই একটা গতি করে দিত।
চাঁদু হল গিয়ে একজন চাবুক চোর। লোকে বলে জাত চোর; কেউ কেউ আবার বলে বজ্জাত চোর। ব্যাটা কম লোকের
সব্বনাশ করেছে!
তা চাঁদু সেটা মেনেও নেয়। কিন্তু যে খেলার যা নিয়ম। তাকেও বউ-ছেলেপুলে পালতে হয়। কিছু লোকের ট্যাঁক ফাঁকা হয় বলেই তার দু-বেলা দু-মুঠো জোটে। তাছাড়া এ তো আর ফোকটে রোজগার নয়; মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়। তার গুরু ছিল টকা ওস্তাদ। তার কাছে চাঁদু দস্তুর মতো নাড়া বেঁধে ট্রেনিং নিয়েছে। খুব রগড়ানির সেসব ট্রেনিং। ট্রেনিং-এর ধমকে কত আচ্ছা আচ্ছা লোকের আধ-হাত জিভ বেরিয়ে যায়। কিন্তু চাঁদুর জন্মই এ কাজের জন্যে। ট্রেনিং শেষে পরীক্ষায় সে ফাস্ট। টকা পিঠ চাপড়ে বলেছিল, আমার আশীর্বাদ রইল, তোর ভাতকাপড়ের অভাব হবে না কোনওদিন—আমার নামটা রাখিস।
তা বলতে নেই, চাঁদু দিনে দিনে গুরুর মুখ উজ্জল করেছে। রাতে বেরিয়ে কোনওদিন খালি হাতে ফিরতে হয়নি। এমন ঘুমপাড়ানি মন্ত্র ছাড়ে যে গেরস্ত একেবারে কাদার তাল। টাকাকড়ি হাতিয়ে গুনগুন করে কালী-কোত্তন গাইতে গাইতে বাড়ি ফিরে আসে চাঁদু।
কিন্তু মাসখানেক হল তার কারবারে লালবাতি। এ তল্লাটে সবাই নিশাচর হয়ে গেছে। রাতভোর ছেলেবুড়ো সকলে টিভির সামনে। পাড়াময় যেন মোচ্ছব। চিৎকার-চেঁচামেচি, মাঝে-মাঝে বোম-ফাটানো, মাঝরাতে রাস্তায় বেরিয়ে ছেলে ছোকরাদের উদ্দাম নাম—চাদু ঘাপটি মেরে দেখে আর ভাবে হলটা কী! এভাবে চললে তো শিগগিরিই কারবারে লাল বাতি জ্বলে যাবে। তাই, চাঁদু খোঁজ-পাত্ত লাগাল। শুনল, কোথায় বিশ্বকাপ না কী যেন একটা হচ্ছে আর তাতেই পাড়া গরম।

চাঁদু ভাবছে একদিন টকা ওস্তাদের কাছে যাবে। তাদের ট্রেনিংএ কুকুর থেকে মুগুর সবকিছু সামলাবার কায়দা বাতলে দিয়েছিল; কিন্তু বিশ্বকাপ! উহু, চাঁদু স্মরণ করতে পারছে না।
এর মধ্যেই একদিন সুযোগ বুঝে ভাবলা মণ্ডলের বাড়ি ঢুকেছিল চাঁদু। রান্নাঘরে একগোছা বাসন-কোসন। সবেমাত্র হাতটা বাড়িয়েছে অমনি 'গো-ও-ওল’ বলে একটা বিকট চিৎকার উঠল। ঘাবড়ে গিয়ে পড়িমড়ি করে পালিয়ে এল চাঁদু।
আর একদিন ভালো সুযোগ এসেছিল। রুইদাস সামন্তর বাড়ির লোকজন সব টিভিতে মশগুল। সিঁড়ির ঘরে ঢুকে চালের বস্তাটা চাঁদুরা সবে মাথায় চাপিয়েছে হঠাৎ কয়েকজন কাকু, কাকু’ বলে কারা যেন কাকাকে ডাকতে লাগল। কে যেন আবার “দিদা, দিদা’ বলে ডাকছে। একজন হেঁড়ে গলায় চিৎকার করছে, মার মার, মেরে শুইয়ে দে, ফাউল...। চাঁদু ভাবল নিশ্চয়ই তাকে বলছে।


কোনও রকমে পাচিল ডিঙিয়ে পালিয়ে এসেছিল সে।
কিন্তু এভাবে আর কতদিন চলে। এরপর তো কপালে হরিমটর। ছেলেমেয়েগুলো শুকনো মুখে ঘুরে বেড়ায়, বউ-ঝামটা দেয় আর রাতের পর রাত এ-বাড়ি, সে-বাড়ি উঁকি দিয়ে ফিরে আসে চাঁদু।
সেদিনও ভোররাতে চাঁদু মনমরা হয়ে ফিরছিল। একহাটু ধুলো, চোখ লাল, চুল উসকো-খুসকো। যদু পোদ্দারের বাড়ির এসে থমকে গেলে। বৈঠকখানার দরজা হাট করে খোলা আর ঘরের মেঝেতে পেটমোটা একটা বস্তা। ধারেকাছে জন-মনিষ্যি নেই। বস্তাটা যেন তার জন্যেই গ্যাট হয়ে বসে অপেক্ষা করছে। সট্‌ করে ঘরে ঢুকে বস্তাটা পরখ করে চাঁদু। ভেতরে চাল আর নারকোল। আর সময় নষ্ট করেনি চাঁদু।
বস্তা মাথায় চাঁদু চলেছে। মনটা তার ভারি খুশিখুশি। বেশ বড় একটা দাও মারা গেছে। আজই বেরবার সময় বউ বাপেরবাড়ি চলে যাবে বলে শাসিয়েছে। যাক, কিছুটা তো মুখরক্ষা হল! ফুর্তিতে অনেকদিন পর গুনগুন করে একটা কালী-কোত্তন ধরে চাঁদু। কেত্তনটা তার গলায় খেলে ভালো।
কিন্তু একটু পরে চাদুর মনে হল কেউ একজন আসছে তার পেছনে। ভালো করে খেয়াল করে সে। হ্যাঁ, আসছে বটে একজন হ্যারিকেন হাতে। চাঁদু ভাবে, কে না কে হবে! ভোররাতে বাগানে যাবে বোধহয়।
বড় রাস্তা ছেড়ে বাড়ির পথ ধরে চাঁদু। ছেলেপুলের মা এখনও নিশ্চয়ই ঘুমুচ্ছে। অনেকদিন পর তার মুখে হাসি ফুটবে। কিন্তু খানিক যেতে না যেতেই পেছনে সেই পায়ের শব্দ। এবার একটু ঘাড় ঘুরিয়ে আড়চোখে দেখে চাদু।
সব্বোনাশ! এ যে যদু পোদ্দার। ব্যাটা বুঝতে পেরেছে না কি! হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয় চাঁদু। বুঝতে পারে যদু পোদ্দারও গতি বাড়িয়েছে। বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে চাঁদু। কিন্তু পেছনেই যদু। এখন তো আর বাড়ি ঢোকা যায় না। চাঁদু তাই বাড়ি ফেলে ঘোষপাড়ার দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু ঘোষপাড়ার শেষ মাথায় এসে দেখে তখনও পিছু ছাড়েনি পোদ্দার।
তাই হাঁটতেই থাকে চাঁদু। ঘোষপাড়ার পর রায়পাড়া, তারপর মোল্লাপাড়া, কিন্তু পেছন ফিরলেই দেখে হ্যারিকেন হাতে যদু পোদার।
পা ধরে গেছে চাদুর। ঘাড়ে ব্যথা। একবার ভাবল মায়া ত্যাগ করে বস্তাটা ফেলে দৌড় দেবে। কিন্তু তাতে যদু যদি চিৎকার শুরু করে। তখন সে আরও কেলেঙ্কারি। ভাবতে ভাবতে দাসপাড়া ছাড়িয়ে চৌধুরীদের চণ্ডীমণ্ডপের পাশ দিয়ে ফের বড় রাস্তায় পড়ে চাঁদু।
থামার উপায় নেই। বড় রাস্তা ধরে এগোতে থাকে চাঁদু। পেছনে যদু পোদ্দার।
ক্রমশ ভোরের আলো ফুটে উঠছে। গাছে গাছে পাখির দল ক্যাচোর-ম্যাচের করছে। রাস্তার মোড়ে টিপ-কলের সামনে দুধে জল মেশাচ্ছে মাধব গয়লা। রায়েদের বড়-পুকুরে ডুব দিয়ে মন্ত্র জপ করতে করতে ফিরছে নিমাই ঠাকুর। চাঁদুর পা দুটো থরথর করে কাঁপছে।
দেখতে দেখতে রেলস্টেশন এসে পড়ে। ওহ, এখনও পেছনে যদু পোদ্দার। আর পারছে না চাদু, এবার ঠিক অজ্ঞান হয়ে যাবে সে |

‘যা থাকে কপালে’ বলে ধপাস করে রাস্তার ওপর বস্তাটা ফেলে দেয় চাঁদু। হা করে বড় বড় শ্বাস নিতে থাকে।
কাছে এসে দাঁড়ায় যদু পোদ্দার। বলে, এখানে নামালি যে! প্ল্যাটফর্মে তুলে দে বাবা, গাড়ির সময় হয়ে এল।
বলে কী লোকটা। খাবি খেতে খেতে বোঝার চেষ্টা করে চাঁদু। পোদ্দার বলে, সত্যিই বাবা তোর দয়ার শরীর। দেখ না; এই চাল আর নারকোলগুলো মেয়ের বাড়ি নিয়ে যাব; এতটুকু মোটে রাস্তা, অথচ একটা ভ্যান-রিকশা ডাকলে এককাড়ি টাকা নিয়ে নেবে। গরিব মানুষ আমি, কোথা থেকে পাই বল ? নেহাত তোর মতন উপকারী ছেলে দুএকটা আছে তাই রক্ষে..তা বাবা, অত ঘুরপথে এলি কেন, আর মাঝে মাঝে অমন ছুটছিলিই বা কেন? চাঁদু তখনও বোয়াল মাছের মতো হা করে হাঁপাচ্ছে। যদু পোদ্দার তাড়া দেয়, নে বাপ, আর একটু কষ্ট করে প্ল্যাটফর্মে পৌছে দে বাবা বস্তাটা।
চাঁদু হঠাৎ কাছাটা বাগিয়ে চোঁ-চোঁ করে দৌড় দেয়। আর যদু পোদ্দার পেছন থেকে গলা তুলে চিৎকার করে, ওরে বাবা চাঁদু, যাস কোথা; হ্যারিকেনটা অন্তত নিয়ে যা, তোর খুড়িমাকে গিয়ে ফেরত দিবি...।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য