যেমন মনিব তেমনি চাকর

      সম্রাট একদিন হঠাৎ তার নানা গল্পের মাঝখানে বলে বসলেন, ওহে বীরবল, মাছ কেমন লাগে বলো তো ?’
নিজের মতামত প্রকাশ সম্বন্ধে বীরবল চিরদিনই খুব সতর্ক। সম্রাটের প্রশ্নে একবারটি মাথা চুলকিয়ে নিয়ে তিনি খতিয়ে বললেন,
      আজ্ঞে, হেঁ হেঁ, তা বলেছেন বটে। তবে...হেঁ হেঁ, খুব ভাল লাগে হেঁ হেঁ...’
      সম্রাট বললেন, তা তুমি যাই বলো, এক থালা মাছভাজা পেলে আমি আর কিছু চাই নে। ওটা আমার ভারী প্রিয়।’
বীরবল এবার সোৎসাহে বললেন, তা যা বলেছেন প্রভু। মাছভাজার তুলনা নেই। ওইজন্যই তো পৃথিবীসুদ্ধ লোক মাছের ভক্ত। দেখুন না বাজারে গিয়ে লোকে প্রথমে মাছ কেনে। সন্দেশ রোজ খেলে অরুচি আসে, কিন্তু মাছ রোজ খেলেও পুরনো হয় না। জাঁহাপনা আপনার এই রুচি অতুলনীয়। এতে কোনওমতেই সন্দেহ নেই।’

      কিছুকাল যায়। তারপর একদিন হঠাৎ আকবর মাছের নিন্দা আরম্ভ করলেন। মাছ খেলে শরীরে চর্বি বাড়ে, মোটা হয়ে যায়, পরিশ্রম করতে পারা যায় না, ইত্যাদি ইত্যাদি। বীরবল এইপ্রকার নিন্দাবাদে মহাখুশি হয়ে বললেন, ‘এই যা বলেছেন সম্রাট, এ হল ঠিক কথার এক কথা।’
      বাদশা প্রশ্ন করলেন, ‘কীরকম?’ 
ওই যে বললেন তখন ? মাছের মতন অমন পাজি জিনিস ভূ-ভারতে নেই, যত খাও ততই পেট গরম, ততই মাথাধরা, আর ততই শরীরের মধ্যে নানা অস্বস্তি। ওটার আগাগোড়াই মদ৷ ওটাকে না খাওয়াই ভাল।’
      বীরবলের মন্তব্য শুনে আকবর একটু অবাক হলেন। মুখে বললেন, ‘তোমার এলোমেলো কথাবার্তা অনেক সময় বুঝতে পারি না বীরবল। একই বস্তুকে কখনও বলছ খুব ভাল, আবার কখনও বলছ ভয়ানক মন্দ! এর মানে কী? এক নিশ্বাসে দু’রকম। এমন কথাই বা কেন, আমার সঙ্গে এমন ধাপ্লাবাজিই বা কীজন্য করছ? তোমার কথাবার্তাই যেন কেমন কেমন, কখন ভাল বলছ আবার খানিক পরে খারাপ বলছ, এর মানে কী ?”
      দমে যাওয়ার পাত্র বীরবল নন। এবার তিনি নত হয়ে কুর্নিশ জানালেন সম্রাটকে। তারপর সবিনয়ে বললেন, ‘জাঁহাপনা, আমার প্রতি সুবিচার করুন এই প্রার্থনা জানাই। আমার মনিব কে? আপনি, না মাছ?’
সম্রাট বললেন, নিশ্চয়ই আমি, এ ছাড়া আবার কে ?” -
      বীরবল বললেন,‘তবেই দেখুন সম্রাট, মাছের প্রতি আমার কোনও আনুগত্য নেই। ওর নিন্দা-সুখ্যাতি যখন খুশি করতে পারি। কিন্তু আপনার কথায় সায় দিয়ে আপনাকে আনন্দে রাখব, এই কি আমার কর্তব্য নয়? মাছকে নিন্দা করলে কোনও অসুবিধে নেই। কিন্তু আপনার কথায় সায় না দিলে চাকরি রাখা যে দায় হবে হুজুর”
      লজ্জায় সম্রাটের মুখ লাল, কিন্তু তোয়াজের গুণে আনন্দে মন ভরপুর।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য