৭. তৃতীয় মিঞার কাহিনী

দ্বিতীয় যুবকের কাহিনী শেষ হলে খচ্চরের মালিক তৃতীয় মিঞা আফ্রিদি দৈত্যকে সালাম করে বলল, হে মহান দৈত্য, আমার কাহিনী শুনলেও আপনি তাক লেগে যাবেন--’
‘--তোমার কাহিনী? তোমারও আবার কাহিনী আছে নাকি হে? বল শুনি কেমন তোমার কাহিনী।’ আফ্রিদি দৈত্য ‍মুচকি হেসে বলল।
এবার খচ্চরের মালিক তৃতীয যুবক বলল--‘দৈত্য শ্রেষ্ঠ, এই খচ্চরটা কিন্তু সত্যিকারের খচ্চর নয়। আমার বিবি। যাদু বলে তাকে খচ্চরের রূপ দেওয়া হয়েছে। একবার আমি দূর দেশে ব্যবসা করতে গিয়েছিলাম। বছর খানেক পরে বাড়ি ফিরেই বিবির সাথে দেখা করার জন্য ছুটলাম ঘরের দিকে। ভাগ্যের কি পরিহাস সেই দিনই আমার বিবি আমার সমস্ত ধন সম্পত্তি চুরি করে পালিয়ে যাবার জন্য তৈরী হচ্ছিল। আমি ঘরের দরজার ছিদ্র দিয়ে সব দেখছিলাম আর মনে মনে আফসোস করছিলাম। এমনি সময় আমার বিবি দেখে ফেলল আমাকে। সে তারাতারি সব কিছু ফেলে একটা পাত্রে পানি নিয়ে মুখ দিয়ে বিরবির করে কি যেন বলে আমার সারা শরীরে ছিটিয়ে দিল। আমি সঙ্গে সঙ্গে একটা কুকুরে পরিনত হয়ে গেলাম। তারপর আমাকে দূর দূর করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল।
মনের দুঃখে আমি নগরের পথে পথে বেড়াতে লাগলাম। একদিন পেটের জ্বালায় একটা মাংসের দোকানে গেলাম। ফেলে দেওয়া হাড়গোড় মুখে নিয়ে চিবোতে লাগলাম। আমাকে দেখে কষাইয়ের বড়ই মায়া হল। সঙ্গে করে সে নিয়ে গেল তার বাড়ি।

কষাইয়ের মেয়ে আমাকে দেখেই ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে তার আব্বাকে বকাবকি করতে লাগল--‘তুমি একজন পরপুরুষকে কে একেবারে বাড়ির মধ্যে নিয়ে এসেছ? এ তো সাধারন কুকুর নয়, এ যে পুরুষ মানুষ। কোন এক যাদুকরী তাকে কুকুর বানিয়ে দিয়েছে। তোমার ইচ্ছা থাকলে আমি একে পুনরায় মানুষ বানিয়ে দিতে পারি।’

কষাই বলল, ‘দে মা, একে আবার মানুষ করে দে। এর কষ্ট আমি আর দেখতে পারছি না।’

কষাইয়ের মেয়ে তখন ঘরের মধ্য থেকে এক বাটি পানি নিয়ে এসে মুখে কি যেন বলে আমার সারা শরীরে ছিটিয়ে দিল। আর অমনি আমি পুনরায় মানুষে পরিনত হলাম।

আমি বললাম, ‘সুন্দরী, আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাবার ভাষা জানা নেই। আপনার কাছে আমার আর একটি মিনতি আছে। আপনি আমার বিবিকে খচ্চর বানিয়ে দিন।

কষাইয়ের মেয়ে আবার এক বাটি পানি নিয়ে এল আর মুখে কি যে বিড়বিড় করে বলল। তারপর আমাকে বাটিটা দিয়ে বলল, ‘তোমার বিবি যখন ঘুমিয়ে থাকবে তখন তুমি এ পানি তার গায়ে ছিটিয়ে দেবে, তাহলে তোমার বিবি খচ্চরে পরিনত হবে।’

এবার অফ্রিদি দৈত্যের দিকে ফিরে তৃতীয় যুবক বলল, ‘হে দৈত্য শ্রেষ্ঠ এ খচ্চরটাই আমার সেই বিবি। যাদুকরী বিবি!’

আফ্রিদি দৈত্য এবার হাসিমুখে সওদাগরকে বলল, ‘সওদাগর, আমি তোমার সব অপরাধ মাফ করে দিলাম। তুমি মুক্ত। তুমি এখন যেখানে খুশি যেতে পার।’

ইতিমধ্যে পূর্ব আকাশে ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়েছে। শাহরাজাদ গল্প শেষ করতেই দুনিয়াজাদ তার গলা জড়িয়ে বলল,--‘কী সুন্দর! কী সুন্দর গল্প-ই না তুমি জান দিদি!’

শাহরাজাদ বলল, ‘এ আর কি গল্প! এর চেয়েও সুন্দর সুন্দর গল্প  আমি জানি। যদি প্রাণ বাঁচে তবে কাল আরও অনেক সুন্দর গল্প শোনাব।

বাদশা শারিয়ার ভাবলেন, একে হত্যা করে এমন সুন্দর গল্প শোনা থেকে কিছুতেই বঞ্চিত হওয়া যায় না। বিবি শাহরাজাদ-এর কোলে মাথা রেখে তিনি সেই দিনের মত ঘুমিয়ে পড়লেন।

সারাদিন দরবারে নানা কাজে ব্যস্ত থাকার পর বাদশাহ শারিয়ার সন্ধার কিছু পরে অন্দরমহলে এলেন। রাত্রে খাবার খাওয়া কোন মতে শেষ করেই শোবার ঘরে এসে শাহরাজাদকে বললেন, ‘বিবি তোমার গল্প শুরু কর। তোমার মুখে গল্প শোনার জন্য অধীর হয়ে আছি।’

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য