ভাগ্যের লেখা -- ইংল্যান্ডের রূপকথা

অনেককাল আগে ইংল্যাণ্ডের উত্তরাঞ্চলে ছিলেন এক ধনী ব্যারন । জাদুবিদ্যায় বিস্তর দখল ছিল তার। ভবিষ্যতে কখন কী ঘটতে যাচ্ছে তা সবই তিনি জাদুর বলে আগেভাগে জেনে নিতে পারতেন।
চার বছর বয়সের এক ছেলে ছিল ব্যারনের। একদিন তিনি ভাবলেন, দেখা যাক ছেলের ভাগ্যে ভবিষ্যতে কী আছে। জাদুবিদ্যার বড় বড় পুথিপত্র ঘাঁটলেন তিনি, অনেক রকম হিসেব-নিকেশ করলেন। শেষ পর্যন্ত ফলাফল জেনে ভারী অবাক হয়ে গেলেন। গণনায় দেখা যাচ্ছে, তাঁর ছেলের বিয়ে হবে খুব গরীব ঘরের এক মেয়ে সঙ্গে--সেই মেয়ের জন্ম হয়েছে মাত্র কয়েকদিন আগে, ইয়র্ক শহরে। ব্যারন এ-ও জানতে পারলেন, মেয়েটার বাবা একেবারে নিঃসম্বল, অথচ এ মেয়ে ছাড়াও আগের আরও পাঁচটি ছেলেমেয়ে রয়েছে তার ঘরে।
অনেক চিন্তা-ভাবনা করলেন ব্যারন। ভাগ্যের এই লেখা মেনে নিতে কিছুতেই তার মন সায় দিল না। শেষ পর্যন্ত ঘোড়ায় চেপে রওনা হয়ে গেলেন ইয়র্কের পথে ।
সেখানে পৌছে গরীব লোকটার বাড়ি খুঁজে বের করলেন। রাস্তা থেকেই দেখতে পেলেন, লোকটা মলিন বিষন্ন মুখে দরজার পাশে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে।
ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে ব্যারন ধরে ধীরে লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
‘কী হয়েছে তোমার? নরম গলায় বললেন তিনি।
মুখ তুলে তাকাল লোকটা। ‘ঘরে আমার পাঁচ-পাঁচটি ছেলেমেয়ে ছিল আগেই—এই সেদিন আবার আরেকটি মেয়ে হয়েছে। এতগুলো মুখের খাবার আমি কোথেকে জোটাব?
‘সেটাই যদি তোমার সমস্যা হয়ে থাকে, আমি সাহায্য করতে পারি, ব্যারন বললেন। সবচেয়ে ছোট এই শেষের বাচ্চাটাকে আমি নিয়ে গিয়ে মানুষ করব, তাকে নিয়ে আর তোমার ভাবনা থাকবে না।
সত্যি বলছেন? খুশি হয়ে বলল লোকটা, অশেষ দয়া আপনার— আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। বাড়ির ভেতরে গিয়ে ছোট্ট মেয়েটাকে কোলে করে নিয়ে এল সে, তারপর সরল বিশ্বাসে তাকে ব্যারনের হাতে তুলে দিল।
ব্যারন বাচ্চাটাকে নিয়ে আবার ঘোড়ায় চেপে এগিয়ে চললেন। এপথ সে-পথ পেরিয়ে এসে পড়লেন উজ নদীর তীরে। চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন আশেপাশে কেউ নেই। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে পানির কিনারায় গিয়ে দাঁড়ালেন তিনি। ছোট্ট মেয়েটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন নদীতে। তারপর ঘোড়া ছুটিয়ে ফিরে এলেন নিজের প্রাসাদে। ছেলের মন্দভাগ্যকে রোধ করতে পেরেছেন ভেবে মনে মনে বেশ প্রসন্ন হয়ে উঠলেন।

এদিকে ছোট্ট মেয়েটা কিন্তু পানিতে পড়ে সঙ্গে সঙ্গে ডুবে যায়নি। পরনের কাপড়ের জন্য ভেসে রইল সে বেশ কিছুক্ষণ, আর সেটুকু সময়ের মধ্যেই স্রোতে ভেসে নদীর পাড়ের এক জেলের বাড়ির সামনে তীরে গিয়ে ঠেকল। ঠিক তখনই বাড়ি থেকে বেরিয়ে তাকে দেখতে পেল জেলে, তার ভারী মায়া হলো। মেয়েটাকে সাবধানে পানি থেকে তুলে সে বাড়িতে তার বউয়ের কাছে নিয়ে গেল।
জেলে আর জেলে-বউয়ের আদর-যত্নে তাদের বাড়িতে বড় হয়ে উঠতে লাগল মেয়েটা। এক বছর দু'বছর করে দেখতে দেখতে পনেরোটি বছর কেটে গেল। একদিন যে ছিল ছোট্ট অসহায় শিশু, আজ সে দিব্যি এক হাসিখুশি সুন্দরী তরুণী।
ব্যারন এসবের কিছুই জানতে পারেননি। একদিন তিনি লোকজন নিয়ে উজ নদীর তীরে শিকার করে ফিরছেন। খুব গরম পড়েছে সেদিন। সবার খুব তেষ্টা পেয়ে গেছে। নদীর তীরে এক জেলের বাড়ি দেখতে পেয়ে ব্যারনের লোকজন সেখানে গিয়ে পানি চাইল ।

একটু পরে পানির পাত্র হাতে বাইরে এসে দাঁড়াল এক তরুণী। তার রূপ দেখে সবাই মুগ্ধ হয়ে গেল।
আপনি তো মানুষের ভাগ্য বলে দিতে পারেন, একজন নিচু গলায় বলল ব্যারনকে, বলুন তো, এই মেয়েটার বিয়ে হবে কার সঙ্গে? কী মনে হয় আপনার?
সে তো সহজেই অনুমান করা যায়, বললেন ব্যারন, 'এ গ্রামেরই কোন ছেলের সঙ্গে নিশ্চয়। হাত তুলে মেয়েটাকে কাছে ডাকলেন তিনি। এদিকে এসো দেখি, মেয়ে—বলতে পারো, তোমার জন্ম হয়েছিল কোন বছরের কত তারিখে?’


তা তো আমার জানা নেই, মেয়েটা উত্তর দিল। শুনেছি, পনেরো বছর আগে নাকি আমার পালক বাবা এখানে এই নদীর তীরে আমাকে কুড়িয়ে পেয়েছিল।
মনে মনে ভয়ানক চমকে উঠলেন ব্যারন। মেয়েটা কে তা বুঝতে তার একটুও দেরি হলো না।
একটু পরে ব্যারন দলবল নিয়ে চলে গেলেন। কিন্তু সেদিনই সন্ধ্যার আগে আবার গোপনে একা ফিরে এলেন সেখানে। জেলের বাড়িতে গিয়ে মেয়েটাকে ডেকে পাঠালেন।
শোনো, মেয়ে, আমি তোমার ভাগ্য ফিরিয়ে দেব, বললেন তিনি।
“স্কারবরোতে আমার ভাই থাকেন, তাঁর কাছে গিয়ে আমার এই চিঠি দেবে। তাহলে সারা জীবনের জন্যে তোমার আর কোনকিছুরই অভাব থাকবে না—তোমার সমস্ত ভার তিনিই নেবেন।
ব্যারনের হাত থেকে চিঠিটা নিল মেয়েটা । ‘অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, বলল সে। যত তাড়াতাড়ি পারি আমি গিয়ে আপনার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করব ।’
আসল ব্যাপার কিন্তু অন্য রকম। ব্যারন তার চিঠিতে লিখেছেন:

প্রিয় ভ্রাতা,
            এই মেয়েটিকে আটক করিয়া অবিলম্বে তাহার প্রাণবধ করিবে ।
তোমার ভ্রাতা
হামফ্রে ।

সরল বিশ্বাসে সেই চিঠি নিয়ে মেয়েটা দুদিন পরে পালক মা-বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে স্কারবরোর পথে রওনা হলো। অনেক দূরের পথ। পৌছতে দিন কয়েক লেগে যাবে। প্রথম রাতে মেয়েটা রাস্তার ধারে একটা ছোট সরাইখানায় আশ্রয় নিল ।
রাত যখন গভীর, একদল ডাকাত এসে হানা দিল সরাইখানায়। অতিথিদের কাছে টাকা-পয়সা, দামী জিনিসপত্র যা পেল সব লুট করে নিল। মেয়েটার কাছে তেমন কিছুই পেল না তারা, শুধু পেল একখানা চিঠি। কয়েকজন ডাকাত কৌতুহলের বশে চিঠিখানা খুলে পড়ে দেখল। অসহায় একটা মেয়েকে মেরে ফেলার এমন হীন ষড়যন্ত্র তাদের কাছেও ভারী অন্যায় বলে মনে হলো। মেয়েটাকে কিছুই জানতে না দিয়ে তারা চিঠিখানা তাদের সর্দারকে দেখাল। চিঠি পড়ে মুচকি হাসল ডাকাতসর্দার। কাগজ-কলম চেয়ে নিয়ে নতুন একটা চিঠি লিখল সে এভাবে:

প্রিয় ভ্রাতা,
      এই মেয়েটিকে আশ্রয় দিয়া অবিলম্বে তাহার সহিত আমার পুত্রের বিবাহের বন্দোবস্ত করবে।
তোমার ভ্রাতা 
হামফ্রে ।
আগের চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলে নতুন চিঠিটা খামে পুরে মেটোর হাতে দিয়ে ডাকাতেরা চলে গেল ।
যথাসময়ে ব্যারনের ভাইয়ের বাড়িতে পৌছল মেয়েটা। ব্যারনের এই ভাই ছিলেন একজন সম্ভ্রান্ত নাইট। ব্যারনের ছেলে তখন তাঁর প্রাসাদে বেড়াতে এসে সেখানে কিছুদিন কাটিয়ে যাবে বলে রয়ে গিয়েছিল। ভাইয়ের চিঠি পেয়ে একটু অবাক হলেও নাইট তৎক্ষণাৎ তার লোকজনকে ডেকে বিয়ের আয়োজন করতে বললেন । সেদিনই সন্ধ্যায় মহাসমারোহে ব্যারনের ছেলে সঙ্গে মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেল।
কদিন পরে ব্যারন নিজে ভাইয়ের প্রাসাদে হাজির হলেন। মেয়েটাকে মেরে না ফেলে বরং তার সঙ্গে তার ছেলের বিয়ে দেয়া হয়েছে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন তিনি। মনে মনে ভয়ানক রেগে গেলেও বাইরে তা প্রকাশ করলেন না। মেয়েটাকে দুএকটা কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনি চিঠির রহস্য বুঝে ফেললেন।

বিকেলে পুত্রবধূকে সঙ্গে নিয়ে ব্যারন সমুদ্রের ধারে পাহাড়ের দিকে বেড়াতে গেলেন । হাটতে হাটতে নির্জন একটা জায়গায় এসে হঠাৎ মেয়েটার হাত পিছমোড়া করে ধরে ফেলে তাকে ঠেলে নিয়ে চললেন সমুদ্রের দিকে, এবার সমুদ্রের পানিতে ছুঁড়ে ফেলবেন এই আপদটাকে ।
মেয়েটা করুণ স্বরে অনুনয়-বিনয় করতে লাগলেন। ‘আমিতো কোন অপরাধ করিনি, কাতর কণ্ঠে বলল সে, দয়া করে আমার প্রাণভিক্ষা দিন, তাহলে আপনি যা বলবেন তা-ই করব। আপনি না চাইলে আর কোনদিনও আপনাকে বা আপনার ছেলেকে মুখ দেখাব না।

শেষ পর্যন্ত নিরস্ত হলেন ব্যারন। নিজের হাত থেকে একটা সোনার আংটি খুলে নিয়ে সমুদ্রের পানিতে ছুড়ে ফেললেন। ওই আংটিটা যতদিন না আমাকে দেখাতে পারবে ততদিন যেন তোমার মুখ না দেখি, বলে মেয়েটাকে ছেড়ে দিলেন তিনি। ভাইয়ের প্রাসাদে ফিরে গিয়ে সবাইকে বললেন, মেয়েটা হঠাৎ পা ফসকে পাহাড় থেকে সমুদ্রের পানিতে পড়ে ডুবে মারা গেছে।
এদিকে অসহায় মেয়েটা হাঁটতে থাকল যেদিকে দুচোখ যায়। যেতে যেতে শেষ পর্যন্ত হাজির হলো এক ধনীর প্রাসাদের দরজায়। দাসী হিসেবে সেখানে আশ্রয় চাইল । রান্নাঘরের কাজ দেয়া হলো তাকে। কঠিন পরিশ্রম আর দুঃখ-কষ্টের ভেতর দিয়ে তার দিন কাটতে লাগল।
বেশ কিছুদিন পরের কথা। প্রাসাদে বিরাট এক ভোজের আয়োজন করা হয়েছে। অনেক গণ্যমান্য অতিথি আসবেন। সকাল থেকেই তাই সবাই খুব ব্যস্ত।
নিমন্ত্রিত অতিথিরা একে একে আসতে শুরু করেছেন। তাদের ঘোড়ায় টানা গাড়ির আওয়াজ রান্নাঘর থেকেও স্পষ্ট শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। একমনে কাজ করতে করতে মেয়েটা একসময় কী ভেবে উঠে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দেখতে পেল, প্রাসাদের সদর দরজায় গাড়ি থেকে একদল অতিথি নামছেন। হঠাৎ তাদের মধ্যে পরিচিত একটা মুখ দেখে চমকে উঠল সে-এ তো সেই ব্যারন, সঙ্গে তার ভাই আর ছেলে!
ফ্যাকাসে হয়ে গেল মেয়েটার মুখ। কী করবে ভেবে পেল না। শেষ পর্যন্ত ভাবল, সে তো রান্নাঘরেই থাকবে, অতিথিদের কেউ তাকে দেখতে পাবে না ।
মলিন মুখে দুঃখী মেয়েটা আবার কাজ শুরু করল। মস্ত একটা মাছ আনা হয়েছে। সেটাকে কেটে-কুটে পরিষ্কার করতে হবে।
মাছের মাথাটা কেটে পেট চিরতেই মেয়েটা লক্ষ করল, পেটের ভেতরে কী যেন একটা চকচক করছে। জিনিসটা বের করে আনল সে। অবাক হয়ে দেখল, এ যে ব্যারনের সেই সোনার আংটি—যেটা তিনি সমুদ্রে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন!

খুশির সীমা রইল না মেয়েটার। আংটিটা ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে লুকিয়ে রাখল সে। তারপর খুব যত্ন করে মাছটা রান্না করল। অন্যান্য খাবারের সঙ্গে সেই মাছ পরিচারকেরা ভোজঘরে নিয়ে গেল ।
খাবার টেবিলে যখন মাছ পরিবেশন করা হলো, অতিথিরা খেয়ে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তারা জানতে চাইলেন এমন অপূর্ব সুস্বাদু মাছ কে রান্না করেছে।
প্রাসাদের মালিক তখন পরিচারকদের ডাকলেন। যে রাঁধুনী এই মাছ রান্না করেছে তাকে এখানে আসতে বলো, হুকুম দিলেন তিনি।
পরিচারকেরা রান্নাঘরে গিয়ে মেয়েটাকে বলল, ভোজঘরে তার ডাক পড়েছে।
মনে মনে হাসল মেয়েটা। পরিপাটি হয়ে আঙুলে সেই সোনার আংটিটা পরে নিল সে। তারপর ধীর পায়ে ভোজসভায় গিয়ে ঢুকল।
সুন্দরী তরুণী রাধুনীকে দেখে অতিথিরা অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন। শুধু ব্যারনের মুখ রাগে তেতে উঠল। তলোয়ারের বাটে হাত রেখে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন তিনি।
ব্যারনের মুখের দিকে তাকিয়ে মেয়েটা মুচকি হাসল। এগিয়ে গিয়ে নিজের হাত মেলে ধরল তার সামনে। তারপর আঙুল থেকে আংটিটা খুলে ব্যারনের সামনে টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল।
কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন ব্যারন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ‘এসো, মা, বসো আমার পাশে, মেয়েটার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন তিনি। এতদিনে বুঝলাম, ভাগ্যে যা লেখা আছে তা খণ্ডানোর সাধ্য মানুষের নেই। তোমার প্রতি যে অন্যায় আচরণ করেছি সেজন্যে আমি অনুতপ্ত।
উপস্থিত অতিথিদের সবাইকে তিনি জানালেন, মেয়েটা তারই ছেলের বিবাহিতা স্ত্রী।
পুত্র ও পুত্রবধূকে নিয়ে সেদিনই ব্যারন ফিরে গেলেন নিজের প্রাসাদে ।
নবদম্পতি সুখে-শান্তিতে দিন কাটাতে লাগল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য