বেতালপঞ্চবিংশতি: নবম গল্প

     সেকালে মগধপুর নামক এক রাজ্যের রাজার নাম ছিল বীরবর। বীরবরের অনেক প্রজার মধ্যে হিরণ্যদত্ত নামে এক ঐশ্বর্যশালী বণিক ছিলেন। ঐ বণিকের মদনসেনা নামে পরমাসুন্দরী এক কন্যা ছিল।
     বসন্ত উৎসবের দিনে মদনসেনা সুন্দর সাজে সেজে তার সখীদের সঙ্গে মনের আনন্দে উপবনে বেড়াচ্ছিল। সেই সময় ধর্মদত্ত বণিকের ছেলে সোমদত্তও বসন্ত উৎসবে যোগ দিতে সেখানে উপস্থিত হয় ।
     সে দূর থেকে পরমাসুন্দরী মদনসেনাকে দেখে মুগ্ধ হলো। তার খুব ইচ্ছা তাকে বিয়ে করার ।

     সোমদত্ত মদনসেনার কাছে গিয়ে তার মনের ইচ্ছা প্রকাশ করল।
     মদনসেনা বললো, পাঁচদিন পর আমার বিয়ে।
     তবে কথা দিলাম শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার আগে তোমার সঙ্গে দেখা করে যাব।
     নির্দিষ্ট দিনে মদনসেনার বিয়ে হলো। রাতে আত্মীয়েরা চলে গেলে মদনসেনা কাপড়ে সবাঙ্গ ঢেকে খাটের একপাশে চুপ করে বসে রইল । তারপর স্বামীকে সোমদত্তর ঘটনা খুলে বললো ।

     একথা শুনে মদনসেনার স্বামী প্রথমে আপত্তি করলেও পরে মত দিল। বললো, না যেয়ে যখন ছাড়বে না, তখন যাও। কথা যখন দিয়েছ তখন তা রাখাই উচিত।
     মদনসেন স্বামীর অনুমতি পেয়ে সেই মাঝরাত্রেই বিয়ের এক-গা-গয়না পরে সমস্ত গা কাপড়ে ঢেকে সোমদত্তর বাড়ির পথে চলল ।
     এক চোর তার সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়িয়ে বললো, তোমার কি ভয়ডর নেই? একগা গয়না পরে একা এই অন্ধকার রাতে পথে বেরিয়েছ? এখনই গয়নাগুলো খুলে আমাকে দাও।
     মদনসেনা ভয় পেয়েছে কিন্তু সে ভাব বাইরে প্রকাশ না করে বললো, বণিক হিরণ্যদত্তের মেয়ে আমি। স্বামীর অনুমতি নিয়ে সোমদত্তের সঙ্গে দেখা করতে তার বাড়ি যাচ্ছি প্রতিজ্ঞা পালন করতে। ভাই, এই সব গয়না আমি তোমাকেই দেব প্রতিজ্ঞা করছি, তুমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা কর, আমি ফিরে আসি তারপর ।
     মদনসেনার কথায় বিশ্বাস করে চোর তাকে ছেড়ে দিয়ে তার ফিরে আসার অপেক্ষায় সেখানে বসে রইল ।
     মদনসেনা সোমদত্তের বাড়ি গিয়ে দেখে সে ঘুমিয়ে আছে। তাকে জাগিয়ে দিতেই সোমদত্ত এই গভীর রাতে তার ঘরে      মদনসেনাকে দেখে খুবই অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, তুমি এত রাতে কি ভাবে এলে?
     মদনসেনা মৃদু হেসে বললো, তোমাকে যে কথা দিয়েছিলাম সেই কথা রাখতেই আমার স্বামীর অনুমতি নিয়ে এসেছি।
     সোমদত্ত কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললো, তুমি যে প্রতিজ্ঞা পালনের জন্য এতখানি কষ্ট স্বীকার করেছ এ জন্য আমি খুবই      খুশি। সব জেনেও তোমার স্বামী যে আসতে দিয়েছে এতে তার মহত্বেরই পরিচয় পাওয়া যায়। তুমি নিরাপদে ফিরে যাও।
     ফিরবার পথে মদনসেনার সাথে চোরের দেখা হলো।  চোর জিজ্ঞাসা করল এত তাড়াতাড়ি সে ফিরল কিভাবে। সব      শুনে চোর বললো, আমি আর তোমার গয়না নেব না। তোমার মতো ভাল মেয়ের জিনিস নিলে আমার খুব পাপ হবে। তুমি নির্ভয়ে বাড়ি ফিরে যাও।
     মদনসেনার স্বামী কিন্তু মোটেই সন্তুষ্ট হতে পারেনি তার এই ব্যবহারে। তাই মদনসেনা তার স্বামীর কাছে ফিরে এলে স্বামী আর আগের মত তার সঙ্গে কোন কথা না বলে চুপ শুয়ে রইল।
     গল্প শেষ করে বেতাল বললো, মহারাজ, তোমাকে বলতে হবে এই চারজনের মধ্যে  কে সবচেয়ে হৃদয়বান এবং ভালমানুষ?
     রাজা বললেন, চোরকেই আমি ভালমানুষ বলব।
     বেতাল বলল, কেন মহারাজ?
   রাজা বললেন, কারন মদনসেনার স্বামী খুশি মনে তাকে অনুমতি দেননি, পরে খুব বিরক্তি দেখিয়েছিলেন। সোমদত্তের উচিত হয়নি এতেরাত্রে  মদনসেনাকে এক যেতে দেওয়া, মদনসেনা যদিও কথা রাখতে বেরিয়েছিল কিন্তু অত গয়না পরে স্বামীকে অসন্তুষ্ট করে ওভাবে বেরিয়ে যাওয়া তার উচিত হয়নি। কিন্তু চোরের কাজ সুযোগ পেলেই চুরি করা। সেই গভীর রাতে মদনসেনাকে একা পেয়ে সে তার অলঙ্কার অনায়াসেই নিতে পারত, কিন্তু সে শ্রদ্ধা দেখিয়ে এবং তাকে বিশ্বাস করে কিছুই করেনি। এমন উদারতা সামান্য একজন  চোরের কাছে থেকে আশা করা যায় না।
     সঠিক উত্তর পেয়ে বেতাল আবার শ্মশানে গিয়ে সেই গাছে ঝুলে রইল আর বিক্রমাদিত্যও তাঁর যা কাজ তাই করল। বেতালও দশম গল্প আরম্ভ করল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য