সুন্দরী মীরজান ও জলতলের অধিপতি -- কাজাখ লোককাহিনী

এক গরীব বিধবা ছিল । তার ছিল একমাত্র সন্তান, একটি মেয়ে, তাদের বংশে সব থেকে সুন্দরী । নাম তার মীরজান। এক গরমের দিনে গ্রামের মেয়েরা নদীতে স্নান করতে যাবে, মীরজানকেও ডাকল তারা ; জলে নামল সবাই । মেয়েরা বলল :
তুই সত্যিই সুন্দরী, মীরজান! খান তোকে দেখলে বলতেন, ও সুন্দরী মীরজান, তোমায় আমি আমার সর্বস্ব দিয়ে দেব, তুমি কেবল আমার হও?’
মীরজান লজ্জায় চোখ নিচু করল ; তোমরা এমন ঠাট্টা করছ কেন, মেয়ের? আমার দিকে খান ফিরেও তাকবেন না। আমি যে গ্রামের মধ্যে সব থেকে গরীব ? নদীর জল ফুঁসে উঠল আর নদীর গভীর থেকে কার যেন তেজী কণ্ঠস্বর শোনা গেল :
‘ও সুন্দরী মীরজান, তোমায় আমি আমার সর্বস্ব দিয়ে দেব, তুমি কেবল আমার হও!’
মেয়েরা ভয় পেয়ে ছুট লাগাল তীরের দিকে, তারপর কাপড়চোপড় নিয়ে দলবেঁধে গ্রামের দিকে দৌড়াল। মীরজানের কথা আর কারুর মনেই রইল না।
মীরজাল তীরে দাঁড়িয়ে দেখে তার পোশাকের ওপরে সাতপাকে কুন্ডলী পাকিয়ে বসে আছে এক বিরাট সাপ, মাথা উঁচু করে তুলে তার দিকে একদৃষ্টি তাকিয়ে আছে।
সাপটা বলল : 'ও সুন্দরী মীরজান। আমি জলের রাজ্যের রাজা। তোমাকে আমি প্রাণের চেয়েও বেশী ভালবাসি। আমাকে বিয়ে কর! তোমাকে উপহার দেখ আমার স্ফটিকের প্রাসাদটা । তুমি যদি আমায় কথা দাও, আমাকে বিয়ে করবে তাহলে তোমার পোশাক দিয়ে দেব তোমায়, যদি রাজী না হও বিয়ে করতে, তোমার পোশাক আমি নদীতে নিয়ে চলে যাব। তখন তুমি কি করবে?
ভয়ে দিশা হারিয়ে মীরজান কথা দিল । অমণি সাপটাও যেন আর নেই । কেবলমাত্র যেখানে সেটা গিয়ে জলে নেমেছে সেখানে জলট চক্রাকারে ঢেউ কাটতে লাগল, আর ছোট ছোট ঢেউগুলো তীরে এসে ধাক্কা দিতে লাগল ! কোনরকমে পোশাক পরে মেয়েটিও দৌড় দিল । হাঁফাতে হাঁফাতে তাঁবুতে ঢুকে মায়ের সামনে মাটিতে পড়ে হু হু করে কেঁদে ফেলল।
"কি হল, সোনামণি? কে তোর মনে দুঃখ দিয়েছে" উদ্বিগ্ন প্রশ্ন মায়ের।

মীরজান হাত মোচড়াতে মোচড়াতে সব কথা মাকে বলল: “কি হবে এখন? আমি কথা দিয়েছি । কথা দিয়ে সে কথা না রাখা সম্ভব নয় তো!’ মা মেয়েকে বুকে চেপে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল : “শান্ত হ’, বাছা ? ঐ ভয়ঙ্কর সাপটা নেহাতই তোর কল্পনা । অমন সাপ হয় না। ক'দিন বাড়ীতে বসে থাক কোথাও বেরোস না ।"

এক সপ্তাহ কেটে গেল। মীরজান আবার হাসিখুশী হয়ে উঠল। মা তাকে তাবু থেকে এক পাও কোথাও বেরোতে দেয় না আর নিজেও দূরে কোথাও যায় না।
একদিন বৃদ্ধ দরজার বাইরে তাকিয়ে ভয়ে হিম হয়ে গেল : হায় হায়, এবার আমাদের আর বঁচিতে হবে না। যতদূর চোখ যায় কালো কালো সাপ নদী থেকে বেরিয়ে আমাদের তাবুর দিকে আসছে।’
সাদা হয়ে পেল মীরজানের মুখ: "আমাকে নিতে এসেছে ওরা...' দরজা বন্ধ করে দিল তারা, তারপর সব আসবাবপত্র এনে চেপে দিল দরজাটা, আর নিজের চাদরের নীচে লুকিয়ে রইল, নিঃশ্বাস নিচ্ছে না ভয়ে ।
সাপগুলো ওদিকে ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসছে-গোটা এলাকাটা গোলমালে ভরে গেছে। তাবুর কাছে এসে দেখে যে ভেতরে ঢোকার পথ বন্ধ ; হিসহিস করে উঠল তারা, তাবুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ভেতরে ঢুকবার পথ খুঁজে নিল, অজ্ঞান মীরজনকে তাবু থেকে বার করে নিয়ে নদীর দিকে বয়ে নিয়ে চলল তারা । মীরজানের মা চীৎকার করে কাঁদতে কঁদিতে ছুটে চলল তাদের পেছনে পেছনে কিন্তু তাদের ধরতে পারল না। মেয়েটিকে সঙ্গে নিয়ে সাপগুলো জলের মধ্যে উধাও হয়ে গেল।

দুঃখে টলতে টলতে মা নিজের ফাঁকা ঘরে ফিরে এসে কান্নায় ভেঙে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে আর বলতে লাপল :
'আমার মেয়ে মীরজান শেষ হয়ে গেল! শয়তান সাপটা আমায় চিরদুঃখিনী করে দিল!...’
দিন যায়, চাঁদ ওঠে আবার ডোবে । মীরজানের মা একেবারেই বুড়িয়ে গেল, পিঠ ঝুঁকে গেল, চুল সাদা হয়ে গেল । তবু কিসের যেন অপেক্ষায় থাকে সে সব সময় । নিস্তেজ চোখে তাকিয়ে থাকে দূর দিগন্তে যেদিকে তার মেয়েকে নিয়ে গেছে কালো সাপেরা।

একদিন সে বিষগ্ন মনে বসে আছে নিজের তাবুর দোরগোড়ায়, হঠাৎ দেখে এক যুবতী আসছে তার দিকে, রানীর মত পোশাক-আশাক, তার বাঁ কোলে একটি মেয়ে আর ডান হাতে একটি ছেলের হাতধরা। সর্বশরীর কেঁপে উঠল বৃদ্ধার। মীরজান মেয়ে আমার! তুই নাকি ?’ মেয়েকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করল সে । তাবুর মধ্যে ঢুকল তারা। মেয়ে, নাতিনাতনীর দিকে চেয়ে দেখে বৃদ্ধা, নিজের চোখকে বিশ্বাস হয় না ।


‘কোথা থেকে তুই এলি, মীরজান ? 
‘আমি এসেছি জলতলের রাজ্য থেকে । আমার স্বামী সে রাজ্যের অধিপতি ' 
‘জলের নীচে তুই সুখে আছিস ? 
‘আমার থেকে বেশি সুখী আর কেউ নেই, মা। তোমার জন্য আমার মন কেমন করছিল আর আমার ছেলেমেয়েকে তোমায় দেখাব ভাবলাম।’
তুই কি আবার ঐ মুখপোড়া সাপটার কাছেই ফিরে যাবি নাকি, মা ? তুই তোর দুঃখিনী মাকে আবার ফেলে যাবি নাকি?’ বলল বৃদ্ধ আর মনে ভাবল; এ আমি কখনও হতে দেব না! কিছুতেই আর আমি মীরজানকে কাছছাড়া করব না। ’

মীরজান উত্তর দিল ; মাগো, আমি তোমার কাছে বেশিক্ষণ থাকতে পারব না। সন্ধ্যাবেলায় আমাদের বাড়িতে, জলতলের প্রাসাদে পৌছান চাই । আমার স্বামী অপেক্ষা করে আছেন আমাদের জন্য । আমি তাকে ভালবাসি, শ্রদ্ধা করি। জল ছেড়ে যখন উঠে আসেন তখন কেবলমাত্র সাপের চেহারা নেন কিন্তু জলের নীচে তিনি চমৎকার বীরপুরুষ '
যাক, কি আর হবে, এই ছিল আমাদের কপালে। কিন্তু তুই জলের নীচের রাজ্যে কি করে আবার ফিরে যাবি ?"
‘আমি নদীর কাছে গিয়ে ডাক দেব; আহমেদ আহমেদ। আমি তোমার স্ত্রী । এসো, সোনামণি, আমাদের নিয়ে যাও?’ আমার স্বামী তখন এসে আমাদের নিয়ে যাবে প্রাসাদে '
বুড়ী ডাবল, ‘আস্থা, এবার বুঝলাম কি করতে হবে।' 
এবার কান্নাকাটি করে মেয়েকে বারবার বলতে লাগল : ‘চিরকাল আমার সঙ্গে থাকতে না চাস, আজকের রাতটা অন্তত থেকে যা!” মায়া হল মীরজানের মায়ের জন্য, সকাল পর্যন্ত থেকে যেতে রাজী হল । অত্যন্ত আনন্দিত হল বৃদ্ধা, সঙ্গে সঙ্গে যেন যৌবন ফিরে পেল।
দিন এদিকে শেষ হতে চলেছে। রাত নামলে বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়ল, ঘুমিয়ে পড়ল সুন্দরী মীরজানও। তখন বৃদ্ধা চুপি চুপি বিছানা ছেড়ে উঠে, অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে কুড়ালটা নিয়ে পা টিপে টিপে বেরিয়ে গেল তাবু থেকে ।
নদীর কাছে এসে উঁচু পাড়ের ওপর দাড়িয়ে চীৎকার করে বলল : আহমেদ, আহমেদ। আমি তোমার স্ত্রী! এসো, সোনামণি, আমাদের নিয়ে যাও! তক্ষুণি জলের থেকে উঠে এল সাপটা আর তীরের ওপর মাথা রেখে মোহমাখা স্বরে বলল :
"এলে শেষ পর্যন্ত, মীরজান; কখন থেকে অপেক্ষা করে আছি, ছেলেমেয়ের জন্যও মন কেমন করছে...”
আর দেরী করল না বৃদ্ধা, কুড়ালের এক ঘায়ে সাপটার মাথা কেটে উড়িয়ে দিল...কাটা মাথাটা তীরে পড়ে গড়াগাড়ি খেতে লাগল। নদীর জল লালে-লাল হয়ে উঠল...

সকালে ঘুম থেকে উঠে মীরজান ছেলেমেয়েকে নিয়ে মায়ের কাছে বিদায় নিতে লাগল :
'চললাম গো মা, আবার এক বছর বাদে আসব তোমার কাছে।’ ছেলের হাত ধরে আর মেয়েকে কোলে নিয়ে চলল নদীর দিকে। জলের কাছে দাঁড়িয়ে ডাকতে লাগল স্বামীকে:
"আহমেদ, আহমেদ। আমি তোমার স্ত্রী এসো, সোনামনি, আমাদের নিয়ে যাও! কেউ উঠে আসে না । একটুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার ডাক দিল মীরজান; ‘আহমেদ, আহমেদ। আমি তোমার স্ত্রী । এসো, সোনামনি, আমাদের নিয়ে যাও। জলের গভীর থেকে জলতলের রাজ্যের অধীশ্বর আর উঠে আসে না কিছুতেই। মীরজামের বুকটা কেমন ব্যথা করে উঠল, ভাল করে লক্ষ্য করে দেখে নদীটী লালে লাল..
সবই বুঝল মীরজান, কাঁদতে কাঁদতে চুমু খেতে লাগল ছেলেমেয়েকে :
‘তোমাদের বাবা মারা পড়েছেন... আর আমিই তার জন্য দায়ী... তোমরা এখন অনাথ হয়ে গেলে, কি করব আমি?”

চোখের জলে ভাসতে ভাসতে ছেলেমেয়েকে বলল : 
তুই, মামণি, দোয়েল পাখি হয়ে জলের কাছে কাছে উড়ে বেড়াবি আর তুই, বাবা, বুলবুলি পাখি হয়ে ভোরবেলায় গান গাইবি! আর আমি তোদের আশ্রয়হীনা মা কোকিল হয়ে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় ঘুরে বেড়াব, স্বামীর কথা স্মরণ করে বিষন্নভাবে ডাকতে থাকব!..'
বলে তারা তিনজনেই পাখিতে পরিণত হয়ে গেল, তারপর ডানা ঝাপটা দিয়ে বিভিন্ন দিকে উড়ে চলে গেল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য