বাকরুদ্ধ বাক্‌বাহাদুর -- উল্লাস মল্লিক

পরাশরবাবু ভেবেছিলেন আড়ংধোলাই খাবেন; তার বদলে পেলেন রজনীগন্ধার মালা, ব্যাপক হাততালি আর একবাক্স মিষ্টি।
সেদিন সন্ধেবেলা পাড়ার ফাংশানে পরাশরবাবু একজন নিরীহ স্রোতা হিসেবে হাজির ছিলেন। পরাশরবাবু অবসর নিয়েছেন মাত্র কিছুদিন। এখন সময় কাটানো তার কাছে মস্ত বালাই। সকালবেলাটা বাজার করে, খবরের কাগজ পড়ে কেটে যায়; দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর দিবানিদ্রা দেন; বিকেলে গাছের পরিচর্যায় থাকেন।
সমস্যা বেশি হয়, সন্ধেগুলোকে নিয়ে। কী করবেন, কোথায় যাবেন—ভেবে পান না কিছুতেই। এই পাড়ায় ভাড়াটে হয়ে নতুন এসেছেন। ফলে বন্ধুবান্ধব বিশেষ কেউ নেই এখানে। গিন্নি আর বউমা টিভি সিরিয়ালে বুদ হয়ে থাকে। দু-একবার সিরিয়াল দেখার চেষ্টা করেছেন; কিন্তু খুব জুৎসই মনে হয়নি। চরিত্রগুলো কে কার সঙ্গে সম্পর্কিত, তাদের দাবি কী, তারা খামোখা কেন সর্বদা চিৎকার করে, রাগ দেখায় বা চোখের জল ফেলে, কিছুতেই বোধগম্য হয় না তার।
গিন্নি বা বউমাকে জিগ্যেস করে জানার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তারা কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে থাকে এইসময়, কিছু কানে ঢোকে না তাদের; খুব বেশি জিগ্যেস করলে তার আনতাবড়ি প্রশ্নে বিরক্ত হয় এবং খেঁকিয়ে ওঠে। চোখের সমস্যার জন্যে রাতে পড়াশোনাও করতে পারেন না।
অগত্যা বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন তিনি। রাস্তাঘাটে ঘোরেন, গাড়ি-ঘোড়া-লোকজন দেখেন, পথকুকুরকে নেড়ো বিস্কুট খাওয়ান, আর কোথাও গানবাজনা হলে ঢুকে পড়েন। নাচ, গান, কবিতা শুনতে শুনতে দিব্যি কেটে যায় সময়টা।
সেদিন তেমনই গিয়েছিলেন একটা ফাংশানে। গিয়ে দেখলেন তার বাড়িওয়ালা নরোত্তমবাবু এই ফাংশানে হৰ্তাকর্তা। নরোত্তমবাবু
বসালেন। অধিক খাতির করে তাঁকে একেবারে সামনের সারিতে নিযে গিয়ে বসালেন। বেশ শুনছিলেন গান, বাজনা। কেলেঙ্কারিটা ঘটে গেল হঠাৎই। একজন শিল্পী গান গাইছিলেন। গানের পরেই বিখ্যাত এক নাচের দলের নৃত্য পরিবেশ করার কথা। কোনও কারণে গানগুলো দর্শকদের ঠিক মনোমতো হচ্ছিল না। প্রথমে তারা হইহল্লা করে, হাততালি দিয়ে তাদের বিরক্তি প্রকাশ করল।
কিন্তু সেই শিল্পী আবার একটু নেআঁকড়ে ধরনের। দর্শকদের বিরক্তিকে আমল না দিয়ে একটার পর একটা গান গেয়ে যাচ্ছিল। শেষে দর্শকদের চূড়ান্ত ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। মুহুর্মুহু পচা ডিম নিক্ষিপ্ত হতে লাগল স্টেজে। এবার রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য হলেন গায়ক; কোনওক্রমে হারমোনিয়াম দিয়ে মাথা আড়াল করে নেমে গেলেন স্টেজ থেকে। কিন্তু তার পরেই শুরু হল আসল সমস্যা। রাস্তায় যানজট থাকায় নাচের দলটা তখনও এসে পৌঁছোয়নি।
কিন্তু স্টেজ তো আর ফাকা রাখা যায় না। দর্শকরা তাহলে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগও বিচিত্র নয়। এদিকে কেউই আর সাহস করে স্টেজে উঠতে চাইছে না।
ঠিক তখনই স্বয়ং নরোত্তমবাবু এসে পরাশরবাবুকে অনুরোধ করলেন স্টেজে উঠতে।
পরাশরবাবু ভয়ানক অবাক হয়ে বললেন, ‘স্টেজে উঠে আমি কী করব ?
যাই হোক করুন। নরোত্তমবাবু বললেন, নাচ, গান, আবৃত্তি, মূকাভিনয়, যোগব্যায়াম, হাস্যকৌতুক, কুইজ, ম্যাজিক— যা ইচ্ছে করুন, মোটকথা দর্শকদের ভুলিয়ে ভালিয়ে রাখতে হবে কিছুক্ষণ।'
পরাশরবাবু করজোড়ে জানালেন, তিনি এসবের বিন্দু বিসর্গও জানেন না। তিনি তো কোন ছার, তার উর্ধ্বতন চোদ্দোপুরুষেও এসবের চর্চা নেই।
নরোত্তমবাবু বললেন, তাহলে বক্তৃতা করুন। পরাশরবাবু বললেন, বক্তৃতাও তিনি কস্মিনকালে করেননি। এবার একটু রাগান্বিত গলায় নরোত্তমবাবু যা বললেন তার সরলার্থ করলে দাঁড়ায় যে, বক্তৃতা অত্যন্ত সহজ কাজ, তার জন্যে কোনও পূর্ব অভিজ্ঞতার প্রয়োজন পড়ে না। আর তিনি যদি এই বিপদের দিনে তাকে রক্ষা না করেন তবে নরোত্তমবাবুও তার ভাড়াটে বিষয়ে নতুন করে চিন্তা ভাবনা করবেন। কারণ রোজই তাঁর কাছে আরও বেশি ভাড়া দেবার প্রস্তাব নিয়ে অনেকেই আসছে।

এর পরও পরাশরবাবু হাত জোড় করে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন; কিন্তু সে সুযোগ তিনি পেলেন না। কয়েকজন বলিষ্ঠ চেহারার কর্মকর্তা তাকে একপ্রকার চ্যাংদোলা করে স্টেজে তুলে দিল।
পরাশরবাবু শুনতে পেলেন মাইকে ঘোষণা হচ্ছে—এবার আপনাদের সামনে বক্তব্য রাখবেন, যিনি দেশ-বিদেশের বহু মঞ্চ কাঁপিয়ে দিয়েছেন বক্তৃতা করে, সেই পরাশর পতিতুন্ডু।
বিদেশের কথা শুনেই বোধহয় দর্শকরা সাময়িকভাবে একটু শান্ত হল। এদিকে পরাশরের জলে কুমির ডাঙায় বাঘ। যেকোনও মুহুর্তে ধেয়ে আসতে পারে পচা ডিম; আবার নেমে গেলে বাস্তুচ্যুত হবার প্রবল সম্ভাবনা। শিকাগোর বিবেকানন্দের থেকেও জটিল পরিস্থিতি।
এমত অবস্থায় বলবেন কী—কিছুই যে মনে আসছে না তাঁর; এমনকী পিতৃ-পিতামহের নামধাম পর্যন্ত ভুলতে বসেছেন। অসহায় চোখে এদিক ওদিক তাকালেন। স্টেজে তিনি, সামনে মাইক্রোফোন আর আশপাশে কটা ফাটা পচা ডিম যা থেকে তীব্র গন্ধ আসছে।

হঠাৎ কিছুদিন আগে কোনও একটা ম্যাগাজিনে কড়া পচা ডিম বিষয়ক একটা নিবন্ধের কথা মনে পড়ে গেল তার।
পচা ডিম যে অতি মূল্যবান একটা বস্তু—পচা ডিম থেকে ভালো সার, উৎকৃষ্ট শ্যাম্পু, বা তীব্র কীটনাশক তৈরি করা যেতে পারে, এবং পচা ডিমের পুষ্টিগুণ টাটকা ডিমের চাইতে বেশি, একবার যদি নাক টিপে খেয়ে নেওয়া যায় তবে অশেষ উপকার; আফ্রিকার কোন একটা উপজাতি পচা ডিম খায়। দেখা গেছে। তাদের গড় আয়ু পৃথিবীর বাকি জনগোষ্ঠীর চেয়ে অনেক বেশি; অর্থাৎ পচা ডিম অনেকটা মরা হাতির মতো! এইসব ছিল ওই নিবন্ধের বক্তব্য।
পরাশরবাবুর একটা গুণ হল—তার স্মৃতিশক্তি চমৎকার। একবার যা পড়েন বা শোনেন হুবহু মনে থাকে। অনন্যোপায় পরাশরবাবু দর্শকদের সম্ভাষণ করে পচা ডিম বিষয়ক সেই নিবন্ধটা গড়গড় করে বলে গেলেন। বলতে বলতে আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলেন, দর্শকরা একেবারে চুপ। খুব মন দিয়ে তার বক্তৃতা শুনছে। নিবন্ধটা শেষ পর্যন্ত বলে, দর্শকদের আরও একবার নমস্কার জানিয়ে এবং তাকে এখানে আমন্ত্রণ জানানোর জন্যে উদ্যোক্তাদের ধন্যবাদ দিয়ে বক্তব্য শেষ করলেন।
স্টেজ থেকে নামতেই কে যেন একট রজনীগন্ধার মালা পরিয়ে দিল গলায়, আর আবেগে থরথর নরোত্তমবাবু বুকে টেনে নিলেন তাঁকে, নরোত্তমবাবুর চোখে জলও যেন লক্ষ করলেন পরাশর।
সে যাত্রায় রক্ষা পেলেও ফের বিপদ ঘনিয়ে এল পরাশরবাবুর জীবনে। আবার সেই নরোত্তমবাবু। তিনদিন পর সকালবেলা নরোত্তমবাবু কয়েকটা ছেলে-ছোকরা নিয়ে হাজির। ক্লাবের ছেলে সব। তবে এটা অন্য ক্লাব। নরোত্তমবাবুর শালা এই ক্লাবের প্রেসিডেন্ট। আবার স্টেজে উঠে বক্তৃতা দিতে হবে পরাশরবাবুকে। এবার আরও একধাপ এগিয়ে কাজ করেছে এরা। প্রধান বক্তা হিসেবে পরাশরবাবুর নাম ছাপিয়ে দিয়েছে প্রচারপত্রে। পরাশরবাবু প্রথমে ভেবেছিলেন, উদ্দিষ্ট দিনে পালিয়ে যাবেন বাড়ি ছেড়ে। কিন্তু তার পরেই ভয় হল, ফিরে এসে হয়তো দেখবেন বাড়িতে তালা। অতি অল্প ভাড়ায় এই বাড়িটা পেয়েছেন তিনি। ফলে গৃহত্যাগের পরিকল্পনা ত্যাগ করলেন। কিন্তু নাওয়া-খাওয়া-ঘুম মাথায় উঠল তার। পচা ডিম একবার রক্ষাকবচ হয়ে দেখা দিয়েছিল, কিন্তু বারবার তো হবে না।
হঠাৎ তার মাথায় একটা সম্ভাবনার উদয় হল। আচ্ছা, বক্তৃতা কি আদৌ কেউ শোনে ? মনে হয় না। নচেৎ, সেদিন তিনি যা বলেছিলেন তাতে করে তার হাড়গোড় একটাও আস্ত থাকার কথা নয়।

এই সম্ভাবনাটাকে সম্বল করেই পরাশরবাবু হাজির হলেন অনুষ্ঠানে। এবং বুক ঠুকে উঠেও পড়লেন স্টেজে। তারপর যথারীতি সম্ভাষণের পর ক্লাস নাইনে পড়া প্রাত্যহিক জীবনে বিজ্ঞান রচনাটা টানা মুখস্থ বলে গেলেন।

এবং কী আশ্চর্য। এবারও বক্তৃতা শেষ হবার পর ব্যাপক হাততালি আলিঙ্গন আর অভিনন্দন।
ব্যস। আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ল তার বাগ্মীতার খ্যাতি। দূর-দূরান্ত থেকে আমন্ত্রণ আসতে লাগল বক্তৃতা দেবার জন্যে। তিনিও তখন বেপরোয়া। পাড়ার জলসা, স্কুল-কলেজের ফাংশান, ধর্মীয় সভা, ফুটবলক্রিকেট প্রতিযোগিতা, রাজনৈতিক মঞ্চ সমস্ত জায়গায় তিনি দাপিয়ে বক্তৃতা করতে লাগলেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি বক্তৃতার জন্যে পারিশ্রমিক ধার্য করলেন। ঘণ্টা পিছু রেট। দিনে দিনে নিজের বক্তৃতাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেলেন। টানা গদ্য না বলে মাঝে মাঝে কিছু কবিতা বা সংস্কৃত শ্লোক ঢুকিয়ে দিতে লাগলেন। লক্ষ করলেন, এতে হাততালির বহর বাড়ে।

একবার এক মহিলা সমিতির অনুষ্ঠানে বক্তৃতা শুরু করলেন মেঘনাদবধ কাব্যের প্রথম সর্গ আউড়ে, তারপর সেদিনের কাগজে পড়া ওয়েদার রিপোর্টটা গড়গড় কর আউড়ে, বিয়ের মন্ত্র দিয়ে বক্তৃতা শেষ করলেন।
মহিলা সমিতির নেত্রী এত আপ্লুত হয়ে গেলেন যে, পরের বছরের অনুষ্ঠানের জন্যে অ্যাডভান্স করে দিলেন তখনই। তারপর এক রাজনৈতিক দলের সভায় শুরু করলেন টুইঙ্কল টুইঙ্কল লিটিল স্টার দিয়ে, তারপর মুঘল সম্রাজ্যের পতনের
কারণগুলো ঝাড়া মুখস্থ বলে, শেষে পিতৃশ্ৰাদ্ধের মন্ত্রটা মনে ছিল, সেটা আউড়ে দিলেন। পরদিন স্থানীয় একটা সংবাদপত্রে ভূয়সী প্রশংসাসহ ছবি ছাপা হল তার। বলা হল, বক্তৃতার ক্ষেত্রে তিনি নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছেন। তাকে বাগবাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করল তারা।

এরকমই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ ঘটে গেল সেই মারাত্মক কাণ্ড । সকালবেলা খবরের কাগজ পড়ছিলেন পরাশরবাবু। এখন খবরের কাগজটা বেশ খুঁটিয়ে পড়েন তিনি। তেমন তেমন সংবাদ পেলে মুখস্থ করে নেন; বক্তৃতার কাজে লাগে। পরশুই তো একটা তবলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একাদশ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বক্তৃতা করে এলেন। সেদিনই কাগজে একটা খবর ছিল—কোথাকার এক ভিখারি পয়সা জমিয়ে লটারির টিকিট কিনেছিল; দেখা গেল তার ভাগেই প্রথম পুরস্কার। সেই গল্পটা বলে; তারপর দুই বিঘা জমি’ আউড়ে বক্তৃতা শেষ করেছিলেন পরাশরবাবু।

হঠাৎ ডোরবেল। দরজা খুলে দেখলেন রোগাভোগা একটা লোক দাঁড়িয়ে। পরনে অতি জীর্ণ পোশাক। পরাশরবাবু প্রথমে ভেবেছিলেন কোনও সাহায্যপ্রার্থী হবে। কিন্তু ভেতরে আসার অনুমতি চাইতে ভাবলেন—সংগঠক। পরাশরবাবু পরিষ্কার বলে দিলেন, এক মাসের মধ্যে তার কোনও ডেট ফাঁকা নেই। লোকটা খুব বিনয়ের সঙ্গে জানাল সে কোনও সংগঠক নয়। তারপর বলাকওয়া নেই পরাশরবাবুকে টিপ করে একটা প্ৰণাম ঠুকে বলল, আপনার ঋণ যে আমি কী করে শোধ করব..!’
হা-হা’ করে বাধা দিয়ে পরাশরবাবু বললেন, কিন্তু আমি তো আপনাকে ঠিক চিনতে পারছি না।’
লোকটা বলল, পরশু আমি তবলা ক্লাবে আপনার বক্তৃতা শুনতে গিয়েছিলাম।
পরাশরবাবু বললেন, ‘বাহ, বেশ, বেশ। আপনি বোধহয় তবলচি ?’
লোকটা বলল, না না, তবলচি নয়। আমি ভিক্ষে-দুঃখু করে খাই। কোথাও অনুষ্ঠান দেখলে ঢুকে যাই, অনেক সময় বিনি পয়সায় চা জুটে যায়।’
ও আচ্ছা!’ পরাশরবাবু বললেন, কিন্তু ঋণ শোধের ব্যাপারটা তো ঠিক এখনও মানে..আমি তো আপনাকে টাকাপয়সা দিয়েছি বলে মনে পড়ছে না।’

লোকটা বলল, তা একরকম টাকাই দিয়েছেন আপনি আমাকে। তবে অনেক বেশি টাকা—একেবারে দশ লাখ!’
দশ লাখ পরাশরবাবু ভাবলেন, লোকটা পাগল-টাগল না কি।”
লোকটা বলল, আপনার বক্তৃতা শুনেই তো লটারির টিকিটটা কেটে ফেলি; আর আজ দেখি একেবারে ফাস্ট প্রাইজ—দশ লাখ! কী বলে যে আপনাকে...।”
লোকটা পরাশরবাবুর পায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে প্রণাম করে ফের।
এবার বাধা দিতেও ভুলে যায় পরাশরবাবু। তার শিরদাঁড়া দিয়ে হিমেল একটা স্রোত নেমে যাচ্ছে। ভয়ে। প্রচণ্ড ভয় লাগছিল তার। মনে হচ্ছিল, কেউ তাহলে বক্তৃতা শোনে ? একজন হলেও শোনে? সর্বনাশ! তার ধারণা ছিল বক্তৃতা কেউ কোথাও কোনওদিন শোনে না।
বক্তৃতা করতে গিয়ে এতদিন তিনি যা যা বলেছেন, তাতে করে দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মহামারি, সুনামি, দেশভাগ, উল্কাপাত, সবকিছু ঘটে যেতে পারত।
একে একে সব মনে পড়ে যাচ্ছিল তার—কিছুদিন আগে একটা স্কুলের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে নিরাপদে টুকলি করার উপায়, যা তিনি স্কুলজীবনে এক ফাঁকিবাজ বন্ধুর থেকে শুনেছিলেন, সেটাই বলে এসেছিলেন হুবহু; তারপর স্থানীয় থানার ক্রীড়া অনুষ্ঠানে, পুলিশের ঘুষ খাবার প্রবণতা বিষয়ে পড়া একটা সমীক্ষা গড়গড় করে বলে এসেছিলেন। এসব যত মনে পড়তে লাগল তত যেন হাত-পা ঠান্ডা হতে লাগল।
এর পরই বক্তৃতা করা ছেড়ে দিলেন পরাশরবাবু। বেপরোয়া বক্তৃতা করার আত্মবিশ্বাসটাই চলে গেল তার। সংগঠকরা অনুরোধ নিয়ে এলেই হাত জোড় করে মার্জনা চাইতেন। তারপর ইশারায় জানিয়ে দিতেন তার গলায় ভয়ানক একটা রোগ ধরা পড়েছে—কথা বলা একেবারে নিষেধ।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য