ধর্মবাবা -- জার্মানের রূপকথা

এক গরিব লোকের ছিল অসংখ্য ছেলেমেয়ে । তাই পৃথিবীর প্রত্যেককে সে বলেছিল তার ছেলেমেয়েদের ধর্মবাবা হতে । কিন্তু আরো একটি ছেলে জন্মাবার পর তার ধর্মবাবা করার লোক কাউকে সে খুঁজে পেল না । কী যে করবে ভেবে না পেয়ে সমস্যাটার কথা ভাবতে ভাবতে সে পড়ল ঘুমিয়ে । ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখল, ফটকের কাছে প্রথম যার দেখা পাবে তাকেই বলতে হবে ধর্মবাবা হবার কথা । জেগে উঠে স্থির করল স্বপ্নে যা দেখেছে তাই করবে বলে । ফটকের কাছে গিয়ে প্রথম যার দেখা পেল তাকে সে অনুরোধ করল ধর্মবাবা হবার ।
বিদেশী লোকটি তাকে ছোট্টো একটা গেলাসে জল দিয়ে বলল, “এটা মন্ত্র-পড়ার জল । মৃত্যু কোথায় দাঁড়িয়ে আছে জানলে এই জল দিয়ে রোগী তুমি সুস্থ করতে পারবে । রোগীর শিয়রের কাছে মৃত্যু দাঁড়িয়ে থাকলে এই জল রোগীকে খেতে দিয়ো । কিন্তু মৃত্যু পায়ের কাছে দাড়িয়ে থাকলে কোনো ফল হবে না । রোগীকে মরতেই হবে ।”
রোগীর জীবন বাঁচানো যাবে কি যাবে না সে কথা সঠিকভাবে তার পর থেকে সে বলে দিতে পারত । পরে তার খ্যাতি পড়ল চারদিকে ছড়িয়ে এবং দেখতে দেখতে সেই গরিব লোক হয়ে উঠল খুব ধনী। একবার রাজার শিশুকে দেখার জন্য তার ডাক পড়ল । ঘরে গিয়ে সে দেখে মৃত্যু শিয়রে দাঁড়িয়ে । সঙ্গে সঙ্গে সেই মন্ত্র-পড়া জল দিয়ে রাজশিশুকে সে সারিয়ে দিল । দ্বিতীয়বারও পারল তাকে সারাতে । কিন্তু তৃতীয়বার শিশু অসুস্থ হবার পর সে গিয়ে দেখে মৃত্যু দাঁড়িয়ে আছে পায়ের কাছে । সে বুঝল শিশুটিকে মৃত্যুর হাত থেকে কিছুতেই বাঁচানো যাবে না।
লোকটি ভাবল এবার তার ছেলের ধর্মবাবার কাছে গিয়ে সে জানাবে ঐ মন্ত্র-পড়া জল কী ভাবে সে ব্যবহার করেছে । কিন্তু তার বাড়িতে গিয়ে সে দেখে আশ্চর্য এক দৃশ্য । বাড়ির দোতলায় গিয়ে দেখে ঝাঁটা আর ধুলো-ফেলা পাত্রের মধ্যে ধুমাধুম ঝগড়া আর মারামারি ।
সে জিজ্ঞেস করল, “ধর্মবাবা কোথায় থাকে ?” 
ঝাঁটা উত্তর দিল, “ওপরতলায় ।” 
তিনতলায় গিয়ে সে দেখে কতকগুলো মরা আঙুল পড়ে রয়েছে। 
সে প্রশ্ন করল, “ধর্মবাবা কোথায় থাকে ?”
একটা আঙুল উত্তর দিল, “চারতলায় ।” 
সেখানে পড়েছিল একগাদা মরা মাথা । তারা তাকে পাঠাল আরো উপরতলায় ৷ পাঁচতলায় পৌছে সে দেখে কড়াই-এর মধ্যে মাছেরা নিজেরাই নিজেদের রান্না করছে । তারাও বলল, “ওপরতলায়।” 
ছতলায় পৌছে দরজার চাবি দেবার ফুটোর মধ্য দিয়ে সে দেখে ধর্মবাবার মাথায় লম্বা এক জোড়া শিঙ । দরজা খুলে সে ভিতরে আসতেই ধর্মবাবা একলাফে বিছানায় উঠে মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল ।
লোকটি বলল, “মিস্টার ধর্মবাবা, তোমার বাড়ির চাকর-বাকর সব ভারি অদ্ভুত। দোতলায় দেখি ঝাঁটা আর ময়লা-ফেলা পাত্রের মধ্যে ধুমাধুম ঝগড়া আর মারামারি ”
ধর্মবাবা বলল, “তুমি ভারি বোকা । ওরা বাড়ির চাকর আর ঝি—নিজেদের মধ্যে খোশগল্প করছিল ।”
“কিন্তু তিনতলায় দেখলাম অনেক মরা আঙুল ৷” 
“আরে বোকা, ওগুলো গাছ-গাছড়ার শেকড় ।” 
“কিন্তু চারতলায় দেখলাম একগাদা মুণ্ডু ।” 
“হাদারাম । ওগুলো তো গাছের কন্দ ।” 
“আর পাচতলায় দেখলাম কড়াইতে নিজেরাই মাছগুলো ভাজাভাজা হচ্ছে ।” তার কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে মাছেরা ঘরের মধ্যে হেঁটে এল।
“আর ছতলায় এসে দরজায় চাবি দেবার ফুটোর মধ্যে দিয়ে তোমাকে দেখলাম, মিস্টার ধর্মবাবা । দেখি তোমার মাথায় লম্বালম্বা শিঙ ।”
ধর্মবাবা বলল, “তোমার কথা সত্যি নয় ।”
লোকটি তখন ভীষণ ভয় পেয়ে দৌড়ে পালাল—তা না হলে ধর্মবাবা তাকে নিয়ে কী করত না করত কে বলতে পারে ?
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য