ন্যাংচাদার হাহাকার

ক্যাবলা বললে, বড়দার বন্ধু গোবরবাবু ফিলিমে একটা পার্ট পেয়েছে। 
টেনিদা চার পয়সার চীনে বাদাম শেষ করে এখন তার খোলাগুলোর ভেতর খোজাখুজি করছিল। আশা ছিল দু-একটা শাস এখনো লুকিয়ে থাকতে পারে। যখন কিছু পেলে না, তখন খুব বিরক্ত হয়ে একটা খোলাই তুলে নিলে, কড়মড় করে চিবুতে চিবুতে বললে, বারণ কর ক্যাবলা—এক্ষুণি বারণ করে দে ।
ক্যাবলা আশ্চর্য হয়ে বললে, কাকে বারণ করব ? গোবরবাবুকে ? 
--আলবাত। নইলে দেখবি তোর গোবরবাবু স্ৰেক ঘুটে হয়ে গেছে।

—ঘুটে হবে কেন ? সেই যে কী বলে—মানে স্টার হবে —আমি বলতে চেষ্ট করলুম।
—স্টার হবে ? আমার ন্যাংচাদাও স্টার হতে গিয়েছিল, বুঝলি ? এখন নেংচে নেচে হাঁটে আর সিনেমা হাউসের পাশ দিয়ে যাবার সময় কানে আঙুল দিয়ে, চোখ বুজে, খুব মিহি স্বরে ‘দীনবন্ধু, কৃপাসিন্ধু, কৃপাবিন্দু বিতরো”—এই গানটা গাইতে গাইতে পেরিয়ে যায় ।
—বুঝতে পারছি —হাবুল সেন মাথা নাড়ল : তোমার ন্যাংচাদা-রে ফিলিমের লোকের মাইরা ল্যাংড়া কইরা দিছে।
—ইঃ, মাইর্য ল্যাংড়া করছে –টেনিদা ভেংচে বললে, খামোকা বকবক করিসনি হাবুল ! যেন এক নম্বরের কুরুবক!
ক্যাবলা বললে, কুরুবক তো ভালোই। এক রকমের ফুল। 
—থাম, তুই আর সবজাস্তাগিরি করিসনি। কুরুবক যদি ফুল হয় তা হলে পাতিবকও এক রকমের গোলাপ ফুল । তা হলে পাতিহাসও এক রকমের ফজলী আম । তা হলে কাকগুলোও এক রকমের বনলতা !
ক্যাবলা বললে, বা-রে, তুমি ডিক্শনারী খুলে দ্যাখো না !
—শাট আপ। ডিকশনারী ! আমিই আমার ডিকশনারী। আমি বলছি কুরুবক এক ধরনের বক—খুব খারাপ, খুব বিচ্ছিরি বক। যদি ফের চালিয়াতি করবি তো এক চাঁটিতে তোর দাঁত—
—দাঁতনে পাঠিয়ে দেব।—আমি জুড়ে দিলুম ; কিন্তু বকের বকবকানি এখন বন্ধ করো না বাপু । কী ন্যাংচাদার গল্প যেন বলছিলে, তাই বলো ।
—অঃ, ফাঁকি দিয়ে গল্প শোনবার ফন্দি ? টেনি শর্মাকে অমন ‘আনরাইপ চাইল্ড' মানে কাঁচা ছেলে পাওনি—বুঝেছ প্যালারাম চন্দর ? ন্যাংচাদার রোমহর্ষক কাহিনী যদি শুনতে চাও তা হলে এক্ষুণি পকেট থেকে ঝাল-মুনের শিশিটি বের করো । একটু আগেই লুকিয়ে লুকিয়ে চাটা হচ্ছিল, আমি বুঝি দেখতে পাইনি ?
কী ডেঞ্জারাস চোখ—দেখেছ? কত হুঁশিয়ার হয়ে একটু একটু খাচ্ছি—ঠিক দেখে ফেলেছে। সাধে কি ইস্কুলের পণ্ডিত মশাই টেনিদাকে বলতেন, বাবা ভজহরি—তুমি হচ্ছ পয়লা নম্বরের সিরিগাল'—মানে ফক্স্ !
দেখেছে যখন, কেড়েই নেবে। কী আর করি—মানে মানে দিতেই হল শিশিটা। প্রায় আদ্ধেকটা ঝাল-মুন একবারে চেটে নিয়ে টেনিদা বললে, ন্যাংচাদা—মানে আমার বাগবাজারের মাসতুতো ভাই—
হাবুল বললে, চোরে চোরে। 
—অ্যাঁ ? কী বললি ? 
—না-না, আমি কিছু কই নাই। কইতাছিলাম একটু জোরে জোরে কও !
 —জোরে? —টেনিদ দাঁত খিঁচিয়ে নাকটাকে আলুসেদ্ধর মতো করে বললে, আমাকে কি অল ইণ্ডিয়া রেডিও পেলি যে, খামোকা হাউ-মাউ করে চ্যাঁচাব ? মিথ্যে বাধা দিবি তো এক গাঁটায় তোর চাঁদি—
আমি বললুম, চাদপুরে পাঠিয়ে দেব ! 
—যা বলেছিস —বলেই টেনিদা আমার মাথায় টকাস করে গাঁট্টা মারতে যাচ্ছিল, আমি চট্ করে সরে গিয়ে মাথা বাঁচালুম।
আমাকে গাটা মারতে না পেরে ব্যাজার হয়ে টেনিদা বললে, ধ্যেৎ, দরকারের সময় হাতের কাছে কিছু পাওয়া যায় না—বোগাস্ ! মরুক গে—ন্যাংচাদার কথাই বলি । খবরদার, মাঝখানে ডিসটর্ব করবি না কেউ।
হ্যাঁ—কী বলছিলুম ? অামার বাগবাজারের মাসতুতো ভাই ন্যাংচাদার ছিল ভীষণ ফিলিমে নামবার শখ। বায়োস্কোপ দেখে দেখে রাতদিন ওর ভাব লেগেই থাকত। বললে বিশ্বাস করবিনে, বাজারে কাঁচকলা কিনতে গেছে—হঠাৎ ওর ভাব এসে গেল। বললে, ‘ওগো তরুণ কদলী! এই নিষ্ঠুর সংসার তোমাকে ঝোলের মধ্যে রান্না করে খায়—তোমার অরুণ হিয়ার করুণ ব্যথা কে বুঝবে ? এই বলে, খুব কায়দা করে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে 'ওক' বলতে যাচ্ছে, এমন সময় কাঁচকলাওলা বললে, ‘কোথাকার এঁচোড়ে পাকা ছেলেরে ! দিতে হয় কান ধরে এক থাপ্পড় !’ ন্যাংচাদা আমার কানে কানে বললে—‘অহো—কী নৃশংস মনুষ্য-দেখেছিস ?

এমন ভাবের মাথায় থাকলে কেউ কি আই. এ. পাশ করতে পারে ? ন্যাংচাদার সব সাবজেক্টে ফেল করে গেল। আর মেসোমশাই অফিস থেকে ফিরে এসে যা যা বললেন, সে আর তোদের শুনে কাজ নেই। মোদ্দা, অপমানে ন্যাংচাদার সারারাত কান কট্কটু করতে লাগল। প্রতিজ্ঞা করল, হয় ফিলিমে নেমে প্রতিভায় চারদিক অন্ধকার করে দেবে —নইলে এ পোড়া প্রাণ আর রাখবে না ।
খুব ইচ্ছেশক্তি থাকলে, মানে মনে খুব তেজ এসে গেলে-বুঝলি, অঘটন একটা ঘটেই যায়। ন্যাংচাদা তো মনের দুঃখে সকালবেলা ‘দি গ্র্যাণ্ড আবার খাবো রেস্তোরাঁয় ঢুকে এক পেয়ালা চা আর ডবল ডিমের মামলেট নিয়ে বসেছে, এমন সময় খুব সুট-টাই হাঁকড়ে এক ছোকরা এসে বসল ন্যাংচাদার টেবিলে । ন্যাংচাদা দেখলে তার কাছে একটা নীলরঙের ফাইল আর তার উপরে খুব বড় বড় করে লেখা—“ইউরেকা ফিলিম কোং’ ; নবতম অবদান—“হাহাকার’ ।

ন্যাংচাদার মনের অবস্থা তো বুঝতেই পারছিস। উত্তেজনায় তার কানের ভেতর যেন তিনটে করে উচ্চিংড়ে লাফাতে লাগল, নাকের মধ্যে যেন আরশোলার সুড়সুড়ি দিতে লাগল। তার সামনেই জলজ্যান্ত ফিলিমের লোক বসে-তাতে আবার নবতম অবদান । একেই বলে মেঘ ন চাইতে জল। কে বলে কলিযুগে ভগবান নেই ?

ন্যাংচাদ বাগবাজারের ছেলে—তুখোড় চীজ। তিন মিনিটে আলাপ জমিয়ে নিলে। !

লোকটার নাম চন্দ্ৰবদন চম্পটী—সে হল ‘হাহাকার’ ফিলিমের একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট। মানে ছবির ডিরেক্টারকে সাহায্য করে আর কি ! 
হাবুল বললে, সহকারী পরিচালক । 
–চোপরাও ! টেনিদা হাবুলকে এক বাঘা ধমক লাগিয়ে বলল, চন্দ্ৰবদনকে ন্যাংচাদা ভজিয়ে ফেললে। তার বদনে দুটো ডবল ডিমের মামলেট, চারটে টেস্ট আর । তিন কাপ চা ঘুষ দিয়ে—শেষে হাতে চাঁদ পেয়ে গেল ন্যাংচাদা। ওঠবার সময় চন্দ্ৰবদন বললে, এত করে বলছেন যখন--বেশ, আপনাকে আমি ফিলিমে চান্স দেব। কাল বেলা দশটার সময় যাবেন বরানগরের ইউরেকা ফিলিমে- নামিয়ে দেব জনতার দৃশ্যে । 

হাত কচলাতে কচলাতে ন্যাংচাদা বললে, স্টুডিওটা কোথায় স্যার ! 
চন্দ্ৰবদন জায়গাটা বাতলে দিলে। বললে, দেখলেই চিনতে পারবেন। উঁচু পাঁচিল --বাইরে লেখা রয়েছে ‘ইউরেকা ফিলিম কোং’ । আচ্ছা আসি এখন, ভেরি বিজি, টা-টা—
হাত নেড়ে চন্দ্ৰবদন তড়াক করে একটা চলতি বাসে উঠে চলে গেল । সেদিন রাত্তিরে তো ন্যাংচাদা আর ঘুম হয় না। বার বার বিছানা থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জনতার দৃশ্যে পার্ট করছে। মানে কখনো স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছে— কখনো জয়ধ্বনি করছে, কখনো অট্টহাসি হাসছে। অবিশ্যি হাসি আর জয়ধ্বনিটা নিঃশব্দেই হচ্ছে—পাশের ঘরেই আবার মেসোমশাই ঘুমোন কিনা!

সারারাত ধরে জনতার দৃশ্য সড়গড় করে নিয়ে ন্যাংচাদা সকাল ন’টার আগেই সোজা ব্যারাকপুর ট্রাঙ্ক রোডের বাসে চেপে বসল। তারপর জায়গাটা আঁচ করে নেমে পড়ল বাস থেকে ।
খানিকট হাঁটতেই—অারে, ওই তো উচু পাচিল । ওইটেই ইউরেকা ফিলিম। গুটি-গুটি পায়ে এগিয়ে গেল ন্যাংচাদা।বাইরে একটা মস্ত লোহার গেট—ভেতর থেকে বন্ধ । তার ওপরে বোর্ডে কী একটা নাম লেখা আছে—কিন্তু লতার ঝাড়ে নামটা পড়া যাচ্ছে না—দেখা যাচ্ছে কেবল তিনটে হরফ—এল. ইউ. এম. ।
এল-ইউ-এম । লাম ! মানে ফিলাম। তার মানেই ফিলিম।

ক্যাবলা আপত্তি করলে, লাম । লাম কেন হবে ? এফ-আই-এল-এম্-ফিলম | 
টেনিদা রেগে-মেগে চিৎকার করে উঠল, সায়লেন্স ! আবার কুরুবকের মতো বকবক করছিস্ ? এই রইল গল্প—আমি চললুম।
প্রায় চলেই যাচ্ছিল, আমরা টেনে-টুনে টেনিদাকে বসালুম। 
হাবুল বললে, ছাইড়া দাও ক্যাবলার কথা-চ্যাংড়া।

—চ্যাংড়া ! ফের ডিস্টার্ব করলে ট্যাংরা মাছ বানিয়ে দেব বলে রাখছি, হুঁঃ! 
লোহার গেট বন্ধ দেখে ন্যাংচাদা গোড়াতে তো খুব ঘাবড়ে গেল। ভাবলে, চন্দ্রবদন নির্ঘাত গুলপট্টি দিয়ে দিব্যি পরস্মৈপদী খেয়ে-দেয়ে সটকান দিয়েছে। তারপর ভাবলে অন্য দিকেও তো দরজা থাকতে পারে। দেখা যাক ।
পাঁচিলের পাশ দিয়ে ঘুর-ঘুর করছে—গেট-ফেট তো দেখা যাচ্ছে না। খুব দমে গেছে, এমন সময় হঠাৎ ভীষণ মোটা গলায় কে বললে, হু আর ইউ ?

ন্যাংচাদা তাকিয়ে দেখলে পাঁচিলের ভেতর একটা ছোট ফুটে । তার মধ্যে কার দুটো জ্বল-জ্বলে চোখ আর একজোড়া ধুমসে গোঁফ দেখা যাচ্ছে। সেই গোঁফের তলা থেকে আবার আওয়াজ এল ; হু আর ইউ ?
ন্যাংচাদা বললে, আমি—মানে আমাকে চন্দ্ৰবদনবাবু ফিলিমে পার্ট করতে ডেকে ছিলেন । এইটেই তো ইউরেক ফিলিম ?
– ইউরেকা ফিলিম ?--গোঁফের তলা থেকে বিচ্ছিরি দাত বের করে কেমন খ্যাঁকখঁকিয়ে হাসল লোকটা । তারপর বললে, আলবত ইউরেকা ফিলিম। পার্ট করবে ? ভেতরে চলে এসো ।
—গেট যে বন্ধ । ঢুকব কী করে ? —পাঁচিল টপকে এসো। ফিলিমে নামবে আর পাঁচিল টপকাতে পারবে না ? ন্যাংচাদা ভেবে দেখলে কথাটা ঠিক। ফিলিমের কারবারই আলাদা । দ্যাখ না— সরসর করে লোকে নল বেয়ে চারতলায় উঠে পড়ছে, ঝপাং করে পাঁচতলার থেকে নিচে লাফিয়ে নামছে—একটা চলতি ট্রেন থেকে লাফিয়ে আর একটা ট্রেনে চলে যাচ্ছে । সব না করতে পারলে ফিলিমে নামাবেই বা কেন ?

ন্যাংচাদা বুঝতে পারল, এখানে পাঁচিল টপকে ভেতরে যাওয়াই নিয়ম, ওইটেই ফিলিমে পার্ট করবার প্রথম পরীক্ষা ।
ন্যাংচাদা কী আর করে ? দেওয়ালের খাঁজে খাঁজে পা দিয়ে উঠতে চেষ্টা করতে লাগল। দু’পা ওঠে—আর সড়াক করে পিছলে পড়ে যায়। শখের সিলকের পাঞ্জাবী ছেঁড়ল, গায়ের মুনছাল উঠে গেল, ঠিক নাকের ডগায় কুটুস করে একটা কাঠ-পিঁপড়ে কামড়ে দিলে। ওদিকে ভেতরে বোধ হয় আরো কিছু লোক জড়ো হয়েছে—তারা সমানে বলছে-হেঁইয়ে জোয়ান—আর একটু—আর একটু—
প্রাণ যায় যায়–কিন্তু ন্যাংচাদা হার মানবার পাত্তর নয়। একে বাগবাজারের ছেলে, তায় জনতার দৃশ্যে পার্ট করতে এসেছে। আধ ঘণ্টা ধস্তাধস্তি করে ঠিক উঠে গেল পাঁচিলের উপর। বসে একটু দম নিতে যাচ্ছে, অমনি তল থেকে কারা বললে, আয়রে আয়—চলে আয় দাদা—আয়রে আমার কুমড়ো-পটাশ—
আর বলেই ন্যাংচাদা পা ধরে হ্যাচকা টান। ন্যাংচাদা একেবারে ধপাস করে নিচে পড়ল। কুমড়ে-পটাশের মতোই।
কোমরে বেজায় চোট লেগেছিল, ‘বাপ-রে মা-রে’ বলতে বলতে ন্যাংচাদা উঠে দাঁড়াল। দেখলে পাচিলে ঘেরা মস্ত জায়গাটা—সামনে খানিক মাঠের মতো-একটু দূরে একটা বড় বাড়ি, পাশেই একটা ছোট ডোবা—তাতে জল নেই, খানিক কাদা। আর তার সামনে পাঁচ-সাত জন লোক দাঁড়িয়ে নানা রকম মুখভঙ্গী করছে।

একজন একটা হুঁকো টানছে—তাতে কলকে-টলকে কিছুটি নেই। আর একজনের ছেঁড়া সাহেবী পোশাক—কিন্তু টুপির বদলে মাথায় একটা ভাঙা বালতি বসানো। একজনের গলায় ছেড়া জুতোর মালা । আর একজন মুখে লম্বা লম্বা গোঁফদাড়ি-সমানে চেঁচিয়ে বলছে : 'কুকুর আসিয়া এমন কামড় দিল পথিকের পায়।’ বলেই সে এমন ভাবে ঘ্যাক করে দৌড়ে এল যে, ন্যাংচাদাকে কামড়ে দেয় আর কী ।
সেই সাহেবী-পোশাক-পরা লোকটা ধাঁ করে রাদ্দা মেরে “কুকুর আসিয়া এ কামড়"-কে দূরে সরিয়ে দিলে। তারপর বললে, বন্ধুগণ, আমাদের নতুন অভিনেতা এসে গেছেন। বেশ চেহারাটি । একেই হিরো করা যাক—কেমন ?
সকলে চেঁচিয়ে বললে, হিরো হিরো—আলবত হিরো।

ন্যাংচাদা প্রথমে ঘাবড়ে গিয়েছিল। কিন্তু হিরো শুনেই চাঙ্গা হয়ে উঠল। বুঝল সিনেমায় তো নানা রকম পার্ট করতে হয়—তাই ওরা সব ওই রকম সেজেছে, যাকে বে মেক আপ' । তারপর তাকেই হিরো করতে চায় ! ন্যাংচাদা নাক আর কোমরের ব্যথা ভুলে একেবারে আকর্ণ-বিস্তৃত হাসি হাসল। বললে, তা আজ্ঞে হিরোর পার্টও আমি করতে পারব—পাড়ার থিয়েটারে দু’ বার আমি হনুমান সেজেছিলুম। কিন্তু চন্দ্ৰবদনবাবু কোথায় ?
সেই জুতোর-মালা-পরা লোকটা বললে, চন্দ্ৰবদন শ্বশুরবাড়ি গেছে—জামাইষষ্ঠীর নেমস্তন্ন খেতে । আমি হচ্ছি সূর্যবদন–ডিরেক্টার।
বালতি মাথায় লোকট। তাকে ধাই করে চাঁটি দিল : ইউ ক্লাডি নিগার । তুই ডিরেক্টার কিরে ? তুই তো একটা হু হুঁকোবর্দার। আমি হচ্ছি ডিরেক্টার-আমার নাম হচ্ছে তারাবদন ।
সূর্যবদন চাটি খেয়ে বিড়-বিড় করতে লাগল :

“সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি 
আজি কি সুন্দর নিশি পূর্ণিমা উদয় 
একা ননী পাড়ে ছানা আমগাছে চড়ে 
মহৎ যে হয় তার সাধু ব্যবহার—” 

তারাবদন ধমক দিয়ে বললে, চুপ। এখন রিহার্সেল হবে। তারপর হিরোবাবু— তোমার নাম কি ?
ন্যাংচাদা বললে, আমার ভালোনাম বিষ্ণুচরণ—ডাকনাম ন্যাংচা । 
—ন্যাংচাদা ! আহ!—খাস নাম ! শুনলেই খিদে পায় —তারপর ফিসফিসিয়ে বললে, জানো—আমার ডাকনাম চমচম !
ন্যাংচাদা বলতে যাচ্ছে, তাই নাকি— হঠাৎ তারাবদন— মানে চমচম চেঁচিয়ে উঠল : কোয়ায়েট্ ! সব চুপ। রিহার্সেল হবে । মিস্টার ন্যাংচা—
ন্যাংচাদা বললে, আজ্ঞে ? —এক পা তুলে দাঁড়াও । ন্যাংচাদা তাই করলে । –এবার দু’পা তুলে দাঁড়াও । ন্যাংচাদা ভেবড়ে গিয়ে বললে, আজ্ঞে দু’পা তুলে কি
— বলতেই তারাবদন চটস করে একটা চাটি বসিয়ে দিলে ন্যাংচাদা গালে । বললে, রে বর্বর, স্তব্ধ করো মুখর ভাষণ ! যা বলছি তাই করো। ফিলিমে পার্ট করতে এসেছ—— দু’পা তুলে দাঁড়াতে পারবে না ! এয়ার্কি নাকি ?
চাটি খেয়ে ন্যাংচাদার তো মাথা ঘুরে গেছে। কাঁউ-মাউ করে দু’পা তুলে দাড়াতে গেল। আর যেই দু’পা তুলতে গেল অমনি ধপাৎ করে পড়ে গেল মাটিতে।
সবাই চেঁচিয়ে উঠল : শেম—শেম—পড়ে গেলি ! ফাই—ফাই! 
ন্যাংচাদা ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে গেল। ফিলমে নামতে গেলে নিশ্চয় দু’পা তুলে দাঁড়াতে হয়, কিন্তু কী করে যে সেটা পারা যায় কিছুতেই ভেবে পেল না ।
তারাবদন ন্যাংচাদার ঝুলপি ধরে এমন হ্যাচক মারল যে, তড়বড়িয়ে লাফিয়ে উঠতে হল বেচারীকে ।
তারপর তারাবদন বললে, এবার গান করে। 
—কী গান গাইব ? 
—যে গান খুশি । বেশ উপদেশপূর্ণ গান । 
ন্যাংচাদা একেবারে গাইতে পারে না—বুঝলি ? মানে আমাদের প্যালার চাইতেও যাচ্ছেতাই গান গায়—একবার রাস্তায় যেতে যেতে এমন তান ছেড়েছিল যে, শুনে একটা কাবলীওলা আচমকা আঁতকে উঠে ড্রেনের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল । কিন্তু হিরো হওয়ার আনন্দে সেই ন্যাংচাদিই ভীমসেনী গলায় গান ধরল :

‘ভুবন নামেতে ব্যাদড় বালক 
তার ছিল এক মাসী— 
ভুবনের দোষ দেখে দেখিত না
সে মাসী সর্বনাশী—’ 

এতটুকু কেবল গেয়েছে—হঠাৎ সবাই চেঁচিয়ে উঠল স্টপ-স্টপ—আর গান না। 
তারাবদন বললে, না—আর গান না ! এবার নাচো
—নাচব ?
—নিশ্চয় নাচবে । 
—অামি তো নাচতে জানিনে ।

—নাচতে জানো না - হিরো হতে এসেছ ? মামার বাড়ির আবদার পেয়েছ— না ?—বলেই কড়াং করে ন্যাংচাদার  ঝুলপিতে আর এক টান ।
—গেলুম গেলুম—বলে ন্যাংচাদা নাচতে লাগল। মানে ঠিক নাচ নয়—লাফাতে লাগল ব্যথার চোটে ।
সকলে বললে, এনকোর—এনকোর । 
যেই এনকোর বলা—অমনি তারাবদন আর একটা পেল্লায় টান দিয়েছে ন্যাংচাদার ঝুলপিতে ! পিসিমা গো গেছি?—বলে ন্যাংচাদা এবার এমন নাচতে লাগল যে তার কাছে কোথায় লাগে তোদের উদয়শংকর!
তারাবদন বললে, রাইট—ও-কে—কাট্ ! 
কাট্ ! কাকে কাট্বে ? ন্যাংচাদা ভয় পেয়ে যেই থমকে গেছে অমনি তারাবদন বললে, এবার তা হলে সন্তরণের দৃশ্য। কী বলে বন্ধুগণ ?
সঙ্গে সঙ্গে সকলে চেঁচিয়ে ৰললে, ঠিক—এবারে সস্তরণের দৃশ্য ! 
ন্যাংচাদা 'আরে অারে—করছ কি-—’ বলতে বলতে সবাই ওকে চ্যাংদোলা করে তুলে ফেলল। তারপর চক্ষের পলকে নিয়ে ছুড়ে ফেললে সেই ডোবাটার ভেতরে ।
কাদা মেখে ভূত হয়ে উঠতে যাচ্ছে, সবাই আবার ঠেলে ডোবার মধ্যে ফেলে দিলে । বলতে লাগল ; সন্তরণ-সন্তরণ !
আর সস্তরণ ! ন্যাংচাদার তখন প্রাণ যাওয়ার জো । সারা গা—জামাকাপড় কাদায় একাকার-নাকে মুখে দুৰ্গন্ধ পচা পাক ঢুকে গেছে, আর বিছুটির মতো সে কি জলুনি। ন্যাংচাদা যেমনি উঠতে চায় অমনি সবাই তক্ষুণি তাকে ডোবায় ফেলে দেয়। আর চ্যাঁচাতে থাকে ; সন্তরণ–সন্তরণ—

শেষে ন্যাংচাদা আকাশ ফাটিয়ে হাহকার করতে লাগল—মানে হাহাকার' ফিলিমে পার্ট করতে এসেছিল কিনা ; বাঁচাও—বাঁচাও--অামাকে মেরে ফেললে—আমি আর ফিলিমে পার্ট করব না—কক্ষনো না— -
প্রাণ যখন যাবার দাখিল তখন কোথেকে তিন-চারজন খাকী-শাট-প্যান্ট-পরা লোক লাঠি হাতে দৌড়ে এল সেদিকে। আর তক্ষুণি তারাবদনের দল একেবারে হাওয়া !

ন্যাংচাদার তখন প্রায় নাভিশ্বাস। খাকী-পরা লোকগুলো তাকে পাক থেকে টেনে তুলে কিছুক্ষণ হাঁ করে মুখের দিকে চেয়ে রইল। শেষে বললে, ক্যা তাজব ! ই নৌতুন পাগলা ফের কাঁহাসে আসলো ?

ব্যাপার বুঝলি ? আরে-ওটা মোটেই ফিলিম স্টুডিও নয় ; ‘লাম’-মানে লুনাটিক, অ্যাসাইলাম—অর্থাৎ কিনা পাগলা গারদ। উঁচু পাঁচিল আর লাম দেখেই, ন্যাংচাদার বুদ্ধি তালগোল পাকিয়ে গিয়েছিল । সাধে কি আর আই. এ.-তে সব সাবজেক্টে ফেল হয়। ফিলিম স্টুডিয়োটা কাছাকাছি আর কোথাও ছিল হয়তো ।

ন্যাংচাদা কী করে বাড়ি ফিরল সে আর শুনে কাজ নেই। কিন্তু সেই থেকে আজো ন্যাংচাদা নেংচে নেংচে হাটে-আর সিনেমা হাউসের সামনে এলেই চোখ বুজে করুণ গলায় গান গাইতে থাকে : ‘দীনবন্ধু কৃপাসিন্ধু—
টেনিদা থামল। আমার ঝাল-মুনের শিশি ততক্ষণে সাফ।
হাত চাটতে চাটতে বললে, তাই বলছিলুম, তোর গোবরবাবুকে এক্ষুণি বারণ করে দে। আরে, আসলে ফিলিম স্টুডিয়োগুলোও এমনি পাগলা গারদ–গোবরবাবুকে স্রেফ ঘুঁটেচন্দর বানিয়ে ছেড়ে দেবে।

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য