বেহালা-বাজিয়ের গল্প -- জার্মানির রূপকথা

বহুকাল আগে এক বেহালা-বাজিয়ে ছিল ৷ আশ্চর্য সুন্দর বেহালা বাজাত সে । একদিন বন দিয়ে যেতে যেতে তার ভারি একলা লাগল । তাই ভাবল, “এখানে বেহালা-বাজিয়ে সময় কাটিয়ে ভালো একজন সঙ্গী জোগাড় করা যাক ৷” তাই-না ভেবে পিঠ থেকে বেহালা নামিয়ে একটা মিষ্টি সুর সে বাজাতে লাগল । বনের গাছে-পাতায় রিনরিন করতে লাগল সেই সুর । কয়েক মিনিট পরে ঝোপ থেকে বেরিয়ে এল একটা নেকড়ে । বেহালা-বাজিয়ে বলল, “আরে । এ যে দেখি নেকড়ে। কিন্তু সঙ্গী হিসেবে নেকড়েকে তো চাই নি।”
নেকড়ে কিন্তু তার কাছে গিয়ে বলল, “ভারি সুন্দর তুমি বেহালা বাজাও । তোমার মতো বাজাতে শিখতে আমার খুব ইচ্ছে ।”
সে বলল, “শেখা আর শক্ত কি ? ষা-যা বলি শুধু তাই কর।”
নেকড়ে বলল, “শিষ্য যেরকম গুরুর কথা শোনে আমিও সেরকম শুনব ।”
বেহালা-বাজিয়ে তাকে বলল সঙ্গে আসতে । খানিক যাবার পর তারা পৌছল একটা ওকগাছের কাছে । গাছটার গুঁড়ি ফাঁপা আর তাতে ছিল একটা গর্ত । -
সে বলল, “শোনো ! বেহালা শিখতে যদি চাও তা হলে তোমার সামনের দুটো থাবা এই গর্তে রাখো ।”
নেকড়ে যেই-না তার কথামতো গর্তে থাবা দুটো রেখেছে বেহালাবাজিয়ে সঙ্গে সঙ্গে একটা পাথর তুলে গর্তের মধ্যে থাবা দুটো দিল শক্ত করে এ-টে। ফলে সেখানে বন্দী হয়ে পড়ে রইল নেকড়েটা ।
“আমি যতক্ষণ না ফিরি ততক্ষণ এখানে থাকো”, এই—না বলে বেহালা-বাজিয়ে চলে গেল !
খানিক পরে মনে মনে সে বলল, “এই বনে সময় যেন কাটতেই চায় না । একজন সঙ্গী জোগাড় করা যাক ।” আবার পিঠ থেকে বেহালা নামিয়ে গাছেদের উদ্দেশে সে বাজাল একটা সুর । আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঝোপ থেকে হেলে-দুলে বেরিয়ে এল একটা খ্যাঁকশেয়াল । বেহালা-বাজিয়ে বলল, “আরে ! এ যে দেখি খ্যাঁকশেয়াল । সঙ্গী কে চায় ?”
খ্যাঁকশেয়াল তার কাছে গিয়ে বলল, “ভারি সুন্দর তুমি বেহালা বাজাও । তোমার মতো বাজাতে শিখতে আমার খুব ইচ্ছে ।”
সে বলল, “শেখা আর শক্ত কী ? যা-যা বলি শুধু তাই করো ।”
খ্যাঁকশিয়াল বলল, “শিষ্য যেরকম গুরুর কথা শোনে আমিও সে রকম তোমার কথা শুনব।”
বেহালা-বাজিয়ে তাকে বলল, “আমার পেছন পেছন এসো ।” থানিক যাবার পর তারা পৌছল এক পায়ে চলার পথে । তার দু পাশে । উঁচু ঝোপ । সেখানে থেমে হেজল-বাদাম গাছের একটা ডাল টেনে নামিয়ে মাটির উপর পা দিয়ে সে চেপে ধরল । তার পর অন্য পাশ থেকে আর-একটা ডাল টেনে নামিয়ে সে বলল, “শেয়াল-ভায়া । যদি শিখতে চাও তো তোমার বাঁ থাবাটা দেখাও।”
খ্যাঁকশেয়াল থাবা বাড়ালে বাঁদিকের ডালে বেহালা-বাজিয়ে সেটা বেঁধে দিলে। তার পর বলল, “শেয়াল-ভায়া ! এবার দাও তোমার ডান থাবাটা ।” সেটাকে সে বাঁধল ডান দিকের ডালে । গিঁটগুলো শক্ত হয়েছে কি না দেখে ডাল দুটো সে ছেড়ে দিল । সঙ্গে সঙ্গে শূন্যে খাড়া হয়ে উঠল ডালদুটো । আর সেই সঙ্গে খ্যাঁকশেয়ালও উঠল শূন্যে । তার পর অসহায়ভাবে লাগল দুলতে ।
“আমি যতক্ষণ না ফিরি ততক্ষণ এখানে থাকো”, এইনা বলে বেহালা-বাজিয়ে চলে গেল ।
যেতে যেতে খানিক পরে আবার মনে মনে সে বলল, “পথটা ভারি লম্বা আর এই বনে সময় যেন কাটতেই চায় না । একজন সঙ্গী অামায় জোগাড় করতেই হবে ।’ পিঠ থেকে বেহালা নামিয়ে সে বাজাতে শুরু করল । আর দেখতে দেখতে সেই সুরের ঝংকারে রিনরিন করতে লাগল বনের গাছ-পালা ডাল-পাতা । এবার ঝোপ থেকে বেরিয়ে এল একটি খরগোশ ৷ তাকে দেখে সে বলল, “আরে । এ যে দেখি খরগোশ । কিন্তু সঙ্গী হিসেবে খরগোশকে তো চাই নি ।”
খরগোশ তার কাছে গিয়ে বলল, “ভারি সুন্দর তুমি বেহালা বাজাও। তোমার মতো বাজাতে শিখতে আমার খুব ইচ্ছে।”
সে বলল, “শেখা আর শক্ত কী ? যা-যা বলি শুধু তাই কর।” খরগোশ বলল, “শিষ্য যেরকম গুরুর কথা শোনে আমিও সেরকম শুনব ।”
খানিক যাবার পর বনের একটা ফাঁকা জায়গায় তারা পৌছল । সেখানে ছিল একটা এ্যাসপেন গাছ । ছোটো খরগোশের গলায় সে বাঁধল লম্বা একটা দড়ি । দড়ির অন্য প্রান্ত সে বাঁধল সেই গাছটার গুড়িতে । তার পর সে বলল, “খরগোশ-ভায়া ! গাছটার চার পাশে কুড়িবার দৌড়ে পাক দাও ।” তার কথামতো খরগোশ কুড়িবার পাক দিল । আর গাছের গুড়িতে দড়িটা জড়িয়ে গেল কুড়ি পাক । ফলে খরগোশ পড়ল আটকা । যত সে লাফঝাপ দেয় দড়িটা ততই কেটে-কেটে বসে তার নরম গলায় ।
“আমি যতক্ষণ না ফিরি ততক্ষণ এখানে থাকো”, এই-না বলে বেহালা-বাজিয়ে চলে গেল ।
ইতিমধ্যে পাথরটা আঁচড়ে-কামড়ে টানাটানি করে ফাঁদ থেকে নিজের থাবাদুটো ছাড়িয়ে নিয়েছিল নেকড়ে । দারুণ রেগে বেহালা-বাজিয়েকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করার জন্য সে ছুটল ।
নেকড়েকে পাশ দিয়ে ছুটে যেতে দেখে প্রাণপণ জোরে চেঁচিয়ে খ্যাঁকশেয়ালটা বলল, “নেকড়ে-ভাই ! নেকড়ে-ভাই ! আমাকে বাঁচাও । বেহালা-বাজিয়ে আমাকেও ফাঁদে ফেলেছে ।”
ঝোপটা টেনে নামিয়ে দাঁত দিয়ে গিটগুলো কেটে খ্যাঁকশেয়ালকে মুক্ত করল নেকড়েটা। তার পর দুজনে তারা ছুটল বেহালা-বাজিয়ের উপর প্রতিশোধ নিতে । পথে খরগোশকে বাঁধা পড়ে থাকতে দেখে তাকেও তারা খুলে দিল । তার পর তিনজনে ছুটল তাদের শক্রর খোঁজে ।
ইতিমধ্যে সেই বেহালা-বাজিয়ে আবার তার বেহালা বাজায় । এবার কিন্তু ফল হয় আগের চেয়ে অনেক ভালো । বেহালার সুর শুনতে পায় গরিব এক কাঠুরে । কাজ ফেলে কুডাঁল হাতে সে ছুটে আসে বাজনা শুনতে ;
তাকে দেখে বেহালা-বাজিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “এতক্ষণে এসেছে আসলঃ সঙ্গী । সঙ্গী হিসেবে বুনো জানোয়ারদের চাইনি। চেয়েছিলাম মানুষের সঙ্গ।” এই বলে এমন সুন্দর সে বাজাতে শুরু করল যে, সেই গরিব কাঠুরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনতে-শুনতে মুগ্ধ হয়ে গেল। আনন্দে ভরে ওঠে তার বুক ।
এমন সময় দৌড়তে-দৌড়তে সেখানে হাজির হল নেকড়ে, খ্যাঁকশেয়াল আর খরগোশ। কাঠুরে তাদের কুমতলব বুঝতে পেরে বেহালা-বাজিয়েকে বাঁচাবার জন্য কুড়ল উঁচিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “ওর গায়ে আঁচড় দেবার আগে আমার সঙ্গে লড়তে হবে ।” তাই শুনে জন্তুরা ভয় পেয়ে বনে পালাল আর কৃতজ্ঞতার উপহার হিসাবে বেহালা-বাজিয়ে কাঠুরেকে শোনাল আশ্চর্য সুন্দর আর-একটি সুর।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য