তিন ভাইয়ের কাহিনী-- কাজাখ লোককাহিনী

অনেকদিন আগে এক সদাচারী জ্ঞানী লোক ছিল। তার ছিল তিন ছেলে । লোকে বলে: শিকারীর ছেলে তীরে শান দেয়, দর্জির ছেলে কাপড় কাটে । জ্ঞানী লোকটির ছেলেরা ছোট বয়স থেকেই বিভিন্ন জ্ঞানবিজ্ঞানের বই পড়েই সময় কাটায়। তাদের মধ্যে বড় যে ভাই সে তখনও ঘোড়ায় উঠে বসতে পারে না অথচ ইতিমধ্যে বিচার, পরামর্শ করার জন্য লোক আসে ভাইয়েদের কাছে ।
একদিন তাদের কাছে দুজন লোক এল দুটি উট অার একটি উটের বাচ্চা সঙ্গে নিয়ে ।
তারা বলল : আমাদের দুজনেরই একটি করে উট আছে। উটদুটি সর্বদাই একসঙ্গে চরত মাঠে । কয়েকদিন আগে ওদের ফিরিয়ে আনতে গিয়ে দেখি দুটি সদ্যজাত উটশিশু, একটি জীবিত, অপরটি মৃত্ত। এখন আমরা বুঝতে পারছি না উটশিশুটি কার, কোন উটটির বাচ্চা সে ; দুটি উটই বাচ্চাটিকে সমানভাবে আদর করে খাওয়ায় আর বাচ্চাটিও দুটি উটের প্রতি সমান আকৃষ্ট ।
বড় ভাই বলল :‘উটগুলোকে নদীর ধারে নিয়ে যাও।
মেজ ভাই বলল :‘বাচ্চাটাকে ডোঙায় করে নদীর অন্য তীরে নিয়ে যাও।'
ছোট ভাই বলল : তাহলেই তোমাদের সমস্যার সমাধান আপনা থেকেই হয়ে যাবে।'
ছেলেগুলি যা বলল তেমনই করা হল ।
অপরপারে উটশিশুটি ভয়ে ছটফট করতে করতে করুণ চীৎকার করে উঠল। উটগুলিও অধীর হয়ে চীৎকার করতে লাগল। একটি উট অস্থির হয়ে নদীর তীর বরাবর ছুটোছুটি করতে লাগল আর অন্যটি নদীর খাড়া পাড় বেয়ে জলে নেমে এল, তারপর জল পেরিয়ে উটশিশুটির কাছে গিয়ে পৌছল । তখনই সবাই বুঝল ঐ উটটিরই বাচ্চা।
এই অসাধারণ ছেলেদের অপূর্ব বুদ্ধির কথা লোকের মুখেমুখে সারা স্তেপে ছড়িয়ে পড়ল। বৃদ্ধ জ্ঞানীও অত্যন্ত সুখী ও গর্বিত ছেলেদের নিয়ে ।
দিন যায়। বাবার বয়স বাড়ে, ছেলেরাও বড় হয়। যখন ছেলেরা বড় হয়ে উঠল জ্ঞানী তাদের ডেকে বলল;

দীর্ঘদিন বাঁচলেই জ্ঞানার্জন করা যায় না, তার জন্য অনেক দেখা দরকার । সোনার প্রকৃত দাম কে জানে? ধনী নয়, জানে স্বর্ণকার। খাদ্যের গুণ কে জানে যে খেল, সে নয়, যে তা তৈরী করেছে সে জানে। কে ঠিক পথ বাতলে দিতে পারে? যে সে পথে যাবার উদ্যোগ করছে সে নয়, যে সেই পথ পেরিয়ে এসেছে সেই । বইপত্র রেখে দিয়ে দেশভ্রমণে বেরিয়ে পড়, জ্ঞানের সব থেকে বড় উৎস জীবনের বইটাকে পড়ে নাও।'
বাবা ছেলেদের আশীৰ্বাদ করল, আর তারা দীর্ঘদিনের সফরে রওনা হল ।
একদিন তারা পৃথিবীর হাজারো পথের একটি দিয়ে যাচ্ছে আর নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছে।
বড় ভাই বলল : 'একটা ক্লান্ত উট একটু আগে এই পথ পেরিয়ে গেছে।"
মেজ ভাই বলল : "হ্যাঁ, উটটার বাঁচোখ কান ?
ছোট ভাই বলল: ওর পিঠে চাপান আছে মধু ?
এমন সময় হাঁফাতে হাঁফাতে তাদের সামনে হাজির হল একজন উৎকণ্ঠিত লোক ।
"আপনারা পথে কোন উট দেখেছেন নাকি? জিজ্ঞেস করল লোকটি। 'চোরেরা আমার একটা উট নিয়ে গেছে।’
‘ তোমার উটটা অনেক পথ চলে ক্লাস্তু হয়ে পড়েছে। তাই নয় কি? জিজ্ঞেস করল বড় ভাই ।
‘হ্যাঁ, বলল লোকটি ।
'ওর বাঁচোখটা কানা তো? জিজ্ঞেস করল মেজ ভাই ।
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ! আনন্দিত হল লোকটি ।
ওর পিঠে মধু ছিল তো? জিজ্ঞেস করল ছোট ভাই !
মধু! মধু! তাড়াতাড়ি বলুন কোথায় আমার উট?"
‘তা আমরা জানি না, আমরা তাকে দেখি নি।’ বলল ভাইয়েরা।
বিরক্ত হল লোকটি:
কি করে এমন মিথ্যা বলতে পারেন যে দেখেন নি, যদিও তার সম্বন্ধে আপনার সবকিছুই জানেন? আপনারাই বোধহয় উটটাকে চুরি করে কোথাও লুকিয়ে রেখেছেন।
এমন চীৎকার চেঁচামেচি জুড়ে দিল সে যে অল্প দূর দিয়ে যেতে থাকা খানের সৈন্যদলও তা শুনতে পেল । তারা সেখানে এসে চারজনকেই ধরে নিয়ে গেল খানের কাছে ।
খান জিজ্ঞাসাবাদ আরম্ভ করলেন।
"তোমরা বলছ যে চুরি যাওয়া উটটাকে তোমরা দেখে নি, তবে কেমন করে তার মালিককে তোমরা উটের নিখুঁত বর্ণনা দিতে পারলে?’ জিজ্ঞেস করলেন খান জ্ঞানীর ছেলেদের
বড় ভাই বলল: উটটা যে অনেক পথ হেঁটেছে তা ওর পায়ের ছাপ দেখে বুঝতে পারি আমি। ক্লান্ত হয়ে পড়া জীব পা টেনে টেনে চলে তাই পায়ের ছাপ পড়ে লম্বা লম্বা।’
মেজ ভাই বলল : ‘উটটা বাঁচোখ কানা বুঝলাম এইভাবে যে, উটটা যেতে যেতে কেবল ডানদিকের ঘাসপাতাগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়েছে।’
ছোট ভাই বলল: 'যদি পথের ওপর দলেদলে পিঁপড়ে দেখা যায় তবে কি আর বুঝতে বাকি থাকে যে উটটা মধু বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।’
খান অবাক হয়ে গেলেন তাদের পর্যবেক্ষণশক্তি আর যে আত্মমর্যাদা নিয়ে তারা তার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল তা দেখে । কিন্তু তার ইচ্ছা হল আর একবার তাদের বুদ্ধি পরীক্ষা করার। একটা মিষ্টি বেদানাকে সবার অলক্ষ্যে রুমালে মুড়ে তিনজনকে দেখিয়ে বললেন:
“আমার হাতে কি?’
বড় ভাই বলল:"একটা কিছু গোল জিনিস ।
মেজ ভাই বলল:আর খুবই সুস্বাদু ?
'এককথায়, হুজুর, আপনার হাতে আছে বেদানা ।
খানের মুখচোখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল ।
ঠিক!' চিৎকার করে বললেন তিনি । এমন সূক্ষ্মদৰ্শী লোক আর কখনও দেখি নি। তোমরা বয়সে তরুণ কিন্তু আমার দাড়িওয়ালা উজীরেরাও তোমাদের কাছে দাঁড়াতে পারবে না। এখানে তিন দিন থেকে যাও তোমরা, পালা করে আমার লোকেদের বিচার করবে, যদি তোমাদের বিচার ন্যায়সঙ্গত মনে হয় আমার, তাহলে তোমাদের উজীর করে নেব ।"
এই কথা শুনে পুরনো উজীরদের মনে প্রচণ্ড বিদ্বেষ জাগল ঐ তিন তরুণের প্রতি । যাতে নিজেদের রোজগার, ক্ষমতা ও থানের মনোযোগ তাদের প্রতি কমে না যায় সেজন্য তারা ঐ তিন তরুণের ক্ষতি করার চেষ্টা করতে লাগল সৰ্বরকমের।
প্রথম দিনে বিচারের কাজ চালাল বড় ভাই। দু'জন লোককে নিয়ে আসা হল তার কাছে ।একজল বলল:‘আমি গরীব মেষপালক। অভাবে পড়ে কাল আমি আমার সবচেয়ে ভাল ভেড়াটাকে কাটি, আজ সারাদিন বাজারে বসে বেঁচি সে মাংস। বিক্রির সমস্ত টাকাটা আমি থলিতে ভরে রাখি, আর এই লোকটি থলিটি চুরি করেছে আমার পকেট থেকে 

অন্যজন ক্রুদ্ধভাবে নিজের দোষ অস্বীকার করতে লাগল;মেষপালক মিথ্যা বলছে। আমার কাছে একটা টাকার থলি আছে, কিন্তু সেটা আমার নিজের । ঠগটা শুধু শুধু আমার নামে বাজে কথা বলছে, বিচারে ও আমার টাকা জিতে নিতে চায় ।
বিচারক বলল : 'থলিটা দাও দেখি । এখুনি বলে দেব এ টাকা কার ।
খানের ভৃত্যদের আদেশ দিল সে একপাত্র ফুটন্ত জল নিয়ে আসতে। সেই জলের মধ্যে সে থলি থেকে সব মুদ্র ফেলে দিল । মুহুর্তে জলের ওপর ভেসে উঠল চর্বির স্তর যেন ভেড়ার মাংস ফেলা হয়েছে জলে । আর কোন সন্দেহই রইল না যে মেষপালকই সত্যকথা বলেছে। বিচারক তাকে তার অর্থ ফিরিয়ে দিল আর চোরটিকে প্রহরাধীনে রাখার আদেশ দিল ।

দ্বিতীয় দিনে মেজ তাই বিচারের কাজ চালাতে লাগল।
বোঝাইকরা বস্তার মত প্রচন্ড মোটা এক জমিদার এল এক গরীবদুঃখী লোককে জামা ধরে টানতে টানতে নিয়ে ।
জমিদার বলল : 'এই ভিখারীটা কান্নাকাটি করে আমার এক সের মাংস ধার নেয়, বলে ওর নাকি ছেলে মরতে বসেছে। দিব্যি দিয়ে বলে যে এক সপ্তাহের মধ্যে দেনা শোধ করে দেবে, তা সে নিজের পায়ের থেকে মাংস কেটে দিতে হলেও । ছেলেটা ওর মরেছে বেশ ক'দিন হল, কিন্তু এই শয়তানটা কিছুতেই দিচ্ছে না মাংস বা তার জন্য দাম ।

বিচারক গরীব লোকটিকে জিজ্ঞাসা করল : ‘তুমি জমিদারের ধার শোধ কর নি কেন?’
আমার কিছুই নেই, ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে গরীব লোকটি বলল, শরৎকালের আগে আমি জমিদারের দেন শোধ করতে পারব না।’
কিন্তু আমি শরৎকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারব না । চীৎকার করে উঠল জমিদার।
বিচারক বলল, তাহলে আমার বিচার হবে এ রকম। জমিদার, তুমি ছুরি নিয়ে ওর পায়ের থেকে এক সের মাংস কেটে নাও । কিন্তু ঠিক এক সের। এককণাও বেশী বা কম যদি হয় তা হলে চাবুকের দাগে তোমার সারা শরীর ভরে যাবে ’
জমিদার প্রথমটা থতমত খেয়ে গেল, তারপর পোশাকে পা জড়িয়ে হেঁচট খেতে খেতে দৌড় লাগাল। সবাই হাসাহাসি করতে লাগল তা দেখে, আর গরীব লোকটি বিচারককে ধন্যবাদ জানাতে লাগল এমন সুবিচারের জন্য।

তৃতীয় দিনে বিচারকাজ চালাবার ভার পড়ল ছোট ভাইয়ের ওপর । দু'জন যুবক এসে উপস্থিত তার কাছে । তাদের মধ্যে চওড়াকাঁধ লম্বা যুবকটি বাদী, সে বলল : ‘আমার বন্ধু আমার মোহর কেড়ে নিয়েছে।’
প্রতিবাদী বলল :‘ঐ মোহরটা আমার সৎ পরিশ্রমের রোজগার । কারুর থেকে মোহর কেড়ে নেবার কথা আমার মাথাতেই আসতে পারে না।’
তোমার বন্ধু যে তোমার ওপর ঝাপিয়ে পড়ে, তার কোন সাক্ষী আছে? 
‘না সাক্ষী নেই কেউ।’ 
বিচারক বলল, তাহলে তোমাদের বিবাদের মীমাংসা করা খুব সহজ নয় । আমাকে চিন্তা করতে হবে । ততক্ষণ তোমরা আমাকে লড়াই দেখিয়ে খুশী কর । যে জিতবে লড়াইয়ে সে পুরস্কার পাবে আমার কাছে।’
গণ্ডীর চিন্তায় ডুবে গেল বিচারক আর যুবক দুজন পরস্পরের কোমরবন্ধ আঁকড়ে ধরে লড়াই আরম্ভ করল। পনেরো মিনিটও কাটল না, বাদী ইতিমধ্যে প্রতিবাদীকে তিনবার মাটিতে ফেলে দিয়েছে।
বিচারক বলল, “হয়েছে। সত্য ধরা পড়েছে, আমার রায়ও তৈরী । যে কোন লোকের কাছেই পরিষ্কার এদের মধ্যে কে বেশী শক্তিশালী । সবার সামনেই বাদী প্রতিবাদীকে তিনবার ফেলে দিয়েছে মাটিতে। দুর্বল লোক শক্তিমানের মোহর ছিনিয়ে নিয়েছে একথা বিশ্বাস করা যায় নাকি? না, প্রতিবাদীর কোনই দোষ নেই, আর নির্লজ্জ বাদী, তোকে ওর নামে কলঙ্ক দেওয়া ও জবরদস্তি করার জন্য কঠোর সাজা দেওয়া উচিত। কিন্তু তুই লড়াইতে জিতেছিস বলে তোকে মাফ করে দিচ্ছি—এই হবে আমার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পুরস্কার । যাও, আবার বন্ধু হবার চেষ্টা কর।’

সমস্ত জনগণ তিন ভাইয়ের ন্যায়বিচারের প্রশংসা করতে লাগল, খানও খুশী । পুরনো উজীররা কেবল বিদ্বেষে জ্বলতে লাগল । তারা খানকে বোঝাতে লাগল যে ঐ তিন ভাই বদমাশ। অজানা আগন্তুকদের বেশী বিশ্বাস করা অযৌক্তিক। খুব সম্ভবত শরুরা তাদের পাঠিয়েছে খানের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করার জন্য । খান কিন্তু ভাগিয়ে দিলেন কানভাঙানিদের, তারপর ঘোষণা করলেন :
'এই তিন তরুণ জ্ঞানীকে আমার উজীর নিযুক্ত করছি । দিনের বেলায় তারা আমাকে শাসনকাজে সাহায্য করবে, সন্ধ্যাবেলায় আমাকে গল্প শোনাবে, আর রাত্রে আমি যখন ঘুমাৰ, আমাকে পাহারা দেবে '
দিন যায়। খান আরো বেশী করে আকৃষ্ট হয়ে পড়তে লাগলেন তিন তরুণের প্রতি ।
সন্ধ্যাবেলায় ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে তাদের কথা শুনতে শুনতে ঘুম এসে যেত তাঁর । ভাইয়েরা খানের কাছে থাকত পালা করে, তাদের সবার প্রতিই মনোযোগ ছিল খানের, কিন্তু সবার ছোট ভাইয়ের প্রতি তার ছিল বিশেষ মনোযোগ । সেই জন্যই বুড়ো উজীরদের তার ওপর আরো বেশী রাগ : রাগে জ্বলতে জ্বলতে তারা ছোট ভাইকে নাজেহাল করবার জন্য ফন্দী আঁটল ।

একদিন যখন থানের কাছে থাকার পাল এল ছোট ভাইয়ের, উজীররা চুপিচুপি খানের শয়নকক্ষে একটা বিষাক্ত সাপ রেখে দিল। তারা ভাবল যে খান সাপট দেখে তার প্রিয়পাত্রকে সন্দেহ করবেন তার বিরুদ্ধে চক্রান্তকারী হিসাবে, প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হবেন তিনি, তখন তাকে ঐ তিন ভাইকে দূর করে দিতে রাজী করান যাবে।

রাতের বেলায় খান ঘুমোতে শুলে তরুণ উজীর তাকে বলতে লাগল প্রাচীনকালের বিভিন্ন বিশ্বাসহননের কাহিনী। এমন চমৎকারভাবে সে বলে যেন তার সামনে অদৃশ্য কোন বই খোলা আছে। এমন আবিষ্ট হয়ে গেছিলেন খান সেই সব কাহিনীতে যে ঘুমিয়ে পড়লেন কেবল মাঝরাতে ।

যুবকটি তখন আলো নিভিয়ে দিতে গিয়ে দেখে একটা ভয়ঙ্কর সাপ খানের পালঙ্কের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। একটুও ভয় না পেয়ে সে তরোয়ালের এক ঘায়ে সাপটার মাথা কেটে ফেলল আর সাপের কাটাদেহটা ফেলে দিল পালঙ্কের নীচে । তরোয়ালটা সে খাপে ভরতে যাবে এমন সময় আওয়াজে ঘুম ভেঙে গিয়ে চোখ মেললেন খান !
সামনে নিজের যুবক উজীরকে খোলা তরোয়াল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লাফিয়ে উঠে চীৎকার করতে লাগলেন : প্রহরী। প্রহরী খুন করল!'
দেহরক্ষীরা ছুটে এল শয়নকক্ষে, যুবকটিকে ধরে কারাকক্ষে বন্ধ করে রাখল সকাল পর্যন্ত ।
সকালবেলায় খান সব উজীরদের ডেকে বন্দীকে নিয়ে কি করা হবে তা আলোচনা করতে লাগলেন ।
উজীররা সবাই এক কথাই বলতে লাগল । বাক্যব্যয়ে তারা কোন কার্পণ্য করল না আর বাকপটুতার লড়াই চালিয়ে গেল পরস্পরের সঙ্গে। সবাই যুবকটিকে বেইমানী, বিশ্বাসঘাতকতা ও খানের জীবননাশের প্রচেষ্টার অভিযোগে অভিযুক্ত করল । দাবী করল তাকে কঠোর, নির্দয় শান্তি দেবার । তাদের কথা শুনতে শুনতে খান মাথা নাড়ছিলেন, তার মুখ ক্রমশঃই অন্ধকার হয়ে যাচ্ছিল। উজীররা ওদিকে মনে মনে প্রচণ্ড উল্লাস বোধ করছিল যদিও তা জানতে দিচ্ছিল না । তাদের এই নির্মম ষড়যন্ত্রের সাফল্য সম্পর্কে সুনিশ্চিত ছিল তারা।
এবার বলার পালা এল অভিযুক্তের বড় ভাইয়ের ।
সে বলল, অনুমতি দিন হুজুর, আমি আদালতের ভাষণের পরিবর্তে একটা প্রাচীন গল্প শোনাব, যেমন এতদিন শুনিয়েছি আমি আর আমার ভাইয়েরা আপনার মাথার কাছে বসে ।

বহুদিন আগে দোর্দণ্ডপ্রতাপ এক বাদশাহ্ ছিলেন একটা কথাবলী তোতাপাখিকে তিনি পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী ভালবাসতেন। বাদশাহের শয়নকক্ষে একাট সোনার খাঁচায় পাখিটা বসে থাকত। সঙ্কটমুহুর্তে পাখিটা বাদশাহকে পরামর্শ দিত, দুঃখে সাত্ত্বনা দিত আর বিশ্রামের সময়ে আমোদ জোগাত।
'একদিন বাদশাহ খাঁচার কাছে এসে দেখলেন পাখিটা পালক ফুলিয়ে বিষগ্ন হয়ে বসে আছে।
"কি হল তোমার, বন্ধু? জিজ্ঞেস করলেন বাদশাহ।
তোতাপাখি বলল : ‘আজ আমার দেশ থেকে উড়ে এসেছিল আমার কয়েকজন বন্ধু । তারা খবর এনেছে যে আমার বোনের বিয়ে হবে, বিয়ের দিনে আমাকে দেখতে চেয়েছে বোন । আমাকে একবার দেশ থেকে ঘুরে আসতে অনুমতি দিন, মহারাজ! এই দয়ার পরিবর্তে আমি আপনার জন্য নিয়ে আসব অমূল্য উপহার '

কতদিন লাগবে তোমার ফিরে আসতে?’ বাদশাহ্ জিজ্ঞেস করলেন।
চল্লিশদিন, মহারাজ। চল্লিশদিনের দিন আমি এখানে পৌছে যাব।'
খাঁচার দরজাটা খুলে ধরলেন বাদশাহ, পাখিটা একটা উল্লাসের ধ্বনি করে জানলার বাইরে উড়ে চলে গেল ।
সেখানে উপস্থিত বাদশাহের মন্ত্রী বলল :
‘হলফ করে বলতে পারি হুজুর, যে পাখিটা আপনাকে ঠঁকিয়েছে, খাচায় আর ফিরে আসবে না ও ।
হিংসুটে লোকেরা সদাই সন্দিগ্ধমনা হয়, হুজুর । কাউকে তারা বিশ্বাস করতে পারে না, ঐ উজীরটাও ছিল হিংসুটে ।
চল্লিশদিন কাটলে পাখিটা তার প্রতিশ্রুতিমত ফিরে এল। খুব খুশী হলেন বাদশাহ্, ঠাট্টা করে জিজ্ঞেস করলেন :
আমার জন্যে কি উপহার এনেছ, বন্ধু?"
মুখ হাঁ করে পাখিটা বাদশাহের হাতে একটা ছোট বীজ দিল ।
বাদশাহ্ খুব অবাক হলেন কিন্তু পাখিটার জ্ঞান সম্পর্কে জানেন বলে বুড়ো মালীকে ডেকে বীজটা পুঁতে দিতে বললেন। একদিন বাদে সেই বীজট থেকে একটা চমৎকার আপেল গাছ জন্মাল, দুদিন বাদে কুঁড়ি দেখা দিল আর তিনদিন বাদে গাছটা সুগন্ধি ফলে ভরে গেল ।
সব থেকে লাল আপেলটা ছিঁড়ে মালী বাদশাহের কাছে নিয়ে চলল। কিন্তু পথে উজীর তাকে থামাল, মালীকে বকলো হাতে করে আপেল নিয়ে যাবার জন্য আর বলল সোনার থালা নিয়ে আসতে। বুড়ো চলে গেলে সেই ফাঁকে উজীর আপেলাঁতে বিষ মাখিয়ে রাখল । তারপর মালীর সঙ্গে সঙ্গেই সেও বাদশাহের কাছে গেল ! মালী বাদশাহকে সেই অপূর্ব গাছটির কথা বলে, আপেলসমেত থালাটি তার সামনে রেখে বিদায় নিল, উজীর বললঃ
হুজুর, আপেলটি দেখতে খুবই সুন্দর, কিন্তু সৌন্দর্য মানুষকে প্রায়ই প্রতারণ করে। আমার মনে হচ্ছে আপেলটি বিষাক্ত। প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত কোনো খুনী আসামীকে কারাগার থেকে এখানে আনতে বলুন, প্রথমে তাকে আপেলের একটুকরো খেতে দেওয়া হোক ।
তার কথামতই কাজ করা হল । হাতপা বাঁধা দস্যুটাকে এনে একটুকরো আপেল খেতে বাধ্য করা হল তাকে, সঙ্গে সঙ্গে সে মারা পড়ল ।
‘বাদশাহ ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে গেলেন । পাশের ঘরে ছুটে গিয়ে খাঁচা থেকে পাখিটাকে বার করে গলাটা মুচড়ে দিলেন তার।
কয়েকদিন বাদে বাদশাহের ইচ্ছা হল আপেল গাছটিকে সচক্ষে দেখার । বাগানে বেরিয়ে তিনি মালীকে ডাকতে লাগলেন। একটি চমৎকার চেহারার তরুণ ছুটে এল তার কাছে ।
কে তুই বাদশাহু জিজ্ঞাসা করলেন ।
‘আমি আপনার মালী, হুজুর।

“আমার মালী তো পুরথুরে বুড়ো ছিল! বিস্মিত হলেন বাদশাহ্। যুবকটি বলল, ‘আমিই সে মালী, শাহানশাহ ! আপনি যখন পাখিটাকে মেরে ফেললেন আমি ভাবলাম আমারও আর রক্ষা নেই, তাই কষ্টযন্ত্রণা সহ্য করার চেয়ে নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার জন্য একটা বিষাক্ত আপেল খাব ভাবলাম । একটা আপেল ছিঁড়ে একটু কামড়াতেই আমার তারুণ্য আবার ফিরে এল।'
অভিভূত বাদশাহ্ যেন স্বপ্নের ঘোরে সেই অদ্ভুত গাছটার কাছে এগিয়ে গেলেন, একটা আপেল ছিঁড়ে নিয়ে মুখে দিলেন । কি এক অপূর্ব সুখের অনুভূতি বয়ে গেল তার দেহের মধ্য দিয়ে, অনুভব করলেন যে তিনি আবার যৌবনের শক্তিতে ভরপুর । যেমন ছিলেন আঠার বছর বয়সে ।

তখন তিনি বুঝলেন যে, বিশ্বাসী তোতাপাখিটাকে শুধু শুধুই মেরে ফেলেছেন। দুঃখে অনুশোচনায় কেঁদে ফেললেন তিনি কিছু করার আর কিছু নেই তখন। কারুর জীবন নিয়ে নেবার ক্ষমতা আছে রাজা-বাদশাহের কিন্তু ফিরিয়ে দেবার ক্ষমতা তো নেই "
বড় ভাইয়ের বলা শেষ হল। খান চুপ করে বসে গভীর চিন্তায় ডুবে গেছেন। তারপর তিনি ইঙ্গিতে মেজ ভাইকে বলতে আদেশ দিলেন। সে বলল :
শাহানশাহ, আমিও আপনাকে একটি কাহিনী শোনাব । এটিও বহুদিন আগের ঘটনা, ঘটে অন্য দেশে, অন্য বাদশাহের জীবনে । ঐ বাদশাহ্‌ ছেলেবেলা থেকেই শিকার ভালবাসতেন। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস তেজীঘোড়ায় চেপে তিনি স্তেপে বিভিন্ন বন্য জন্তু, পাখির পিছনে ধাওয়া করে বেড়াতেন । বাদশাহের ছিল চমৎকার একটা শিকারী ঈগলপাখি যেমনটি আর কোন শিকারীর ছিল না। পাখিটা তার অত্যন্ত প্রিয় ছিল ।

একদিন বাদশাহ্ একটা সাইগার (মোটাতাজা প্রাণী) পিছনে ধাওয়া করতে করতে এসে উপস্থিত হলেন প্রাণহীন এক মরুভূমিতে । সূর্যের নির্মম উত্তাপ, একফোটা জলও নেই, বাদশাহের এদিকে তেষ্টায় বুক ফাটছে । হঠাৎ তিনি দেখতে পেলেন একটা পাহাড়ের গা বেয়ে সরু একটা জলের ধারা নেমে আসছে। বাদশাহ সোনার পেয়ালা বার করে, তাতে সেই জল নিয়ে খেতে যাবেন এমন সময় ঈগলটা হঠাৎ পেয়ালার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সবটা জল ফেলে দিল ।

বাদশাহ প্রচণ্ড রেগে গেলেন, চীৎকার করে উঠলেন ঈগলটার প্রতি, তারপর আবার একটু জল ধরলেন। কিন্তু পাখিটা আবার উড়ে এসে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল পেয়ালাটার ওপর, বাদশাহের হাত থেকে মাটিতে পড়ে গেল পেয়ালাটা । প্রচণ্ড রাগে বাদশাহ্ শূন্য পেয়ালাটা তুলে নিয়ে সেটা দিয়ে আঘাত করলেন পাখিটার মাথায়। পাখিটা মরে পড়ে গেল। তারপর তিনি আবার জলধারাটায় কাছে গেলেন—আর ভয়ে জমে গেলেন: পাহাড়ের ফাটল দিয়ে বেরিয়ে আসছে বিরাট এক সাপ। জল নয়, প্রাণঘাতী বিষ বয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের গা বেয়ে! লাফিয়ে ঘোড়ায় উঠে সেখান থেকে পালিয়ে গেলেন বাদশাহ্। কিন্তু সেদিন থেকে তিনি বুঝলেন, তাড়াহুড়ো না করে সতর্ক হওয়াই ভাল, বাদশাহ্ বলেই যে তিনি সর্বনাশা ভুলের হাত থেকে রেহাই পেলাম তা নয় । আর ভাল মন্দের তফাৎ করতে পারেন কেবল পণ্ডিতেই, শক্তিশালী ব্যক্তি নয়।’

হয়েছে! চুপ কর! হুঙ্কার দিয়ে খান উঠে দাঁড়ালেন । তোমরা দু’জনেই ভাইয়ের সঙ্গে মিলে ষড়যন্ত্র করেছ, এখন বদমাশটার ঘাড় থেকে সব দোষ নামিয়ে ওকে নিয়ে পালাতে চাও। তোমাদের কথা অনুযায়ী এই দাঁড়াচ্ছে যে, ওর কোন দোষ নেই আর আমি অন্যায়, অবিচার করছি ওর প্রতি । তাই যদি হবে তাহলে ও তলোয়ার নিয়ে দাঁড়িয়েছিল কেন আমার কাছে?
ভাইয়েরা বলল, তা আমরা জানি না’, ওকেই জিজ্ঞেস করুন।' 
‘বন্দীকে নিয়ে এস!' চীৎকার করে খান প্রহরীকে আদেশ দিলেন। ছোট ভাই এসে খান আর উজীরদের সামনে দাঁড়াল । তার চোখের দিকে তাকিয়ে খান জিজ্ঞেস করলেন :
সত্যি করে বল, কোনরকম ধূর্তমিই তোকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না জানবি,-- কি উদ্দেশ্যে তুই কাল রাতে তলোয়ার হাতে নিয়ে আমার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলি?’
আপনাকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য হুজুর, ধীরভাবে বলল ছোট ভাই। 
‘তুই ছাড়া আর কে আমার মৃত্যু ঘটাতে পারত?’
‘যে সাপটা আপনাকে ছোবল মারতে এসেছিল, যেটাকে আমি তলোয়ার দিয়ে কেটে ফেলেছি, সেটা। '
‘সাপ? কি যা-তা বলছিস! আমার শয়নকক্ষে সাপ আসবে কোথা থেকে?’ অবাক হলেন খান ।
আপনার বহু অভিজ্ঞ উজীয়রা, যাদের ওপর আপনার অগাধ বিশ্বাস, তারাই এ প্রশ্নের উত্তর ভাল দিতে পারবে ।’
খান নিজের শয়নকক্ষে গিয়ে ঢুকলেন, তারপর খানিক বাদে বেরিয়ে এলেন ধীর পায়ে, মাথা নীচু করে । জলভরা চোখে ভাইদের মধ্যে ছোটজনের কাছে গিয়ে তাকে আলিঙ্গন করে আবেগপূর্ণ কষ্ঠে বললেন:
তুমি আমার বিশ্বস্ত বন্ধু, জীবনরক্ষাকারী, ক্ষমা কর আমায়! তোমাকে এমন কষ্ট দেবার বিনিময়ে তুমি যা চাও তাই দেব তোমায়, সবার সামনে শপথ করে বলছি, যে তুমি আর তোমার ভাইয়েরা যা চাও তাই পাবে।'
তরুণটি তখন বলল : “আমাদের তিনজনকে ছেড়ে দিন, শাহানশাহ, আপনার কাজ থেকে আমাদের মুক্তি দিন ; আমাদের আবার ভ্রমণে বেরোবার অনুমতি দিন। আমাদের পথ এখনও শেষ হয় নি, সব থেকে বড় জ্ঞানভাণ্ডার জীবনের বইটা আধখানাও পড়া হয় নি আমাদের।
এমন প্রার্থনা আশা করেন নি বাদশাহ । আবার প্রচণ্ড রাপে মুখচোখ লাল হয়ে গেল তার । কিন্তু যে প্রতিজ্ঞা করেছেন, তা রাখতেই হবে।
আবার পথে রওনা দিল তিন ভাই ।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য