বত্রিশ পুতুলের উপাখ্যান: ৪র্থ উপাখ্যান

   পরদিন ভোজরাজ চতুর্থ পুতুলের মাথায় পা দিতেই সেই পুতুল জীবন্ত হয়ে বললো, মহারাজ, আমার নাম ইন্দ্রসেনা, প্রথমে আমার গল্পটা শুনুন। 
   বিক্রমাদিত্যের রাজ্যে এক ব্ৰাহ্মণ বাস করতেন। তিনি সকল বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন, সকল গুণ ও জ্ঞান তাঁর ছিল। কিন্তু তাঁর কোন ছেলে ছিল না । মনের দুঃখে তাঁদের দিন কাটে। একদিন রাত্রে ব্ৰাহ্মণ স্বপ্ন দেখলেন, মাথায় জটা ও ষাঁড়ের পিঠে চড়ে মহাদেব তাঁকে বলছেন, তুমি প্রদোষ ব্রতের অনুষ্ঠান কর, তাহলে ছেলে পাবে।
   সকালে ব্রাহ্মণ বৃদ্ধদের স্বপ্নের কথা বললেন। বৃদ্ধরা বললেন, এ স্বপ্ন সত্য। অতএব তুমি যদি এই অনুষ্ঠান কর তাহলে তোমার ছেলে হবে।
   তাঁদের কথা শুনে ব্রাহ্মণ বেশ ঘটা করে প্রদোষ ব্ৰতের অনুষ্ঠান করলেন। মহাদেবও সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে একটি সুন্দর পুত্র দিলেন। ব্রাহ্মণ পুত্রের নাম রাখলেন দেবদত্ত ।
   যথাসময়ে ব্রাহ্মণ ছেলের মুখে ভাত দিলেন। তারপর সেই ছেলে নানা শাস্ত্রে পণ্ডিত হয়ে উঠল।
   দেবদত্তের বয়স যখন ষোল বছর, তার বাবা তার বিয়ে দিলেন এবং স্ত্রীকে নিয়ে তীর্থে যাবার সময় দেবদত্তকে বলে গেলেন, কখনও নিজধৰ্ম পরিত্যাগ করবে না, কারো সঙ্গে ঝগড়া করবে না, সবাইকে দয়া করবে, ভগবানের প্রতি ভক্তি রাখবে, নিজ সম্পত্তি অনুসারে ব্যয় করবে, সাধুদের সেবা করবে এবং খারাপের সঙ্গে মিশবে না। এইভাবে থাকলে তুমি জীবনে শান্তি পাবে।
   এই বলে ব্রাহ্মণ তীর্থে বেরিয়ে গেলেন। দেবদত্ত তাঁর পিতার উপদেশ মত দিন কাটাতে লাগলেন। একদিন তিনি হোমের জন্য কাঠ আনতে বনে গেলেন। তিনি যখন কাঠ কাটছিলেন তখন রাজা বিক্রমাদিত্য শিকারে বেরিয়েছিলেন। তিনি শিকার করতে একটি শুয়োরের পেছন পেছন ছুটে সেই গভীর বনে এসে পড়লেন, আর বেরোবার পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তখন দেবদত্তের সঙ্গে রাজার দেখা হয়। রাজা দেবদত্তকে পথের কথা জিজ্ঞাসা করায় দেবদত্ত তাঁকে সযত্নে নগরে পৌঁছে দিলেন। রাজা এতে খুশি হয়ে দেবদত্তকে রাজকার্যের মযাদাপূর্ণ কাজ দিলেন।
   এরপর অনেকদিন কেটে গেল। তবু রাজা মাঝে মাঝে বলতেন, কী করে আমি দেবদত্তের ঋণ শোধ করব। এই বলে তিনি দুঃখ করতেন। দেবদত্ত এই কথা শুনে ভাবলেন রাজার এই দুঃখটা সত্যি কিনা পরীক্ষা করতে হবে ।

   এই ঠিক করে দেবদত্ত একদিন রাজার ছেলেকে  নিজের ঘরে লুকিয়ে রেখে তার গায়ের কয়েকটি গয়না চাকরকে দিয়ে স্যাকরার কাছে বিক্ৰী করতে  পাঠালেন।
   এদিকে রাজবাড়িতে কান্নাকাটি পড়ে গেছে, রাজার ছেলেকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। সারা নগরে এই কথা রটে গেল। রাজাও ছেলের খোঁজ করতে রাজপুরুষদের চারপাশে পাঠালেন।
   রাজপুরুষরা যখন হন্যে হয়ে খুঁজছে তখন দেখতে পেল দেবদত্তের চাকরের হাতে রাজকুমারের গয়না।  তারা সেই চাকরকে বেঁধে রাজার কাছে নিয়ে এল।  জেরা করতে চাকরটি বললো, আমি দেবদত্তের  চাকর, তিনি আমায় এগুলো বেঁচতে বলেছেন।  আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না।
   রাজা তখন দেবদত্তকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, দেবদত্ত, এই গয়না আপনার হাতে কে দিল?
  দেবদত্ত বললেন, কেউ দেয় নি, আমি নিজেই টাকার লোভে কুমারকে বধ করে সমস্ত গয়না নিয়ে এই চাকরের হাত দিয়ে বিক্রির জন্য পাঠিয়েছিলাম । এখন আপনার যা খুশি তাই করুন।
   এই শুনে সভার কেউ বললো, এই লোকটা সর্বশাস্ত্রবিদ হয়েও এমন পাপ কাজ করল! কেউ বললো, মানুষ লোভে পড়ে কি না করতে পারে।
   তখন রাজপুরুষরা বললো, মহারাজ, এ শিশুহত্যা করেছে, আবার সোনাচোর। অতএব একে একশত খণ্ড করে চিলকে দিয়ে খাওয়ানোর হুকুম দিন ।
   তাদের একথা শুনে বিক্রমাদিত্য বললেন, ইনি আমার আশ্রয়ে আছেন, একদিন আমায় বনের মধ্যে পথ দেখিয়ে মহা উপকার করেছেন, আশ্রিতের দোষ গুণ বিচার করা সৎ ব্যক্তির কর্তব্য নয়। আমার পূর্বের কর্মফলের জন্যই আমি ছেলেকে হারিয়েছি। আমি বুঝলাম, উপকারী একবার উপকার করলে তার ঋণ কোনদিনও শোধ করা যায় না। 
   বিক্রমাদিত্য দেবত্তকে টাকা-কড়ি, কাপড়-চোপড় ইত্যাদি উপহার দিয়ে সম্মান দেখিয়ে তাঁকে ছেড়ে দিলেন ।
   দেবদত্ত তখন রাজকুমারকে নিয়ে এসে রাজাকে দিলেন । এই দেখে সভার সকলে স্তম্ভিত । রাজা অবাক হয়ে বললেন, এ কি ব্যাপার?
   দেবদত্ত বললেন, আপনি আগে বলেছিলেন, আমার উপকার থেকে মুক্ত হতে পারলেন না। সে কথার সত্যতা পরীক্ষার জন্য আমি এ কাজ করেছিলাম। এখন আপনার কথায় আমার বিশ্বাস জন্মাল। মহারাজ, আপনার মত মহাপুরুষ পৃথিবীতে আর একজনও নেই।
   পুতুল এই গল্প শেষ করে বললো, মহারাজ, যদি আপনার এমন পরোপকার ও ঔদার্যগুণ থাকে তাহলে এই সিংহাসনে বসুন ।
ভোজরাজ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য