রাজপুত্র -- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

কাঞ্চীর রাজপুত্র এবার যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত হবে। রাজ্যময় ধূমধাম পড়ে গেছে। কাঞ্চীর উত্তরপ্রান্তে গরুড়ধ্বজ বিষ্ণুমন্দির। পুরোহিত গেছেন সেখানকার আর্শীবাদী নির্মাল্য আনতে, লোক পাঠানো হয়েছে প্রয়াগতীর্থ থেকে জল আনবার জন্য। সেই জলে স্নান করিয়ে বিষ্ণুর পূজা-নির্মাল্য তার কপালে দিয়ে রাজপুত্রকে পুরনারীরা বরণ করবেন।
রাজা বিশ্রামকক্ষে প্রবেশ করছেন। রাত্রি প্রায় দ্বিপ্রহর। কোশলরাজের দূত কি এক প্রস্তাব নিয়ে এসেছে, রাজা তাই আজ সারাদিন ধরে মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করছিলেন—শরীর ও মন দুই বড় ক্লান্ত। এমন সময়ে রাজকুমার কক্ষে ঢুকে পিতাকে প্রণাম করে এক পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। রাজা বললেন ‘চন্দ্রসেন, তোমার কিছু বলার আছে ?’
রাজপুত্র বিনীত অথচ দৃঢ়স্বরে বললেন, ‘বাবা, গত বছর যখন গুরুগৃহ থেকে ফিরে আসি তখন আপনি বলেছিলেন—আমায় কিছুদিন দেশভ্রমণে যাবার অনুমতি দেবেন।
আপনার অসুখের জন্যে এতদিন কোনো কথা বলিনি। আমি এইবার এ বিষয়ে অনুমতি চাই।’
—“তুমি জানো, তোমার যৌবরাজ্যে অভিষেকের সব আয়োজন করা হয়েছে ?
—“সেই জন্যেই তো আরও বেশী করে যেতে চাই, বাবা। আমি কাঞ্চী ছাড়া জীবনে কখনও কিছু দেখলুম না, জানলুম না—কানে শুনেছি উত্তরে হিমবান পর্বত আছে, দক্ষিণে সমুদ্র আছে, পশ্চিমে সিন্ধুনদ আছে—কাঞ্চী ছাড়া আরও কতো রাজ্য-দেশ আছে, কিন্তু উনিশ-কুড়ি বৎসর বয়সে আমি চোখ থেকেও অন্ধ। যার জীবনে কোনো অভিজ্ঞতা নেই, তাকে দিয়ে দেশ শাসন কি করে হবে? আমায় যেতে দিন, বাবা!”

এর দুদিন পরে রাজ্যের লোক সবিস্ময়ে শুনলে রাজকুমার চন্দ্রসেনের অভিষেক উৎসব সম্প্রতি স্থগিত থাকলো—কারণ, তিনি চলেছেন দেশভ্রমণে—একা, সঙ্গে তিনি কাউকে নিতে রাজী নন।
সত্যই রাজকুমার কাউকে সঙ্গে নেননি। 
আজ সপ্তাহ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, চন্দ্রসেন তার প্রিয় সাদা ঘোড়াটিতে চড়ে একা পথ চলেছেন। তার সঙ্গে থাকবার মধ্যে বা দিকে খাপে ঝোলানো পিতৃ-দত্ত তলোয়ারখানি। আর চোখে অসীম তৃষ্ণা, বুকে অদম্য সাহস ও নির্ভীকতা। কাঞ্চী রাজ্যের সীমা ছাড়িয়েও দুদিনের পথ চলে এসেছেন, কতো গ্রাম, মাঠ, বন, নদী, পার হয়ে চলেছেন—সবই অচেনা, এ তার নিজের রাজ্য কাঞ্চী নয়, এখানে তিনি একজন অজানা পথিক মাত্র।

তখনও সূর্য অস্ত যায়নি, এক নদীর ধারে তার ঘোড়া নিয়ে এসে পৌছল। প্রকাণ্ড নদী—বিকেলের রাঙা আলোয় ওপারের বনরেখা অপূর্ব দেখাচ্ছে। অত বড় নদী কি করে পার হবেন, রাজকুমার চিন্তায় পড়লেন। কোনোদিকে মানুষের চিহ্ন নাই— সন্ধ্যার ছায়া ক্রমে ধূসর হয়ে এলো। বিজন নদী-তীরের ছন্নছাড়া চেহারাটা সুমুখ-আঁধার রাতে গাঢ় ছায়ায় যেন আরও বেশি ছন্নছাড়া হয়ে ফুটে উঠলো।
ওপারে দূরে একটা পাহাড়–নীল চুড়া একটু একটু চোখে পড়ে। রাজকুমার চেয়ে থাকতে থাকতে পাহাড়ের ওপর থেকে আগুন-রাঙা একটা হলকা হঠাৎ আকাশের পানে লক্ লক করে জ্বলে উঠেই দপ করে নিবে গেল। রাজপুত্র অবাক হয়ে সেদিকে চেয়েই আছেন, এমন সময় একটা প্রকাণ্ড বাজপাখি আকাশে ডানা মেলে নদীর উজান দিক থেকে উড়ে এসে তার মাথার ওপর তিন-চারবার চক্রাকারে ঘুরে আবার কোনদিকে অদৃশ্য হ’ল।

রাজকুমারের নির্ভীক মনও একটুখানি কেঁপে উঠলো। তিনি জানতেন, তাঁদের বংশে কারুর মৃত্যুর পূর্বে তার মাথার ওপর গৃধ্ৰুযাতীয় পাখি তিনবার ওড়ে—কেউ কেউ বলেছেন, বিশেষ করে শকুন-শাস্ত্রবিৎ কোনো গণৎকার সে-বার বলেছিলেন যে, এই গৃধ্ৰু তাদের পূর্বপুরুষদের হাতে অন্যায়ভাবে অবিচারে নিহত কোনো শত্রুর বংশধরের মৃত্যুর পূর্বাভাস। কোথা থেকে আসে, কোথায় আবার উড়ে চলে যায়—কেউ বলতে পারে না।

রাতের সঙ্গে-সঙ্গে এলো হাড়-কাঁপানো ধারালো শীত। একটা বড় গাছও কোথাও নেই, যার তলায় আশ্রয় নিতে পারেন। অবশেষে একটা মাটির ঢিপির পেছনে ঘোড়া থেকে নেমে রাজপুত্র নিজের আসন বিছোলেন—সেখানটাতে হাওয়া বেশি লাগে না—শুকনো লতা-কুটি কুড়িয়ে আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা করে সে রাত্রের মতো সেইখানে রইলেন। উপায় কি ?

গভীর রাত্রে রাজপুত্রের ঘুম ভেঙে গেলো। বহুদূরে যেন কাদের আর্তনাদ—মৃত্যুপথের পথিকদের অন্তিম চিৎকারের মতো করুণ। রাজপুত্র নিজের অলক্ষিতে একবার শিউরে উঠলেন। শয্যার পাশের আগুন নিবে গিয়েছে, রাজপুত্র উঠে ভালো করে আগুন জ্বালালেন। সারারাত্রির মধ্যে আর ঘুম এলো না কিন্তু।

ভোরের দিকে একটা ডিঙি পাওয়া গেল। তাতে পার হয়ে রাজকুমার ওপারে গিয়ে উঠলেন। ডিঙির মাঝি আধ-পাগলা এবং বোধহয় কানে আদৌ শুনতে পায় না। রাজকুমারের প্রশ্নের কোনো উত্তর সে দিতে পারলে না।
প্রথমে একটা মরুভূমির মতো মাঠ—ঘাস, খড়, গাছপালা কিছুই নেই—কটা রঙের বালির পাহাড় এখানে-ওখানে। অনেক দূরে গিয়ে একটা জনপদ। কিন্তু কেমন একটা নিরানন্দ ভাব চারিদিকে। পথ দিয়ে পথিক চলে না, দোকান-পসরায় খদের নেই, নদীর ঘাটে স্নানার্থীর দল নেই, মাঠে চাষীরা চাষ করে না—যেন কেমন একটা বিষাদ ও অমঙ্গলের ছায়া চারিদিকে।
রাজকুমার ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় বড় কাতর হয়েছিলেন। কাছেই গৃহস্থের বাড়ি। সেখানে গিয়ে আশ্রয় চাইতেই তারা খুবই যত্নের সঙ্গে আশ্রয় দিলে। অনেকদিন পরে রাজকুমার ভালো খাবার খেলেন, ভালো বিছানায় বিশ্রাম করতে পেলেন, মানুষের সঙ্গ অনেকদিন পরে বড় প্রিয় মনে হ’ল। কয়েকদিন সেখানে রয়ে গেলেন তিনি। গৃহস্থের একটি ছোট মেয়ে ও ছেলের সঙ্গে রাজকুমারের বড় ভাব হ'ল। তারা তাকে ফুল তুলে মালা গেথে দেয়, দুপুরে তার কাছে বসে গল্প শোনে, তাদের শত আবদার প্রতিদিন তাকে সহ্য করতে হয়। ছোট ছেলেটির উপদ্রবের তো আর অন্ত নেই!

অল্পদিনের মধ্যে রাজকুমার সে বাড়ির সবার তো বটেই, গ্রামের সকলেরও প্রীতি ও শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে উঠলেন। এত সুন্দর মুখশ্রী, এমন সুন্দর কান্তি, এমন মিষ্টি স্বভাবের মানুষ তারা কখনও দেখেননি। রাজকুমারের আসল পরিচয় কেউ জানেনা। তিনি কাউকে সে সব কথা বলেননি। সবাই ভাবে, তিনি একজন গৃহহীন পথিক—হয়তো তার কেউ কোথাও নেই। এতে সবারই স্নেহ তার ওপর আরও বেড়ে যায়, কিসে তিনি সুখে থাকবেন, কিসে আত্মীয়হীন নিঃসঙ্গ প্রবাস-কষ্ট তার কমবে—সবারই এক চেষ্টা।

তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে, এমন সুন্দর চেহারার ছেলে নিশ্চয়ই কোনো বড়-ঘরের হবে। গ্রামের যিনি মণ্ডল, তার এক মেয়ে পরমাসুন্দরী—সবাই বলে, ওই ছেলেই এ মেয়ের উপযুক্ত হবে। বিধাতা ওর জন্যই যেন এই দেবতার মতো সৌম্যকান্তি ছেলেটিকে কোথা থেকে জুটিয়ে এনেছেন। মণ্ডল গৃহিণীও রাজকুমারকে একদিন দেখে এতো পছন্দ করলেন যে তিনি স্বামীকে জানিয়ে দিলেন—যদি ঐ ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে হয় ভালো—নয় মেয়ে চিরকুমারী থাকুক, তার আপত্তি নেই।
রাজকুমার কিন্তু কিছুতেই তেমন আমোদ পান না। তার মনে কি একটা বিষাদের ছায়া সকল আনন্দকে ম্লান করে রাখে। একবার ভাবেন, হয়তো বাপ-মাকে অনেকদিন দেখেননি বলে এমন হয়—কিন্তু তার মন বলে, তা নয়, তা নয়, ও-সব সামান্য সুখ-দুঃখের ব্যাপার এ নয়, এমন একটা কিছু যার কারণ আরও গভীর, জীবন-মরণ নিয়ে এর কারবার।
ক্রমে এলো সে মাসের কৃষ্ণপক্ষ। রাজকুমার অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন, বাড়িতে সবারই চোখে জল—গ্রামসুদ্ধ সকলে বিষন্ন, নিরানন্দ। কেউ কোনো কথা বলে না, কারণ জিজ্ঞাসা করলেও উত্তর পাওয়া যায় না। সবাই কিসের ভয়ে জুজু হয়ে আছে যেন ।
অবশেষে রাজকুমার কথাটা শুনলেন। এখান থেকে যোজন দূরে গৃধ্ৰুকুট পাহাড়ের ওপর রাজগুরু এক কাপালিকের সাধন-পীঠ। প্রতি অমাবস্যায় সেখানে নরবলির জন্যে প্রতি গ্রাম থেকে পালাক্রমে একটি তরুণ বয়স্ক লোক পাঠানো চাই-ই। রাজার হুকুম। এবার এ গ্রামের পালা।
শোনামাত্র রাজকুমার নিজের কর্তব্য স্থির করে ফেললেন। তার পিতৃদত্ত তৃণের তীক্ষ ইস্পাতের ফলা-পরানো যে বাণ, তা কি শুধু নিরীহ পশুপক্ষী শিকারের জন্যে ?


“খেত হতে ত্ৰাণ করে এই সে পরাণ—মহান ক্ষত্রিয় নাম বিদিত জগতে৷”—অস্ত্রগুরুর সে উপদেশ রাজকুমার কি ভুলে গিয়েছেন!
অমাবস্যার দিন মণ্ডলের বাড়িতে পাশার সাহায্যে নির্ধারিত হবে এবার কে যাবে গ্রাম থেকে। রাজকুমার এ-কথা শুনলেন। অমাবস্যার পূর্বদিন গভীর রাত্রের অন্ধকারে তিনি চুপি চুপি শয্যা ত্যাগ করে কোথায় চলে গেলেন—কেউ জানে না। সকালে উঠে তাকে আর কেউ দেখতে পেল না।
মণ্ডলের বাড়িতে পাশার মজলিসে যার নাম উঠলো সে গৃহস্থের একমাত্র পুত্র। সবাই চোখের জলে ভেসে তাকে বিদায় দিলে। তার বৃদ্ধ পিতা ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে চললো কাপালিকের কাছে—যদি হাতে-পায়ে ধরে ছেলেকে ছাড়িয়ে আনতে পারে, এই দুরাশায়।

গৃধ্ৰুকূট পৰ্বতের পাদদেশে গিয়ে তারা যা দেখলে, তাতে তারা অপ্রত্যাশিত বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গেল। বড় জামগাছটার তলায় দুটো মৃতদেহঃ একটা তাদের গ্রামের সেই তরুণ অতিথির, আর একটা কাপালিকের—দেখে মনে হয়, দু’জনেই পরস্পরকে অস্ত্রাঘাত করেছে। 

দলে দলে স্ত্রী-পুরুষ সবাই ছুটে এলো দেখতে, যে নিজের প্রাণ দিয়ে তাদের চিরকালের জন্য বিপদমুক্ত করে গেল—রাজার ভয়ে গোপনে চোখের জলে ভেসে তার শেষ সৎকার সম্পন্ন করলে।
রাজকুমারের আসল পরিচয় সে-দেশের লোকে তখনো জানেনি।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য