সরল স্মৃতিধর -- সুচিত্রা ভট্টাচার্য

হোটেল গোলোকধামের বারান্দায় বসে ছিলেন স্মৃতিধর। গিন্নি গিয়েছেন জগন্নাথদেবের মন্দিরে, আরতি দেখতে। বেরোনোর আগে পইপই করে বলে দিয়েছেন, স্মৃতিধর যেন খবরদার হোটেলের বাইরে পা না বাড়ান। যা ভুলো মানুষ, বেড়াতে এসে কোথায় কখন হারিয়ে যাবেন তার ঠিক আছে!
তা এমন আশঙ্কা তো স্মৃতিধরগিন্নির মনে জাগতেই পারে। স্মৃতিধর সদাসর্বদাই স্মৃতিবিভ্রাটে ভোগেন কিনা! স্কুলে নাইনের বদলে ফাইভের ক্লাসরুমে ঢুকে ত্রিকোনমিতির অঙ্ক কষতে দেওয়ার ঘটনা তো এখন ছাত্রদেরও গা সওয়া। এই যে স্মৃতিধর এবার পুরী এলেন, এও তো ভুল করে আসা। কথা ছিল বড়দিনের ছুটিতে পাটনা যাওয়া হবে। গিন্নির দাদার বাড়িতে। সেই মতো ট্রেনের টিকিটও কাটতে গিয়েছিলেন স্মৃতিধর। কিন্তু লাইনে দাঁড়িয়ে পাটনা নামটাই বেমালুম মাথা থেকে হাওয়া, স্মৃতিধর বাড়ি ফিরলেন পুরীর টিকিট হাতে। গিন্নি তো প্রথমে চটে কাই, তারপর অবশ্য ঠান্ডা হয়েছেন ক্রমে ক্রমে। পাটনার বদলে পুরীই বা মন্দ কী! আস্ত একটা সমুদ্র রয়েছে, সকাল-বিকেল জগন্নাথদেবের মন্দিরে যেতে পারবেন...! পাঁচ-সাতটা দিন তো চমৎকার কাটানো যায়।
পুরীতে এসে স্মৃতিধরেরও শরীর মন ভারী ফুরফুরে লাগছে। হোটেলটিও জুটেছে ভালো। স্টেশনে নেমেই কোত্থেকে যেন মাথায় এসে গিয়েছিল গোলোকধাম নামটা । রিকশাওয়ালাকে বলতে সে অবশ্য খানিক গাইগুই করছিল। কিন্তু শেষমেশ যখন নিয়ে এল, হোটেলটি দেখে স্মৃতিধর মহা আহ্লাদিত। বাড়িটা হয়তো একটু পুরোনো পুরোনো, ঘরগুলোও
শহর থেকে বেশ খানিকটা বাইরে, চতুর্দিক মোটামুটি নির্জন, এমন একটা জায়গায় না উঠলে কটা দিন শাস্তিতে অঙ্ক কষা যায় !
হ্যাঁ, অঙ্ক আসছেও বটে স্মৃতিধরের মগজে। একের-পর এক। হোটেলের বারান্দায় এলেই সামনে সমুদ্র, অন্তহীন জলরাশি, অগুনতি ঢেউ। আর সেদিকে চোখ পড়লেই তো রাশি রাশি অঙ্ক ধেয়ে আসতে থাকে। দুপুরে ভরপেট সাটিয়ে
এসে দাঁড়াতেই এক নম্বর অঙ্কটি হাজির। এত যে ঢেউ আসছে পাড়ে, এদের কি গোনা হয়েছে কখনও ? সারা বছরে কত ঢেউ আসে?


যেই না অঙ্কটা মনে এল, অমনি হাতঘড়ি খুলে চোখের সামনে মেলে ধরেছেন স্মৃতিধর। একবার সেকেন্ডের কাঁটা দেখছেন, পরক্ষণে ঢেউ। কী কাণ্ড, সংখ্যা তো স্থির থাকছে না! প্রতি মিনিটে বদলে বদলে যাচ্ছে! প্রথম মিনিটে ষোলোটা ঢেউ এল, পরের মিনিটে বারোটা, তার পরের মিনিটে চোদ্দোটা...! এরকম হচ্ছে কেন ? নিশ্চয়ই এই সংখ্যাগুলোর মধ্যে একটা গাণিতিক সম্পর্ক আছে! ঢেউয়ের সংখ্যা আর সময় দিয়ে একটা সমীকরণ তৈরি করা যায় না? সেই সমীকরণের সমাধান করলেই তো সারা বছরে কোন দিন কোন সময়ে কত ঢেউ আসতে পারে তার হিসেব মিলে যায়। দারুণ অঙ্ক! ক্লাসে করতে দিলে বেশ খাবি খাবে ছেলেরা।
ভাবনার মাঝেই বেয়ারা চা দিয়ে গেল। স্মৃতিধরের সমীকরণ যখন মোটামুটি তৈরি, গিন্নিও বেরিয়ে গেলেন। ঠিক তার পর পরই দ্বিতীয় অঙ্কের আবির্ভাব। স্মৃতিধর লক্ষ করলেন, প্রতি মিনিটে যত ঢেউ পাড়ে আসছে, পরের মিনিটে ঠিক তত ঢেউ পাড় থেকে ফিরছে না। আসা-ঢেউয়ের থেকে চলে যাওয়া ঢেউয়ের সংখ্যা সর্বদাই কম। অর্থাৎ প্রতি মিনিটে কিছু ঢেউ খোওয়া যাচ্ছে। এভাবে যদি ঢেউ হারাতে থাকে, তা হলে কত দিন পরে সমুদ্রে ঢেউয়ের সংখ্যা শূন্য হয়ে যাবে?

এই অঙ্কটা সত্যিই জটিল। সমাধান পেতে পেতে সন্ধে নেমে গেল। পরের অঙ্কের জন্য সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আর লাভ নেই, অন্ধকারে ঢেউ দেখা যাচ্ছে না। তখনই অন্য এক অঙ্কের আবির্ভাব। স্মৃতিধর টের পেলেন, বেশ কয়েকটা মশা বসেছে হাতে। হুল ফুটিয়ে তারা রক্ত চুষছে মহানন্দে।
স্মৃতিধর সাবধানে মশার সংখ্যা গুনে ফেললেন। ডান হাতে আটটা, বা হাতে এগারোটা। অতএব মোট উনিশটি মশা। এবং প্রত্যেকে যদি স্মৃতিধরের শরীর থেকে পাঁচ মিনিটে এক গ্রাম রক্ত শুষে নেয়, আর স্মৃতিধরের শরীরে যদি মোট তিন কেজি রক্ত থাকে, আবার একই সঙ্গে যদি শরীরে ঘণ্টায় পঁচিশ গ্রাম রক্ত তৈরি হয়, তা হলে এক মাস পর স্মৃতিধরের শরীরে কতটা রক্ত থাকবে ?
এমন একখানা প্যাঁচালো অঙ্ক পেয়ে স্মৃতিধর দারুণ পুলকিত। মশার কামড় টেরই পাচ্ছেন না। মস্তিষ্ক নামক কম্পিউটারটিকে চালনা করছেন দ্রুত।
হঠাৎই কানের পাশে পিনপিন শব্দ, কঠিন অঙ্ক, তাই না স্যার ?”
চমকে ঘাড় ঘোরালেন স্মৃতিধর। আধো অন্ধকারে একটি উনিশ-কুড়ি বছরের ছেলে দাঁড়িয়ে। মুখখানা স্পষ্ট ঠাহর হয় না। তবু কেমন চেনা চেনা লাগে।
গণনায় ব্যাঘাত ঘটায় স্মৃতিধর সামান্য বিরক্ত। ব্যাজার মুখে বললেন, ‘অ্যাই, তুমি কে হে?
"আমায় চিনতে পারলেন না স্যার ? আমি সরল। আপনার ছাত্র ছিলাম ?
অ। তাই মনে হল কোথায় যেন দেখেছি। কবে পাশ করেছ বলো তো ?’
‘এই তো স্যার, গত বছরের আগের বছর, সরল দাঁত বের করে হাসল, “আমাকে তো আপনার ভালোভাবেই স্মরণ রাখার কথা ?
‘কেন? তুমি কি অঙ্কে লেটার পেয়েছিলে ?’ 
‘না স্যার। অঙ্কে তো আমি বরাবরই মাটো ছিলাম। আপনি আমাকে “গোবর সরল” বলে ডাকতেন।”
এতক্ষণে ঠিকঠাক মনে পড়েছে স্মৃতিধরের। এই সরলের মতো অঙ্কে এত নিরেট মাথা শিক্ষকজীবনে স্মৃতিধর বড় একটা দেখেননি। বীজগণিত, জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতি তো দূরস্থান, সামান্য যোগ-বিয়োগ, গুণ-ভাগ করতে গিয়েও ঘেমেনেয়ে একশা হত ছেলেটা। কী করে যে ছেলেটা স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েছে কে জানে?
গম্ভীর মুখে স্মৃতিধর বললেন, ‘হুম, এবারে চিনেছি। তা এখন কী করা হয় ?
কিছুই না স্যার। এদিক-ওদিক ভেসে ভেসে বেড়াই।’ 
মানে ? 
পড়াশোনা লাটে? 
উপায় কী স্যার! আর তো করার জো নেই।” 
‘কেন ??
‘আমি এখন ওসবের বাইরে স্যার।’
অর্থাৎ একেবারেই গোল্লায় গিয়েছে। লেখাপড়া ছেড়ে এখন নিশ্চয়ই টো টো কোম্পানি করে বেড়ায়। খুব খারাপ, খুব খারাপ!
স্মৃতিধর অপ্রসন্ন স্বরে বললেন, তা এখানে কী মনে করে? 

এই হোটেলে ?’
‘এখানেই তো এখন থাকি স্যার।’ 
চাকরি করো বুঝি এই হোটেলে ?’ 
না স্যার। এমনিই থাকি। 
রীতিমতো বিস্মিত হয়েছেন স্মৃতিধর। চোখ পিটপিট করে বললেন, ‘এমনি এমনি থাকো মানে ?”
আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না স্যার। তাই এই হোটেলেই থেকে গিয়েছি।”
‘অর্থাৎ এখানকার পার্মানেন্ট বোর্ডার?’
 ‘বলতে পারেন স্যার ” 
আশ্চর্য, সকাল থেকে তো একবারও চোখ পড়েনি! কোন রুমে আছ?”
‘সাত নম্বর ” 
নম্বরটা ভীষণ পরিচিত লাগল স্মৃতিধরের। কে যেন আছে ওই রুমে ? কে যেন... ?
‘ওটা আপনাদেরই রুম স্যার’, সরল ফিক করে হাসল, ওখানে আপনারাও আছেন, আমিও আছি।’
এবার সত্যিই বিস্মিত হয়েছেন স্মৃতিধর। বললেন, তা কী করে হয়? ঘরে তো তোমার জিনিসপত্র কিছু নেই। রাতে শোবেই বা কোথায়? আলাদা কোনও খাট-বিছানাও তো
দেখলাম না!”
‘আমার আর ওসব লাগে না স্যার। সরল লাজুক হাসল, ‘আমি তো আর নেই।’
মানে ??
‘বুঝলেন না? মরে গিয়েছি।”
ও, তাই বলো!” এতক্ষণে বুঝি স্বস্তি পেলেন স্মৃতিধর। হিসেবটাও যেন মিলল। ছেলেটা যদি জীবিতই হত, তা হলে
না। সুতরাং মৃত হওয়াটাই এখানে একমাত্র সমাধান। স্মৃতিধর হাসি হাসি মুখে বললেন,‘তা কবে মারা গিয়েছ?’

‘এক বছর তো হবেই। গত বছর এই সময়েই বন্ধুদের সঙ্গে পুরী বেড়াতে এসেছিলাম। উঠেছিলাম এই হোটেলেই। রুম নম্বর সেভেনে। সমুদ্রে স্নান করতে নেমে অনেকটা ভিতরে চলে যাই, তারপর স্রোতই আমায় টানতে টানতে আরও গভীরে নিয়ে গেল। পারে যখন ফিরলাম, তখন আর বেঁচে নেই। কলকাতার খবরের কাগজে তো নিউজটা বেরিয়েছিল, খেয়াল করেননি?’
ক্ষীণভাবে স্মৃতিধরের মনে পড়ল, স্কুলে একদিন ছেলেটার শোকসভা হয়েছিল বটে। তখনই বোধ হয় শুনেছিলেন হোটেল গোলোক ধামের নামটা। তাই হয়তো পুরী স্টেশনে নেমেই...!
স্মৃতিধর দু-চার সেকেন্ড নিরীক্ষণ করলেন সরলকে। তারপর বললেন, তা মরে গিয়ে তো ভালোই আছ মনে হচ্ছে?
চিন্তা নেই, ভাবনা নেই, পড়াশোনা করতে হচ্ছে না, অঙ্ক-টঙ্ক তো ভুলেই মেরে দিয়েছ...?’
না-না স্যার, অঙ্ক তো এখন আমার হাতের মুঠোয়। অ্যারিথমেটিক, অ্যালজেব্রা, জিওমেট্রি, ট্রিগনোমেট্রি সব এখন জলবৎ তরলং ?
‘বটে? বলো তো দেখি, “প্রবৃদ্ধ কোণ” কাকে বলে? 
‘একশো আশি ডিগ্রির বেশি, তিনশো ষাট ডিগ্রির কম।” 
‘কট থার্টি ডিগ্রির ভালু কত? 
‘খুব সহজ। রুট খ্রি। বড় গুণ দিন স্যার, মুখে মুখে করে দেব ?
‘বেশ। আট হাজার নশো সাতষট্টিকে সাত হাজার তিনশো একুশ দিয়ে গুণ করলে কত হয় বলো দেখি?
‘ছ কোটি ছাপ্পান্ন লক্ষ সাঁইত্রিশ হাজার চারশো সাত। প্রশ্ন শেষ হতে না হতে সরলের জবাব উড়ে এল। সঙ্গে অনুযোগ, ‘এত ছোট ছোট গুণ দেবেন না স্যার! আর একটু জট পাকিয়ে দিন।’
স্মৃতিধরের জেদ চেপে গেল। পরের পর জটিল অঙ্ক দিচ্ছেন সরলকে এবং কীমাশ্চর্যম, হেলায় করে দিচ্ছে ছেলেটা! টানা আধ ঘণ্টা লড়াই চালানোর পর অবশেষে হার মানলেন স্মৃতিধর। হাঁপাচ্ছেন অল্প অল্প।
সরল হাসছে মিটিমিটি। পিনপিনে স্বর আরও সরু করে বলল, শুধু অঙ্ক নয় স্যার, আমি এখন সবকিছু করতে পারি।
যেমন ?? 
‘এই যে আমার এই হাতখানা...যেমন খুশি লম্বা করে দিতে পারি। বলেই দু-বাহু সমুদ্রের পানে বাড়িয়ে দিয়েছে সরল। হুহু করে এগিয়ে গেল হাত দু-খানা। আঁজলা ভরতি সমুদ্রের জল নিয়ে ফিরেও এল পলকে। স্যারের পায়ে জলটুকু ঢেলে দিয়ে সরল বলল, বিশ্বাস হল ?’
ভারী মজা পেয়েছেন স্মৃতিধর। বললেন, আর কী পারে? 
‘আমার মুভুটা ধড় থেকে আলাদা করে দিতে পারি। সরল সত্যি সত্যিই মাথাখানা হাতে নিয়ে দেখাচ্ছে স্মৃতিধরকে।
অন্ধকারে ছুড়ে দিয়ে লুফল বারকয়েক। আবার লাগিয়ে নিয়েছে যথাস্থানে। গর্বিত স্বরে জিগ্যেস করল, আর কিছু দেখতে চান, স্যার??

মুগ্ধ স্মৃতিধর পরবর্তী ফরমায়েশ পেশ করতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই গিন্নির গলা। হোটেলের গেট পেরিয়ে প্রায় ছুটতে ছুটতে আসছেন গিন্নি। কাছে এসে সভয়ে বললেন, ‘এই ওঠো, ওঠো! এক্ষুনি এই হোটেল ছাড়তে হবে।’
স্মৃতিধর অবাক! দুহাত উলটে বললেন, ‘কেন? 

‘মন্দিরে এক বাঙালি ফ্যামিলির সঙ্গে পরিচয় হল। তারা বললেন, এই হোটেল গোলোকধাম নাকি ডেঞ্জারাস। এখানে নাকি একটা ভূত আছে!’

জানি তো! আমার ছাত্র ? স্মৃতিধর এদিক-ওদিক তাকালেন। সরলকে দেখতে পেলেন না। অস্ফুটে বললেন, ‘এই তো এতক্ষণ আমার সঙ্গেই ছিল... ?
স্মৃতিধরগিন্নির দৃষ্টি বিস্ফারিত। ঢোক গিলে বললেন, তুমি তাকে দেখেছ?”
অবশ্যই! এতক্ষণ ধরে কত কসরত দেখাল...! অঙ্কে কী কাচা ছিল ছেলেটা, এখন দারুণ তুখোড়! ও তো আমাদের রুমেই আছে, রাতে তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব...!
বাক্য শেষ হল না। আঁ আঁ’ একটা আওয়াজ ছাড়লেন স্মৃতিধরগিন্নি, পরক্ষণে কাটা কলাগাছের মতো ধপাস! অজ্ঞান!
স্মৃতিধর হতবাক! কেন যে হঠাৎ ভিরমি খেলেন গিন্নি কে জানে!
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য