কাঁপতে শেখা -- জার্মানের রূপকথা

একটি লোকের ছিল দুই ছেলে। বড়োটি চালাক-চতুর। ছোটোটা হাবাগোবা। কিছুই সে বোঝে না, কিছুই পারে না শিখতে। তাকে দেখে লোকে বলে, “ছেলেটার জন্যে বাপের কপালে অনেক দুঃখ আছে।”
কোনো কিছু করার দরকার হলে ডাক পড়ে বড়ো ছেলের । কিন্তু কোনো জিনিস অনার জন্য সন্ধে কিংবা রাতে তার বাবা যেতে বললে আর পথটা গিজের কবরখানা বা সেরকম কোনো গা-ছমছমে জায়গার ভিতর দিয়ে গিয়ে থাকলে সে বলে ওঠে, “বাবা, আমার শরীর কাঁপছে।” কারণ ছোট ছেলেটি ছিল ভীতু । সন্ধেয় আগুনের চার পাশে বসে লোকে যখন ভয়ংকর সব ভয়ের গল্প বলে, শ্রোতাদের মধ্যে কেউ হয়তো বলে ওঠে, “গুনে আমার গা কাঁপছে । ছোটো ছেলেটি তখন এক কোণে বসে লোকেদের কথাবার্তা শোনে, কিন্তু তার মাথামুণ্ডু কিছুই বঝতে পারে না । প্রায়ই তাকে বলতে শোনা যায়, “সবাই বলে, “গাঁ কাঁপছে, গা কাঁপছে । কই, আমার তো কখনো গা কাঁপে না, কাপুনি ধরে না । ব্যাপারটা নিশ্চয়ই এক জাতের শিল্পকলা, যেটা আমি বুঝি না।”
একদিন বাবা তাকে বলল, “ওরে শোন । তুই আর এখন নেহাত খোকাটি নোস্ । দিব্যি গাট্টাগোট্টা বড়োসড় হয়ে উঠেছিস্ । কিছু একটা শেখ, যাতে রুজি-রোজগার হয় । তোর বড়ো ভাইকে দ্যাখ, শেখবার জন্যে কী পরিশ্রমই-না করে । কিন্তু জানি, তোকে উপদেশ দেওয়া বৃথা ।”
ছোটো ছেলে বলল, “ঠিক বলেছ বাবা, কিছু একটা জিনিস শেখার আমারও খুব ইচ্ছে। সম্ভব হলে শিখতে চাই, কী করে কাঁপতে হয় । কারণ কাঁপতে আমি জানি না ।”
কথাগুলো শুনে, তার বড়ো ভাই তো হেসে কুটোপাটি । ভাবল, “বোকামিতে ভাইটার জুড়ি মেলা ভার । জীবনে কিচ্ছু ও করতে পারবে না। বড়শি বানাতে হলে শুরুতেই যে দরকার লোহাকে বাঁকানো; তাদের বাবা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, “একদিন কাঁপতে শিখবি ঠিকই। কিন্তু তা দিয়ে তোর রুজি-রোজগার হবে না ।”
দিন কয়েক পরে পাড়ার পুরুতমশাই তাদের বাড়িতে এলেন বেড়াতে । ছেলেদের বাবা নিজের দুঃখের কাহিনী তাকে শোনাল । বলল, তার ছোটো ছেলেটা বেয়াড়া গোছের । কিছুই সে জানে না, কিছুই চায় না শিখতে। “ভাবুন একবার,” ছেলেদের বাবা বলে চলল, “আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম—কী করে রুজি-রোজগার করবি ? সে বলে—‘কী করে কাঁপতে হয় শিখব’ ”
পুরুতমশাই বললেন, “তাই যদি চায়, আমি তাকে কাঁপতে শিখিয়ে দেব। আমার সঙ্গে সে চলুক।’
ছেলেদের বাবার তাতে আপত্তি ছিল না । ভাবল, কিছু না . হোক, ওখানে গেলে স্বভাবটা তো খানিক শুধরোবে । পুরুতমশাই তাকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে গিজের ঘণ্টা বাজাবার কাজ দিলেন ।
দিন কয়েক পরে মাঝরাতে ঘুম থেকে তুলে পুরুতমশাই তাকে পাঠালেন গির্জের ঘণ্টাঘরে ঘণ্টা বাজাতে । মনে মনে বললেন, ‘কাঁপতে তোকে শেখাচ্ছি। তার পর তার আগেই চুপি চুপি সেখানে তিনি হাজির হলেন । ঘন্টাঘরে উঠে দড়িটা মুঠো করে ধরতে গিয়ে ছেলেটা দেখে জানালার উলটো দিকের সিঁড়িতে সাদামতো একটা মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে । i
ছেলেটা চেঁচিয়ে উঠল, “কে ওখানে ?” কিন্তু সেই শ্বেতমূতি কোনো উত্তর দিল না, নড়লও না ।
ছেলেটা আবার চেঁচিয়ে বলল, “উত্তর দাও, নয়তো ভাগো । রাতে তোমার এখানে আসার কথা নয়।” কিন্তু পুরুতমশাই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। চেয়েছিলেন ছেলেটা মনে করে তিনি ভূত । '
ছেলেটা দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করল, “এখানে কী চাও ? ভালো লোক হলে উত্তর দাও । নয়তো সিঁড়ির নীচে তোমায় ছুঁড়ে ফেলব।” পুরুতমশাই ভাবলেন, ‘সত্যিই কি আর ছুঁড়ে ফেলবে । তাই তিনি পাথরের মূতির মতো চুপচাপ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন ।
ছেলেটা তৃতীয়বার হাঁক ছাড়ল । কিন্তু তাতেও কোনো ফল হল না দেখে ছুটে গিয়ে সেই ভুতকে এমন জোরে সে ঠেলা মারল যে, দশটা সিঁড়ি গড়িয়ে এক কোণে ভূত পড়ে রইল স্থির হয়ে । ছেলেটা তার পর খানিক ঘণ্টা বাজিয়ে বাড়ি ফিরে বিছানায় শুয়ে অসাড়ে ঘুমিয়ে পড়ল । কাউকে কোনো কথা বলল না। এদিকে পুরুতমশাইয়ের বউ অপেক্ষা করে বসে রয়েছে । অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরেও স্বামীকে ফিরতে না দেখে ভয় পেয়ে ছেলেটাকে ঘুম থেকে তুলে প্রশ্ন করল, “আমার স্বামী কোথায় জানো ? তোমার আগেই তিনি ঘণ্টাঘরে গিয়েছিলেন ।”
ছেলেটা বলল, “জানি না তো ! কিন্তু জানলার উলটো দিকের সিঁড়িতে কে একজন দাঁড়িয়েছিল । আমার ডাকে সে না দিল সাড়া, না গেল চলে । তাই ভাবলাম লোকটা হয়তো বদমাশগোছের কেউ । তাকে সিঁড়ির নীচে ঠেলে ফেলে দিয়েছি। গিয়ে দেখুন লোকটি আপনার স্বামী কি না । পুরুতমশাই হলে সত্যিই আমি খুব দুঃখিত।”

পুরুতমশাইয়ের বউ ছুটে গিয়ে দেখে এক কোণে পড়ে তার স্বামী গোঁ-গোঁ করছে । কারণ পড়ার ফলে তার একটা পা ভেঙে গিয়েছিল।
পুরুতমশাইকে ধরে ধরে বাড়ি এনে গলা ফাটিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে গিয়ে ছেলেটার বাবাকে পুরুতমশাইয়ের বউ বলল, “তোমার ছেলে আমার সর্বনাশ করেছে । এমন জোরে সিঁড়ি দিয়ে আমার স্বামীকে ঠেলে ফেলেছে যে, তার একটা পা গেছে ভেঙে ৷ হতচ্ছাড়াটাকে আমাদের বাড়ি থেকে নিয়ে যাও ।”
খবর শুনে আঁতকে উঠল ছেলের বাবা । পুরুতমশাইয়ের বাড়িতে দৌড়ে গিয়ে ছেলেকে দারুণ গালমন্দ করে বলল, “এ-সব শয়তানীর মানে কী ? নিশ্চয়ই তোকে দানোয় ভর করেছে ।”
তার ছেলে বলল, “বাবা । বিশ্বাস কর আমার কোনো দোষ নেই । আমার কথাটা শোনো । রাতে উনি দাঁড়িয়েছিলেন যেন কোনো কু-মতলব নিয়ে । আমি জানতাম না উনি কে । তিনবার তাকে বলি, “হয় আমার কথার জবাব দিতে, নয় চলে যেতে।”
তার বাবা বলল, “তুই আমাকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খাঁক করেছিস । তুই আমার দু চক্ষের বিষ ॥—দূর হ ।”
ছেলেটা বলল, “বেশ তাই যাব, বাবা শুধু ভোর হতে দাও । ভোরে বেরিয়ে পড়ব । শিখব কী করে কাঁপতে হয় । সেটা শিখলে হয়তো জানতে পারব কী করে রুজি-রোজগার হয় ।”

তার বাবা বলল, “যা-কিছু শেখো গিয়ে । সেটা নিয়ে মোটেই মাথা ঘামাচ্ছি না। এই নে পঞ্চাশ ডলার । বেরিয়ে পড় । কিন্তু খবরদার । কাউকে বলবি না কোথা থেকে এসেছিস । কাউকে বলবি না তোর বাপের নাম কী । তোর জন্যে লজ্জায় আমার মাথা কাটা গেছে ।”
ছেলেটা বলল, “যা বললে তাই হবে । এটা আর বেশি কথা কী ?” ভোর হলে সেই পঞ্চাশ ডলার পকেটে গুঁজে ছেলেটা পথে বেরিয়ে পড়ল । হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে সে কেবল আউড়ে যায়, “কাঁপতে যদি পারতাম। কাঁপতে যদি পারতাম ।’
হঠাৎ পথে দেখা গেল আর-একটা লোককে । ছেলেটার বিড় বিড়, করে কথাগুলো সে শুনেছিল । খানিক হাঁটার পর একটা ফাঁসিকাঠ চোখে পড়তে ছেলেটাকে সে বলল, “ওরে শোন । ঐ যে গাছটা দেখছিস, ওখানে এক সঙ্গে সাত-সাতটা ডাকাতকে লটকানো হয়েছে । গাছতলায় বসে থাক । রাত হলে শিখবি কী করে কাঁপতে হয় ।”
ছেলেটা বলল, “এটা আর শক্ত কী ? অনায়াসে পারব । অত চট্‌পট্‌ কাঁপতে শিখলে আমার এই পঞ্চাশ ডলারের পুরোটাই তোমায় দিয়ে দেব । কাল সকালে এসো ।”
সেই ফাঁসিকাঠটার কাছের গাছতলায় গিয়ে বসে পড়ল ছেলেটা । রাত হল । খুব ঠাণ্ডা । ছেলেটা আগুন জ্বালাল । কিন্তু মাঝরাতে এমন ঠাণ্ডা বাতাস বইতে শুরু করল যে, আগুন সত্ত্বেও শরীর আর গরম হয় না । বাতাসে সেই ডাকাতদের মড়াগুলো এদিক-সেদিক দুলতে-দুলতে খট্‌খট্‌ করতে লাগল । ছেলেটা ভাবল, ‘আগুন-তাতে আমি শীতে কাঁপলে, গাছের ওপর ও-বেচারাদের কতই-না জানি শীত করছে ।” তাই সে একটা মই দিয়ে উঠে সেই সাতটা ডাকাতের মড়া এক-এক করে নামিয়ে আনল, তার পর খুঁচিয়ে আগুনের আঁচ গন গনে করে তাতিয়ে তোলার জন্যে সেগুলোকে রাখল আগুনের চার পাশে । তাদের পোশাকে আগুন ধরতেও মড়াগুলো কিন্তু নড়ল না । তাই-না দেখে ছেলেটা বলল, “সাবধান ! নয়তো আবার তোমাদের গাছে লটকে দেব ।” কিন্তু ডাকাতদের মড়াগুলো তার কথা শুনতে পেল না । চুপচাপ রইল তারা । তাদের পোশাক জ্বলতে লাগল ।
তাই-না দেখে ছেলেটা দারুণ রেগে উঠল । বলল, “তোমরা সাবধান না হলে আমি আর কী করব ? তোমাদের সঙ্গে আমি তো আর পুড়ে মরতে পারি না।” আবার তাদের সারি সারি গাছে লটকে দিয়ে গাছতলার আগুন-তাতে বসে সে ঘুমিয়ে পড়ল ।
পরদিন সকালে সেই লোকটা তার কাছে এসে পঞ্চাশ ডলার চেয়ে বলল, “আশাকরি এখন বুঝেছ—কী করে কাঁপতে হয়।”
ছেলেটা বলল, “না-না, কী করে বুঝব ? বেচারারা তো একবারও মুখ খোলে নি । ভারি তারা বোকা–নিজেদের পোশাক পুড়লেও কোনো কথা বলে না " .
লোকটা বুঝল সেদিন তার কপালে পঞ্চাশ ডলার পাবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না । যাবার সময় তাই সে বলে গেল, “জম্মেও এরকম মশকরা দেখি নি ।”
ছেলেটা আবার যাত্রা শুরু করল । আর যেতে যেতে আপন-মনে জাগল বিড় বিড়, করতে, “কাঁপতে যদি পারতাম । কাঁপতে যদি পারতাম ।”
তার পিছন-পিছন আসছিল এক গোরুর গাড়ির গাড়োয়ান । ছেলেটার কথা শুনে সে প্রশ্ন করলে, “কে তুমি ?”
ছেলেটা বলল, “জানি না ।”
গাড়োয়ান আবার প্রশ্ন করল, 
“কোথা থেকে আসছ ?” 
জানি না!” 
“তোমার বাবার নাম কী ?”
“সেটা তোমায় বলতে পারব না ।” “বিড় বিড় করে কী-সব বকছিলে ?” 
ছেলেটা বলল, “আমি শুধু জানতে চাই কী করে কাঁপতে হয় । কিন্তু কেউ আমায় সেটা শেখায় না ।” -
গাড়োয়ান বলল, “বাজে বকবক থামাও ! আমার সঙ্গে এসো । তোমার থাকার ভালো একটা ব্যবস্থা করে দেব ।”
তার সঙ্গে গেল ছেলেটা । সন্ধেয় তারা একটা সরাইখানায় পৌছল। স্থির করল, সেখানেই রাত কাটাবে। .ঘরে এসে ছেলেটা আবার চেঁচিয়ে উঠল, “যদি কাঁপতে পারতাম । যদি শুধু কাঁপতে পারতাম”
সরাইখানার মালিক আড়িপেতে কথাগুলো শুনে বলল, “কাপুনি শিখতে চাও ? — বেশ কথা। এখানেই তার সব চেয়ে ভালো সুযোগ পাবে ।”
বউ তাকে মুখ-ঝামটা দিয়ে বলল, “থামো তো । অনেক গোঁয়ার লোক ওখানে মরেছে । এ-ছেলেটার চোখদুটো ভারি সুন্দর। ঐ চোখে দিনের আলো আর সে দেখতে না পেলে আমার দুঃখের অবধি থাকবে না ।”
ছেলেটা কিন্তু বলল, “কাজটা,কঠিন হলে আমি তো শিখবই । তাই তো বাড়ি ছেড়ে বেরিয়েছি।” সরাইখানার মালিককে প্রশ্ন করে করে জেরবার করে তুলল সে । শেষপর্যন্ত সরাইখানার মালিককে কবুল করে তাকে জানাতে হল সব ব্যাপারটা। ছেলেটা শুনল কাছেই রয়েছে একটা মায়াবী দুর্গ ৷ সহজেই সেখানে যে-কোনো লোক শিখতে পারে—কী করে কাঁপতে হয় । শুধু দরকার সেখানে তিনটে রাত কাটানো । রাজা বলেছেন সেখানে তিন রাত যে কাটাবে তার সঙ্গেই মেয়ের বিয়ে দেবেন । মেয়েটির মতো রাপসী আর হয় না । সেই দুর্গে আছে রাশি রাশি গুপ্ত ধনদৌলত। সেগুলো পাহারা দিচ্ছে যখের দল আর ডাকিনী-যোগিনীরা । অনেকেই সেই দুর্গে গিয়েছিল; কিন্তু প্রাণ নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে নি ।
পরদিন ছেলেটা রাজার কাছে গিয়ে বলল, “রাজামশাই । রাজা-- মশাই ! আপনি অনুমতি দিন। ঐ মায়াবী দুর্গে তিন রাত কাটাতে আমি প্রস্তুত ।”
তাকে দেখে রাজার ভালো লাগল । তিনি বললেন, “বেশ । দুর্গে তিনটে জিনিস নিয়ে যেতে পার তুমি। কিন্তু কোনো জীবন্ত জিনিস নয় ।”
ছেলেটা বলল, “মহারাজ ! আমাকে তা হলে এই তিনটে জিনিস দিন—প্রথমটা একটা আগুন । দ্বিতীয়টা ছুতোরের বেঞ্চি । তৃতীয়টা ছুরি লাগানো একটা লেদমেশিন ।”
ছেলেটার কথামতো জিনিসগুলো সেদিনেই রাজা পাঠালেন দুর্গে । রাত হতে ছেলেটা সেখানে গিয়ে একটা ঘরে আগুন জ্বালিয়ে ছুতোরের বেঞ্চি আর ছুরিটা পাশে রেখে লেদমেশিনের কাছে গিয়ে বসল। বলল, “যদি কাঁপতে পারতুম । কিন্তু মনে হচ্ছে—কী করে কাঁপতে হয়, এখানেও শিখব না ।”
মাঝ রাত নাগাদ আগুন জ্বালাবার জন্য বাতাস করতে গিয়ে এক কোণ থেকে হঠাৎ নানা স্বরে তার কানে এলঃ “মি-ও, মি-ও, ঠাণ্ডায় যে জমে গেলুম ” *
ছেলেটা বলল, “বোকার ঝাড় । কেন মিউ-মিউ করছিস ? শীত করে তো আগুন-তাতে বসে নিজেদের সেকে নে-না ?”
তার মুখ থেকে কথাগুলো খসবার সঙ্গে সঙ্গে প্রকাণ্ড দুটো কালেট বেড়াল হুড় মুড়িয়ে লাফাতে-লাফাতে এসে দু পাশে বসে লাল টকটকে চোখ মেলে তার দিকে ভয়ংকর দৃস্টিতে তাকাল। খানিক আগুন পুইয়ে তাকে তারা বলল, “দোস্ত । আমাদের সঙ্গে এক হাত তাস খেলবে ?
সে বলল, “নিশ্চয়ই । কিন্তু আগে তোমাদের থাবাগুজো দেখাও।” বেড়াল দুটো তার দিকে থাবা বাড়িয়ে দিল । সে বলল, “ও মা । কী কাণ্ড ৷ কী বড়ো-বড়ো নথ । একটু সবুর কর । এক্ষুনি কেটে দিচ্ছি ।”
বলে ঘাড় খামচে ধরে তুলে ছুতোরের বেঞ্চিতে বসিয়ে সেখানে তাদের থাবাগুলো স্ক্রুপ দিয়ে এঁটে সে বলল, “এই আঙুলগুলো দেখার পর তোমাদের সঙ্গে তাস খেলার আর ইচ্ছে নেই ।”
তাই-না বলে তাদের মেরে ফেলে জলে তাদের সে ছুড়ে ফেলল । কিন্তু তার পর আগুনের পাশে সে বসতে না বসতেই সেখানকার সব গর্ত আর কোণ-টোন থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল লাল কালো বেড়াল আর কালো কুকুরের দল । প্রত্যেকেই টেনে আনছিল গন গনে লালচে শেকল ৷ গুণে তাদের শেষ করা যায় না ।
সবাই তারা ভয়ংকর স্বরে চীৎকার করতে লাগল । তার পর চেস্টা করতে লাগল সে-যে আগুনের পাশে বসেছিল সেটা তছনছ করে নিভিয়ে ফেলতে । খানিক চুপচাপ সে সইল । শেষটায় অসহ্য হয়ে উঠলে লেদ মেশিনের সেই ছুরিটা বার করে কচকচ করে তাদের কাটতে কাটতে সে চেঁচিয়ে উঠল, “দুর হ হতচ্ছাড়ার দল ।” সেগুলোর কতক পালাল, বেশির ভাগই মরল । যেগুলো মরল সেগুলোকে সে ছুড়ে ফেলল বাইরের পুকুরে ।
ফিরে এসে নিজের শরীরকে গরম করার জন্য আগুনের অাঁচ ফুঁ দিয়ে সে গনগনে করে তুলল। তার পর সেখানে বসে থাকতে থাকতে ঘুমে জড়িয়ে এল তার দু চোখ । চারি দিকে তাকিয়ে সে দেথল এক কোণে মত্ত বড়ো একটা খাটে বিছানা পাতা। “আঃ, কী আরাম।” বলে সেই বিছানায় শুয়ে সে চোখ বন্ধ করতে না করতেই দুর্গময় চলতে শুরু করল খাটসুদ্ধ বিছানাটা ।
চেঁচিয়ে বলল সে, “ঠিক আছে । যত পার জোরে দৌড়োও।” সঙ্গে সঙ্গে সেই খাটটাও পাগলের মতো ছুটে চলল নানা ঘরের চৌকাঠ আর সিঁড়ি দিয়ে । যেন আধ-ডজন ঘোড়া সেটাকে টেনে নিয়ে চলেছে । হঠাৎ দুম-দুম, করে একটা শব্দ হল আর বিরাট একটা পাহাড়ের মতো খাটসুদ্ধ বিছানাটা পড়ল তার উপর উপুড় হয়ে । লেপতোষক-বালিশ ছুড়ে সরিয়ে সে বলল, “যার খুশি সে এবার এটায় চড়ে বসুক।” এই-না বলে নিজের আগুনের পাশে গিয়ে শুয়ে সে ঘুমিয়ে পড়ল।

পরদিন সকালে রাজা এসে তাকে মাটির উপর পড়ে থাকতে দেখে ভাবলেন ভূতেরা তাকে মেরে ফেলেছে । বললেন, “আহা বেচারা : ছেলেটার চেহারা ভারি সুন্দর ছিল ।”
রাজার কথাগুলো শুনেই তড়াক করে লাফিয়ে উঠে ছেলেটা বলল, “রাজামশাই ! এখনো আমি মরি নি ।” রাজা অবাক হলেন, খুশিও হলেন । তার পর জিজ্ঞেস করলেন কেমন সে আছে ।
ছেলেটা বলল, “খুব ভালো আছি, রাজামশাই ! একটা রাত কেটেছে । অন্য দুটো রাতও কাটবে ।”
সরাইখানায় ছেলেটা ফিরতে অবাক হয়ে চোখ গোল-গোল করে - তার দিকে তাকিয়ে সরাইখানার মালিক বলল, “ভাবি নি তোমাকে বেঁচে ফিরতে দেখব । কী করে কাঁপতে হয় শিখেছ কি ?”
ছেলেটা বলল, “না— একেবারে পণ্ডশ্রম । কাঁপুনি ব্যাপারটা কী— কেউ যদি আমায় বলতে পারত ।”
দ্বিতীয় রাতে সেই পুরনো ঠাণ্ডা কেল্লায় গিয়ে আগুনের পাশে বসে, আবার সে বিড় বিড় করতে শুরু করল, “যদি কাঁপতে পারতাম । যদি কাঁপতে পারতাম ! যখন মাঝ রাত তখন প্রথমে দুরে শোনা গেল দারুণ হৈচৈ । শব্দটা ক্রমশ বাড়তে-বাড়তে মুহুর্তের জন্য থামল, আর তার পর চিমনির ভিতর দিয়ে আধখানা মানুষ পড়ল তার কাছে গড়িয়ে । ছেলেটা চেঁচিয়ে উঠল, “আরে । কী কাণ্ড । আর আধখানা গেলে কোথায় ?”
তার পর আবার শুরু হল দারুণ হৈ-হল্লা আর বাকি অর্ধেক শরীরটাও পড়ল গড়িয়ে । --
ছেলেটা বলল, “একটু সবুর কর । আগুনটা খানিক উস্কে দি ।” আগুন উসকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতে ছেলেটা দেখে সেই আধখানা শরীর দুটো জোড়া লেগেছে আর তার বসার জায়গায় গিয়ে বসেছে ভয়ংকর বীভৎস চেহারার একটা লোক ।
ছেলেটা বলল, “আরে । বেঞ্চিটা যে আমার ” লোকটা তাকে ঠেলে সরাতে গেল। কিন্তু ছেলেটা তাকে জোর কারে ঠেলে সরিয়ে বেঞ্চিতে নিজের জায়গায় গিয়ে বসল। তারপর আরো নানা লোক এল গড়িয়ে গড়িয়ে । তাদের সঙ্গে বড়ো-বড়ো নটা হাড় আর দুটো মানুষের মাথার খুলি । ভাটা খেলার জন্য হাড়গুলো তারা সাজাল । ছেলেটারও ইচ্ছে হল খেলতে । তাই সে বলল, “আমি খেলতে পারি ?”
তারা বলল, “টাকা থাকলে খেলতে পার ।” ছেলেটা বলল, “টাকাকড়ি যথেস্টই আছে । কিন্তু এই খুলিগুলো মোটেই গোল নয়।” নিজের লেদমেশিনে খুলিগুলো চড়িয়ে সেগুলো গোল করে সে বলল, “এগুলো এখন অনেক ভালো গড়াবে ৷ এসো, খেলা শুরু করা যাক ৷” 
তাদের সঙ্গে খেলা শুরু করে কিছু পয়সাকড়ি সে হারল । কিন্তু যেই-না তং তং করে বারোটা বাজা অমনি হঠাৎ সব-কিছু অদৃশ্য হয়ে গেল। ছেলেটা তখন চুপচাপ শুয়ে পড়ল ঘুমিয়ে ।
তৃতীয় রাতে আবার নিজের বেঞ্চিতে বসে দারুণ বিরক্ত হয়ে সে বলে উঠল, “যদি শুধু কাঁপতে পারতাম।”
হঠাৎ সেখানে হাজির হল একটা লোক । সেরকম লম্বা মানুষ আগে কখনো সে দেখে নি । চেহারাটাও তার ভয়ংকর। লোকটা বুড়ো । লম্বা তার সাদা দাড়ি ।
বুড়োটা চেঁচিয়ে বলল, “হতচ্ছাড়া । শিগগিরই কাঁপতে শিখবি । কারণ মরতে তোর আর দেরি নেই।”
ছেলেটা উত্তর দিল, “অত তড় বড়, কোরো না । মরতে হলে প্রথমে আমার অনুমতির দরকার ।”
ভূতটা গর্জে উঠল, “এক্ষুনি তোকে নিকেশ করে ফেলছি।” ছেলেটা বলল, “গলা ফাটিয়ে বড়াই কোরো না । আমার তো মনে হয় তোমার চেয়ে আমার গায়ের জোর অনেক বেশি ।”
বুড়োটা চেঁচিয়ে উঠল, “সেটা দেখা যাবে। আমার চেয়ে তোর গায়ের জোর বেশি হলে তোকে ছেড়ে দেব । আয়, লড়ে যাওয়া যাক ৷”
নানা অন্ধকার বারান্দা দিয়ে একটা জায়গায় তাকে সে নিয়ে এল । সেখানে ছিল একটা কামারশালা। একটা কুড়ুল তুলে এক কোপে বুড়োটা কামারের দুটো নেহাইয়ের একটাকে মাটিতে গেঁথে ফেলল ।
“ওটার চেয়েও বেশি আমি করতে পারি" বলে ছেলেটা গেল অন্য নেহাইয়ের কাছে । বুড়োটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাকে লক্ষ্য করতে লাগল। 
জুলে পড়ল তার লম্বা সাদা দাড়ি । ছেলেটা সেই কুড়ল তুলে অন্য নেহাইটাকে শুধু দু টুকরোই করে ফেলল না, সেইসঙ্গে নেহাইয়ের মাঝখানে শক্ত করে গেঁথে দিল বুড়োর দাঁড়ি ।

সে চেঁচিয়ে উঠল, “এইবার তোমায় পাকড়েছি । এবার মরবার পালা তোমার ”
তার পর লোহার একটা ভাণ্ডা তুলে সে পেটাতে শুরু করল বুড়োটাকে । বুড়ো কাতরাতে-কাতরাতে ছেড়ে দেবার জন্যে তাকে কাকুতি-মিনতি করতে লাগল । বলল, মার থামালে তাকে দেবে অনেক ধনদৌলত । ছেলেটা তাই কুড়লটা টেনে তুলে বুড়োর দাড়ি খুলে দিল।
বুড়ো তখন তাকে আবার দুর্গের মধ্যে নিয়ে এসে দেখিয়ে দিল মোহর ভর্তি বিরাট তিনটে সিন্দুক । বলল, “এর একটা গরিবদের, একটা রাজার আর তৃতীয়টা তোমার ।”
তার কথা শেষ হতে-না-হতেই ঘড়িতে তং ঢং করে বারোটা বাজল আর সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হল বুড়ো ভূত । অন্ধকারে একলা ছেলেটা দাঁড়িয়ে রইল ।
সে বলল, “এখান থেকে বেরুনো শক্ত হবে না।” হাতড়ে-হাতড়ে নিজের ঘরে ফিরে তার আগুনের কাছে সে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল ।
পরদিন সকালে আবার রাজা এসে বললেন, “মনে হচ্ছে কাঁপতে তুমি শিখেছ ।”
ছেলেটা উত্তর দিল, “মোটেই না, রাজামশাই । কাঁপুনি জিনিসটা কি ? 
এক দাড়িওলা বুড়ো এসে অনেক মোহর দেখিয়েছিল, কিন্তু কি করে যে কাঁপতে হয় সে কথা বলে নি ।” 
রাজা বললেন, “দুর্গটাকে তুমি জাদুমুক্ত করেছ । তাই আমার মেয়েকে তুমি বিয়ে করবে ।”
ছেলেটা বলল, “সে তো খুব ভালো কথা । কিন্তু এখনো যে শিখলাম না কাঁপুনিটা কী জিনিস ”
তার পর সেই-সব মোহর আনা হল আর খুব ধুমধাম করে হয়ে গেল বিয়ে । সেই তরুণ রাজা খুব সুখী, বউকেও খুব ভালোবাসে । কিন্তু থেকে থেকেই বলে ওঠে, “যদি কাঁপতে পারতাম.। যদি কাঁপতে পারতাম।” কথাগুলো শুনতে শুনতে শেষটায় তার বউয়ের ভারিরাগ ধরে গেল। তাই দেখে তার দাসী বলল, “আমি এর বিহিত করছি । কী করে কাঁপতে হয় শিখিয়ে দেব ।”
বাগানের মধ্যে দিয়ে বয়ে যেত ছোটো একটা নদী । সেখান থেকে এক বালতি ছোটো-ছোটো মাছ সে নিয়ে এল । রাজকন্যেকে সে বলল রাতে তার বর ঘুমিয়ে পড়লে বিছানা-ঢাকা তুলে মাছ ভর্তি বালতির জল তার গায়ে ঢেলে দিতে, মাছগুলো যাতে তিড়িংবিড়িং করে তার গা-ময় লাফাতে থাকে ।
রাজকন্যে তাই করল আর জেগে উঠে তরুণ রাজা চীৎকার করতে লাগল, “আমি কঁপিছি—উঃ—উঃ—কেন আমি কাঁপছি ? বউ, এখন জানলাম কাঁপনি কাকে বলে ।”
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য