মধুসূদন মামার গল্প -- শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জ্জী

একবার এক সময়ের কথা – একটা গ্রামে একটা বিধবা মহিলা বাস করতো, তার আর কেও ছিল না, ছিল একটা ছেলে তার বয়স আট বছর। মহিলাটির নাম ছিল কমলা আর তার ছেলের নাম ছিল বাদল। সেই মহিলা ছিলেন অত্যন্ত গরিব, ভিক্ষা করের তাদের দিন চলতো। তবুও তার ইচ্ছা ছিল তার ছেলেকে লেখাপড়া শেখাবে। তাদের গ্রামে কোন পাঠশালা ছিলো না, তাই তাকে পাশের গ্রামের পাঠশালায় ভর্তি করে দিয়েছিল।
পাঠশালায় যাবার পথে পড়তো একটা জঙ্গল, খুব বেশি গভীর ছিলনা বটে তবে জঙ্গল বলা যায়। প্রথম প্রথম দুই তিন দিন কমলা বাদলকে তার পাঠশালায় পৌছে দিয়ে আসতো কিন্তু এভাবে বেশিদিন চলা সম্ভব নয় তা সে যানতো, তাকে নিজেকেও ভিক্ষায় বার হতে হবে তা নাহলে খাবে কি?
তাই কিছুদিন পর থেকে বাদলকে একা একাই পাঠশালায় যেতে হতো, বাদল খুবই সাহসী ছেলে ছিল তবু ছিল তো বাচ্চা ছেলেই মাঝে মাঝেই ফিরে এসে তার মাকে বলতো সে আর পড়তে যাবে না জঙ্গল পার হতে তার খুবই ভয় লাগে।
তখন তার মা তাকে বলে তোর যখন ভয় লাগবে তুই তোর মধুসূদন মামাকে ডাকবি।
বাদল বলে- মধুসূদন মামা কে মা? তাকে কখনো দেখিনি, আর জঙ্গলে তাকে ডেকে পাবো কোথায় সেখানে কি উনি থাকেন।
মা- সে একজন তোর মামা আছে যখনে কেউ তাকে মন দিয়ে তাকে ডাকে তখন তিনি তার ডাকে সাড়া দেন।
বাদল- আমি ডাকলে সাড়া দেবে।
মা- দেবে তো, মন দিয়ে ডাকলেই দেবে।
পরের দিন স্কুলে যাবার পথে বাদলের যখন ভয় পায়, তখন সে একমনে তার মধু সুদন মামাকে ডাকতে থাকে, সে দেখতে পায় একজন রাখাল হাতে বাঁশি নিয়ে কয়েকটা গরুকে চরাতে বার হয়েছে। সে বাদলের কাছে এসে বলল কি হয়েছে।
আমার এই জঙ্গল একা একা পার হতে খুব ভয় করে।
ও এই ব্যাপার, আমি তো এখানে গরু চরাই আমি তোমাকে এই জঙ্গল প্রতিদিন পার করে দেব।
তোমাকে কে আগে কখনো এই পথে দেখতে পাই নি, তোমার নাম কি?
আমি মধুসূদন, তুমি তো আগে আমাকে ডাকোনি, তাই আমি দেখা দিই নি।
তুমি যদি আমাকে ডাকো তাহলে আমি তোমাকে দেখা দেব, তবে একটা কথা, যখন তোমার সত্যি সত্যি দরকার হবে তখনই আমি দেখাদেব, তা নাহলে যদি আমাকে অন্য কারোকে দেখাতে চাও তাহলে আমি আর দেখা দেব না।
এভাবে প্রতিদিন বাদলের মধুসূদন মামা তাকে এই পথ পার করে দিত। তাকে মাঝে মধ্যে ননি, মাখন এইসব খেতে দিত। তার ভালোই দিন কাটতে থাকল।
একদিন বাদলের স্কুলে মাস্টার মসাইয়ের মা মারা গেলেন। তখন কার দিনে মাস্টারদের খুব বেশি রোজগার ছিল না। তাই মাস্টার মশাইরা ছাত্রদের কাছথেকে সাহায্যের জন্য জিনিস পত্র চাইতো। সেরকম তার মাস্টার মশাই সবাইকে বলেন কালকে বাড়ি থেকে যেনে আসতে আমার মায়ের শ্রাদ্ধে কে কি দিতে পারবে। কেউ বলল আলু দেবে, কেউ বলল চাল-ডাল দেব, কেউ বলল শাক সবজি দেবে ইত্যাদি ইত্যাদি। বাদলের মা ভিক্ষা করে সংসার চালাত , তাই সে কিছুই দিতে পারবে না, মন খারাপ করে জঙ্গলের পথ পার হচ্ছিল। তার মামা তাকে পথ পার করে দিতে দিতে বলল তোমার আজ মন খারাপ কেন ?
সে সব কথা খুলে বলল, তখন তার মামা বলল কাল তুমি স্কুলে গিয়ে বলবে তোমার মাস্টারমশায়ের মায়ের শ্রাদ্ধে যত দৈ লাগবে সব তুমি দেবে।
আমি কোথায় অত দৈ পাব, আমাদের তো অবস্থা ভালো নয়, কোন রকমে আমাদের দুবেলা খাবার জোটে, আমি কি করে দেব।
তোমাকে কোন চিন্তা করতে আমিই সব দৈ দেব।
মামার কথামতো বাদল- তার স্কুলে গিয়ে সব দৈ দেবে বলে জানায়।
শ্রাধের দিন বাদল তার মার কাছে দই চাইতেই মধুসূদন মামা তার হাতে একটা ছোট্ট ভাঁড় ধরিয়ে বলে এই নিয়ে যা।
অত লোকের এই ভাঁড়ের দইয়ে কি হবে?
এতেই হবে তুমি এই ভাড়টা উল্টিয়ে অন্য পাত্রে দিয়ে আবার ভাড়টা আমার কাছে ফেরত আনবে।
মামার কথামতো সব কথা গিয়ে মাস্টার মশাইকে বলতেই তিনি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। এই একটু খানি দৈ, আগে কেন বলিশ নি তুই দিতে পারবি না, আমি তাহলে বিকল্প ব্যবস্থা করতাম। আবার এই ছোট্ট ভাঁড়টা ফেরত চাই, যা যা ওই হাঁড়িটাতে ঢেলে দে, আর আমার চোখের সামনে থেকে দূর হ।
বাদল একটা হাঁড়িতে ঢালতে চলে গেল। তার চোখ থেকে টপ টপ করে জল পড়ছে, মধুসূদন মামা আমার সাথে কেন যে এমন করলো, কেনো আমাকে মাস্টারমশায়ের কাছে ছোট করে দিল। সে গরিব কিন্তু মিত্থুক নয়, আজ মাস্টারের চোখে সেটাও হয়ে গেল। মনে কষ্ট মনের মধ্যেই লুকিয়েই সে হাঁড়িতে দই ঢালতে থাকলো, কিন্তু একি দৈ যতই ঢালা হয় ততই তার থেকে বার হতে থাকে, ভাঁড়ের দৈ ফুরোতেই চায় না, প্রথমে যেমন ছি এখনো সে রকমি আছে , হাঁড়ি ভর্তি হয়ে গেল ভাঁড় আর খালি হয় না। এই ঘটান দেখে সবাই তাকে জানতে চাইলো এই ভাঁড় সে কোথা থেকে পেয়েছে। তখন সে সব কথা খুলে বলল। মাস্টারমহাশয় বললে উনি আর কেউ ছিলেন না উনি ভগবান মধুসূদন, সকলের সাথি, সকলের সহায়, যার কেউ নেই তার আছে ঈশ্বর মধুসূদন।
সবাই বলল চল, চল তুই কোথায় তাকে দেখতে পেয়েছিস আমাদের সেখানে নিয়ে চল। সেখানে কারোকে দেখতে পাওয়া গেল না, কিন্তু সেখানে পৌঁছেই বাদলের হাতের ভাঁড়টি অদৃশ্য হয়ে গেল। এরপর বাদল আর কখনো তার মধুসূদন মামাকে দেখতে পায়নি, তবে সেই জঙ্গলের পথ পার হতে তার আর এখন ভয় করে না, সেখানে একটা মন্দির তৈরি করেছে প্রভুর ভক্তেরা, সেখানে লোকজনের ভিড় লেগেই থাকে, তাই বাদল নিরাপদের সেই পথ পার হয় এখন।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য