বেতালপঞ্চবিংশতি: চতুর্দশ গল্প

কুসুমবতী নগরে সুবিচার নামে এক রাজা ছিলেন। তাঁর কন্যা চন্দ্রপ্রভা রাজধানীর কাছেই উপবনে সখীদের নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। তাঁরা উপবনে যাওয়ার আগেই মনস্বী নামে একজন রূপবান ব্রাহ্মণকুমার ঐ পথ দিয়ে যেতে যেতে পরিশ্রান্ত হয়ে গাছের স্নিগ্ধ ছায়ায় ঘুমিয়ে পড়েছিলেন ।
রাজকুমারী ও তাঁর সখীদের পায়ের শব্দে ও কথায় ব্রাহ্মণকুমারের ঘুম ভেঙ্গে যায়। চন্দ্রপ্রভাকে দেখে মুগ্ধ হলেন যুবক। এমন সুন্দরী মেয়ে তিনি আগে কখনও দেখেন নি।
রাজকুমারীও এমন রূপবান যুবক কখনও দেখেন নি। মনস্বীকে তাঁর খুব ভাল লাগল। সখীরা রাজকুমারীর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি সেখান থেকে তাঁকে নিয়ে রাজধানীতে চলে গেল।
ব্ৰাহ্মণকুমার নিদারুণ হতাশায় সেইখানেই মুচ্ছিত হয়ে পড়লেন ।
সেই সময় শশী ও ভূদেব নামে দু'জন পথিক সেখানে পৌঁছলেন। তাঁরাও পথশ্রমে ক্রান্ত । কামরূপ থেকে বিদ্যাশিক্ষা করে তাঁরা দেশে ফিরছিলেন। মনস্বীকে ঐ অবস্থায় দেখে তাঁরা চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে তাঁর জ্ঞান ফেরাল।
তারপর কারণ জিজ্ঞাসা করতে মনস্বী তাদের সব কথা খুলে বললেন। আরও বললেন, তাঁকে না পেলে আমি বাঁচব না ;
ভূদেব বললেন, তুমি কিছুমাত্র চিন্তা করো না, এখন আমার সঙ্গে চল । তুমি যাতে তাকে পাও তার সব ব্যবস্থা আমি করছি।

নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ভূদেব তাঁকে এক অক্ষরের মন্ত্র শিখিয়ে দিয়ে বললেন, এই মন্ত্রের এমন গুণ, এই মন্ত্র উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তুমি এক ষোল বছরের যুবতীতে পরিণত হবে, আবার ইচ্ছা করলেই নিজের চেহারা ফিরে পাবে।
তখন মনস্বী মন্ত্রপ্রয়োগে ষোল বছরের এক সুন্দরী কন্যা হয়ে গেলেন। ভূদেব হলেন আশী বছরের এক বৃদ্ধ ব্ৰাহ্মণ। মনস্বীকে বধূর বেশে সাজিয়ে রাজা সুবিচারের কাছে উপস্থিত হলেন।

রাজা বৃদ্ধ ব্রাহ্মণকে দেখে সিংহাসন থেকে উঠে এসে তাঁকে প্ৰণাম করে সম্মানের সঙ্গে বসতে বললেন। ব্রাহ্মণ রাজাকে আশীর্বাদ করে আসন গ্রহণ করলেন।
বৃদ্ধ ব্রাহ্মণবেশী ভূদেব বললেন, মহারাজ, আমার সঙ্গে যাকে দেখছেন এ আমার পুত্রবধূ একে তার বাপের বাড়ি থেকে আনতে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে দেখি গ্রামে ওলাওঠা দেখা দেওয়ায় আমার ব্ৰাহ্মণী ও ছেলে গ্রাম ছেড়ে কোথায় চলে গেছে। তাদের খুঁজতে দেশে দেশে ঘুরতে চাই। তাই আমার বিনীত অনুরোধ, আমার এই পুত্রবধূকে আপনি আশ্রয় দিয়ে আপনার কন্যার সাথে অন্তঃপুরে রাখুন। ফিরে এসে আমার বৌমাকে নিয়ে যাব।
রাজা এই প্রস্তাব শুনে মনে মনে ভাবলেন, পরের মেয়ে ঘরে রাখা সহজ কাজ নয়। কিন্তু অস্বীকার করলে ব্ৰাহ্মণ মনে কষ্ট পাবেন। তাই ঠিক করলেন কন্যা চন্দ্রপ্রভার সখী হিসেবে তাকে অন্তঃপুরে রাখা যেতে পারে।
তারপর বললেন, আপনার প্রস্তাবে আমি রাজি হলাম। রাজা হিসাবে এটা পালন করা অবশ্যকর্তব্য।
রাজকন্যা একজন সমবয়স্ক সঙ্গী পেয়ে খুশি হলেন । অল্প সময়ের মধ্যে দু’জনের খুব ভাব হলো ।
একদিন রাজকন্যার মনের ভাব বুঝবার জন্য বউটি কথাপ্রসঙ্গে বললো, ভাই, তুমি সব সময় কি চিন্তা কর বলতো, চিন্তায় চিন্তায় তুমি ক্রমেই রোগা হয়ে যাচ্ছ ।
তখন রাজকন্যা প্রাণের কথা খুলে বললেন, কিছুদিন আগে উপবনে বেড়াতে গিয়ে এক সুন্দর যুবকের সাথে আমার দেখা হয়। কিন্তু তার নাম ঠিকানা কিছুই জানি না। তাকে বিয়ে না করতে পারলে আমার কোন সুখ নেই।
মনস্বী রাজকন্যার কথা শুনে খুব খুশি হলেন। তিনি বললেন, আমি সেই ব্রাহ্মণকুমারের সঙ্গে তোমার দেখা করিয়ে দিতে পারি।

তারপর মন্ত্রবলে আপন শরীরে আবির্ভূত হলে রাজকন্যা বিস্মিত হযে সমস্ত বিষয় জানতে চাইলেন। ব্রাহ্মণযুবক মনস্বী তখন তাঁকে সমস্ত খুলে বললে গন্ধৰ্ব্ব মতে তাঁদের বিয়ে হলো ।
একদিন রাজা সুবিচার মন্ত্রীর বাড়ি সপরিবারে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গেলেন। রাজকন্যা,
ব্রাহ্মণপুত্রবধুরূপী মনস্বীকেও সঙ্গে নিয়ে গেলেন।
মন্ত্রীপুত্র ব্রাহ্মণবধূর রূপলাবণ্যে এমনই মোহিত হলেন যে তিনি তার বন্ধুকে বললেন, যদি ঐ মেয়েকে বিয়ে করতে না পারি তবে আত্মহত্যা করব। বন্ধু অন্য উপায় না দেখে মন্ত্রীকে সমস্ত বিষয় জানালেন। মন্ত্রীও ছেলের কথা চিন্তা করে রাজাকে তাঁর পুত্রের অবস্থা বললেন।
রাজা শুনে খুবই রেগে বললেন, এ আপনি কি কথা বলছেন? এক ব্রাহ্মণ তাঁর পুত্রবধূকে বিশ্বাস করে আমার কাছে রেখে গিয়েছেন, তার অনুমতি না নিয়ে -- এমন অন্যায় কাজ করা কিভাবে সম্ভব? আপনার এ অন্যায় অনুরোধ প্রাণ গেলেও আমি রাখতে পারব না।
মন্ত্রী নিরাশ হয়ে ফিরে এলেন এবং পুত্রের অবস্থা দেখে তিনিও আহার নিদ্রা ত্যাগ করলেন। মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে রাজকার্য ঠিকমত চলছে না দেখে অন্যান্য রাজপুরুষের রাজকে বললেন, মহারাজ, মন্ত্রীপুত্রের যা অবস্থা তাতে তিনি প্রাণে বাঁচবেন বলে মনে হয় না। যদি পুত্রের মৃত্যু হয় তবে মন্ত্রীও বাঁচবেন না। আপনার মন্ত্রীর মত জ্ঞানী ও বিচক্ষণ
দ্বিতীয় কেউ নেই, এই মন্ত্রী না থাকলে রাজ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। আমাদের অনুরোধ, ব্রাহ্মণপুত্রবধূকে মন্ত্রীর ছেলের সাথে বিয়ে দিন। ব্ৰাহ্মণ হয়তো আর না ফিরতেও পারেন। যদি ফিরে আসেন তখন যথেষ্ট অর্থের লোভ দেখালে তিনি আর আপত্তি করবেন না ! যদি অর্থে কাজ না হয় তবে ব্রাহ্মণপুত্রের অন্য কোন কন্যার সঙ্গে বিয়ে দিলেই ব্যাপারটা মিটে যাবে।
রাজা অনেক ভাবনা চিন্তা করে ব্রাহ্মণপুত্রবধূর কাছে গিয়ে সব বললেন।
ব্রাহ্মণপুত্রবধুরূপী মনস্বী বললেন, মহারাজ, আপনি একটু চিন্তা করে দেখুন, আমার স্বামী এখনও বেঁচে আছেন। প্রাণ গেলেও আপনার আদেশ পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব না !
মনমরা হয়ে রাজা অন্তঃপুর থেকে বেরিয়ে এলেন। মনস্বী ভাবলেন, অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে এখানে থাকা আর ঠিক হবে না। এই ভেবে মন্ত্রবলে পুরুষবেশে রাজপ্রাসাদ থেকে পালিয়ে সোজা উপস্থিত হলেন ভূদেবের বাড়ি । সমস্ত শুনে ভূদেব খুব খুশি হলেন। মনে মনে ভাবলেন ব্যাপারটা বেশ জমে উঠেছে।
বন্ধু শশীকে যুবক সাজিয়ে ভূদেব নিজে সেই বৃদ্ধ ব্ৰাহ্মণের বেশ ধরে রাজার কাছে উপস্থিত হলেন। রাজা আসন থেকে উঠে এসে ভক্তিসহকারে প্রণাম করে ব্রাহ্মণকে বসতে অনুরোধ করে বললেন, আপনার ফিরতে এত দেরী হলো কেন?

ভূদেব বললেন, অনেক কষ্টে পুত্রকে ফিরে পেয়েছি, এখন পুত্রবধূসহ নিজের বাড়ি ফিরে যাব। রাজা তখন কোন কথা না লুকিয়ে সব কথা সবিস্তারে ব্রাহ্মণকে বললেন ।
ব্ৰাহ্মণ শুনে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, এই কি রাজার কাজ হয়েছে? এইভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করা কি কোন মানুষের উচিত কাজ ?

রাজা অনেক অনুনয় বিনয় করে বললেন,আমাকে ক্ষমা করুন। আপনার যে ক্ষতি আমি করেছি তা যে কোন মূল্যে পরিশোধ করতে আমি প্রস্তুত।
ভূদেব বললেন, বেশ, আপনার কন্যার সঙ্গে আমার পুত্রের যদি বিয়ে দেন তবেই আপনার প্রতিজ্ঞা পালন করা হবে ।
রাজা নিরুপায় হয়ে এই প্রস্তাবে রাজি হলেন এবং শুভদিনে বিয়ে হয়ে গেল।
ভূদেব রাজকন্যা নিয়ে বাড়িতে উপস্থিত হলে শশী এবং মনস্বী দু’জনেই রাজকন্যাকে নিজ স্ত্রীরূপে দাবী করলেন এবং নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করতে লাগলেন ।
গল্প এখানেই শেষ করে বেতাল বললো, এখন বল মহারাজ, শাস্ত্র ও যুক্তি অনুসারে কার স্ত্রী হওয়া উচিত এই রাজকন্যার?
বিক্রমাদিত্য বললেন, মনস্বীর স্ত্রী হবে এই রাজকন্যা ।
বেতাল বললো, কিন্তু রাজা সকলের সামনে ধর্ম সাক্ষী রেখে শশীকে কন্যা দান করেছেন । মনস্বী কি ভাবে দাবী করতে পারে ?
রাজা বললেন, তুমি যা বলছ তা আমি অস্বীকার করছি না ; কিন্তু মনস্বী এই কন্যাকে আগেই বিয়ে করেছে। সুতরাং তার অন্য কোথাও বিয়ে হতে পারে না |
বেতাল খুশি হয়ে রাজার কাঁধ থেকে নেমে সেই গাছে গিয়ে উঠলো আর রাজাও আবার তাকে কাঁধে নিয়ে চলতে আরম্ভ করলেন । বেতালও তার পঞ্চদশ গল্প বলতে আরম্ভ করল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য