বেতালপঞ্চবিংশতি: অষ্টম গল্প

     সেকালে মিথিলায় গুণাধীপ নামে এক রাজা ছিলেন। চিরঞ্জীব নামে এক রাজপুত যুবক রাজার কাছে চাকরির আশায় মিথিলায় এসে উপস্থিত হলো। কিন্তু দুঃখের বিষয় রাজা তখন অন্তঃপুরেই আমোদ-আহ্লাদে দিন কাটাচ্ছিলেন। রাজার সঙ্গে দেখা করার জন্য সেখানে চিরঞ্জীব রয়ে গেল কিন্তু রাজার দেখা পেল না।
     এদিকে তার সব টাকাকড়ি ফুরিয়ে এল। চিরঞ্জীব মনে মনে ভাবতে লাগল, রাজা কতদিনে বাইরে আসবেন তার ঠিক নেই। এরপর ভিক্ষা করে খেতে হবে। কিন্তু ভিক্ষা করে খাবার চেয়ে মৃত্যুও ভাল। রাজা ছাড়া অন্য কেই বা আমাকে চাকরি দেবে। কিন্তু রাজার উপর নির্ভর করে কতদিনই বা এখানে থাকা সম্ভব। তার চেয়ে বরে গিয়ে ভগবানের আরাধনা করা অনেক ভাল। এই ভেবে সে মিথিলা ত্যাগ করে বনে চলে গেল।
    এই ঘটনার কিছুদিন পর রাজা গুণাধিপের আমোদ-আহ্লাদের শখ মিটে যাওয়ায় অন্তঃপুর ত্যাগ করে আবার রাজকার্যে মন দিলেন।

     এরপর একদিন দলবল সঙ্গে নিয়ে রাজা শিকার করতে ঐ বরে গেলেন। নানা স্থান ঘুরে একটা হরিণের পিছু ধাওয়া করে বনের গভীরে প্রবেশ করলেন। সঙ্গীসাথীরা পেছনে পড়ে গেল।
     এদিকে সন্ধ্যা  হয়ে এসেছে। সারাদিন বনে বনে ঘুরে রাজা খিদেয় তেষ্টায় কাতর হয়ে পড়লেন। শরীর আর বইছে না। অথচ কাছে কোথাও জলাশয় নেই। কিছুটা চলার পর বনের মধ্যে এক কুটির দেখে তিনি খুব খুশি হলেন, তাঁর আশা হলো নিশ্চয় ওখানে গেলে মানুষের দেখা পাওয়া যাবে।
     কুটিরের সামনে গিয়ে দেখলেন একজন লোক ধ্যান করছে। রাজা হাত জোড় করে তার কাছে জল চাইলেন। লোকটি আর কেউ নয়, সেই রাজপুত বীর চিরঞ্জীব। চিরঞ্জাব রাজাকে সাদরে বসতে দিয়ে জল ও ফলমূল এনে দিল খিদে মেটাবার জন্য। রাজা যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেলেন।
     তিনি চিরঞ্জীবকে বললেন, আপনি আজ আমার প্রাণ বাঁচালেন । আমি আপনার কাছে চিরগুণী হয়ে রইলাম। আপনার ব্যবহার দেখে আপনাকে তপস্বী মনে হলেও আপনার চেহারা এবং স্বভাব দেখে অন্যরকম মনে হয় । দয়া করে বলুন, কে আপনি ? কেন এই গভীর বনে একা একা তপস্যায় দিন কাটাচ্ছেন?
     চিরঞ্জীব রাজার অনুরোধ ফেলতে না পেরে সব খুলে বললো। শুনে রাজা বড়ই লজ্জা পেলেন । কিন্তু তখনই নিজের পরিচয় প্রকাশ না করে সেই রাতটি সেখানে সেই কুটিরেই কাটালেন।
     চিরঞ্জীবকে সঙ্গে নিয়ে প্রাসাদে ফিরে এলেন। তিনি চিরঞ্জীবকে প্রিয়পাত্র হিসাবে নিজের কাছে রাখলেন। চিরঞ্জীব রাজার খুবই অনুগত ও বিশ্বাসী হয়ে উঠল।
     একবার রাজা বিশেষ দরকারে চিরঞ্জীবকে বিদেশে পাঠালেন। সে রাজার প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে ফেরবার পথে সমুদ্রের ধারে একটি অপূর্ব মন্দির দেখে সেই মন্দিরে প্রবেশ করলো। দেবীকে প্রণাম করে ফেরার মুখে একটি সুন্দরী মেয়েকে দেখে চিরঞ্জীব মুগ্ধ হয়ে গেল।
     মেয়েটি জিজ্ঞাসা করলো, হে বীর, তোমার এখানে আসার কারন কি?
     উত্তরে চিরঞ্জীব তাকে সমস্ত ঘটনা বলল।

     মেয়েটি বলল, তুমি এই সমুদ্রে ডুব দিয়ে ওঠার পর আমাকে যা করতে বলবে আমি তাই করব।
     চিরঞ্জাব মেয়েটির কথামত ডুব দিল । উঠেই দেখে --আশ্চর্য। কোথায় মন্দির আর কোথায় সেই সুন্দরী সে যে নিজের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
     যাই হোক, সে ভিজে কাপড় ছেড়ে রাজার সামনে উপস্থিত হয়ে সমস্ত ঘটনা বললো।
     এই অলৌকিক গল্প শুনে রাজার নিজের চোখে দেখার খুব ইচ্ছা হলো !
     যথাসময়ে দু’জনে সেখানে উপস্থিত হয়ে সেই মন্দিরে প্রবেশ করে দেবীকে ভক্তিসহকারে পূজা দিয়ে মন্দির থেকে বেরিয়ে এসে সেই একই দৃশ্য দেখলেন।
     রাজা গুণাধিপ সুপুরুষ ছিলেন। সেই মেয়েটি রাজাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে তাঁর কাছে এসে বললো, মহারাজ, আপনি আমাকে যা আদেশ করবেন আমি তাই করব।
     রাজা বললেন, তুমি যদি আমার কথা শোন তবে আমার প্রিয়পাত্র চিরঞ্জীবকে বিয়ে কর ।
     এই কথা শুনে মেয়েটি বললো, মহারাজ, আমি আপনার রূপ ও গুণে মুগ্ধ হয়েছি, অন্যকে বিয়ে করব কি করে ?
     রাজা বললেন, তুমি কথা দিয়েছ, আমার আদেশ মেনে চলবে । 
     তখন মেয়েটি রাজি হলো এবং রাজা তাদের গন্ধৰ্ব মতে বিয়ে দিয়ে রাজধানীতে নিয়ে এলেন । 
     গল্প শেষ করে বেতাল বললো, মহারাজ, রাজা  আর চিরঞ্জীব-এদের মধ্যে কে বেশী মহত্ব আর উদারতার পরিচয় দিয়েছে?
     বিক্রমাদিত্য বললেন, চিরঞ্জীবই বেশী মহত্বের পরিচয় দিয়েছে।
বেতাল বললো, কিভাবে বল? 
     বিক্রমাদিত্য বললেন, যদিও রাজা গুণাধিপ শেষের দিকে চিরঞ্জীবের উপকার করেছেন কিন্তু চিরঞ্জীৰ সেই শিকারের দিনে তাঁকে জল, আহার ও  আশ্রয় দিয়ে যে উপকার করেছিল তার তুলনা হয় না।
     ঠিক উত্তর পেয়ে বেতাল আবার চলে গেল গাছে ঝুলতে, রাজা বিক্রমাদিত্যও তাকে গাছ থেকে  নামিয়ে কাঁধে তুলে সন্ন্যাসীর আশ্রমের দিকে চললেন । বেতালও নবম গল্প আরম্ভ করল ।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য