Home Top Ad

Responsive Ads Here

Search This Blog

একদা মণিপুর রাজ্যের রাজা চন্দ্রকান্ত বীরবলের কথা শুনে বীরবলের জ্ঞান ও বুদ্ধির চাক্ষুষ দেখার লোভ সামলাতে পারলেন না। রাজা চন্দ্রকান্ত চাষির পো...

বীরবলের চাতুর্য

একদা মণিপুর রাজ্যের রাজা চন্দ্রকান্ত বীরবলের কথা শুনে বীরবলের জ্ঞান ও বুদ্ধির চাক্ষুষ দেখার লোভ সামলাতে পারলেন না।
রাজা চন্দ্রকান্ত চাষির পোশাক পরে নিরস্ত্র হয়ে তাজা ঘোড়ার পিঠে চড়ে দিল্লির তোরণের পথে রওনা হলেন। রাজধানী দিল্লির তোরণের কিছু দূরে একটু বিশ্রামের জন্য তিনি এক জায়গায় থামলেন। সেখানে দেখেন, এক খোঁড়া দরিদ্র ভিক্ষুক বসে আছে। ভিক্ষুকটি তাঁকে দেখতে পেয়েই প্যানপ্যান করে বলতে লাগল, “হে সদাশয় বিদেশি, আমি খোড়া, অনাহারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। প্রতি রাত্রে খাবারের সন্ধানে আমাকে শহরে ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করতে হয় এবং সন্ধ্যার আগেই যদি শহরে পৌছতে না পারি, রাতে আর খাবার পাব না। আলো জ্বললেই শহরের তোরণ বন্ধ হয়ে যাবে। ওঃ, আমার কী ভাগ্য! আজ ভোর থেকে এখনও পর্যন্ত আমার পেটে একটুও দানাপানি পড়েনি। আপনার ঘোড়ার পিঠে চড়িয়ে আমাকে যদি শহরে নিয়ে যান, তাহলে ভগবান আপনার মঙ্গল করবেন। আমি আপনাকে এই আশীর্বাদ করছি।’
ছদ্মবেশী রাজার দয়া হল। তিনি তাকে ঘোড়ার পিঠে তুলে নিয়ে শহরে পৌছলেন সন্ধ্যার আগেই।
শহরে ঢুকেই ছদ্মবেশী চন্দ্রকান্ত ঘোড়ার পিঠ থেকে তাকে নেমে যেতে বললেন, কারণ রাজপ্রাসাদে তার বিশেষ কাজ আছে। কাজ শেষ করে পরে যেখানে থাকার সেখানে থাকবেন।

ভিক্ষুক কিন্তু ঘোড়ার পিঠ থেকে নামতে রাজি হল না। রাজা তো আশ্চর্য হয়ে গেলেন। ভিক্ষুক কপটভাবে উলটােসুরে বলতে লাগল, ‘কী, আমার ঘোড়ার পিঠ থেকে আমি নেমে যাব এ কেমন কথা। এই মুহূর্তে তুমি নেমে যাও শয়তান।”—চিৎকার করতে লাগলেন। তার চিৎকার শুনে হুজুগে লোকেরা ছুটে এসে ভিড় করল। লোক জড়ো হয়ে হাজার রকম প্রশ্নবাণ ছুঁড়তে লাগল, ‘কী, কেন, কোথায়, আরও কত কী বলে। সব আবোল তাবোল প্রশ্ন।

অবশেষে দিল্লির প্রধানমন্ত্রী বীরবল ও কাজির কাছে ঘটনাটির কথা উঠল। ছদ্মবেশী রাজা ও ভিক্ষুককে তাদের সামনে হাজির করা হল। অন্য দুটি বিচারের ভার হাতে থাকায় কাজি ওই ব্যাপারটির ফয়সালা পরে করবেন বলে অপেক্ষা করতে বললেন এবং সব বিচারের ভার সেদিন বীরবলকে দিলেন।
প্রথম বিচারের বিষয়টি হল : একজন কসাই আর কলু দুজনেই টাকার একটি থলির মালিকানা দাবি করছে। অপর বিচারের বিষয় : এক বৃদ্ধা মহিলা ছোট কাজির বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ এনেছে বীরবলের কাছে।
প্রথম বিচারের কাজ শুরু হলে কলুকে নিজের কথা বলার সুযোগ দেওয়া হল। সে বলল, ‘ধর্মাবতার। তখন সন্ধ্যা, আমি আমার হিসেবের খাতায় দিনের বিক্রি জমা করছিলাম, এমন সময় ওই কসাই আমার কাছে কিছু তেল কিনতে এল। আমি তাকে তেল দিয়ে আবার লিখতে বসলাম। কিন্তু হঠাৎ লক্ষ করলাম যে টাকার থলিটি আমার পাশে এক মুহূর্ত আগে ছিল সেটি অদৃশ্য হয়ে গেছে। আমি দৌড়ে বাইরে গেলাম এবং ভাগ্যগুণে টাকার থলি সমেত লোকটিকে ধরে ফেললাম। অথচ লোকটির এত দুঃসাহস যে, সে এটি দাবি করছে। সে বলছে ওটা তার টাকার থলি, কিন্তু হুজুর আমি গঙ্গার জল পর্যন্ত ছুঁয়ে বলতে পারি, আমি সত্য কথা বলছি, এটি আমার নিজের টাকার থলি, ওর নয়।’

কসাইও ওই থলির মালিকানা দাবি করে। কলুকেই চোর প্রতিপন্ন করে নিজের বক্তব্য রাখল। -
কারও কোনও সাক্ষী ছিল না। সেজন্য কেউ প্রমাণ করতে পারল না।
বীরবল বিচারের রায় না দিয়ে পরের বিষয়টিতে বৃদ্ধা ভদ্রমহিলাকে তাঁর কথা বলতে বললেন।

‘ধর্মাবতার’, বৃদ্ধা বলল, ‘পৃথিবীতে আমার কেউই নেই। আমার স্বামীর তৈরি একটি ছোট ঘরে আমি বাস করি। কয়েক মাস আগে আমি কাশীতে তীর্থভ্রমণ করার সময় ছোট কাজি সাহেবের কাছে আমার কিছু গচ্ছিত টাকা রাখার
ব্যবস্থা করি। কিন্তু হায়, ফিরে এসে টাকা চাইতেই তিনি তো টাকা আমাকে দিলেনই না, উপরন্তু আমাকে গালাগালি করে তাড়িয়ে দিলেন।
বীরবল এক মুহূর্ত চিন্তা না করে বললেন, ‘তুমি কাল সকালে ছোট কাজির কাছে গিয়ে টাকা চাইবে, সে তোমাকে টাকা দিতে অস্বীকার করবে না। এখনকার মতো বাড়ি যাও। তোমার কোনও চিন্তা নেই। .
এবার ছদ্মবেশী রাজা ও খোড়া ভিক্ষুকটির বিষয় উঠল। ছদ্মবেশী রাজা চন্দ্রকান্ত ও ভিক্ষুক  যে যার কথা সব বীরবলকে বললেন। ভিক্ষুক অন্যান্য সব ঘোড়ার মধ্যে রাজার ঘোড়াটিও লোকটাই নানা কথা তুলে বেশি দোষী করছে রয়েছে। ভিক্ষুকটি এত ধূর্ত যে রাজার চন্দ্ৰকান্তকে।

দু’পক্ষের কথা শুনে বীরবল তখনই ঘোড়াটিকে বিচারালয়ের হেফাজতে রেখে দু’জনকে বাড়ি যেতে বললেন।
পরেরদিন নির্দিষ্ট সময়ে বীরবল রায় দিলেন। প্রথম বিচারটির নিষ্পত্তি করে কসাইকে তিনি টাকার থলির মালিক বলে ঘোষণা করলেন এবং কলুটিকে একশ ঘা বেত্রাঘাত ও ২০০ টাকা জরিমানা দেওয়ার আদেশ দিলেন।

এরপর বীরবল রাজা ও ভিক্ষুকটিকে ঘোড়ার আস্তাবলে নিয়ে গেলেন। সেখানে অন্যান্য সব ঘোড়ার মধ্যে রাজার ঘোড়াটিও রয়েছে। ভিক্ষুকটি এত ধূর্ত যে রাজার ঘোড়াটিকে এক পলক দেখা মাত্র চিনে ফেলল। রাজার সঙ্গে ঘোড়ার পিঠে আসার সময় সে বিশেষভাবে চিনে রেখেছিল। ছদ্মবেশী রাজাও ঘোড়াটিকে চিনতে পারলেন, ঘোড়াটি আসল প্রভুকে দেখে ডাক ছাড়ল। ফলে বীরবলের পক্ষে ঘোড়াটিকে তার প্রকৃত মালিক ছদ্মবেশী চন্দ্রকান্তের কাছে দিতে অসুবিধা হল না। অপরাধী ভিক্ষুকটির পায়ের তলায় ১০০ বেত্রাঘাত দন্ড দেওয়া হল।

বিচার সভায় ফিরে আসার পথে রাজা চন্দ্রকান্ত বীরবলের কাছে নিজের পরিচয় দিয়ে দিল্লিতে তার আসার উদ্দেশ্য সব জানালেন এবং বীরবলের কাছে অকপটে স্বীকার করলেন যে, এমন নির্ভুল বিচার নিষ্পত্তি দেখে তিনি চমকিত হয়ে গেছেন। রাজাকে যথাযোগ্য সম্মান দেখিয়ে বীরবল বললেন যে, ‘এটি কোনওরকম আশ্চর্যজনক ব্যাপার নয়। সাধারণ বুদ্ধি প্রয়োগ করেই বিচার নিম্পন্ন করা হয়েছে। এতে এমন কী বাহাদুর আছে? সকলে চেষ্টা করলে পারবে।'

বীরবল তাঁকে সব খুলে বললেন:
প্রথম বিচারটির নিষ্পত্তির জন্য বীরবল টাকার থলিটি বাড়িতে নিয়ে গিয়ে থলিটির ভেতর পরীক্ষা করে দেখলেন যে, মুদ্রাগুলোর গায়ে রক্তের সুস্পষ্ট চিহ্ন আর থলিটির গায়ে মাংসের গন্ধ রয়েছে। থলিটি শুকে তেলের সামান্য গন্ধও তিনি পাননি। কাজেই তাঁর পক্ষে প্রকৃত সত্য বের করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে কোনও অসুবিধা হয়নি।

বুড়ির বিষয়টি তুলে বীরবল বললেন, ছোট কাজির কাছে তার অর্থলালসা মেটাবার জন্য একটা বড়রকমের টোপ ফেলা হয়েছিল। বৃদ্ধার টাকা এই সুযোগের কাছে সামান্য। ছোট কাজিকে তিনি খবর দিয়েছিলেন যে, বিচারসভার এই অধিবেশনে তিনি উপস্থিত থাকতে পারবেন না, তাকে শহর থেকে চলে যেতে হচ্ছে। তার জায়গায় একজন যোগ্য লোক না পাওয়ার ফলে ছোট কাজিকেই তার অনুপস্থিতির সময় এই কাজের ভার দেওয়া হল। ছোট কাজিকে বলা হল ওইদিন সকালেই প্রধান কাজির কাজ তাকে বুঝে নিতে হবে। অবিলম্বে তিনি যেন সকালে আমার সঙ্গে দেখা করেন।
এই বিরাট পুরস্কারের সুযোগ ছোট কাজির সামনে আসায় টাকা ফেরত দিয়ে বৃদ্ধার মুখ তিনি বন্ধ করে দিলেন। বৃদ্ধার টাকার প্রসঙ্গটি নিয়ে হইচই হলে তার পক্ষে এই পদলাভের সম্ভাবনা না থাকতেও পারে। রাজা চন্দ্রকান্ত চাষির ছদ্মবেশে বীরবলের এইরূপ জ্ঞান-বুদ্ধির প্রত্যক্ষ পরিচয় লাভ করে খুবই আনন্দিত হলেন এবং বীরবলের ভুরিভুরি প্রশংসা করতে লাগলেন। তিনি তারপর তার রাজ্যে ফিরে গেলেন।

0 coment�rios: