‘শ্রীশ্রীরাম সহায়’

সম্রাট আকবর বীবলকে একদিন ডেকে পাঠালেন বিশেষ কাজের জন্য। বীরবল হন্তদন্ত হয়ে তৎক্ষণাৎ এসে পৌছতিই সম্রাট বেশ গম্ভীরভাবেই বললেন, ‘একটা কথা ভাবছি কিছুদিন থেকে, বুঝলে বীরবল? মন দিয়ে শোনা সে কথা।’
‘আজ্ঞে বলুন হুজুর।’
‘আজ থেকে প্রত্যেক নরনারীকে কিছু লেখার সময় আমার নাম লিখে শুরু করতে হবে।’
বীরবল কথাটা ঠিক বুঝতে না পেরে কৌতুহলী হয়ে সম্রাটের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি ঠিক বুঝতে পরলাম না হুজুর!’

আকবর বললেন, ‘আরে, এই ধরো না কেন, লোকে এত চিঠিপত্র, দলিলপত্র লেখে, কিন্তু চিঠির মাথায় আমার নামটা উল্লেখ করলেই তো পারে। হাজার হোক, লোকে আমাকে দিল্লীশ্বর বা জগদীশ্বর তো বলে। আমার কথা মানতে সকলেই বাধ্য।’
বীরবল বললেন, ‘সে তো বটেই হুজুর! কিন্তু ব্যাপারটা বী, এখনও মানে, ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি এখনও হুজুর। তবে নিশ্চয়ই আইন করে বাধ্য করাব আপনার নাম উপরে লিখতে।’
সম্রাট বললেন, ‘আরে এ তো অতি সহজবোধ্য! হিন্দুরা প্রত্যেকে চিঠির মাথায় লেখে, ‘শ্রী শ্রীরাম সহায়’,-- ওটার বদলে আমার নামটা তো তারা ব্যবহার করতে পারে। এবার বেশ বুঝতে পারছ তো?
‘আজ্ঞে হ্যাঁ, একশোবার।’আপনি সম্রাট, দন্ডমুন্ডের কর্তা, আপনার কথায় পৃথিবী চলে। আপনার নাম লেখা সকলের উচিত বলেই আমার মনে হয়। তবে একটা কথা এই যে, তার আগে আপনাকে একখন্ড পাথর নিয়ে সমুদ্রের ধারে যেতে হবে, এখনই?’
‘পাথর নিয়ে? কেন বলো তো?’
বীরবল নিবেদন করলেন, এটাও সহজবোধ্য হুজুর। পাথরখানা ছুঁড়ে ফেলবেন আপনি সমুদ্রের জলে! তারপর আপনার হুকুমে দেখবেন, পাথরখানা জলের ওপর দিব্যি ভেসে ভেসে চলেছে।’
সম্রাট সন্দিগ্ধভাবে ভ্ৰকুঞ্চন করে বললেন, তুমি বোধ করি আমাকে বোকা বানাতে চাও, বীরবল। পাথর তো পড়ার সঙ্গে সঙ্গে টুপ করে ডুবে যাবে। পাথর কি কখনও জলে ভাসে?
বীরবল শান্তকণ্ঠে জবাব দিলেন, আপনি জগতের সম্রাট, আপনার হুকুমে জলের ওপর পাথর ভাসতে বাধ্য! যদি না ভাসে তবে লোকে আপনাকে মানতে বাধ্য নয় বলে আমার মনে হয় হুজুর।’
“মিথ্যে কথা !’
বীরবল তখন বললেন, ‘সে কী কথা, আপনি জানেন না শ্রীরামচন্দ্রের নামে জলের ওপর শিলা ভেসে যেত,—তার নামের এমনই গুণ, হুজুর। সেইজন্যই আজও হিন্দুরা চিঠির মাথায় ঈশ্বর স্বরূপ রামচন্দ্রের নামটি উল্লেখ করে। আজও
তারা ভোলেনি। রামচন্দ্র সমুদ্রের ওপর পাথর দিয়ে সমুদ্রের উপর সেতুবন্ধন তৈরী করেছিলেন হুজুর ‘
সম্রাট আকবর দেখলেন, বেগতিক। সুতরাং তিনি এ সম্বন্ধে কোনও হুকুমনামা জারি করতে আর সাহস করলেন না। বেবাক চুপ করে গেলেন।
বীরবল আড়চোখে একবার সম্রাটের দিকে তাকিয়ে নিজের কাজে চলে গেলেন মুচকি হাসতে হাসতে।

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য