বেতালপঞ্চবিংশতি: একাদশ গল্প

পুণ্যপুর নগরে বল্লভ নামে এক রাজা ছিলেন। প্রজারা তাঁকে দেবতার মত ভক্তি করত । দান ও সৎ কাজেই তাঁর দিন কাটত ।
তিনি একদিন মন্ত্ৰী সত্যপ্রকাশকে ডেকে বললেন, দেখ, ভেবে দেখলাম রাজা হয়েও যদি কেবল পরের জন্যই খেটে মরি তবে রাজা হয়ে লাভ কি? আমার সব রকম ভোগ সুখ করবার ক্ষমতা আছে। এই পৃথিবীতে এসে আমোদ আহ্লাদই যদি না করলাম তবে আর রাজা হওয়া কেন? তাই আমি ঠিক করেছি এখন থেকে শুধু ফূর্তি করব আর আমার সব কাজ করবে তুমি ।
মন্ত্রী খুবই চিন্তায় পড়লেনঃ আমার পক্ষে কি রাজকার্য পরিচালনা করা সম্ভব! রাজার যে বিচারবুদ্ধি ও ধৈর্য আছে তা কি আমার আছে!

যাই হোক, একান্ত বাধ্য হয়েই তিনি রাজকার্য চালাতে লাগলেন কিন্তু অতি অল্প দিনের মধ্যেই তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়লেন ।
একদিন বাড়িতে বসে তিনি একমনে এই সবই
চিন্তা করছিলেন। তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মী বললেন, তোমার কি হয়েছে বল তো! সব সময় দেখি এক মনে কি যেন ভাবছ। আগে তো তুমি এমন ছিলে না?
মন্ত্রী সত্যপ্রকাশ তখন বললেন, তুমি তো জান, রাজা সব রাজকার্যের ভর আমার উপর ছেড়ে দিয়েছেন, রাজ্যে কি হচ্ছে না হচ্ছে কিছুই দেখছেন না। কিন্তু আমার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব হয়ে উঠছে না।
স্ত্রী বললেন, দেখ, রাজকাৰ্য চালানো তোমার কম্ম নয়। বরং এক কাজ কর, এসব ছেড়ে কিছুদিন তীর্থে ঘুরে এস, শরীব মন দুই-ই ভাল হবে।
সত্যপ্রকাশ স্ত্রীর কথামত রাজার অনুমতি নিয়ে তীর্থ করতে বেরলেন। অনেক দেশ ঘুরে দক্ষিণে রামেশ্বরে পৌঁছলেন । সেখানে রামচন্দ্রের প্রতিষ্ঠিত মহাদেবের মন্দিরে প্রবেশ করে ভক্তিভরে পূজা নিবেদন করে বেরিয়ে সমুদ্রের দিকে তাকাতেই এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখতে পেলেন।
সমুদ্রের ঢেউ থেকে বিশাল এক সোনার গাছ বেরল আর সেই গাছের মাথায় সুন্দর দেখতে একটি মেয়ে বীণা বাজিয়ে
গান করছেন। সত্যপ্রকাশ তন্ময় হয়ে এই অপূর্ব দৃশ্য দেখতে লাগলেন। পরে সেই গাছটা আস্তে আস্তে জলের নীচে তলিয়ে গেল।
এই দেখে তিনি আর থাকতে পারলেন না, তাড়াতাড়ি দেশে ফিরে রাজার সঙ্গে দেখা করে সমস্ত কথা বললেন।
রাজা সত্যপ্রকাশকে বিশ্বাস করতেন। তাই তিনি আর দেরী না করে সত্যপ্রকাশের হাতে রাজ্যভার দিয়ে রামেশ্বরে গিয়ে উপস্থিত হলেন । সেখানে গিয়ে মন্ত্রী সত্যপ্রকাশের কাছে যা যা শুনেছিলেন সবই দেখলেন। তবে রাজা সেই অপূর্ব দৃশ্য দেখে তাড়াতাড়ি নৌকোয় করে সেখানে গিয়ে সেই সোনার গাছে উঠে বসলেন এবং গাছটি রাজাকে নিয়ে তখনই পাতালে চলে গেল।
 পাতালে গিয়ে সেউ সুন্দরী রাজার দিকে চেয়ে বললেন, তোমার বীরত্ব ও সাহস দেখে মুগ্ধ হয়েছি, তুমি এখানে কেন এসেছ? আর তোমার পরিচয়ই বা কি ?
রাজা বললেন, আমি পুণ্যপুরের রাজা-বল্লভ। তোমার রূপ ও গুণে মুগ্ধ হয়ে আমি এখানে এসেছি।

মেয়েটি বললেন, তোমাকে দেখে সন্তুষ্ট হয়েছি আমি তোমার রাণী হতে পারি তবে একটি শর্তে, অমাবস্যার দিন আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবে না।

রাজা তাঁর প্রস্তাবে রাজি হলেন। তখন গন্ধৰ্বমতে তুমি দু’জনের বিয়ে হলো। দু’জনে মনের আনন্দে দিন কাটাতে লাগলেন।
তারপর অমাবস্যা এল। রাজা অন্দরমহল থেকে চলে গেলেন। কিন্তু এর কারণ জানবার জন্য বিশেষ কৌতুহলী হয়ে অন্ধকার রাত্রে হাতে তরবারি নিয়ে লুকিয়ে থেকে সব দেখতে লাগলেন। তিনি দেখলেন ঠিক মাঝরাতে একটা রাক্ষস এসে রাণীকে ধরতে গেল। রাজা আর নিজেকে ঠিক রাখতে না পেরে রাক্ষসের সামনে উপস্থিত হয়ে হাতের তরবারি দিয়ে রাক্ষসের মাথা কেটে ফেললেন।

রাণীর তখন আনন্দে চোখে জল এসে গেছে। জলভরা চোখে বললেন, তুমি আমাকে বাঁচালে।এতদিন কি যন্ত্রণা ভোগ করেছি তা তোমাকে বলে  বোঝাতে পারব না ।
 রাজা কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন  এতদিন এই যন্ত্রণ সহ্য করেছ? আর তোমার প্রকৃত পরিচয়ই বা কি?
 রাণী তখন বললেন, শোন তবে আমার সেই  দুঃখের কথা। আমি গন্ধৰ্বরাজ বিদ্যাধরের মেয়ে, নাম রত্নমঞ্জরী। আমি বাবার আদরের মেয়ে  ছিলাম। বাবা যখন খেতে বসতেন আমি কাছে না  থাকলে তার খাওয়া হতো না। একদিন সখীদের  সঙ্গে খেলায় এতই মেতে ছিলাম যে কখন বাবার  খাওয়ার সময় হয়েছে তা একদম ভুলে গিয়েছিলাম ।  এতে বাবা আমার উপর এতই রেগে গেলেন যে আমাকে অভিশাপ দিলেন ; আজ থেকে তোর বাসস্থান হবে পাতালে আর প্রতি অমাবসাতে এক রাক্ষস এসে তোকে নানাভাবে কষ্ট দেবে। 
এই ভয়ঙ্কর অভিশাপ শুনে আমি কাঁদতে কাঁদতে বাবার পায়ে মাথা কুটতে কুটতে বললাম, বাবা, সামান্য ভুলের জন্য আমায় এমন কঠোর শান্তি দিও না।

বাবা আমার কাতর আবেদনে সাড়া দিলেন এবং নিজেও বুঝলেন তাঁর স্নেহের কন্যার প্রতি কি অবিচার করেছেন। বললেন, তবে জেনে রাখ, মহাবলশালী এক রাজা যেদিন ঐ রাক্ষসকে বধ করবেন সেই দিন তুমি শাপমুক্ত হবে। আজ আমি শাপমুক্ত হলাম। এখন তোমার অনুমতি পেলে বাবার কাছে ফিরে যাই।
রাজা বললেন, আগে আমার রাজধানীতে চল, পরে তোমার বাবার কাছে যাবে।
রত্নমঞ্জরী রাজী হলেন এবং রাজা তাঁকে নিয়ে রাজধানীতে গিয়ে বেশ কিছুদিন কাটাবার পর রাণীকে তাঁর বাবার কাছে যেতে অনুমতি দিলেন।
তখন রত্নমঞ্জরী বললেন, মহারাজ, দীর্ঘদিন মানুষের সঙ্গে বাস করে আমার গন্ধৰ্বত্ব চলে গেছে, আমি এখন মানুষের মত হয়ে গেছি। আমার বাবা গন্ধবদের রাজা। আমার মনে হয় আমি আর বাবার কাছে ফিরে গিয়ে সেই স্নেহ-ভালবাসা পাব না; তাই আমার ইচ্ছা আমি এখানেই থেকে যাই ।

রাজা এই কথা শুনে খুবই খুশি হলেন, তিনিও চাইছিলেন না রাণী তার বাবার কাছে ফিরে যাক । মন্ত্রীর হাতে রাজ্যভার দিয়ে তিনি আবার আমোদ আহ্লাদে দিন কাটাতে লাগলেন। মন্ত্রী সত্যপ্রকাশ এই সব দেখে শুনে মনের দুঃখে মারা গেলেন। 
গল্প শেষ করে বেতাল বললো, বল মহারাজ, মন্ত্রী মরলো কেন ? 
বিক্রমাদিত্য বললেন, রাজা আবার আনন্দসাগরে ডুবে যাওয়ায় মনের দুঃখে মন্ত্রী সত্যপ্রকাশ মারা গেলেন। তিনি দেখলেন প্রজারা রাজা হারা হয়ে অনাথ হলো। প্রজাদের সুখ সুবিধা দেখার আর কেউ রইল না। রাজ্যে কোন অঘটন ঘটলে সব দোষ পড়বে মন্ত্রীর উপর। এভাবে বাঁচার চেয়ে মরাই ভাল। 
মনের মত উত্তর পেয়ে বেতাল আবার সেই গাছে গিয়ে ঝুলে রইলো আর রাজা বিক্রমাদিত্যও তাকে গাছ থেকে নামিয়ে কাঁধে নিয়ে চলতে লাগলেন। বেতালও দ্বাদশ গল্প বলতে আরম্ভ করল।


Previous
Next Post »
0 মন্তব্য