বেতালপঞ্চবিংশতি: প্রথম গল্প

সেকালে বারাণসী নগরে প্রতাপমুকুট নামে এক রাজা ছিলেন। তাঁর একটি মাত্র পুত্র ছিল। নাম বজ্ৰমুকুট । সে ছিল বাপ-মায়ের নয়নের মণি।
বজ্রমুকুট শিকার করতে খুব ভালবাসতো। সে একদিন মন্ত্রীপুত্রকে নিয়ে গভীর বনে শিকার করতে গেল। বনের মাঝে এদিক ওদিক কিছুটা ঘোরার পর সে দেখল একটি খুব সুন্দর সরোবর। তার জলে
হাঁস, বক আর অন্যান্য জলচর প্রাণীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। মৌমাছিরা গুনগুন করে এ ফুল থেকে ও ফুলে বসছে, তীরে কোকিল ও অন্যান্য পাখিরা গান গাইছে। বড় সুন্দর জায়গা। মিষ্টি বাতাস ও গাছের শীতল ছায়ায় কিছুক্ষণ বসলে ঘুম এসে যায়।

রাজকুমার ঘোড়া থেকে নেমে একটা বকুল গাছের সাথে ঘোড়া বাঁধলো। তারপর সরোবরের জলে স্নান করলো। তীরে একটা শিবমন্দির দেখে সেখানে পূজা করতে বসলো। পূজা শেষ হলে ঠাকুর প্রণাম করে মন্দির থেকে বেরিয়ে এলো।

এসে দেখলো এক রাজকন্যা তার সখীদের সাথে এসে স্নান আর পূজা সেরে গাছের ছায়ায় বেড়াচ্ছে। তাকে দেখে বজ্রমুকুটের খুব ভাল লাগলো।
রাজকন্যাও বজ্রমুকুটকে দেখে মুগ্ধ হলো । তারপর নিজের খোঁপা থেকে একটা পদ্মফুল খুলে হাতে নিল। ফুলটি প্রথমে কানে পরলো, তারপর কান থেকে খুলে দাঁতে কাটলো, তারপর মাটিতে ফেলে দিল এবং যাবার সময় ফুলটি কুড়িয়ে নিজের বুকে রাখলো। তারপর সখীদের সাথে চলে গেল।

রাজকুমার এর কোন মাথ মুণ্ড বুঝলো না। কিন্তু রাজকুমারীকে তার বড়ই ভাল লেগেছে। বন্ধু মন্ত্রীপুত্রের সাথে দেখা হতে তাকে সব খুলে বললো। সব শুনে মন্ত্রীপুত্র বজ্রমুকুটকে নিয়ে তাড়াতাড়ি রাজপ্রাসাদে ফিরে এলো।
কোন কাজকর্ম করে না, সব সময় কেবল সেই রাজকুমারীর কথা চিন্তা করে। ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করে না ফলে রাজকুমারের চেহারা ক্রমশ খারাপ হতে লাগলো।

রাজকুমারের এই অবস্থা দেখে মন্ত্রীপুত্রের বড়ই চিন্তা হতে লাগলো। সে একদিন রাজকুমারকে জিজ্ঞাসা করলো, তোমার হঠাৎ এমন পরিবর্তন কি কারণে ?
রাজকুমার বললো, বন্ধু, আমি যদি ঐ রাজকন্যাকে বিবাহ না করতে পারি তাহলে প্রাণ ত্যাগ করবো।
মন্ত্রীপুত্র বললো, যাবার সময় রাজকন্যা কি তোমায় কিছু বলে গেছে ?
বজমুকুট তখন পদ্মফুলের কথা বললো।

মন্ত্রীপুত্র খানিক চিন্তা করে বললো, তাহলে তো সব জানাই হয়ে গেল। শোন, মাথা থেকে ফুলটি নিয়ে কানে পরার মানে সে কর্ণাট নগরে থাকে, দাঁতে ফুল কাটার মানে দন্তকাট রাজার মেয়ে, মাটিতে ফুল ছুঁড়ে ফেলার মানে ওর নাম পদ্মাবতী, আর বুকে তুলে নেওয়ার মানে সে তোমায় বিয়ে করতে চায়।
আর দেরী না করে রাজপুত্র তখনি মন্ত্রীপুত্রকে সঙ্গে করে কর্ণাট নগরের দিকে যাত্রা করলো। অবশ্য সঙ্গে রাজকীয় পোশাক আর অস্ত্রশস্ত্র নিতে ভুললো না।

সেখানে পৌঁছে দেখল রাজবাড়ির সামনে এক কুঁড়ে ঘরে এক বুড়ি বসে আছে। তারা ঘোড়া থেকে নেমে বুড়িকে বললো, মা-আমরা এখানে ব্যবসা করতে এসেছি, একটু থাকবার জায়গা দিতে পার?
তাদের সুন্দর চেহারা আর মিষ্টি কথা শুনে বুড়ির খুব ভাল লাগল। সে বললো, বাছা, আমার এখানে তোমরা যতদিন ইচ্ছা থাকতে পারে।

আস্তে আস্তে তারা বুড়ির সাথে ভাব জমালো। বুড়ির কাছে শুনলো যে তার ছেলে রাজবাড়িতে চাকরি করে। সে নিজেও রাজকন্যা পদ্মাবতীর ধাইমা ছিল। রাজবাড়ির সকলেই তাকে খুব ভালবাসে। বুড়ি রোজ একবার করে রাজবাড়িতে যায় পদ্মাবতীর সাথে দেখা করতে।
বজ্রমুকুট বললো, মা, তুমি আমার একটা কাজ করে দেবে? কাল রাজ রাজকন্যা পদ্মাবতীকে গিয়ে বলবে, সরোবরের তীরে যে রাজকুমারকে দেখেছিল, সে তার সংকেত বুঝে এখানে এসেছে।
—কাল কেন? আমি এখনই যাচ্ছি। এই বলে বুড়ি রাজবাড়ির দিকে রওনা দিল।
-- অন্দরমহলে পদ্মাবতীকে একা দেখে সে বললো, বাছা তোমায় আমি মেয়ের মতো মানুষ করেছি। আমি চাই কোন যোগ্য পাত্রের সঙ্গে তোমার বিয়ে হোক। সরোবরের তীরে যে রাজকুমারকে তুমি দেখেছিলে সে এখন আমার বাড়িতে। আমার মতে সে সব দিক থেকেই তোমার উপযুক্ত।

একথা শুনে রাজকন্যা বুড়ির দু’গালে চড় মেরে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল। সে বাড়ি এসে রাজকুমারকে সব বললো।
তা শুনে বজ্রমুকুট খুব ভেঙে পড়লো। কিন্তু মন্ত্রীপুত্র বললো, এতে ভেঙে পড়ার কি আছে? গালে দশ আঙুলের ছাপ মানে দশদিন পর তার সাথে তোমার দেখা হবে ।
দশদিন পর বুড়ি আবার রাজবাড়িতে গিয়ে রাজকন্যার সাথে দেখা করলো। এবার সে বুড়িকে গলা ধাক্কা দিয়ে খিড়কী দরজা দিয়ে বার করে দিল ।



তা শুনে বজ্রমুকুট খুব হতাশ হলেও মন্ত্রীপুত্র বললো, আর ভাবনা নেই, আজ রাতে রাজকন্যা তোমায় খিড়কী দরজা দিয়ে যেতে বলেছেন।
সেদিন রাত্রে মন্ত্রীপুত্র রাজকুমারকে খিড়কী দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে এলো। ভেতরে গিয়ে বজ্রমুকুট দেখে রাজকন্যা তার জন্যই অপেক্ষা করছে। সেদিন রাতেই দু'জনার বিয়ে হলো। পরদিন রাজকুমার যখন অন্দরমহল থেকে বেরোতে যাবে তখন রাজকুমারী তাকে কিছুতেই ছাড়ল না। দেখতে দেখতে রাজকুমার এক মাস সেখানে কাটিয়ে দিল।

একদিন বজ্রমুকুট রাজকুমারীকে বললো, দেখো আমার বন্ধু মন্ত্রীপুত্রের জন্যই তোমাকে আমি পেয়েছি। অথচ এক মাস হলো আমি তার কোন খবর নিই না। সে কেমন আছে কি করছে তা একবার জানা দরকার।

রাজকুমারী বললো, তুমি খুব অন্যায় করেছ। আমি নানা রকম মিষ্টি তৈরী করে পাঠাচ্ছি। তুমি তার কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে এসো।
দীর্ঘদিন পর দুই বন্ধুর দেখা হওয়ায় দুজনের চোখেই জল এলো। বজ্রমুকুট মন্ত্রীপুত্রকে তার সৌভাগ্যের কথা বললো। তখন রাজকুমারীর সখী এসে মিষ্টি দিয়ে গেল। মন্ত্রীপুত্র জিজ্ঞাসা করলো, এসব কার জন্য ?
রাজকুমার বললো, বন্ধু, আমার স্ত্রী তোমার জন্য এই মিষ্টি পাঠিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমি যেন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তোমাকে খাইয়ে আসি ।
মন্ত্রীপুত্র বড় দুঃখের সাথে বললো, কিন্তু এ মিষ্টি তো আমি খেতে পারব না, এতে বিষ মাখনো আছে। আমার পরিচয় তার কাছে দিয়ে তুমি ঠিক কাজ কর নি।


রাজকুমার তখন একটি মিষ্টি নিয়ে বুড়ির পোষা বিড়ালকে খেতে দিল । তা খাওয়ামাত্র বিড়ালটি মারা গেল ।
তখন রাজকুমার খুব ভেঙে পড়লো, বললো পদ্মাবতীর সাথে আমার আর কোন সম্পর্ক নেই। চলো বন্ধু, আমরা আজই দেশে ফিরে যাই ।
মন্ত্রীপুত্র বললো, সেটা করা ঠিক হবে না। তুমি বরং পদ্মাবতীকে গিয়ে বল যে মিষ্টি খেয়েই আমি ঘুমিয়ে পড়েছি। তাকে কিছুই জানতে দিও না। তারপর রোজকার মত যখন সে রাত্রে ঘুমিয়ে পড়বে, ' তখন তুমি তার গা থেকে সব গয়না খুলে একটা পুটলি বাঁধবে আর বাঁ পায়ে একটা ত্ৰিশূলের চিহ্ন এঁকে চলে আসবে।
রাজকুমার মন্ত্রীপুত্রের কথামত কাজ করলো। পরদিন তারা সন্ন্যাসীর বেশ ধরে এক শ্মশানে গিয়ে হাজির হলো। মন্ত্রীপুত্র গুরু সাজলো, আর রাজপুত্রকে শিষ্য করে বললো, তুমি রাজবাড়ির কাছের কোন স্যাকরার কাছে গিয়ে এই গয়নাগুলো বিক্রী করো। যদি কেউ রাজকুমারীর গয়না চিনতে পেরে চোর বলে তোমায় ধরে, তাহলে তাকে আমার কাছে নিয়ে আসবে।


ঞটলও ঠিক তাই। স্যাকরা রাজকুমারীর গয়না ঠিক চিনতে পারলো কারণ এগুলি তারই হাতে গড়া। তখন নগররক্ষক এসে রাজপুত্র এবং মন্ত্রীপুত্রকে বন্দী করে রাজার কাছে নিয়ে গেল।
সন্ন্যাসীর বেশধারী মন্ত্রীপুত্র রাজাকে বললো, মহারাজ, “গতকাল রাত্রে আমি ডাকিনীমন্ত্র সিদ্ধ করছিলাম। মন্ত্রের প্রভাবে এক ডাকিনী এসে তার গা থেকে সমস্ত গয়না খুলে দিয়ে গেছে আর আমিও তার বাঁ পায়ে ত্ৰিশূলের চিহ্ন একে দিয়েছি। 
রাজা অন্দরমহলে গিয়ে রাণীকে বললেন, দেখতো পদ্মাবতীর বাঁ পায়ে কোন চিহ্ন আঁকা আছে কিনা।
রাণী দেখে এসে বললেন, হ্যাঁ, একটা ত্ৰিশূলের চিহ্ন আছে।
একথা শুনে দুঃখে রাগে অন্ধ হয়ে রাজ হুকুম দিলেন, রাজকুমারীকে গভীর বরে ছেড়ে আসা হোক।

এখানে গল্প শেষ করে বেতাল বললো, মহারাজ,  এবার বলো, পদ্মাবতী, তাঁর বাবা দন্তবাট আর মন্ত্রীপুত্র, এদের মধ্যে সবচেয়ে অপরাধী কে ?
 বিক্রমাদিত্য বললেন, রাজা দন্তবাট ।  
— কেন? বেতাল প্রশ্ন করল ।
 বিক্রমাদিত্য বললেন, কারণ, পদ্মাবতী মন্ত্রীপুত্রকে শক্ৰ মনে করে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল। আর মন্ত্রীপুত্রও পদ্মাবতীকে শত্রু মনে করে তার সাথে নিষ্ঠুর ব্যবহার করেছিল। শক্রকে মারায় কোন দোষ হয় না। কিন্তু রাজা দন্তবাট ন্যায় বিচার ভুলে মেয়েকে নির্বাসন দিলেন।

সঠিক উত্তর পেয়ে বেতাল আবার আগের মত শ্মশানে ফিরে গিয়ে গাছের যালে ঝুলে পড়লো। বিক্রমাদিত্যও তার পিছন পিছন গিয়ে তাকে গাছ থেকে নামিয়ে কাঁধে তুলে পুনরায় রওনা দিলেন।
বেতাল তার দ্বিতীয় গল্প শুরু করল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য