লাল দৈত্য -- ইংল্যান্ডের রূপকথা

এক ছিল গরীব বিধবা। তার দুটি ছেলে। ছেলেদের নিয়ে দুঃখ-কষ্টে তার দিন কাটে ।
দুভাই বড় হয়ে উঠেছে। এখন ভাগ্যের অন্বেষণে ঘর ছেড়ে বাইরে বেড়িয়ে পড়ার সময় হয়েছে তাদের।
একদিন বড় ছেলে যাত্রার জন্যে তৈরি হলো । মা কাছে ডাকল তাকে। ঘড়ায় করে কুয়ো থেকে পানি নিয়ে এসো, বলল মা, আমি তোমার জন্যে কেক তৈরি করে দেব । বেশি পানি আনতে পারলে কেক বড় হবে। যদি অল্প একটু পানি আনো, কেক হবে খুব ছোট । একটা মাত্র কেক ছাড়া আমি কিন্তু আর কিছুই তোমাকে দিতে পারব না।”
ঘড়া নিয়ে কুয়োর দিকে চলল ছেলে। কুয়ো থেকে পানি তুলে সেটা ভর্তি করল। কিন্তু সে লক্ষ করেনি, ঘড়াটা ছিল ফুটো-বাড়ি ফিরতে ফিরতে বেশির ভাগ পানি ফুটো দিয়ে চুইয়ে পড়ে গেল।
কেক হলো একেবারে ছোট । মা সেটা হাতে নিয়ে ছেলের কাছে এসে দাঁড়াল। “অর্ধেক কেক আর আমার আশীর্বাদ নিতে পারো তুমি,”বলল মা, কিংবা নিতে পারো আশীৰ্বাদ ছাড়া পুরোটা কেক। কী চাও বলো ।”
কীভাবে খাবার যোগাড় হবে কে জানে! পুরো কেকটাই আমি নিতে চাই, মা, বলল সে ।
কাজেই আশীৰ্বাদ করল না মা, শুধু গোটা কেকটা ছেলের হাতে তুলে দিল।
ছেলে এবার ছোট ভাইকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে নিজের একটা ছুরি দিল তার হাতে। আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত এই ছুরিটা তোমার কাছে রাখবে, বলল সে । 'প্রত্যেক দিন সকালে খাপ থেকে বের করে দেখবে এটা। যতদিন ফলাটা চকচক করতে থাকবে, বুঝবে আমি ভালো আছি। যদি দেখো মরচে ধরেছে, বুঝবে বিপদে পড়েছি আমি—তোমার সাহায্য দরকার।’
মা আর ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল ভাগ্যের খোজে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাঁটল। পরদিনও থামল না। তৃতীয় দিন বিকেলে সে এসে পড়ল মস্ত এক মাঠের কিনারায়। দেখল, মাঠের ভেতরে এক বুড়ো বিরাট একপাল ভেড়া চরাচ্ছে। লোকটার কাছে গিয়ে সে জানতে চাইল ভেড়াগুলোর মালিক কে।
এগুলো সব লাল দৈত্যের, বলল বুড়ো। জানাল, তিন মাথাওয়ালা সাংঘাতিক নিষ্ঠুর আর ভয়াবহ সেই দৈত্য নানারকম জাদুও জানে। রাজা ম্যালকমের একমাত্র মেয়েকে সে চুরি করে এনে আটকে রেখেছে, প্রতিদিন তাকে মারধর করে।
‘কোথায় থাকে সে? জানতে চাইল ছেলেটা। লাল দৈত্যের প্রাসাদ এখান থেকে বেশি দূরে নয়, বুড়ো বলল। আরও সামনে এগোতে চাও যদি, সাবধানে এগিয়ো । অদ্ভুত কিছু জানোয়ারের দেখা পেতে পারো, অমন বিদঘুটে প্রাণী তুমি জীবনেও দেখেনি। আমি খুব ভাল করে জানি কেমন ভয়ঙ্কর ওগুলো ।
ছেলেটা এগিয়ে চলল। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখতে পেল রাস্তার পাশে অনেকগুলো ভয়াল চেহারার জানোয়ার ওত পেতে আছে। তাদের দুটাে করে মাথা, একেকটা মাথায় চারটে করে শিং। দেখামাত্র এমন ভয় পেয়ে গেল সে যে সঙ্গে সঙ্গে প্রাণপণে ছুটতে শুরু করল। ছুটতে ছুটতে সামনে একটা প্রাসাদ দেখতে পেয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল যেন।
একটা পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে প্রাসাদটা। সামনের ফটক হাট করে খোলা । ভয়াল জানোয়ারগুলোর কবল থেকে বাঁচবার জন্যে ছেলেটা সোজা প্রাসাদের ভেতর ঢুকে পড়ল।
এদিক-ওদিক ঘুরে কাউকে দেখতে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত রান্নাঘরে উকি দিয়ে দেখল, আগুনের পাশে এক বুড়ি বসে আছে। --আজকের রাতটা এখানে থাকতে পারি? বলল সে বুড়ির দিকে তাকিয়ে। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে ভারী ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।”
--‘তা থাকতে পারো, বুড়ি জবাব দিল, তবে কিনা এ জায়গাটা যে ভালো নয় তা বলে দিচ্ছি আগেই, বিপদ হলে আমাকে দোষ দিয়ো না। এটা লাল দৈত্যের প্রাসাদ—যাকে পায় তাকেই সে মেরে ফেলে।’
ছেলেটা একবার ভাবল চলে যাব, কিন্তু বাইরের জানোয়ারগুলোর কথা মনে হতেই তার আর প্রাসাদ ছেড়ে বেরোনোর সাহস হলো না।
বুড়িকে মিনতি করে বলল তাকে যেন প্রাসাদের কোথাও লুকিয়ে রাখে আর দৈত্যকে যেন তার কথা না বলে। কথা দিল, সকাল হলেই সে প্রাসাদ ছেড়ে চলে যাবে।
সন্ধ্যা হতে না হতেই ভয়ঙ্কর লাল দৈত্য ফিরে এল প্রাসাদে । মানুষের গন্ধ পাচ্ছি, মানুষের গন্ধ। ঘরে পা দিয়েই গর্জে উঠল, 'জ্যান্ত হোক, মরা হোক, এক্ষুনি ধরে খাব!’ গন্ধ শুকে শুকে মানুষ খুঁজে বেড়াতে লাগল সে প্রাসাদময়।
খুঁজতে খুঁজতে ছেলেটাকে ঠিকই পেয়ে গেল দৈত্য—গোপন জায়গা থেকে তাকে হিড়হিড় করে টেনে বের করে আনল।
-- ছেড়ে দাও আমাকে, ছেড়ে দাও—আমাকে প্রাণে মেরো না, ছেলেটা কাকুতি-মিনতি করতে লাগল।
‘বেশ,’ শেস পর্য ন্ঠিত বলল লাল দৈত্কয, ‘যদি আমার তিনটে প্রশ্নের ঠিক উত্তর দিতে পারো, তবে তুমি রেহাই পাবে।
বাধ্য হয়ে তাতেই রাজি হলো ছেলেটা। 
‘বলো তো, কোন জিনিসের শুরুও নেই, শেষও নেই? প্রশ্ন করল দৈত্যের প্রথম মাথা ।
ছেলেটা জবাব দিতে পারল না।
যত সরু তত বিপদের ভয়—বলো দেখি কী জিনিস? দৈত্যের দ্বিতীয় মাথা জানতে চাইল ।
এ প্রশ্নেরও জবাব খুঁজে পেল না ছেলেটা। বলতে পারো, কোন মৃত জিনিস বয়ে নিয়ে যায় জীবন্তদের? লাল দৈত্যের তৃতীয় মাথা শেষ প্রশ্ন করল।
অনেক চেষ্টা করল ছেলেটা, কিন্তু এবারও প্রশ্নের জবাব ভেবে বের করতে পারল না।
একটা জাদুদণ্ড হাতে তুলে নিল লাল দৈত্য। সেটা দিয়ে ঠক করে আস্তে ঘা দিল ছেলেটার মাথায়। আমনি সে বড় একখণ্ড পাথরে পরিণত হয়ে গেল ।
এদিকে বাড়িতে ছোট ভাই পরদিন সকালে বড় ভাইয়ের রেখে যাওয়া ছুরিটা খাপ থেকে বের করে দেখে সেটার ফলায় হঠাৎ করে মরচে ধরেছে। তার মন খুব খারাপ হয়ে গেল। মাকে গিয়ে শুধু বলল, ভাগ্যের অন্বেষণে সে-ও একদিকে বেরিয়ে পড়তে চায়। মা অমত করল না।
রওনা হওয়ার আগে মা ছেলের জন্যে কেক বানিয়ে দিতে চাইল । তাকে বলল ঘড়ায় করে কুয়ো থেকে পানি এনে দিতে।
পানি আনতে গেল ছোট ছেলে। ফেরার পথে দেখল, ঘড়ার ফুটো দিয়ে পানি চুইয়ে পড়ে যাচ্ছে। বুদ্ধি করে সে তাড়াতাড়ি খানিকটা কাদা দিয়ে ঘড়ার ফুটো ভালো করে সন্ধ করে দিল। ফলে বেশ অনেকটা পানি নিয়ে আসতে পারল অনায়াসে।
সেই পানি ময়দায় মিশিয়ে বড়সড় একটা কেক তৈরি করে মা এসে দাঁড়াল ছোট ছেলের কাছে। ‘অর্ধেক কেক আর আমার আশীৰ্বাদ নিতে পারো তুমি, বলল মা, কিংবা আশীৰ্বাদ ছাড়া গোটা কেক নিতে পারো। কোনটা চাও বলো।’
ছোট ছেলে চাইল অর্ধেক কেক আর মায়ের আশীর্বাদ । সেই অর্ধেক কেক অবশ্য তার ভাইয়ের পুরো কেকের চেয়েও আকারে বড় হলো ।
অজানার পথে বেরিয়ে পড়ল সে। কত গ্রাম-নগর অরণ্য-পর্বত পার হয়ে গেল। শেষে একদিন পথে তার দেখা হলো এক বুড়ির সঙ্গে।
‘ভারী খিদে পেয়েছে আমার, বাছা,’ বুড়ি ক্ষীণ কন্ঠে বলল, ‘তোমার কেক থেকে একটুখানি দেবে আমাকে খেতে?
‘নিশ্চয়,বুড়িমা,’ বলে ছেলেটা কেকের বেশ বড় একটা টুকরো বুড়ির হাতে তুলে দিল।
অমনি হাওয়ায় মিলিয়ে গেল বুড়ি—দেখা গেল, তার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে অপূর্ব সুন্দর এক পরী। তোমার ব্যবহারে আমি খুব খুশি হয়েছি, মুচকি হেসে বলল সে। এই নাও, ছেলেটাকে একটা জাদুদণ্ড উপহার দিয়ে বললো, যদি ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারো, এটা তোমার উপকারে আসবে।’ ভবিষ্যতে দরকার হতে পারে এমন কিছু জরুরী কথাও সে ছেলেটাকে শিখিয়ে দিল। তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল।
ছেলেটা আবার এগিয়ে চলল। শেষ পর্যন্ত সে এসে পড়ল সেই মস্ত মাঠের কাছে। দেখল এক বুড়ো সেখানে অনেক ভেড়া চরাচ্ছে। কার ভেড়া জানতে চাইলে বুড়ো বলল সেগুলো লাল দৈত্যের। বুড়োর মুখ থেকে লাল দৈত্যের সব কথা জানতে পারল ছেলেটা। কথায় কথায় এ-ও বুঝতে পারল, কিছুদিন আগে এ পথেই গিয়েছে তার বড় ভাই।
সাহসে বুক বেঁধে লাল দৈত্যের প্রাসাদের দিকে রওনা হলো সে । ভয়াবহ জানোয়ারগুলোকে দেখে ভয় পেল না মোটেই; থেমেও দাঁড়াল না, ছুটেও পালাল না—বুক ফুলিয়ে এগিয়ে যেতে থাকল। একটা জন্তু প্রকাণ্ড হা করে গর্জন করতে করতে ছুটে এল তার দিকে। তাড়াতাড়ি হাতের জাদুদণ্ড দিয়ে সেটাকে এক ঘা দিল সে। আমনি জানোয়ারটা নিজীব হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল তার পায়ের কাছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেলেটা লাল দৈত্যের প্রাসাদের কাছে এসে পড়ল। দরজায় ঘা দিয়ে ঢুকে পড়ল ভেতরে। রান্নাঘরে আগুনের পাশে বসে থাকা বুড়ির সঙ্গে দেখা হলে বুড়ি তাকে ভয়ঙ্কর লাল দৈত্যের দাপট আর তার ভাইয়ের দুৰ্গতির কথা জানাল। কিন্তু সে মোটেই ঘাবড়াল না। সন্ধেবেলা তিন মাথাওয়ালা পাহাড়প্রমাণ লাল দৈত্য প্রাসাদে ফিরে এল। মানুষের গন্ধ পাচ্ছি, মানুষের গন্ধ। হুঙ্কার ছেড়ে বলল সে ঘরে ঢুকেই, জ্যান্ত হোক, মরা হোক, এক্ষুনি ধরে খাব!’
বীরদৰ্পে সামনে গিয়ে দাঁড়াল ছেলেটা। দৈত্য একটু অবাক হয়ে গেল। ছটা লাল চোখ মেলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ছেলেটাকে আরও কাছে এগিয়ে যেতে বলল।
‘তিনটে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করব তোমাকে, বলল লাল দৈত্য। উত্তর দিতে পারলে প্রাণে বাঁচবে। আর না পারো যদি, তোমার রেহাই নেই।’
‘বেশ, আমি রাজি, বলল ছেলেটা। দৈত্যের প্রথম মাথাটা নড়ে উঠল। 'বলো দেখি, কোন জিনিসের শুরুও নেই, শেষও নেই?"
‘বাটি,’ সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল ছেলেটা। সব প্রশ্নের উত্তর সে পরীর কাছ থেকে আগেই জেনে এসেছে।
বলো তো, যত সরু তত বিপদের ভয় কোন জিনিসে? এবার দৈত্যের দ্বিতীয় মাথা প্রশ্ন করল।
সেতু, এবারও ছেলেটা জবাব দিতে দেরি করল না। 
বলতে পারো, কোন মৃত জিনিস বয়ে নিয়ে যায় জীবন্তদের? শেষ প্রশ্ন করল লাল দৈত্যের তৃতীয় মাথা।
জাহাজ, ছেলেটা মুচকি হেসে বলল। শোনামাত্র লাল দৈত্য দু'হাতে তিন মাথা একসঙ্গে চেপে ধরে কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়ল। ছেলেটা বুঝতে পারল, দৈত্যের সব জাদুর ক্ষমতা মুহুর্তে লোপ পেয়ে গেছে। চোখের পলকে দেয়ালের পাশ থেকে মস্ত একটা কুড়ুল তুলে নিয়ে সে তিন ঘায়ে দৈত্যের তিন মাথা কেটে ফেলল ।
বুড়ির কাছে গিয়ে সে জানতে চাইল রাজা ম্যালকমের মেয়েকে কোথায় বন্দী করে রাখা হয়েছে। বুড়ি তাকে পথ দেখিয়ে ওপরতলায় নিয়ে গেল। সেখানে সারি সারি বন্ধ দরজা। একেকটা দরজা খুলতেই ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে থাকল কয়েকজন পরমাসুন্দরী মেয়ে। তারা সবাই অভিজাত রাজপুরুষদের কন্যা। তাদের মধ্যে সবচেয়ে যে সুন্দরী সে-ই হচ্ছে রাজা ম্যালকমের মেয়ে।
সব বন্দীকে মুক্তি দেয়া হয়ে গেলে বুড়ি ছেলেটাকে নিচের একটা তলকুঠুরিতে নিয়ে গেল। সেখানে সে দেখতে পেল ঘরের ঠিক মাঝখানে বড় একটা পাথরের খণ্ড । হাতের জাদুদণ্ড পাথরে ছোয়াতেই দেখল সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার বড় ভাই। দু'জন দু’জনকে বুকে জড়িয়ে ধরল।
মুক্তি পাওয়া বন্দীরা ছোট ভাইকে অনেক কৃতজ্ঞতা আর ধন্যবাদ জানাল। তাদের সঙ্গে নিয়ে দু'ভাই পরদিন রওনা হয়ে গেল রাজা ম্যালকমের দরবারের উদ্দেশে ।

নিরুদ্দেশ মেয়েকে ফিরে পায়ে রাজা ম্যালকাম আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন।‘ যে সাহসী যুবা আমার মেয়েকে দৈত্যের বন্দীশালা থেকে উদ্ধার করে এনেছে, তারই সঙ্গে রাজকন্যার বিয়ে হবে,’ ঘোষণা করলেন তিনি, সে-ই হবে আমার সিংহাসনের উত্তরাধিকারী।
যথাসময়ে সুন্দরী রাজকন্যার সঙ্গে ছোট ভাইয়ের বিয়ে হয়ে গেল। বড় ভাইয়ের বিয়ে হলো রাজদরবারের এক অভিজাত অমাত্যের মেয়ের সঙ্গে।
দুঃখী মাকে দুভাই ভোলেনি। নিজেদের প্রাসাদে পালা করে রেখে মায়ের সেবা-যত্ন করে তারা। মায়ের আশীর্বাদের চেয়ে মূল্যবান তাদের কাছে আর কিছুই নেই।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য