দুঃসাহসী জ্যাক-২ -- ইংল্যান্ডের রূপকথা

কয়েকদিন একটানা এগিয়ে চলল সে। তারপর হঠাৎ একদিন বিরান এক প্রান্তরের মধ্যে পথ হারিয়ে ফেলল। তখন সূর্য ডুবে গেছে, চারদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে। রাত গভীর হওয়ার আগেই যে করে হোক একটা আশ্রয় খুঁজে নেয়া দরকার। যেতে যেতে মাঠ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত বিরাট একটা বাড়ি দেখতে পেল সে। এগিয়ে গিয়ে দরজায় ঘা দিল । অমনি দরজা খুলে বেরিয়ে এল প্রকাণ্ড এক ভয়াবহ দুমাথাওয়ালা দৈত্য!
ভয়ানক চমকে উঠলেও সাহস হারাল না জ্যাক। দৈত্যকে বলল, রাতে ঘুমোবার জন্য সে একটু আশ্রয়ের খোঁজ করছে। দৈত্য তাকে ভেতরে ঢুকতে বলে পথ দেখিয়ে একটা শোবার ঘরে নিয়ে গেল।
বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ক্লান্ত জ্যাকের চোখ ঘুমে জড়িয়ে এল। কিন্তু তারপরও ভাল করে ঘুমোতে পারল না সে। কী এক অজানা সংশয় মনে দোলা দিতে লাগল।
গভীর রাতে আধোঘুমের মধ্যে গুনগুন গানের শব্দ শুনতে পেয়ে সজাগ হয়ে উঠল জ্যাক। কান পেতে শুনে বুঝতে পারল, দৈত্য হেঁড়ে গলায় খুব আস্তে আস্তে গাইছে:

ঘুমোও সুখে—তবে তোমার হবে না এ রাত কাবার 
মুগুর দিয়ে গুড়িয়ে মাথা করব তোমায় কাল সাবাড়।’

'এই তাহলে তোমার মতলব’, আপনমনে বলল জ্যাক, আমার সঙ্গে চালাকি? বেশ, দেখা যাক কে কত চালাক!
বিছানা ছেড়ে নিঃশব্দে উঠে পড়ল সে। লম্বা কয়েক ফালি কাঠ খুঁজে এনে সেগুলো বিছানায় লম্বালম্বি করে রেখে কম্বল দিযে এমনভাবে ঢেকে দিল যাতে মনে হয় একজন মানুষই শুয়ে ঘুমোচ্ছে। এরপর সে ঘরের এক অন্ধকার কোণে গুড়ি মেরে লুকিয়ে রইল।
গানের শব্দ ততক্ষণে থেমে গেছে। একটু পরেই পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকল দৈত্য। হাতে প্রকাও একটা ভারী মুগুর। বিছানার পাশে গিয়ে দাড়িয়ে সেই মুগুর দিয়ে বার কয়েক দমাদম ঘা মারল সে কম্বলের ওপর। প্রচণ্ড আঘাতে কম্বল-ঢাকা কাঠ ভেঙেচুরে থেতলে গেল। মড়মড় শব্দ শুনতে পেয়ে দৈত্য ভাবল জ্যাকের মাথা-হাড়গোড় সব একেবারে গুড়িয়ে দিয়েছে। সকালে মানুষের মাংস দিয়ে কেমন খাসা নাশতা হবে ভাবতে ভাবতে সে নিজের ঘরে ঘুমোতে চলে গেল। একটু পরে জ্যাকও অন্ধকার কোণ ছেড়ে বেরিয়ে বিছানা থেকে কাঠ সরিয়ে নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়ল।
পরদিন সকালে দৈত্য এসে ঘরে উকি দিতেই জ্যাক দিব্যি আড়মোড়া ভেঙে বিছানায় উঠে বসল। দৈত্যের হতভম্ব চেহারা দেখে হাসি চেপে রাখল অনেক কষ্টে । বিনয় করে তাকে ধন্যবাদ জানাল রাতের আশ্রয়ের জন্য ।
দৈত্যের মুখে আর সহজে কথা সরে না। কেমন ঘুম হয়েছে? শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করল সে। রাতে কোন অসুবিধে হয়নি?

‘না তো, ’বলল জ্যাক। শুধু একটা ইঁদুর এসে সামান্য উৎপাত করেছিল–গায়ের ওপর লেজ আছড়েছিল দু'তিনবার।'
শুনে দৈত্য একেবারে থ হয়ে গেল। চোখ বড় বড় করে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে চলে গেল।
একটু পরে জ্যাককে নাশতা করতে ডাকল দৈত্য। জ্যাক উকি দিয়ে দেখল, খাবার টেবিলে দৈত্য তার জন্যে প্রকাণ্ড এক বাটিভর্তি পরিজ দিয়ে রেখেছে। সে ভাবল, এত পরিজ খাওয়ার সাধ্য যে তার নেই সেকথা দৈত্যকে বুঝতে দেয়া ঠিক হবে না। খেতে বসার আগে সে তাই গোপনে মস্ত একটা চামড়ার থলি নিজের ঢিলে কোটের নিচে পেটের সঙ্গে বেঁধে নিল।
দৈত্য আর জ্যাক মুখোমুখি নাশতা করতে বসেছে। জ্যাক তার প্রকাণ্ড বাটি থেকে এক থাবা পরিজ তুলে তার সামান্য একটুখানি মুখে দেয়, বাকিটা চালান করে দেয় পেটে বাধা চামড়ার থলির ভেতরে। এমনি করে খুব অল্প সময়ের মধ্যে সে পুরো বাটি শূন্য করে ফেলল। দৈত্য তার চালাকি কিছুই বুঝতে পারল না, কারণ প্রচণ্ড খিদে নিয়ে সে একমনে নিজের বাটির পরিজ সাবাড় করে চলেছে।
শূন্য বাটি একপাশে সরিয়ে রেখে জ্যাক পেটে হাত বুলোতে বুলোতে দৈত্যের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। এবার একটা জাদু দেখাই তোমাকে—কী বলো? বলে সে টেবিল থেকে একটা বড় ছুরি তুলে নিল। তারপর সেটার ধারাল ফলা নিজের পেটের ওপর দিয়ে আড়াআড়ি চালিয়ে দিল। কোটের নিচের চামড়ার থলি চিরে গেল, আর সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত পরিজ বেরিয়ে এল বাইরে ।
আমিও পারি অমন করতে! বলে উঠল দৈত্য। সে-ও একটা ছুরি তুলে নিয়ে একটানে সত্যি সত্যি চিরে ফেলল নিজের পেট । তারপর ছটফট করতে করতে প্রাণ হারিয়ে ঢলে পড়ল মেঝেতে ।
খাবার ঘর থেকে বেরিয়ে জ্যাক গোটা বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। বেশির ভাগ ঘর তালাবন্ধ। দৈত্যের চাবির গোছা খুঁজে বের করল সে, তারপর একেকটা ঘরের দরজা খুলে ভেতরে উকি দিয়ে দেখতে থাকল। দিনের বেলাতেও ঘরগুলোর ভেতর জমাট অন্ধকার। জনপ্রাণী বলতে আর কেউ কোথাও নেই। জ্যাকের গা ছমছম করতে লাগল।

একটা ঘরে ঢুকে সে দেখল, চারদিকের দেয়ালে অসংখ্য বিদঘুটে অস্ত্রশস্ত্র ঝোলানো রয়েছে। মেঝেতে ছড়িয়ে আছে নানা জীবজন্তুর হাড়গোড়। বেশ কিছু মানুষের মাথার খুলিও আছে সেসবের মধ্যে। ঘরের এক কোণে একটা প্রকাণ্ড লোহার সিন্দুক। সেটার গায়ে বিরাট একটা ভারী তালা ঝুলছে। দৈত্যের চাবির গোছা থেকে সবচেয়ে বড় চাবিটা বেছে নিয়ে সেই তালায় ঢুকিয়ে ঘোরাতেই সেটা খুলে গেল।
সিন্দুকের ভেতর পাওয়া গেল হীরে-জহরত মণিমুক্তো ভর্তি একটা বড় থলি। আর পাওয়া গেল তিনটে অদ্ভুত জিনিস—একজোড়া পুরনো জুতো, একটা মলিন কোট আর একটা মরচে-পড়া তলোয়ার। জ্যাক ভাবল, সিন্দুকের ভেতর এত যত্ন করে তুলে রাখা হয়েছে যখন, তখন নিশ্চয় এগুলোর প্রত্যেকটার কোন-না-কোন আশ্চর্য গুণাগুণ রয়েছে। দৈত্যের ধনরত্বের থলির সঙ্গে সেগুলোও সে সিন্দুক থেকে বের করে নিল। তারপর বেরিয়ে এল বাড়ির বাইরে।

একটু পরীক্ষা নিরীক্ষা করতেই জিনিসগুলোর রহস্য বুঝে ফেলল জ্যাক—জুতোজোড়া পায়ে দিয়ে চোখের নিমেষে চলে যাওয়া যায় যেখানে ইচ্ছে, কোটটা যে পরবে সে সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে যাবে, আর তলোয়ারটা দিয়ে কোপ দেয়ামাত্র দু'ভাগ হয়ে যাবে যে-কোন জিনিস ।
সেগুলো সঙ্গে নিয়ে জ্যাক আবার অভিযানে বেরিয়ে পড়ল। দুর্গম পাহাড়-পর্বত আর বন-জঙ্গল পেরিয়ে অনেক পথ পাড়ি দিয়ে অনেক দিন পরে শেষ পর্যন্ত আবার এক দৈত্যের দেখা পেল সে । ভয়ঙ্কর সেই দৈত্যের বাস এক পাহাড়ের গুহায়। গুহার সামনে বসে সে তখন বিশ্রাম নিচ্ছিল, পাশেই রাখা একটা প্রকাণ্ড লোহার মুগুর। যেমন বিকট তেমনি ভয়াবহ তার চেহারা। চোখদুটো লাল টকটকে আগুনের গোলার মতো। আর চুল তো নয়, যেন কুণ্ডলী পাকানো সাপের গোছা।
বেশ খানিকটা দূরে থাকতেই জ্যাক ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে পড়ল। তারপর গায়ে চড়াল তার জাদুর কোট। অদৃশ্য অবস্থায় এবার সে নিৰ্ভয়ে দৈত্যের কাছে এগিয়ে গেল।
এই যে, বাছাধন গলা চড়িয়ে হাক দিল জ্যাক, এখুনি তোমাকে খতম করছি আমি, দাঁড়াও ।
দৈত্য অবাক হয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। জ্যাক এক লাফে একেবারে সামনে গিয়ে জাদুর তলোয়ারের এক ঘায়ে দৈত্যকে দু’টুকরো করে ফেলল।

এরপর দৈত্যের গুহার ভেতরে ঢুকল সে। কামরার পর কামরা পার হয়ে এগিয়ে চলল। শেষ পর্যন্ত প্রকাণ্ড এক কামরায় এসে দেখল মস্তবড় একটা টেবিল পাতা রয়েছে। পাশেই বিশাল একটা তামার পাত্রে কী যেন ফুটছে টগবগ করে। বোঝা গেল, এটাই ছিল দৈত্যের খাবার ঘর। এর পরের ঘরটার লোহার দরজা খুলে অসংখ্য বন্দীর দেখা পেল জ্যাক। বন্দীরা জানাল, দৈত্য তাদের নানা জায়গা থেকে ধরে এনে আটকে রেখেছিল—প্রতিদিন তাদের ভেতর থেকে সবচেয়ে মোটাতাজা লোকটাকে বেছে নিয়ে মেরে খেত সে।
সব বন্দীকে বন্দীশালা থেকে বের করে আনল জ্যাক। নতুন জীবন পেয়ে তারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল। জ্যাক গুহার ভেতর থেকে দৈত্যের সমস্ত ধনরত্ন খুঁজে বের করে বন্দীদের সবার মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দিল। তারপর তাদের সঙ্গে নিয়ে কাছাকাছি এক দুর্গে গিয়ে উঠল। বিরাট এক ভোজের আয়োজন করা হলো সেখানে, সবাই মিলে আনন্দ-উৎসবে মেতে উঠল।
কিছুদিন বেশ ভালোই কাটল। তারপর হঠাৎ একদিন জ্যাকের কানে এল, থানডারডেল নামের দুমাথাওয়ালা এক দৈত্য নাকি দুর্গে হানা দিতে আসছে। যে দৈত্যকে জ্যাক বধ করে এসেছে তার ভাই এই থানডারডেল। সে আসছে প্রতিশোধ নিতে।
দুর্গের চারপাশ ঘিরে রয়েছে গভীর পরিখা। তার ওপরে একটামাত্র কাঠের সেতু। শেকলে বাঁধা সেই সেতু ইচ্ছে করলে দুর্গের দিক থেকে তুলে নেয়া যায়। কিন্তু তা না করে জ্যাক কয়েকজন লোককে বলল সেতুর এক জায়গায় ধারাল করাত দিয়ে দু’পাশ থেকে প্রায় মাঝামাঝি পর্যন্ত চিরে রাখতে। এরপর সে জাদুর কোট পরে তলোয়ার হাতে দুর্গ থেকে বেরিয়ে নিজেই দৈত্যের সন্ধানে চলল।
বেশি দূর যেতে হলো না জ্যাককে। পথেই দৈত্যের দেখা পেয়ে গেল। দৈত্য তাকে চোখে দেখতে না পেলেও মানুষের গন্ধ পেয়ে থমকে দাঁড়াল। বিকট স্বরে হুঙ্কার দিয়ে বলল:

হাঁউ, মাউ, খাউ! 
মানুষের গন্ধ পাউ!

তুমি নাকি আমাকে মারতে চাও? জ্যাক তাচ্ছিল্যের সুরে বলল। কোথায় তুমি?" থানডারডেল গর্জে উঠল, আমার ভাইকে তুমিই তাহলে মেরেছ? প্রতিশোধ নেব আমি এখখুনি তোমাকে পিষে মেরে হাড়-মাংস চিবিয়ে খাব!’
বেশ তো খুব ভালো কথা, বলল জ্যাক, তবে আগে আমাকে হাতে পেতে হবে তো!’
একটু দূরে সরে এসে সে আগে জাদুর জুতোজোড়া পরে নিল, তারপর কোট খুলে ফেলল গা থেকে। দৈত্য তাকে দেখতে পেয়েই ধরবার জন্যে ধেয়ে এল।
জাদুর জুতো পায়ে তীরবেগে ছুটে চলল জ্যাক। থানডারড়েলও মুগুর হাতে তার পিছু ধাওয়া করল। পাহাড়সমান সেই দৈত্যের পায়ের চাপে গাছপালা থেতলে যাচ্ছে, গুড়ো হয়ে যাচ্ছে বড় বড় পাথরের চাই, মাটি কাঁপছে থরথর করে। একেকবার জ্যাকের খুব কাছে এসে পড়ছে সে, কিন্তু কিছুতেই তার নাগাল পাচ্ছে না।
শেষ পর্যন্ত দুর্গের কাছে এসে পড়ল দু’জন। জ্যাক হালকা পায়ে সেতুর ওপর দিয়ে দৌড়ে পরিখা পার হয়ে গেল। রাগে গরগর করতে করতে দৈত্যও সেতুর ওপর উঠে পড়ল। কিন্তু সে মাঝামাঝি যেতেই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল সেতু, সে-ও গিয়ে পড়ল পরিখার গভীর পানিতে।

জ্যাক পরিখার কিনারায় দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাক শুনে দুর্গের সব লোকজন ছুটে এল। পরিখার ভেতর থেকে থানডারডেল কিছুতেই উঠে আসতে পারছে না। লম্বা একগাছা মোটা দড়ি আনতে বলল জ্যাক । সেটার একপ্রান্তে ফাঁস তৈরি করে দৈত্যের দুমাথার ওপর ছুড়ে দিল। দৈত্যের গলায় ফাস আটকে যেতেই দড়ির অন্য মাথা কয়েকটা ঘোড়ার সঙ্গে জুড়ে দেয়া হলো। বলবান ঘোড়াগুলো দৈত্যের বিশাল দেহ টেনে তুলল পরিখা থেকে। অমনি জ্যাক তলোয়ারের এক ঘায়ে তার দুটো মাথাই ধড় থেকে আলাদা করে ফেলল।
সবার মনে স্বস্তি ফিরে এল। আবার শুরু হলো পান-ভোজন, আনন্দ-উৎসব ।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য