প্রফেসর ঝমলু ও ডাইনোসর--মুহাম্মদ রিয়াজুল আমীন

পানি দিয়ে গাড়ি চালানোর ওপর একটা গবেষণা করছিলাম। কাজের চাপে কোন দিক দিয়ে যে তিনটা দিন চলে গেল, টেরই পাইনি। আজ সকালবেলা যখন আমার হাত-পা অবশ হয়ে এল আর চোখে একটু ঘোলা ঘোলা দেখতে শুরু করলাম, বুঝলাম ঘুম দরকার।
শোবার আগে চোখে স্বপ্ন দেখার যন্ত্র ‘স্বপ্নচারী’ পড়ে নিয়েছিলাম। মাত্র স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি যে আমি আর নিউটন বসে বসে অঙ্ক কষছি। নিউটনের সূত্রের ভুলটা যখনই ধরিয়ে দিতে যাব, তখনই বিকট শব্দে মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। মোবাইল ফোন আমার খুব অপছন্দ। এর বদলে অন্য কী নিয়ে আসা যায়, সেটা নিয়ে একটা গবেষণা করছি। যদি ঠিকমতো শেষ হয়, তাহলে মোবাইল ফোনের আর দরকার হবে না। যাকে ফোন করার ইচ্ছা, তাঁর কথা চিন্তা করলেই হবে। সরাসরি আমাদের মস্তিষ্ক তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে নেবে। কোনো শব্দ হবে না, কাঁপাকাঁপি হবে না। সহজ ও স্বাভাবিক।
প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখলাম আমার বন্ধু আমির আলী ফোন করেছে। এই সাতসকালে এত কী প্রয়োজন? ‘হ্যালো’।
ফোনের ওপাশ থেকে আমির আলী রীতিমতো চিত্কার করে উঠল, ‘ঝমলুউউউ, তুমি বিশ্বাস করবে না আমি কী পেয়েছি...’
আমার বিরক্তির সীমা প্রায় শেষের পর্যায়ে। আমির আলী প্রায়ই পুরোনো কবিতা আবিষ্কার করে মহা উত্সাহে আমাকে পড়ে শোনায়। এবারও হয়তো তেমন কিছুই হবে। বিরক্তিটা প্রকাশ না করে ঠান্ডা মাথায় বললাম, ‘কী পেয়েছ?’
সে দ্বিগুণ জোরে চিত্কার করে বলল ‘ডাইনোসর’!
ধরেই নিয়েছিলাম সে কোন কবিতার কথা বলবে। কিন্তু যখন বলল ‘ডাইনোসর’, তখন মাথার ভেতরটা টুক করে নড়ে উঠল। চোখে যা একটু ঘুম লেগে ছিল, পুরোটাই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। কারণ, ডাইনোসর নিয়ে আমার গবেষণা অনেক দিনের। একবার লন্ডনের ন্যাশনাল মিউজিয়াম থেকে ডাইনোসরের জিন এনে আমি ডাইনোসর জন্ম দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু সম্ভব হয়নি।
আমির আলী বলল, ‘তুমি কোথাও যেয়ো না। এক ঘণ্টার ভেতর তোমার বাসায় আসছি।’ বলেই সে লাইন কেটে দিল। হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ ফোন কানে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। যখন হুঁশ হলো, বুঝলাম অনেক দিনের সাধ পূরণ হওয়ার উত্তেজনায় আমার বুক ধুকধুক করছে।
ঠিক এক ঘণ্টা পর আমির আলী এল। মাথার চুল উষ্কখুষ্ক, চোখ ভারী। বোঝাই যাচ্ছে কয়েক রাত ঘুমায়নি, কিন্তু নতুন কিছু আবিষ্কারের উত্তেজনায় তার চোখ চকচক করছে। তাকে নিয়ে সোজা চলে গেলাম ল্যাবরেটরিতে।
‘শোনো ঝমলু, তুমি তো জানোই গত বছর আমি কেনিয়া গিয়েছিলাম ভাষাতত্ত্বের ওপর একটা সম্মেলনে। সম্মেলন শেষ করার পরেও কয়েক দিন ছিলাম। গিয়েছিলাম মাসাইমারার জঙ্গলে। সেখানে অনেক পুরোনো একটা সভ্যতার সন্ধান পেয়েছে বিজ্ঞানীরা। পৃথিবীর কাউকে জানানো হয়নি, কিন্তু সেখানকার প্রধান গবেষক বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ মিখাইল আমার বন্ধু হওয়ায় তাঁর সঙ্গে আমি সেখানে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। মিখাইলের মতে, এই সভ্যতা অনেক উন্নত ছিল। বিভিন্ন বাড়ি থেকে তারা একেবারে আধুনিক যুগের ইলেকট্রিক্যাল জিনিসের মতন নিদর্শন পেয়েছে। এই শহরেই একটা বাড়িতে তারা অনেক বই আবিষ্কার করেছে। ধারণা করা হচ্ছে এই বাড়িটা লাইব্রেরি ছিল। যদিও সব বইই একেবারে নষ্ট হয়ে গিয়েছে তারপরেও কিছু কিছু লেখা পড়া যায়। সেখান থেকেই কিছু লেখার পাঠোদ্ধার করতে নিয়ে এসেছিলাম আমি। প্রথম কয়েকটা লেখা ছিল শুধুই গল্প। কিন্তু হঠাৎই একটা লেখায় পেয়ে গেলাম সেই সময়ের গবেষণার দিনলিপি। “উল্ভাকিয়া” নামে এক বিজ্ঞানী নিজের ল্যাবরেটরিতে বসে ডাইনোসরের জন্ম দিয়েছিলেন। তাঁর তত্ত্বমতে ডাইনোসর যেহেতু পৃথিবীর মাটিতে বিচরণ করেছে, সেহেতু এই মাটি থেকেই তাদের জিন উদ্ধার করা সম্ভব। এই গবেষণার অন্যতম একটা অংশ ছিল তএকেবারে ছোট্ট আকারের ডাইনোসর কীভাবে তৈরি করা যায়, তার ওপর। টিকটিকির ডিমের ভেতর ডাইনোসরের বাচ্চা জন্ম দিয়ে তিনি সফলও হয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল, তা আর পড়তে পারিনি। কারণ, সব লেখা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। কিন্তু কোথা থেকে কী ধরনের উপাদান দিয়ে ডাইনোসরের জন্ম দেওয়া যায়, সব লেখা আছে এই জর্নালে।’
আমির আলীর কথা শুনে আমার বুকের ধুকধুক এক শ গুণ বেড়ে গেল। আর দেরি না করে কাজে লেগে গেলাম। জার্নালের লেখা অনুযায়ী সারা দিন ছোটাছুটি করে মাটি, গাছের বাকল, চড়ুই পাখির পালক, আনারসের কষসহ বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করলাম। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হলো টিকটিকির ডিম খুঁজে বের করতে। টিকটিকি কোথায় ডিম পাড়ে, সেটা তো আর সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। তারপরেও বাসার দেয়ালে গর্তটর্ত খুঁড়ে একসময় পেয়ে গেলাম টিকটিকির ডিম। সবকিছু ঠিকঠাক মতন জোগাড় করে, জার্নালের লেখা পদ্ধতি অনুযায়ী ডিএনএ সংগ্রহ করলাম। তারপর তা টিকটিকির ডিমের ভেতর প্রবেশ করিয়ে চড়ুই পাখির পলক দিয়ে ডিমটি খুব সুন্দর করে মুড়িয়ে ইনকিউবেটরে রেখে দিলাম। এখন অপেক্ষার পালা।
রাত বারোটা বাজে। সবকিছু ঠিক থাকলে জার্নালের লেখা অনুযায়ী ঠিক পাঁচ ঘণ্টা পর জন্ম নেবে ডাইনোসরের বাচ্চা।
কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, টের পাইনি। ঘুম ভাঙল চিঁ চিঁ একটা শব্দে। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি ভোর ছয়টা বাজে। তার মানে ডাইনোসর এক ঘণ্টা আগে জন্ম নিয়েছে। সোফায় হাত-পা তুলে আরাম করে ঘুমিয়ে চিকন শব্দে নাক ডাকছিল আমির আলী। নাক ডাকার শব্দেই ঘুম ভেঙেছে আমার। তাকে ঘুম থেকে টেনে তুলে ছুটে গেলাম ল্যাবরেটরিতে রাখা ইনকিউবেটরের কাছে। গিয়ে দেখলাম ডিমটা যেমন রেখেছিলাম, তেমনই আছে। কোনো পরিবর্তন হয়নি। মনটাই খারাপ হয়ে গেল। আমির আলী তো পারলে কেঁদে ফেলে। সে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘ঝমলু, এখন কী হবে?’ আমি উত্তরে কিছুই বললাম না। শুধু মনে মনে ভাবলাম, ‘পদ্ধতি যখন আছে, তখন ডাইনোসর জন্ম দিয়েই ছাড়ব। আজ হোক কাল হোক, ছোট্ট একটা ডাইনোসরের বাচ্চা পোষ মানিয়ে রাখবই!’



মুহাম্মদ রিয়াজুল আমীন | সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৫ | দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকা
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য