চপের ভেতর ভূত -- উল্লাস মল্লিক

     চপের ভেতর ভূত’—গল্পটা লিখে নিজেরই গা ছমছম করতে লাগল সাহিত্যিক করালীচরণের। করালীচরণ সাহসী মানুষ। রাতবিরেতে যাত্রা দেখে একা ফেরেন, অমাবস্যার রাতে নির্জন শ্মশানে যেতে বুক কঁপে না, মাঝে মাঝে নিশুতি রাতে ডাকাতে কালীতলায় গিয়ে গল্পের প্লট ভাবেন।
কিন্তু এখানে ভূতের যে বর্ণনাটা তিনি দিয়েছেন তা বড় সাংঘাতিক। আলকাতরার মতো গাত্রবর্ণ, মোটর গাড়ির হেডলাইটের মতো তীব্র দুটো চোখ, গায়ে সজারুর মতো খোঁচা খোঁচা কাটা। পরনে রক্তাম্বর, গলায় রদ্রাক্ষের মালা। রুদ্রাক্ষের মালাটা দেওয়া ঠিক হল কিনা বুঝে উঠতে পারছেন না। জিনিসটা কাপালিকরা পরে। তবে ভূতেরা পরবে না, এমন কথা নেই। ভাবলেন, আপাতত থাক, পরে না হয় এর ওপর একটা মুন্ডুমালা দিয়ে দেবেন।
      করালী যে খুব রোগা-পাতলা মানুষ তাও নয়। পেটানো চেহারা, গা-ভর্তি গুলি গুলি মাসল, বাজখাই গলা। দু’ছেলেমেয়ে নিয়ে সুখের সংসার। একশো বিঘে ধানি জমি, পনেরো-বিশ বিঘে সবজি বাগান, মাছ কিলবিলে পুকুর পাঁচসাতটা। অভাব বলতে কিছু নেই। কিন্তু করালীচরণের দুঃখটা অন্য জায়গায়। করালী লেখক। আর পাঁচটা হেজি-পেজি লেখকের মতো তিনি চোর, ডাকাত, গোয়েন্দা বা পরিদের গল্প লেখেন না। তার একমাত্র বিষয় ‘ভূত‘। ভূতের গল্পে তিনি স্পেশালিস্ট। নয় নয় করেও অদ্যবধি শ’খানেক গল্প লিখে ফেলেছেন। কিন্তু দুঃখের কথা ছাপা হয়নি একটাও। পত্রিকা সম্পাদকেরা আর ভূতের গল্প ছাপতে চাইছে না। তাদের এক কথা, ভূতেদের দিনকাল গেছে। চারদিকে এত পিলপিলে লোক, জোরালো বৈদ্যুতিক আলো, লোকের আর ভূতে বিশ্বাস নেই।

     তবে তিনি সবচাইতে আঘাত পেলেন কিছুদিন আগে। ‘অশরীরী’ নামে একটা পত্রিকা আছে যারা কিনা শুধুই ভূতের গল্প ছাপে। অনেক আশা নিয়ে একখানা জোরালো গল্প পাঠিয়েছিলেন সেখানে। সম্পাদক ভূতেশ নন্দী কথা দিয়েছিলেন গল্পটা ছাপা হচ্ছে। আনন্দের চোটে করালী পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনদের কাছে রাষ্ট্রও করেছিলেন খবরটা। ক'দিন আগে পত্রিকা দফতর থেকে হঠাৎ তার কাছে একটা চিঠি আসে। দুঃখ-টুঃখ প্রকাশ করে অশরীরী সম্পাদক যা লিখেছেন তার মর্মার্থ এই যে, করালীবাবুর গল্পটা প্রেসে চলে গিয়েছিল; এমন সময় এক নবীন গল্পকার একটি গল্প নিয়ে আসে। সেটি এতই ভয়ঙ্কর যে স্বয়ং সম্পাদক পড়তে পড়তে চেয়ারে বসেই অজ্ঞান হয়ে যান। সুতরাং, সেই গল্প না ছেপে উপায় নেই। করালীচরণের গল্পটা তিনি পরে কোনওদিন ছেপে দেবার চেষ্টা করবেন; করালীবাবুর যেন কিছু মনে না করে—ইত্যাদি। পুনশ্চ দিয়ে সম্পাদক আরও লিখেছেন, প্রেসের কম্পোজার আর প্রুফ রিডারও নাকি গল্পটি পড়াকালীন জ্ঞান হারায়।
     সন্ধে হয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগে। মেয়ে নিশাচরী বাটি ভর্তি করে ফুরফুরে মুড়ি দিয়ে গেল করালীচরণকে। নৈবিদ্যির মাথায় সন্দেশের মতো, মুড়ির ওপর বড়সড় একটা চপ। দেখেই বোঝা যায় গরম, মনমাতানো গন্ধ পেলেন করালী। মনটা তার বেশ প্রফুল্ল হয়ে উঠল।

     এক গাল মুড়ি মুখে পুরে চপে একটা কামড় দিলেন করালীচরণ। আবেশে চোখদুটো বুজে এল। হঠাৎই চপটা হাত থেকে পিছলে বাটিতে পড়ে গেল। করালীচরণ তুলতে যাবেন, অমনি কে যেন বলে উঠল, ওহ্‌, বাঁ পা-টা একদম জখম করে দিলেন যে।’
     বুকের মধ্যে ছ্যাৎ করে উঠল করালীচরণের। এদিক-ওদিক তাকালেন; কিন্তু কাউকে দেখতে পেলেন না; ভাবলেন, মনের ভুল। চপটা ফের তুলতে যাবেন, ফের কে যেন বলে উঠল, ‘দেখেছেন, আপনার সামনের দাঁতগুলো একেবারে দগদগে হয়ে বসে গেছে...।”
     একটু কাঁপা গলায় করালীচরণ বললেন, কি-কে! আশ্চর্য তো, আজ সারাটাদিন আমায় নিয়ে পড়ে আছেন, আর আমাকেই চিনতে পারলেন না। নিবাস আমার চপের ভেতর।’

     করালীচরণের বুকের মধ্যে কে-যেন ভুটভুটি ভ্যান চালিয়ে দিয়েছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। কোনওরকমে বললেন, তাই নাকি? চপের ভেতর থেকে ভেসে এল,—তা শাস্তিতে একটু থাকব, জো কী! চপ তো আমিও ভালোবাসতুম, কিন্তু এত নোলা ছিল না। হাতে পেলেই আপনারা সব এত বড়বড় কামড় বসান, সরে বসার টাইম পর্যন্ত পাই না...।”
একটু সামলে নিয়ে করালী বললেন, তা এত জায়গা থাকতে অমন বেয়াড়া জায়গায় ঠিকানা নিলে কেন ??
     আমার দুঃখের কথা কী আর শুনবেন! গেল জন্মে সূক্ষ্ম দেহ পেয়েছিলুম। তা সূক্ষ্ম দেহ পেলেও বাসের তো একটা পাকাপোক্ত ঠেক চাই; এদিকে আবার নিরিবিলি জায়গার বড় অভাব; গাছপালা তো আপনারা সব মেরে কেটে সাফ করে দিলেন, হানাবাড়ি যেগুলো ছিল প্রোমোটার সব ফ্ল্যাট বানিয়ে ফেলেছে। তো হল কী, যেদিন জায়গার বিলিব্যবস্থা সেদিন আমার পৌছুতে একটু দেরি হয়ে গেল। যাবার পথে দেখি শিবু ময়রা চপ ভাজছে, লোভে পড়ে দু’খানা সরিয়ে খেয়ে ফেললুম। গিয়ে দেখি শাওড়া, তাল, বেল, নিম সব ভালো ভালো গাছ আগেই বিলি হয়ে গেছে। যে বুড়ো জায়গা বিলিবন্টন করছিল সে মানুষজন্মে মিলিটারি ছিল, পাকিস্তান বর্ডারে গুলি খেয়ে মরেছে। তা মিলিটারিম্যান যেমন হয়, খুব কড়া, ভীষণ রাগি, লেট একদম দেখতে পারে না। প্রচণ্ড রেগে গিয়ে বলল, চিপে যখন এতই নোলা, তখন চপেই থাক! সেই থেকে বড় কষ্টে আছি দাদা।’
     করালীচরণ বুঝলেন, এ ব্যাটা ভূত হলেও নিরীহ গোছের। বুকে একটু বল পেলেন। বললেন, তা চপে থাকতে অসুবিধে কী, বেশ তো জায়গা...।”
     বলেন কী! সমস্যা কি একটা ? একে তো ঘুপসি জায়গা, হাত-পা গুটিয়ে থাকতে হয়। তারপর যেটাতে থাকি, বিক্করি হয়ে গেলে অন্য চপে গিয়ে ঢোকো আবার। আপনি তো মনগড়া বর্ণনা দিয়েই খালাস। রং আমার কালো নয় মোটেও; শ্যামবর্ণ ছিলুম, ভাজা হতে হতে ফ্যাকাসে মেরে গেছি। চোখ জ্বালা তো দূরের কথা, ছানির জন্যে ভালো দেখতেই পাই না। গায়ে কিছু লোম ছিল বটে, সেসব এখন নেতিয়ে সুতো; আর আপনি লিখে দিলেন আমার গায়ে সজারুর মতো কাঁটা। লেখকদের বাস্তবজ্ঞানের বড় অভাব।’
     করালীচরণ বললেন, 'এঃ হেঃ, তুমি এত বেচারি জীব সত্যি জানতুম না ভাই।’
     ‘বেচারি বলে বেচারি! কত সমস্যা। মানুষের চপে বড্ড নোলা। তন্দ্রা এসেছে, একটু ঝিমুচ্ছি, অমনি কেউ একজন দিল পেল্লায় কামড়। হাত-পা একেবারে জখম। এই তো সেদিন, এক বুড়ো, নাতিকে ভাগ দিতে হবে বলে, চপটা গোটাগুটি মুখে ঢুকিয়ে দিল। আমার তো প্রাণ যায়-যায় অবস্থা। ভাগ্যিস বুড়োর বা-ধারের কষের দুটো দাঁত ফোকলা ছিল, আমি কোনওরকমে সুড়ৎ করে গলে বাইরে আসি। এখনও গা-গতর টাটিয়ে বিষ। 
করালীচরণ খুব দুঃখ-দুঃখ গলায় বললেন, আহা রে!’ 
     খুব কাতর স্বরে চপ-ভূত বলল, আপনার কাছে একটা আর্জি আছে লেখকমশাই।’
     করালীচরণ একটু সতর্ক গলায় বললেন, কী? আপনার পুকুরের পশ্চিমপাড়ের যে বুড়ো তালগাছটা কাটার কথা ভাবছেন, আমি বলি কী, ওটা থাক। সামান্য একটা গাছ বেঁচে আপনি আর ক’পয়সা পাবেন! ভাবছি আমি, ওটাতে আস্তানা গাড়ব, বেশ নিরিবিলি শাস্তির জায়গা।’

     করালীচরণের মাথায় ধা-করে একটা বুদ্ধি খেলে গেল। বললেন, ঠিক আছে; তালগাছ কাটব না; আমার কিন্তু একটা কাজ করে দিতে হবে।’ 
     ‘বলেন, বলেন?’
     ‘এই গল্পটা একটা পত্রিকায় পাঠাচ্ছি। সম্পাদককে ভয় দেখিয়ে, বা যে করেই হোক ছাপাবার ব্যবস্থা করে দিতে হবে।’
     “এ আর এমন কী কথা; হয়ে যাবে, আপনি নিশ্চিত থাকুন। 
     ‘ঠিক তো!’ 
     ‘একদম ঠিক, একশোবার ঠিক! আজ আসি, আপনি তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দিন ওটা...।”
     করালীচরণ দেখলেন একটা মৃদু বাতাস টেবিলের কাগজপত্রকে একটু কাঁপিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল। তিনি একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। কিন্তু মনে একটা খটকাও থেকে গেল। বড্ড নিরীহ গোছের চেহারা। সম্পাদক ভয় পেলে হয়!
ভাবতে ভাবতে আধখাওয়া ঠান্ডা চপে সাবধানে ছোট্ট একটা কামড় বসালেন সাহিত্যেক করালীচরণ।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য