সেরটা কত বড় - বাংলাদেশের লোককাহিনী

     তাঁতি আর তাঁতির বউ। সারাদিন তাঁত খট্‌ খট্‌, চরকা ঘড় ঘড়। সকাল হইতে সন্ধ্যা এদের কাজের বিরাম নাই । কিন্তু এত কাজ করিয়াও পেট ভরিয়া খাইতে পায় না । তাঁতের কাপড় বিক্রি করিয়া অতি সামান্যই তাহারা আয় করে।      একদিন তাঁতির বউ তাঁতিকে ডাকিয়া বলিল  “দেখ, আমাদের বাড়ির কাছে চাষীরা কত সুখে আছে । তাদের ক্ষেতে ধান হয়, কাউন হয়, আরও কত রকমের ফসল হয় । এসব দিয়া গেরস্ত বউরা বারোমাসে তের রকমের পিঠা করে।
     তুমি এক কাজ কর । এই তাত-খুটি বেচিয়া বাজার হইতে বীজধান কিনিয়া আন । আমাদের বাড়ির কাছের ওই জমিটায় আমরা ধান বুনিয়া দিব । 
     তাঁতি বলিল, “বউ । তুই খুব ভাল পরামর্শ দিয়াছিস । আমাদের ক্ষেতে যখন ধান হইবে, তখন কি মজাই না হইবে! নতুন ধান ভানিয়া তুই কি কি পিঠা বানাইবি ?” 
     তাঁতির বউ বলে, “চিতই পিঠা, পাঠিসাপটা পিঠা, বড়া পিঠা ।” শুনিয়া তাতির জিহবায় পানি আসে আর কি ! বল ত খোকাখুকুরা, তাঁতির বউ আর কি কি পিঠা বানাইবে ? যে আগে বলিতে পারিবে তারই জিত । 
     মহাউৎসাহে তাঁতি তার তাঁত-খুটি মাথায় করিয়া হাটে চলিল। অনেক দরদস্তুর করিয়া সে পাচসিকাতে সেই তাঁত-খুটি বিক্রি করিল। তারপর যাকে দেখে তাকেই জিজ্ঞাসা করে, “তোমার কাছে বীজধান আছে ?” 
     বেনেতি দোকানে, ওষুধের দোকানে যাইয়া সে জিজ্ঞাসা করে, “পাচসিকার বীজধান দিতে পার ভাই ? 
    সবাই ঠাট্টা করিয়া তাঁতিকে তাড়াইয়া দেয়। বীজধান ত আর যেখানে সেখানে যার তার কাছে পাওয়া যায় না । আগেকার দিনে হাটে বাজারে দু’একজন ট্যাটন থাকিত । লোক ঠকাইয়া তাহারা টাকা-পয়সা উপার্জন করিত । তাতি এমনই এক ট্যাটনের কাছে বীজধানের খোজ করিতেই সে তাঁতিকে খুব আদর করিয়া হাটের বাহিরে একটি চষা ক্ষেতের কাছে লইয়া গেল । 
     চাষীরা চষা ক্ষেত হইতে ঘাসের শিকড়-বাকড় কুড়াইয়া এক জায়গায় জড়ো করিয়াছিল। উদ্দেশ্য ছিল, এগুলি রৌদ্রে শুকাইয়া আগুন দিয়া পুড়াইয়া ফেলিবে । তাহাতে সেই শিকড়-বাকড়গুলি হইতে ঘাসের চারা গজাইবে না । 
     সেই চালাক ট্যাটন বোকা তাঁতির নিকট হইতে পাচসিকা দাম লইয়া একবস্তা ঘাসের শিকড়-বাকড় বিক্রি করিল। আর
     বলিয়া দিল, “তোমার জমিটা খুব ভাল করিয়া চষিয়া এগুলি বুনিয়া দিও । খুব ভাল ফসল হইবে।” 
     বস্তা মাথায় করিয়া বাড়ি ফিরিল। পরদিন সকাল না হইতেই তাতি আর তার বউ কোদাল লইয়া তাহাদের বাড়ির সামনের জায়গাটি কোপাইতে লাগিল । তাহাদের ত গরু নাই যে জমি চষিয়া লইবে । 
    তাঁতি আর তার বউ । তারা তাঁত চালাইতে জানে, চরকা ঘুরাইতে পারে, কিন্তু জমি কোপাইতে তাহারা বড়ই হয়রান হইয়া পড়িল । অপটু হাতে কোদাল চলে না। তাঁতি মাটিতে এক কোপ মারিয়া হাপাইয়া পড়ে, তাঁতির বউ কোদাল লইয়া মাটিতে আর এক কোপ দিয়া শুইয়া পড়ে। তাঁতি গামছা দিয়া বাতাস করিয়া তাকে সুন্থ করে। আবার তাঁতি কোদাল লইয়া মাটিকে দুই তিন কোপ দিয়া হয়রান হইয়া পড়ে, তাঁতির বউ তার কপালে তেল মালিশ করে, হাত পা টিপিয়া দেয় । 
     এইভাবে প্রায় একমাস পরিশ্রম করিয়া বাড়ির সামনের জমিটুকু তারা কোপাইয়া শেষ করিল। শুধু কি কোপাইল ? জমিতে ঘাসের শিকড়-বাকড় যা কিছু ছিল সব বাছিয়া ক্ষেতের এক পাশে জড়ো করিল। 
     শুভদিনে শুভক্ষণে তারা হাট হইতে কেনা সেই ঘাসের শিকড়-বাকড় ক্ষেতের মধ্যে ছড়াইয়া দিল । তারপর তাঁতি আর তার বউ প্রতিদিন সকালে বিকালে সেই জমিতে কলসি কলসি পানি আনিয়া ঢালিতে লাগিল । একে ত ঘাসের শিকড়-বাকড়, তার উপর এত যতু! কয়েক দিনের ভিতরেই কালো ঘাসের মতো করিয়া তাঁতির ক্ষেতখানি নতুন নতুন ঘাসের চারায় ভরিয়া গেল। দেখিয়া তাদের কি আনন্দ । তাহারা আরও যত্ন করিয়া ক্ষেতে পানি ঢালিতে লাগিল ।
     অল্পদিনের মধ্যেই সেই ক্ষেতের ঘাস বুক সমান উচু হইয়া উঠিল । তাঁতি আর তার বউ মনের খুশিতে সেই ক্ষেতের চার পাশ ঘুরিয়া নাচে আর গান করে। ভোর হইতেই তাঁতি ছুটিয়া আসে তার ক্ষেত দেখিতে । 
    সেদিন অসিয়া দেখে কি, কার যেন গরু আসিয়া ক্ষেতের ধান খাইয়া গিয়াছে। সারাদিন অনেক জল্পনা-কল্পনা করিয়া তাঁতি রাত্র জাগিয়া ক্ষেত পাহারা দিতে লাগিল । 
     রাত যখন ভোর হয়-হয়, এমন সময় তাতি দেখে কি, কার যেন একটা গরু আসিয়া তার ক্ষেতের ধান খাইতেছে । তাঁতি তাড়াতাড়ি যাইয়া গরুটির লেজ ধরিয়া ফেলিল।
     গরুটি তৎক্ষণাৎ আকাশে উড়িতে আরম্ভ করিল। উড়িতে উড়িতে মুনিঠাকুরের আথালে যাইয়া পৌছিল। তাঁতি ত গরুর লেজ ধরিয়াই আছে। 
     সেই গরুটি ছিল আকাশের মুনিঠাকুরের । সকালবেলা দোহাইতে আসিয়া মুনিঠাকুর দেখেন, তাঁর গরুর লেজ ধরিয়া একটি মানুষ। মুনিঠাকুরকে দেখিয়া, তাঁতি তেড়িয়া-বেড়িয়া বলিল, “আপনার কি আক্কেল ? আমি গরিব মানুষ! আপনার গরু ছাড়িয়া দিয়া আমার ক্ষেতের ধান খাওয়ান!” 
     তাঁতির প্রতি মুনিঠাকুরের দয়া হইল। মুনিঠাকুর তাঁতিকে দু্ি সের চাউল দিয়া বলিলেন, “এই চাউল লইয়া গিয়া একটি হাড়ির মধ্যে রাখিবে । সেই হাড়ি হইতে যত চাউল লইবে হাড়ির চাউল ফুরাইবে না! কিন্তু সাবধান! হাড়ির চাউল যদি কাউকে ধার দিবে, তবে কিন্তু চাউল আর বাড়িবে না। আমার গরুকে তোমার ক্ষেতে যাইতে দিও। তাকে ঘাস খাইতে বাধা দিও না।” 
     সন্ধ্যা হইলে মুনিঠাকুরের দেওয়া সেই চাউল গামছায় বাঁধিয়া গরুর লেজ ধরিয়া তাঁতি বাড়ি ফিরিয়া আসিল । তাঁতির বউ খুঁটিয়া খুঁটিয়া তাঁতির নিকট হইতে সমস্ত খবর শুনিল । 
     তারপর প্রতিদিন ই হাঁড়ি হইতে চাউল লইয়া তাঁতি আর তাঁতির বউ ভাত রাঁধিয়া পেট ভরিয়া খায় । মনের আনন্দে
     তাতির বউ পিঠা তৈরি করে। আজ এ পিঠা, কাল সে পিঠা ; অল্পদিনের মধ্যে তাহাদের নাদুসনুদুস চেহারা হইয়া উঠিল। 
     বাড়ির কাছে এক গেরস্তের বউ । সে বলে, “দেখরে, তাঁতির বউ রোজ আসিত আমার কাছে এটা ওটা ধার করিতে, ভাতের ফেন লইয়া যাইতে ; কিন্তু আজ একমাসের মধ্যে তাতির বউ আমাদের বাড়িতে আসে না। ওদের চেহারাও ত বেশ মোটাসোটা হইয়া উঠিয়াছে। না-খাওয়া মানুষের মতো লাগে না । ইহার কারণ কি ?” 
     গেরস্ত-বউ তাঁতির বাড়িতে আসিল । তাঁতি যদিও বউকে বারণ করিয়া দিয়াছিল, মুনিঠাকুরের ব্যাপারটা কাউকে না বলিতে কিন্তু তাঁতির বউ এত বড় ঘটনাটা কি করিয়া পেটে হজম করিতে পারে! আজ গেরস্ত-বউকে কাছে পাইয়া একথা ওকথার পরে সে মুনিঠাকুরের ব্যাপারটা সব খুলিয়া বলিল । 
     অনেকক্ষণ গালগল্প করিয়া তাঁতির বউ গেরস্তের বউকে বলিল, “একটা কথা, আমাদের কাছে কোনোদিন চাউল ধার নিতে আসিবে না ; যদি কাউকে চাউল ধার দেই, তবে আর হাঁড়ির চাউল বাড়িবে না।” পরের ভাল কে দেখিতে পারে? 
     তাঁতিদের এই উন্নতি দেখিয়া গেরস্তের বউ ত হিংসায় জুলিয়া পুড়িয়া মরে । সে পরদিন আসিয়া বলিল, “বলি বুবু! আমাকে এক সের চাউল ধার দাও।” তাঁতি-বউ বলিল, “না, তা দিতে পারিব না। তোমাকে ধার দিলে হাড়ির চাউল আর বাড়িবে না।” 

গেরস্তের বউ বলিল, “বুবু, তোমার মাথার কিরা, আমাকে এক সের চাউল ধার দাও । চাউল ধার দিলে হাড়ির চাউল যে বাড়ে না, ও একটা কথার কথা! হাড়ির চাউল নিশ্চয় বাড়িবে। চাউল ধার দিলে হাড়ির চাউল বাড়ে কি না একবার পরীক্ষা করিয়াই দেখ না ?”

তাঁতির বউর মন গলাইতে বেশিক্ষণ লাগিল না । গেরস্তের বউ তাহার নিকট হইতে এক সের চাউল কর্জ করিয়া বাড়ি ফিরিল। 

সন্ধাবেলা তাঁতির বউ রান্না করিতে চাউলের হাঁড়িতে হিাত দিয়াছে। হাড়িতে একটিও চাউল নাই। হাড়িটি লইয়া এদিকে ঘুরায়, ওদিকে ফিরায়, কিন্তু চাউল বাহির হয় না।

তখন ত মাথায় বাড়ি! তাঁতি আসিয়া সকল কথা শুনিয়া বউকে খুব বকিল। কিন্তু বকিয়া আর কি হইবে! পরামর্শ করিয়া স্থির করিল, তাহারা দুইজনেই গরুর লেজ ধরিয়া আবার সেই মুনিঠাকুরের বাড়ি যাইবে । 

রাত হইলে মনিঠাকুরের গরু আসিয়া যেই তাঁতির ক্ষেতে ঘাস খাইতে আরম্ভ করিয়াছে, তাঁতি দৌড়াইয়া যাইয়া গরুর লেজ ধরিয়া ফেলিল । গরু ত তাড়া খাইয়া আকাশে উড়িতে আরম্ভ করিল । তাঁতির বউ আসিয়া তাঁতির পা ধরিয়া ফেলিল । গেরস্তের বউ গোপনে ক্ষেতের একপাশে লুকাইয়া ছিল । মুনিঠাকুরের বাড়ি যাইবার জন্য তাহারও বড় ইচ্ছা । সেও যাইয়া তাঁতি-বউর পা ধরিয়া ঝুলিয়া রহিল। ধীরে ধীরে অনেক উপরের আকাশ দিয়া তাহারা উড়িয়া যাইতে লাগিল । -

এত দুরের পথ চলিতে তাঁতি-বউ চুপ করিয়া থাকিতে পারে না। সে তাতিকে জিজ্ঞাসা করে, “আচ্ছা বল ত, মুনিঠাকুর যে সের দিয়া তোমাকে চাউল মাপিয়া দিয়াছিলেন সে সেরটা কত বড় ?” তাঁতি ত বউর উপর আগেই চটা! সে ধমক দিয়া বলিয়া উঠিল, “তা দিয়া তোমার কি হইবে?” তাঁতীর বউ কাঁদিয়া কাটিয়া মান অভিমান করিয়া বলিল, “আচ্ছা বল না কত বড় সেরটা।” এবার তাতি রাগিয়া মাগিয়া গরুর লেজ হইতে হাত ছাড়িয়া যেই দেখাইতে গিয়াছে "এই এত্ত বড় সেরটা।” 
     অমনি তাঁতি পড়িল তাঁতির-বউর উপর, তাঁতি-বই পড়িল গেরস্তের বউর উপর । তিনজন ধগ্লাস করিয়া মাটিতে পড়িয়া গেল ।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য