Home Top Ad

Responsive Ads Here

Search This Blog

জবালার পুত্র সত্যকাম। সত্যকাম বাল্য পার হয়ে কৈশোরে পা দিয়েছে। তখন একদিন মাকে বলল সত্যকামঃ মা, ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করে গুরুগৃহে পড়াশুনা করত...

সত্যকামের ব্রহ্মজ্ঞান

জবালার পুত্র সত্যকাম। সত্যকাম বাল্য পার হয়ে কৈশোরে পা দিয়েছে। তখন একদিন মাকে বলল সত্যকামঃ মা, ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করে গুরুগৃহে পড়াশুনা করতে যাব। তুমি অনুমতি দাও।”
মা পুত্রকে আশীৰ্বাদ করে দিনক্ষণ দেখে গুরুগৃহে পাঠিয়ে দিলেন। সত্যকাম গৌতমবংশীয় হারিদ্রুমত নামক এক গুরুর গৃহে গিয়ে উপনীত হয়ে তার মনের অভিপ্রায় জানাল। সবিনয়ে সত্যকাম বললঃ
মহাশয়! আপনার গৃহে থেকে আপনার নিকট আমি পড়াশোনা করতে চাই—আপনি অনুমতি দিন।
শান্তস্বরে গুরু বললেনঃ
‘তোমার পরিচয় কী আর গোত্র কী বৎস?’
সত্যকাম পিতার নামও জানে না, কোন গোত্র তাও জানে না। বাড়ি ফিরে এসে সে তার মাকে জিজ্ঞেস করলঃ মা, আমার কোন গোত্র?
জবালা তার মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে বললেনঃ ‘বাবা! আমি বহুজনের সেবা করে তোমায় লাভ করেছি। তোমার পিতার পরিচয় কিংবা গোত্র তো আমার জানা নেই।’

সত্যকাম আবার ফিরে গেল গুরুগৃহে। তারপর মা তাকে যা বলেছিলেন, তাই সে জানাল গুরুকে। গুরু হারিদ্রুমত সত্যকামের এই সরল ও সত্য কথা শুনে বললেনঃ
‘ব্রাহ্মণ ছাড়া আর কেউ এমন সত্য কথা বলতে পারে না। কাজেই তুমিই প্রকৃত ব্রাহ্মণ। তোমার মাতার নাম জবালা—তোমার গোত্র হল জাবাল। তুমি আজ থেকে সত্যকাম জাবাল বলে পরিচিত হবে।’
এই বলে গুরু তাকে আশীৰ্বাদ করলেন এবং বললেন যে তার উপনয়ন দিয়ে তাকে ব্রাহ্মণ করবেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি সত্যকামকে লক্ষ করে বললেনঃ
বৎস! তুমি যে সত্যভ্রষ্ট হওনি, সেজন্য আমি খুবই, খুশি হয়েছি। তুমি যজ্ঞের জন্য কাঠ নিয়ে এসো— আমি তোমার উপনয়ন দেব।’
সত্যকাম গুরুর আদেশে অরণ্যে গিয়ে যজ্ঞের জন্য কাঠ কুড়াল, তারপর কাঠ নিয়ে গুরুগৃহে ফিরে এলে গুরু সেই কাঠে যজ্ঞ করে তার গলায় পৈতে পরিয়ে দিলেন—সত্যকাম ব্রাহ্মণ হল।
তারপর গুরু সত্যকামকে চারশ ক্ষীণ ও দুর্বল গোরু পৃথক করে দিয়ে তাকে লক্ষ করে বললেনঃ ‘এই গাভিগুলির ভার তোমায় দিলাম—তুমি এদের চরিয়ে নিয়ে এস।” গুরুর আদেশে সত্যকাম সেই চারশ’ গরু নিয়ে বনের পথে রওনা হল, আর মনে মনে ভাবলঃ এই চারশ’ গরু হাজারে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত আমি গুরুগৃহে ফিরব না।’ সত্যকাম বনে চলে গেল। দীর্ঘকাল সে বনে বনেই কাটাল—তারপর একদিন গরুর সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াল হাজারে!
সত্যকামের শ্রদ্ধা ও তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে অনুগ্রহ করবার জন্য বায়ুদেবতা এক ষাঁড়ের দেহ আশ্রয় করে সত্যকামকে বললেনঃ
সত্যকাম, গুনে দেখ, আমরা এখন সংখ্যায় হাজার পূর্ণ হয়েছি—এবার আমাদের গুরুগৃহে নিয়ে চল। এই বলে বৃষস্থিত বায়ুদেবতা আবার বললেনঃ সত্যকাম, তোমাকে ব্রহ্মজ্ঞান বিষয়ে কিছু উপদেশ দিতে চাই। সবিনয়ে সত্যকাম বললেনঃ
দয়া করে বলুন, প্রভু।
তখন বৃষরূপী বায়ুদেবতা বললেনঃ
পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ—এই চার দিককে ব্রহ্মের চার অংশ বলে জানবে। যিনি ব্রহ্মকে এইভাবে উপাসনা করেন, তিনি দেবলোক জয় করতে পারেন। এ বিষয়ে অগ্নিও তোমাকে উপদেশ দেবেন।
পরদিন সত্যকাম হাজার গরু নিয়ে গুরুগৃহে ফিরে গেল। তারপর সন্ধ্যা এসে গেছে দেখে গরুদের বেঁধে রেখে যজ্ঞকাষ্ঠ দিয়ে আগুন জ্বালাল। তারপর অগ্নির পশ্চাতে পূর্বমুখী হয়ে বসল । তখন অগ্নি তাকে বললেনঃ
‘সত্যকাম! আমি তোমাকে ব্রহ্ম সম্বন্ধে কিছু উপদেশ দেব। পৃথিবী, আকাশ, স্বৰ্গ আর সমুদ্ৰ—এরা ব্রহ্মের চার অংশ। যাঁরা এভাবে ব্রহ্মের উপাসনা করেন, তারাই পরলোকে জয়ী হন। এ বিষয়ে হংস তোমায় আরও উপদেশ দেবেন।”

পরদিন সত্যকাম আবার গাভিদল চরিয়ে সন্ধ্যাকালে গুরুগৃহে ফিরে এল। তারপর গরু বেঁধে যজ্ঞকাষ্ঠে আগুন জ্বেলে পূর্বমুখী হয়ে বসল। -
তখন সূর্য হংসরূপে সেখানে উড়ে এসে বললেনঃ সত্যকাম, আমি ব্রহ্ম বিষয়ে তোমায় কিছু উপদেশ দেব, শোন। অগ্নি, সূর্য, চন্দ্র আর বিদ্যুৎ—এরা ব্রহ্মের চার অংশ। যারা এভাবে ব্রশ্নের উপাসনা করেন, তারাই পরলোকে চন্দ্রলোক ও সূর্যলোক জয় করতে পারেন। এ বিষয়ে মদগু তোমায় আরও উপদেশ দেবেন।
এই বলে হংস উড়ে চলে গেলেন। পরদিন আবার দিনমানে গরু চরিয়ে সন্ধ্যাকালে সত্যকাম গুরুগৃহে ফিরে এসে অন্যদিনের মতোই গরু বেঁধে আগুন জেলে পূর্বমুখী হয়ে বসলেন।
তখন মদগু নামে এক জলচর পাখি উড়ে এসে বললেনঃ সত্যকাম! ব্রহ্ম বিষয়ে কিছু উপদেশ দেব—শোন! প্রাণ, চক্ষু, কর্ণ আর মন—এরা ব্রহ্মের চার অংশ। যারা এভাবে ব্রহ্মের উপাসনা করেন—তারাই পরলোকে জয়ী হন।’
এই বলে মদগু-রূপী জলদেবতা উড়ে চলে গেলেন। সত্যকাম এই ভাবে ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করবার পর তার দেহে অপূর্ব এক জ্যোতি দেখা দিল। পরদিন সন্ধ্যায় গরুর দল নিয়ে সত্যকাম গুরুগৃহে ফিরে এলে পর তাঁর দিকে তাকিয়ে গুরু হারিদ্রুমত অবাক হয়ে গেলেন তারপর সত্যকামকে লক্ষ করে বললেনঃ
সত্যকাম—তোমার দেহে ব্ৰহ্মতেজ বিদ্যমান দেখছি। কোন ব্যক্তি তোমায় উপদেশ দিযেছেন—সত্য করে বল |’ -
সত্যকাম সবিনয়ে বললেনঃ ‘প্রভু, আমি গুরুত্যাগ করিনি। অপর কোনো মানুষের কাছে আমি উপদেশ পাইনি। যাদের কাছ থেকে পেয়েছি—তারা কেউ মানুষ নন। আপনার কাছ থেকেই প্রকৃত ব্ৰহ্মজ্ঞান লাভ করতে চাই—উপদেশ দিন প্রভু। 
তখন গুরু হারিদ্রুমত সত্যকামকে ব্রহ্মবিষয়ে পুনরায় উপদেশ দিলেন। পূর্বে সত্যকাম যে সমস্ত জ্ঞান লাভ করেছিলেন, গুরুর নিকটও সেই উপদেশই পেলেন।
সত্যকাম কালক্রমে একজন প্রকৃত ব্রহ্মজ্ঞাণী হয়ে উঠলেন।

0 coment�rios: