গুরু ঠাকুরে ভাগবত পাঠ - বাংলাদেশের লোককাহিনী

     আমাদের দেশে হিন্দুসামজের মধ্যে বহু জাত । বামুন, বৈদ্য আর কায়স্থ, ইহারা হইল উঁচু জাতের। আর নমঃশূদ্র, জেলে, মালী, ধোপা, এরা হইল নিচু জাতের । উঁচু জাতের লোকেরা এদের হাতের ছোয়া পানি পর্যন্ত খায় না। মানুষকে অবহেলা করা খুবই খারাপ। আজকাল হিন্দু-সমাজে বহু নেতা এই নিয়মের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইয়াছে।
     আমাদের বাঙলাদেশে বহু নমঃশূদ্রের বাস। তাহারা খেতখামারের কাজে বড়ই পটু ৷ লাঠি খেলায়, নৌকা বাওয়ায়, গ্রাম্য নাচে তাহাদের জুড়ি মেলা ভার। তবু উচু জাতের বামুনেরা তাদের বাড়িতে পূজা করে না। তাই নমঃশূদ্রের আলাদা বামুন আছে। তারাই তাদের গুরুঠাকুর । উঁচু জাতের বামুনেরা এইসব বামুনদের বড়ই ছোট নজরে দেখে । তাদেরই কেউ হয়ত নিচের গল্পটি রচনা করিয়াছে। এখানে উঁচু জাতের একটি বামুন কি করিয়া একটি নমঃশূদ্র বামুনকে জব্দ করিয়াছিল, নিচের গল্পটি তারই পরিচয় । গল্প—গল্পই। এর মধ্যে তোমরা প্রচুর হাস্যরস পাইবে ।
     গ্রামের জমিদার বাড়িতে কাশী হইতে এক ভাগবত-ঠাকুর আসিয়াছেন। তিনি জমিদার বাড়িতে রোজ ভাগবত পাঠ করেন। পাঠ করিতে করিতে তিনি কত সুন্দর সুন্দর গল্প বলেন। কত মজার মজার কেচ্ছা বলেন । তাহা শুনিতে কত ভাল লাগে— কত পুণ্য হয়। কিন্তু গ্রামের নমঃশূদ্রেরা সেখানে যাইতে পারে না। জমিদার তাহাদের নিমন্ত্রণ করেন নাই । কারণ জমিদারের মতে, তাহারা ছোটজাত ।
     নমঃশূদ্রেরা বলাবলি করে, “দেখরে, গ্রামে আমরা পাঁচশত ঘর নমঃশূদ্র। যদি প্রত্যেকে একটাকা করিয়া চাঁদা তুলি তবে
     পাঁচশত টাকা উঠে । আমরা ত ইচ্ছা করিলে একদিন ভাগবত পাঠ আমাদের বাড়িতেই দিতে পারি।” নমঃশূদ্রদের মোড়ল গ্রামের আরও দুই একজন লোককে সঙ্গে লইয়া সত্য সত্যই একদিন ভাগবত-ঠাকুরের নিকট যাইয়া উপস্থিত, “ঠাকুর মশায় । প্রণাম হই!” 
     ভাগবত-ঠাকুর জিজ্ঞাসা করিলেন, “কিগো, ব্যাপার কি ?” 
     “আজ্ঞে, আমরা একদিন আপনাকে আমাদের বাড়িতে লইয়া গিয়া ভাগবত শুনিতে চাই ।” মোড়ল বলিল ।
     ঠাকুরমশায জিজ্ঞেস করলেন, “তোরা গরিব মানুষ। আমার  ভাগবত পাঠে অনেক টাকা লাগে । তোরা কি অত টাকা দিতে পারিবি?” 
     পাঁচশ ঘর নমঃশূদ্ৰ। প্রত্যেকে এক টাকা করিয়া দিলেও পাঁচশ টাকা উঠে । দশজনে একসাথে যখন মিলিয়াছি, তখন আমরা গরিব কিসের ? আপনার ভাগবত পাঠে কত টাকা লাগিবে ?” 
     ঠাকুর মহাশয় জমিদার বাড়িতে ভাগবত পাঠ করিয়া প্রতি রাত্রে বড়জোর পাঁচ টাকা পান। কিন্তু যদি বেশি টাকা পাওয়া যায়— ছাড়ে কে ? তিনি বলিলেন, “তোদের বাড়িতে ভাগবত পাঠ করিলে আমাকে পাঁচশত টাকা দিতে হইবে।” 
     গরিব মানুষ । কিছু কম করেন। আট আনার পয়সা দিব না। চারশ নিরানব্বই টাকা আট আনা, এর বেশি দিতে পারিব না।”
     ঠাকুর মহাশয় মনে করিলেন, আট আনাই বা কম নেই কেন? তিনি বলিলেন, “নারে তাহা হইবে না।” 
     গদাই মোড়ল গ্রমের মাতব্বর। দরদস্তুর করিয়া ভাগবতের দাম কিছু কম না করিলে ত তাহার মাতব্বরি থাকে না, সে বলিল, “আচ্ছা, না হয় আরও চার আনা আপনাকে ধরিয়া দিলাম। একুনে দাঁড়াইল চারশ’ নিরানব্বই টাকা বারো আনা । 
     কর্তা! এতে রাজি হন ।” ভাগবত-ঠাকুর মোড়লের দরকষাকষি দেখিয়া এবার রাগিয়া গিয়াছেন। বলিলেন, “দেখ, তোরা কি ইলিশ মাছের দোকান পাইয়াছিস?” 
     ঠাকুর মহাশয়ের রাগ দেখিয়া মোড়ল প্রথমে একটু থতমত খাইল, পরে কানের মধ্যে গোজা একটি আধলা পয়সা বাহির করিয়া বলিল, “ঠাকুর মশাই! যখন ছাড়িবেনই না, তখন ধরিয়া দিলাম আরও এক আধলা । 
     একুনে দাঁড়াইল গিয়া চারশ নিরানব্বই টাকা বারো আনা আধ পয়সা। দয়া করিয়া আপনি ইহাতেই রাজি হইয়া যান।” 
     ঠাকুর দেখিলেন, ইহার পরে দর কসাকষি করিলে আর মান থাকিবে না। তিনি বলিলেন, “যা ইহাতেই হইবে । এখানে আর দুইদিন আমাকে ভাগবত পাঠ করিতে হইবে। তারপরেই তোদের ওখানে যাইব । সব জোগাড়-যন্তর কর গিয়া।"
     নমঃশূদ্রেরা বাড়ি চলিল। পথে যাইবার সময় মোড়ল তাহার সঙ্গের লোকদের খুব ভালমতোই বুঝাইয়া দিল যে সে না 
     থাকিলে ঠাকুর মহাশয় পাঁচশত টাকার কমে কিছুতেই রাজি হইত না। সে-ই ত দর কষাকষি করিয়া পাঁচশত টাকা হইতে তিন আনা সাড়ে তিন পয়সা কমাইল। শুনিয়া তাহার সঙ্গের লোকেরা মোড়লের প্রতি বড়ই কৃতজ্ঞ হইল । 
     বাড়ি যাইয়া নমঃশূদ্রেরা পরামর্শ করে, কোথায় ভাগবতের আসর বসানো যায় ? নমুদের কাহারও বাড়িতে এমন ঘর নাই যেখানে পাঁচশত লোক একসঙ্গে বসিতে পারে। তখন স্থির হইল, একজনের ধানের ক্ষেত নষ্ট করিয়া সেখানেই ভাগবতসভা দেওয়া হইবে । কিন্তু কার ধানক্ষেত নষ্ট করা যায় ? 
     দুখিরামের ক্ষেত কাটার কথা উঠিলে সে নয়ন পালের ধানের ক্ষেত দেখাইয়া দেয়, নয়ন পাল জগৎরামের পাটক্ষেত দেখাইয়া দেয়, জগৎরাম মহিমবালার হলদিক্ষেত দেখাইয়া দেয়। কার ক্ষেত কাটা যায়? শেষে মোড়ল যুক্তি দিল, সকলের ক্ষেতই কাটা হউক । 
     ভাগবত শোনার এমনই নেশা । সমস্ত নমু মিলিয়া মাঠকে মাঠ ভর্তি, যার যত ধান পাট হলদির ক্ষেত সমস্ত কাটিয়া সাফ করিয়া ফেলিল । 
     জমিদার বাড়িতে ভাগবত পাঠ শোনার সময় ভদ্রলোকেরা তাকিয়া-বালিশ হেলান দিয়া বসে। নমুরা গরিব মানুষ । এসব তাহারা কোথায় পাইবে ? 
     তাহারা ঘাস আর বিচালির আঁটি বাধিয়া বড় বড় বালিশ তৈরি করিল। খড়ের গদি তৈরি করিল। ঠিক বড়লোকেরা যেভাবে ভাগবত শোনে তাহারাও তেমনি গদি বালিশে হেলান দিয়া আরাম করিয়া ভাগবত শুনিবে । 
     কিন্তু জমিদার বাড়ির মতন বড় শামিয়ানা ত তাহদের নাই! কি করিয়া শামিয়ানা জোগাড় করা যায় ? মোড়লের পাকা বুদ্ধি । স্থির হইল, যার বাড়িতে যত কাথা আছে, লেপ আছে, চাদর আছে, সব একত্র সেলাই করিয়া শামিয়ানা তৈরি করিতে হইবে । 
     প্রত্যেক বাড়ি হইতে রং-বেরঙের কাথা আসিতে লাগিল । কারও কাথা ছেড়া, কারও লেপের খানিকটা উই-এ খাইয়া ফেলিয়াছে। কারও চাদরে তরকারির হলুদের দাগ রহিয়াছে। কাথা, লেপ, চাদর, চটের ছালা সমস্ত জোড়া দিয়া সেলাই করিয়া এক বিচিত্র শামিয়ানা তৈরি হইল । 
    সেই শামিয়ানা ধানের ক্ষেতের মাঝখানে পাতিয়া চারকোণে চারটি খুঁটার সাথে তাহার চারকোণা বাধা হইল। তাহার পর প্রকাণ্ড একটা বাঁশের মাখায় নারিকেলের অাঁচা বাঁধিয়া সেই বাঁশে শামিয়ানার মধ্যখানটা আটকাইয়া সব নমু মিলিয়া হেইও-হেইও করিয়া ঠেলিয়া উঠাইয়া দিল ।  সেই অদ্ভুত শামিয়ানার তলে খড়ের গদি ও খড়ের বালিশ পাতিয়া দেওয়া হইল । মধ্যখানে একটি ভাঙা জলচৌকি পাতা হইল । 
     তাহার চারকোণে সিন্দুর দেওয়া হইল। চৌকির সামনে দুইটি কলসি, কলসির উপরে একখানা গামছা । ফলকথা, বড়লোকের বাড়িতে ভাগবতসভা যেভাবে সাজানো হয়, নমঃশূদ্রেরা তাহার চাইতে তাহাদের ভাগবতসভা কম করিয়া সাজাইল না । 
     সবকিছু ঠিকঠাক। আজই বৈকাল হইতে ভাগবত পাঠ আরম্ভ হইবে, এমন সময় নমঃশূদ্রদের গুরুঠাকুর আসিয়া উপস্থিত। তিনি ত সকল দেখিয়া আশ্চর্য, “কিরে ব্যাপার কি ?” 
  গুরুঠাকুরের পায়ের ধূলি মাথায় লইয়া মোড়ল বলিল, “কাশী হইতে জমিদার বাড়িতে এক ভাগবত-ঠাকুর আসিয়াছেন । তিনি আজ আমাদের এখানে ভাগবত পাঠ করিবেন।” 
     গুরু মহাশয় নিজে বাঁচিযা থাকিতে তাহার শিষ্যবাড়ি অন্য লোক ভাগবত পাঠ করিবেন ? ঈর্ষায় গুরু মহাশয়ের সকল শরীর জ্বালা করিতে লাগিল । “তা কাশীর ঠাকুর ভাগবত পাঠ করিবেন, কত টাকা লইবেন ?” তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন।
     মোড়ল খুব গর্বের সঙ্গে বলিল, “আগে ত পাঁচশ টাকার কমে ছাড়েনই না, তবে অনেক বলিয়া কহিয়া তিন আনা সাড়ে তিন পয়সা কমাইয়াছি।” 
     “আমার মাথা করিয়াছ।” গুরুঠাকুর রাগ করিয়া বলিলেন, “ভাগবত পাঠ আমি জানি না যে অন্যখানের লোক আসিয়া তোদের বাড়িতে ভাগবত পাঠ করিবে ? আর ভাগবত পাঠে কি এত টাকা লাগেরে মূর্খের দল! পাঁচ টাকা দিলেই আমি ভাগবত পাঠ করিতে পারি।” 
     মোড়ল বলিল, “গুরুদেব! আপনি যে ভাগবত পাঠ করিতে পারেন, এ ত আমাদের জানা ছিল না।” 
     গুরুঠাকুর উত্তর করিলেন, “আরে মূর্খের দল! তোরা ত কিছুই জানিস না। আমি বেদ গানও জানি– রামায়ণ গানও জানি। তবে তোরা গরিব মানুষ, টাকা-পয়সা দিতে পারিস না বলিয়া তোদের কাছে এসব বিদ্যা জাহির করি না ।” 
     নমঃশূদ্রেরা সকলে ভাবিল, “তাই ত, আমাদের গুরুঠাকুর নিজেই যখন ভাগবত পাঠ করিতে জানেন, তখন আর অন্য লোকের কাছে যাই কেন ? তা ছাড়া, গুরুঠাকুর মোটে পাঁচটি টাকা চাহিতেছেন।” 
     সকুল নমু স্থির করিল, “তাহাই হউক। আমাদের গুরুঠাকুরই ভাগবত পাঠ করুন।” নমঃশূদ্রেরা যেমন লেখাপড়া জানে না, তাদের গুরুঠাকুরও তেমনি লেখাপড়া জানেন না। কিন্তু একটু চালাক চতুর বলিয়া নানা কলাকৌশলে তাহাদের মধ্যে নিজের সম্মান বাঁচাইয়া রাখেন। 
     সন্ধ্যাবেলায় তিনি শহরে যাইয়া অনেকগুলো পুরাতন পঞ্জিকা আর বিজ্ঞাপনের বই সংগ্ৰহ করিয়া এক কুলির মাথায় দিয়া সভামণ্ডপে আসিয়া উপস্থিত। শিষ্যেরা গর্বের সহিত বলাবলি করিল, “আমাদের গুরুঠাকুর এত বড় বিদ্বান, তাহার বিদ্যা মাথায় করিয়া বহিবার জন্য কুলি লাগে।”
     সকলে ধরাধরি করিয়া কুলির মাথা হইতে গুরুঠাকুরের বিদ্যার বোঝা নামাইল । যত্ন করিয়া পা ধোয়াইয়া সকলে মিলিয়া তাহাকে পাঁখার বাতাস করিতে লাগিল । ইতিমধ্যে অন্যান্য শিষ্যেরা ত আসিয়া বসিয়া গিয়াছে। তাহারা বসিয়া এদিক ওদিক হয়,আর সেই খড়-বিচালির তাকিয়ে বালিশ মচমচ করে।
   তারপর প্রকাণ্ড ভুঁড়িসমেত গুরুঠাকুর সেই ভাঙা জলচৌকির উপর যাইয়া বসিলেন। গুরুঠাকুরের ভারে জলচৌকিখানি মড়মড় করিয়া উঠিল । সেখানে বসিয়া গুরুঠাকুর একে একে সেই বিজ্ঞাপন ও পুরাতন পঞ্জিকাগুলি পড়িবার ভান করিলেন। যেন বেদ, ভাগবত কত কঠিন কঠিন বইয়েরই না তিনি পাতা উল্টাইতেছেন।
     আগেই বলিয়াছি নমঃশূদ্ৰদের গুরুঠাকুর মোটেই লেখপড়া জানেন না। ছোটকালে কয়েকদিন মাত্র পাঠশালায় গিয়াছিলেন। সেখানে ক, খ, গ, ঘ এই পর্যন্তই তিনি পড়িয়াছিলেন আর সেইটুকুই তার মনে আছে। যা হোক, একখানা পুরাতন পঞ্জিকার পাতা খুলিয়া গুরুঠাকুর নাকে নস্য লইয়া কাশিয়া সেই ক, খ, গ, ঘ অক্ষরগুলিকে একটু সংস্কৃতের মতো উচ্চারণ করিয়া পাঠ আরম্ভ করিলেন, “কিয়, ক্ষিয়, ঘিয়, শোন শিষ্যগণ, কিয়, ক্ষিয়, ঘিয় ।”


     গুরুঠাকুরের সামনে নমঃশূদ্রেরা সকলে ভাগবত শুনিতে বসিয়া গিয়াছে। তাহারা গরিব লোক । কতজনের কত রকম দুঃখ । সেই দুঃখ প্রকাশের এতটুকু সুযোগ পাইলেই তাহারা খানিকটা কাঁদিয়া লয় ।
     মহিম মারা গিয়াছে আজ দশ বৎসর। কিন্তু ভাগবত শোনার সুযোগ লইয়া মহিমের মাতা তাহার মৃত মহিমের জন্য ডুকরাইয়া কাঁদিয়া উঠিল, “বাবা মহিমরে, তুই কোথায় গেলি ?” 
     তারণী ঠাকুরের সঙ্গে মামলায় হারিয়া রামমোহনকে তাহার বসত বাড়ি বেচিতে হইয়াছে। সে মহিমের মার সঙ্গে কান্নায় যোগ দিল ।
     গ্রামের জমিদার সুধারামের পাঠক্ষেত হইতে জোর করিয়া পাট কাটিয়া লইয়া গিয়াছিল । রামকানাই দশ বছর আগে মহাজনের বাড়ি হইতে দশ টাকা কর্জ করিয়াছিল । সুদে ফুলিয়া সেই কর্জের টাকা এখন একশত টাকায় পরিণত হইয়াছে । আজ ভাগবত শোনার সুযোগ পাইয়া তাহারা সকলেই ডুকরাইয়া কাঁদিয়া উঠিল । 
     মোড়ল দেখিল, সকলে কাঁদিতেছে, সে না কাঁদিলে লোকে মনে করিবে কি! তাহারও ত মনে কম দুঃখ না! সেবার সদর থানা হইতে বড় দারোগা আসিয়া তাহাকে খাতির করে নাই, অন্য গ্রামের মোড়লকে খাতির করিয়াছে। সেই কথা ভালমতো মনে করিয়া মোড়লও কাঁদিয়া উঠিল। মোড়লের কান্না দেখিয়া গুরুঠাকুর আরও উৎসাহের সঙ্গে পড়িতে লাগিল, “কিয়, ক্ষিয়, ঘিয়। এমন মধুর কথা কেহ কোনোদিন শোনে নাই। বল, বল, ভক্তগণ, কিয়, ক্ষিয়, ঘিয় ।” 
     ভাগবত শুনিতে শুনিতে রাত্র যে কোথা দিয়া কাটিয়া গেল কেহই টের পাইল না। এমনই করিয়া প্রতিরাত্রে ভাগবত পাঠ হইতে লাগিল । 
     সেদিন সন্ধ্যাবেলায় ওপাড়ার এক ভদ্রলোক পথ দিয়া যাইতে দেখিতে পাইলেন, নমঃশূদ্রেরা এ বাড়ি হইতে, ও বাড়ি হইতে কেরোসিনের লণ্ঠন জ্বালাইয়া দলে দলে সেই শামিয়ানার দিকে যাইতেছে। খবর লইয়া জানিলেন, কি চাই, নমুদের বামুন ঠাকুর রোজ রাত্রে এমন ভাগবত পাঠ করেন যে, তাহা শুনিয়া সমস্ত গ্রামের লোক কাঁদিয়া বুক ভাসায়। শুনিয়া, ভদ্রলোকের মনে  কৌতুহল হইল, “যাই, একবার শুনিয়া আসি কিরূপ ভাগবত পাঠ হইতেছে।” 
     ভদ্রলোক আসিয়া একপাশে বসিলেন। খানিক শুনিয়া তিনি ত অবাক! গুরুঠাকুর কেবল অনবরত “কিয়, ক্ষিয়, ঘিয়” এই  শব্দ কয়টি উচ্চারণ করিতেছেন আর নমঃশূদ্রেরা শেয়ালের মতো ডাক ছাড়িয়া কাঁদিতেছে। 
     খানিক বসিয়া ভদ্রলোক উঠিলেন । যাইবার সময় অসতর্কে বলিয়া ফেলিলেন, “ভাগবত না, ঘোড়ার ডিম পড়িতেছে।” 
     এই কথা কয়টি গুরুঠাকুরের কানে গেল। গুরুঠাকুর সহসা পাঠ বন্ধ করিলেন । 
     শিষ্যেরা গুরুঠাকুরের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। গুরুঠাকুর বলিতে আরম্ভ করিলেন, “দেখ শিষ্যগণ! এই যে মধুর     ভাগবত— ইহার মর্ম অরসিক লোক কি বুঝিবে ? তাই ত হরি বলিয়াছেন, কেবলমাত্র ভক্তের কাছে হরিনাম করিও। কিন্তু আমার একটি কথা ।” 
     মোড়ল হাত জোড় করিয়া বলিল, “কি কথা, গুরুদেব ?” 
     গুরুঠাকুর গম্ভীর হইয়া বলিলেন, “কথা আর বিশেষ কিছু নয়! এই যে ভদ্রলোক উঠিয়া গেলেন, এইসব পোশাকপরা লোকেরা ভাগবত পড়ার মর্মকথা বুঝিতে পারে না । সেজন্য আমার কোনো দুঃখ নাই। তবে কিনা তোমরা আমার পাঁচশ ঘর শিষ্য এখানে উপস্থিত থাকিতে আমার ভাগবত পাঠকে কি না বলিয়া গেল ঘোড়ার ডিম।” 
     মোড়ল গর্জন করিয়া উঠিল, “কি, এত বড় কথা! কি করিতে হইবে গুরুদেব ?” 
     গুরুদেব বলিলেন, “কি করিতে হইবে, তা কি আমাকে বলিয়া দিতে হইবে ? তোমরা পাঁচশ ঘর শিষ্য ইহার বিহিত করিতে পার না ?” 
     এই কথা শুনিয়া পাঁচশ নমঃশূদ্ৰ খেপিয়া গেল। ভদ্রলোক তখনও বেশি দূর যান নাই। ধরিয়া আনিয়া নমঃশূদ্রেরা তাহাকে পাড়িয়া ফেলিয়া যার যত খুশি কিল, থাপ্পড়, ঘুষি দিতে লাগিল । এত লোকের মার খাইয়া খোড়াইতে খোড়াইতে ভদ্রলোক বাড়ি ফিরিলেন। গায়ের ব্যথায় সারারাত ঘোরতর জ্বর। পরদিন
     সকালে ভদ্রলোকের ছোটভাই জিজ্ঞাস করিল, “দাদা! রাতভর ত তোমার খুব জ্বর দেখিলাম আর গায়ের ব্যথায় এপাশ ওপাশ করিতেছিলে, এরূপ হওয়ার কারণ কি ?” 
     মার খাইয়া কে তাহা স্বীকার করিতে চায়! ভদ্রলোক বলিলেন “এমনিই আমার জ্বর হইয়াছে। আর জ্বর হইলেই ত গায়ে ব্যথা হয় ।” 
     কিন্তু ছোটভাই নাছোড়বান্দা । সে তবু জিজ্ঞাসা করে, না দাদা! হঠাৎ তোমার গায়ে ব্যথাই বা হইল কেন ? নিশ্চয়ই ইহার কোনো কারণ আছে।” তখন ভদ্রলোক সমস্ত ব্যাপার ছোটভাইকে খুলিয়া বলিলেন। 
     ছোটভাই বলিল, দাদা! তুমি কোনো চিন্তা করিও না। আমি ইহার প্রতিশোধ লইতেছি।” 
     ভদ্রলোক বলিলেন “ওরা সংখ্যায় পাঁচশত । ওদের সঙ্গে লড়াই করিয়া তুমি পারিবে না। আমারই মতো মার খাইয়া ফিরিয়া আসিবে ।” 
     ছোটভাই বলিল, “দাদা! তুমি কোনো চিন্তা করিও না। আমি কৌশলে ওদের জব্দ করিয়া আসিব ।” সারাদিন বসিয়া ছোটভাই নানারকম ফন্দি-ফিকির আওড়াইতে লাগিল । সন্ধ্যা হয়-হয়। এমন সময়ে সে গায়ে একখানা নামাবলী জড়াইয়া কপালে বুকে ফোটা-তিলক কাটিয়া দিব্যি এক হিন্দু সাধু সাজিয়া খড়ম পায়ে চটর চটর করিয়া নমঃশূদ্রদের পাড়ার দিকে রওয়ানা হইল । 
     বহুক্ষণ হয় ভাগবত পাঠ আরম্ভ হইয়াছে। গুরুঠাকুরের মুখে ভাগবত পাঠ শুনিয়া নমঃশূদ্রেরা মাঝে মঝে সুর করিয়া কাঁদিয়া উঠিতেছে। এমন সময় খড়ম পায়ে নামাবলী গায়ে, কপালে বুকে ফোটা-তিলক পরিয়া ছোটভাই সভামণ্ডপে গুরুঠাকুরের একেবারে সামনে যাইয়া, মাটিতে শুইয়া পড়িয়া প্রণাম করিল। তারপর গুরুঠাকুরের পায়ের ধুলা খানিকটা মাথায় লইয়া, খানিকটা জিহবায় ঠেকাইয়া বলিল, “গুরুদেব । অধমকে দয়া করেন!”
     একজন সাধুব্যক্তির এরূপ ভক্তি দেখিয়া গুরুঠাকুর খুব খুশি হইলেন। তিনি আজ আরও উৎসাহের সঙ্গে পড়িতে লাগিলেন, “বল, বল ভক্তগণ, কিয়, ক্ষিয়, ঘিয়– কিয়, ক্ষিয়, ঘিয় । এমন মধুর নাম আর কখনও শুনিবে না।” নমঃশূদ্রেরা সকলেই একযোগে চিৎকার করিয়া উঠিল, কিয়, ক্ষিয়, ঘিয়– কিয়, ক্ষিয়, ঘিয়!” 
     সাধুবেশধারী ছোটভাই মাটির উপর আরও একটি প্রণাম করিয়া হাউ-মাউ করিয়া কাঁদিয়া উঠল।
     গুরুঠাকুরও উৎসাহের সঙ্গে বলিতে লাগিলেন, “এমন মধুর নাম আর কোথাও খুঁজিয়া পাইবে না। এই নামের মোহে ভুলিয়া রামছাগল ঘাস খাইতে খাইতে ঘন ঘন দাড়ি নাড়ে। বোলতার চাক মাথায় পরিয়া শেয়াল মামা সারারাত ভরিয়া হুক্কা-হুয়া করিয়া এই নাম উচ্চারণ করে– ভীমরুলের বাসায় বসিয়া বসিয়া দিনরাত রামভালুক এই নাম কান পাতিয়া শোনে। বল, বল ভক্তগণ, কিয়, ক্ষিয়, ঘিয় ।” 
     সাধুবেশধারী ছোটভাই তখন গুরুঠাকুরের পা খানা টানিয়া লইয়া বলিল, “আহা-হা, গুরুদেব! কি মধুর নাম শুনাইলেন! আপনার পাখানা একবার আমার বুকের উপর রাখুন।” 
     উৎসাহ পাইয়া গুরুঠাকুর আরও জোরে জোরে বলিতে লাগিলেন, “কিয় ক্ষিয় ঘিয়– কিয় ক্ষিয় ঘিয় ।” 
     সারারাত্র এই ভাবে ভাগবত পাঠ চলিতে লাগিল ! সাধুবেশধারী ছোটভাই একবার মাটিতে গড়াগড়ি যায় ; আবার গুরুঠাকুরের পায়ের ধুলা লইয়া মাথায় দেয়, আর মাঝে মাঝে গুরুদেবের মুখের দিকে চায়। 
     সারারাত এইভাবে “কিয়, ক্ষিয়, ঘিয়” বলিতে বলিতে ঠাকুর মহাশয়ের মুখে থুথু আসিয়া যায়। তখন সামনের গাড়ুর উপর হইতে গামছাখানা লইয়া তিনি মুখ মোছেন। হঠাৎ ছোট ভাই গামছাখানার উপর হইতে কি একটা জিনিস পাইয়া ট্যাঁকে 
     গুঁজিয়া, খড়ম পায়ে উঠিয়া দাঁড়াইয়া, চিৎকার করিয়া উঠিল, , “পাইয়াছিরে, আমি পাইয়াছি।”
সভার সকল রোক জিজ্ঞাসা করিল, “আরে কি পাইয়াছেন আপনি?”
     সে খড়ম বগলে করিয়া নাচিতে লাগিল আর বলিতে লাগিল, “যে জিনিস পাইলে মাজা দোলাইয়া স্বর্গে যাওয়া যায়, যে জিনিস তাবিজ করিয়া পরিলে কোনো অসুখ থাকে না, যে জিনিস সঙ্গে থাকিলে মারামারিতে কেহ হারাইতে পারে না, আমি সেই জিনিস পাইয়াছি।” 
     চারিদিক হইতে তাহাকে ঘিরিয়া নানাজনে নানা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল। মোড়ল তাহাদিগকে থামাইয়া জোড়হাতে বলিল, “আপনি কি জিনিস পাইয়াছেন, আমাদিগকে দেখান।” ছোট ভাই তখন তাহার ট্যাঁক হইতে একগাছি দাড়ি বাহির করিয়া বলিল, “যে মুখ হইতে এমন মধুর ভাগবত বাহির হইতেছে সেই মুখের একগাছা দাঁড়ি । ইহা যার সঙ্গে থাকিবে, তার চৌদ্দ পুরুষ স্বর্গে যাইবে।” 
     মোড়ল তখন বলিল, “এমন জিনিস আপনি লইয়া যাইতেছেন তাহা আমরা দিব না। ওটা রাখিয়া যান ।” 
   ছোটভাই বলিল, “আমি ত মাত্র একটা দাড়ির আঁশ পাইয়াছি। গুরুঠাকুরের মুখভরা কত দাড়ি আছে, তোমরা টানিয়া লও না কেন ?" যেমনি বলা আমনি পাঁচশত নমু ছুটিয়া আসিল গুরুঠাকুরের দিকে । 
     গুরুঠাকুর কেবল বলেন, “আরে তোরা করিস কি ?” 
     কার কথা কে শোনে! চৌকির উপর হইতে গুরুঠাকুরকে ঠ্যাং ধরিয়া টানিয়া আনিয়া মাটিতে ফেলিয়া এক একজন এক এক গাছা দাঁড়ি ধরিয়া টানিতে লাগিল। দাঁড়ি ছেড়ার ব্যথায় গুরুঠাকুর


     যতই চিৎকার করিয়া কাঁদেনততই তাহারা অতি উৎসাহে দাঁড়ি ছিঁড়িতে থাকে । সমস্ত দাড়ি যখন ছেড়া শেষ হইল, তখন পুণ্যলোভী নমুরা গুরুঠাকুরের মাথার চুলও বাদ দিল না। ইত্যবসরে ছোটভাই খড়ম বগলে করিয়া সেখান হইতে
পালাইয়াছে।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য