নচিকেতার উপাখ্যান

অনেক দিন আগের কথা। সেকালে বাজশ্রবা নামে এক মুনি ছিলেন। মুনি ছিলেন পরম ধাৰ্মিক এবং যাগযজ্ঞপরায়ণ। তার এক পুত্র ছিলেন—নাম নচিকেতা।
বাজশ্রবা মুনি একবার এক বিরাট যজ্ঞ করেন, সেই যজ্ঞের নাম বিশ্বজিৎ যজ্ঞ। যেমন যজ্ঞ, তেমন তার দক্ষিণা। যিনি যজ্ঞ করেন তার সর্বাপেক্ষা প্রিয় বস্তুকেই যজ্ঞের দক্ষিণারূপে দান করতে হয়।
বাজশ্ৰবা দান করছেন অনেক গোরু। নচিকেতা ভাবলেন, তিনি বাজশ্রবার পুত্ৰ—পুত্ৰই তো পিতার সর্বাপেক্ষা প্রিয়জন।
কাজেই তাকে যদি দান করা না হয়, তবে তো যজ্ঞের সম্পূর্ণ ফল তার পিতা পাবেন না। এই ভেবে তিনি বাজশ্রবা মুনির কাছে গিয়ে বললেনঃ
“পিতা আপনি আমাকে কার কাছে দান করবেন ??
বাজশ্রবা কোনো উত্তর দিলেন না। একবার, দুইবার, তিনবার—নচিকেতা তার বাবাকে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছেন। তখন বাজশ্রবা বিরক্ত হয়ে বলে উঠলেনঃ
আমি তোমাকে যমের হাতে তুলে দেব।’
পিতার কথা শুনে নচিকেতা ভাবলেনঃ.
‘আমি তো পিতার শিষ্যদের মধ্যে হীন নহি; কোনো বিষয়ে উত্তম আর কোনো বিষয়ে মধ্যম। তবে কেন অন্যকে যমের কাছে না পাঠিয়ে আমাকে পাঠাতে চাইছেন? নিশ্চয়ই কোনো গুরুতর প্রয়োজন আছে, যে কারণে আমারই যমের নিকট যাওয়া প্রয়োজন।’

এই ভেবে নচিকেতা স্থির করলেন তিনি যমের কাছে যাবেন। কিন্তু বাজশ্ৰবা সত্যিই তো আর তাকে যমের বাড়ি পাঠাতে চাননি! বিরক্ত হয়ে শুধু একটা কথার কথা বলেছিলেন। তাই নচিকেতা যখন যমের বাড়ি যেতে চাইলেন, তখন তিনি তাকে বাধা দিলেন। সত্যিই তো, কেউ ইচ্ছে করে কি আর নিজের প্রিয় পুত্রকে যমের হাতে তুলে দিতে পারে? -
পিতার নিষেধে নচিকেতা কিন্তু মত পরিবর্তন করলেন না। তিনি ভাবলেনঃ
যজ্ঞের সামনে বসে তিনি আমাকে যমের হাতে দান করেছেন। এখন যদি তিনি সে কথা ফিরিয়ে নিতে চান, তবে যজ্ঞের ফল পাবেন না, অধিকন্তু সত্যভ্রষ্ট হয়ে আরো পাপের ভাগী হবেন। কাজেই পিতার সত্যরক্ষার জন্যেও আমাকে যমের বাড়ি যেতে হবে।’ -
এই সমস্ত ভাবনা-চিন্তা করে নচিকেতা তার বাবাকে সাত্ত্বনা দিয়ে বললেনঃ পিতা, আপনার পিতা-পিতামহগণের কথা চিন্তা করুন। তারা সত্যনিষ্ঠ ছিলেন, কোনো দিন, কোনো কারণেই তারা সত্যভ্রষ্ট হননি; অন্যান্য সৎ ব্যক্তিরাও সত্য থেকে সরে যাননি। কাজেই আপনি বা কেন সত্যভ্রষ্ট হবেন? আর তাছাড়া মানুষের জীবনের মূল্য কি? শস্য যেমন কিছুদিন পর মরে যায়, মানুষও তেমনি মরবেই। কাজেই এই মরণশীল মানুষের জন্য কেন সত্যভ্রষ্ট হবেন? আমি আজ যদি যমালয়ে না যাই, পরে যেতেই হবে; কাজেই দুঃখ করবেন না—আমাকে যেতে দিন।' -
বাজশ্রবা বুঝলেন আপত্তি করে কিছু হবে না। অতঃপর নচিকেতা যমালয়ে রওয়ানা হয়ে গেলেন। নচিকেতা যখন যমের বাড়িতে গিয়ে পৌছলেন, তখন যম বাড়ি ছিলেন না। নচিকেতা সেখানে অপেক্ষা করতে লাগলেন। একদিন, দুদিন, তিনদিন পার হয়ে গেল। নচিকেতা একঠায় বসে আছেন—স্নান নেই, খাওয়া নেই, ঘুম নেই। যমের সঙ্গে দেখা না হওয়া পর্যন্ত তিনি নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না—অন্য কর্মও করতে পারছেন না।

তিনদিন পর যম বাড়ি ফিরে শুনলেন, তিনদিন ধরে অনাহারী অতিথি ব্রাহ্মণ  তাঁর ঘরে অপেক্ষা করছেন। এই সংবাদ পেয়ে যম অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে উঠলেন। কারণ ঘরে আগুন লাগলে তাকে না নেভাতে পারলে গৃহস্থের যেমন অমঙ্গল হয়, তেমনি ব্রাহ্মণ বাড়িতে এলে যদি তাকে শাস্ত না করা যায়, তবে গৃহস্থের মঙ্গল নেই। কাজেই সত্বর পাদ্য অর্ঘ দিয়ে নচিকেতাকে শান্ত করতে গেলেন। নতুবা, যমের সমস্ত কর্মফলও নষ্ট হয়ে যাবে। কারণ শাস্ত্রে আছে অতিথির উপবাসের ফলে দানফল, যজ্ঞফল, এমন কি পুত্রফল পর্যন্ত নষ্ট হয়। কাজেই যমরাজা যথাযোগ্য সমাদর করে নচিকেতাকে বললেনঃ
‘হে ব্রাহ্মণ, তুমি অতিথি হয়েও আমার গৃহে তিন রাত্রি অনাহারে কাটিয়েছ, তাই তোমাকে নমস্কার করি। তোমার ক্রোধে আমার যেন কোনো অমঙ্গল না হয়। তোমার প্রতি আমি প্রসন্ন হয়েছি—প্রতি রাত্রির জন্যে একটি করে তুমি তিনটি বর প্রার্থনা কর—আমি পূর্ণ করবো।’
তখন নচিকেতা তিনটি বরই প্রার্থনা করলেন; প্রথম বরে বললেনঃ হে যমরাজ, তিনটি বরের মধ্যে আমি প্রথম বর চাই—আমার জন্য আমার পিতার মনে যেন কোনো উদ্বেগ না থাকে, আমার প্রতি যেন তিনি ক্ৰোধশুন্য ও প্রসন্ন হন। আর যমালয়ে গত ব্যক্তির সঙ্গে মর্ত্যলোকের কারো পরিচয় থাকে না—কিন্তু আমার পিতার সঙ্গে যেন আমার ঐরূপ সম্বন্ধ না ঘটে—তিনি যেন আমায় চিনতে পারেন।
যম সন্তুষ্ট হয়ে বললেনঃ ‘তোমার অভীষ্ট সিদ্ধ হোক। তোমার পিতা পূর্বে তোমার প্রতি যেরূপ স্নেহপরায়ণ ছিলেন, তোমায় চিনতে পেরে ভবিষ্যতেও সেরূপ থাকবেন। মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে যাবার পর আমার আদেশে তিনি ক্ৰোধশুন্য হবেন এবং বহুরাত্রি সুখে নিদ্রা যাবেন। এক্ষণে দ্বিতীয় বর প্রার্থনা কর।’
দ্বিতীয় বর প্রার্থনা করে নচিকেতা বললেনঃ স্বৰ্গলোকে কোনো ভয় নেই—সেখানকার অধিবাসীরা আপনার ভয়ে কখনও ভীত হয় না। সেখানে লোক বৃদ্ধ হয় না, লোকের ক্ষুধাতৃষ্ণা থাকে না—আনন্দের মধ্য দিয়ে তারা দিন যাপন করে। হে যমরাজ, অগ্নিবিদ্যার প্রভাবে যারা এই অমরত্ব লাভ করে, তাদের সেই অগ্নিবিদ্যার রহস্য আপনি জানেন। এই রহস্য আমায় বলুন— দ্বিতীয় বরে ইহাই আমি প্রার্থনা জানাই।’

তখন যমরাজ অগ্নিবিদ্যা প্রকাশ করলেন—নচিকেতাও শ্রদ্ধাযুক্ত হয়ে শিষ্যের মতো সমস্ত শুনলেন। নচিকেতা শিষ্যত্ব গ্রহণ করায় যমরাজ প্রীত হয়ে তাকে তিনটি ববের অতিরিক্ত একটি বর দিয়ে বললেনঃ
স্বেচ্ছায় তোমাকে এই চতুর্থ বর প্রদান করছি। অতঃপর অগ্নি তোমার নামেই প্রসিদ্ধ হবেন। যিনি তোমার নামে যজ্ঞাদির অনুষ্ঠান করবেন, তিনিও জন্মমৃত্যু অতিক্রম করবেন। এক্ষণে তোমার তৃতীয় বর প্রার্থনা কর।’

তখন নচিকেতা বললেনঃ মানুষের মৃত্যুর পর এই সংশয় উপস্থিত হয়—আত্মা আছে কি নেই, দয়া করে আমাকে মৃত্যুর এই স্বরূপের বিষয় বলুন—ইহাই আমার তৃতীয় প্রার্থনা।’

যম নচিকেতাকে পরীক্ষা করবার জন্যে বললেনঃ
দেবতারাও এই তত্ত্ব জ্ঞাত নহেন। কাজেই তুমি এই বর ত্যাগ কর অন্য বর প্রার্থনা কর।’ যখন দেবতারাও জানেন না তখন মৃত্যুর স্বরূপ নিশ্চয়ই অত্যন্ত রহস্যময়, এই ভেবে নচিকেতা যমকে বললেনঃ না প্ৰভু! আমাকে এই তত্ত্বই বলুন—অন্য কোনো প্রার্থনা আমার নেই।’
যম নচিকেতকে লোভ দেখিয়ে বললেনঃ তুমি দীর্ঘায়ু পুত্র-পৌত্রসমূহ প্রার্থনা কর, বহু গবাদি পশু, হস্তি, স্বর্ণ কিংবা বিশাল রাজ্য প্রার্থনা কর, কিংবা অমরত্ব;–আমি তোমার সমস্ত প্রার্থনা পূর্ণ করবো, শুধু মৃত্যুর স্বরূপ জানতে চেয়ো না।’

নচিকেতার জেদ চড়ে গেল—তিনি মৃত্যুর স্বরূপই জানবেন, তাই বললেনঃ মানুষ কখনও ধন-রত্ন নিয়ে সুখী হতে পারে না, আমার কামনা থাকলে আপনার কৃপায় প্রচুর বিত্ত কিংবা অমরত্বও পেতে পারি; কিন্তু সে বিষয়ে আমার কামনা নেই—আমাকে মৃত্যুর স্বরূপ বলুন।
যম সন্তুষ্ট হয়ে বললেনঃ নচিকেতা, তোমায় পরীক্ষা করে দেখলুম, তুমি লোভহীন; সাধারণ মানুষ যা চায়, তুমি তা চাও না—তুমি প্রকৃত বিদ্যাভিলাষী, তাই উপযুক্ত শিষ্য ভেবে দেবতাদেরও অজ্ঞাত মৃত্যুতত্ত্বের বিষয় তোমাকে জানাবো ? -
এই বলে যম নচিকেতাকে মৃত্যুর স্বরূপ সম্বন্ধে বিস্তৃতভাবে উপদেশ দিলেন। একমাত্র ব্রহ্মবিদ্যার সহায়তায়ই ইহার স্বরূপ জানা যায়—যম নচিকেতাকে ব্রহ্মবিদ্যা দান করলেন। "
এই ব্রহ্মবিদ্যা জ্ঞাত হয়ে নচিকেতাও জরামৃত্যুর অতীত মুক্তি লাভ করলেন।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য