আশ্চর্য কৌশল

বাদশা সব মন্ত্রীকে বাদ দিয়ে বীরবলকেই বেশি ভালবাসতেন। মন্ত্রীরা অনেকেই বীরবলের প্রতি ঈর্ষান্তিব, বাদশা এ কথা জানতেন। বীরবলকে অপদস্থ করার অনেক চেষ্টা করেও তাঁরা তা পারতেন না, এসব জেনেও বাদশা চুপ করে থাকতেন। একদিন হঠাৎ বীরবলের অনুপস্থিতিতে একদল মন্ত্রী এসে বাদশাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে বললেন ‘হুজুর আমরা এমন কী অপরাধ করেছি যে জাঁহাপনা, আপনার সেবা করবার কোনও সুযোগ পাই না। যা কিছু জ্ঞানবুদ্ধির কাজ, বিচারের কাজ, সেবার কাজ, সবই আপনি বীরবলকে দেন। দয়া করে আমাদের ওপরেও কিছু ভাল কাজের দায়িত্ব দিন। দেখুন না বীরবলের চেয়ে আমরা ভাল পারি কি না?
বাদশা বললেন, ‘তোমাদের কথাটা নেহাত মিথ্যে নয়। সত্যিই বীরবলকে যত বিশ্বাস করি বা ভালবাসি, তোমাদেরকে তা করি না। কারণ বীরবলের অসাধারণ গুণ, সততা, ধৈর্যবিচক্ষণতা ও সাধুতা যেন আমাকেও দিন দিন ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তাকে একদণ্ডও না হলে আমার একদম চলে না, এটা তোমরা মিথ্যা বলোনি। কাজ অবশ্য তোমাদের আমি দিই না আজকাল, কারণ জানি তোমরা বীরবলের মতো পারবে না বলে। বীরবলকে হিংসা কোরো না, সে কিন্তু সত্যিই ভাল।' '

মন্ত্রীরা সব একসঙ্গে মিলে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। বললেন, ‘হুজুর, কী আমাদের অপরাধ?

বীরবল ছাড়া কি এ পৃথিবীতে আর কেউ যোগ্য নয় ? কেন আপনার এই ধারণা হয়েছে, জাঁহাপনা। কীসে আমরা অপারগ তা পরীক্ষা করে দেখুন। আমরা যদি বীরবলের মতো না পারি তবে আপনি আর কোনওদিন আমাদের কাজ দেবেন না।" 
সম্রাট বললেন, তাহলে আমাকে কী করতে হবে, বলো ? সবাই আবার ডুকরে কেঁদে উঠলেন, আমাদের বিদ্যেবৃদ্ধি প্রকাশ পায়, এমন কাজ দিন, সম্রাট। আমরাও আপনার সেবা করতে চাই। আমরাও প্রমাণ করে দেব, আপনার প্রিয় মন্ত্রী বীরবলের চেয়ে আমরা কোনও অংশে কম নই।’ এমনি সব তোষামোদের কথা বলতে লাগলেন তাঁরা। 
তথাস্তু বাদশ ডাক দিলেন তাঁর ভৃত্যগণকে। তারা এসে দাঁড়াল। বাদশা হুকুম করলেন, ‘হাত দুই লম্বা এক টুকরো কাপড় নিয়ে এসো। ঠিক দুহাত লম্বা হওয়া চাই, কমও নয় বেশিও নয়।" 
যেমন বলা, তেমনি কাজ। ভৃত্যরা ঠিক দুহাত লম্বা এক টুকরো কাপড় এনে হাজির করল সম্রাটের সামনে। অন্য মন্ত্রীরা হঠাৎ যেন একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। এ আবার কেমনধারা প্রহসন। সম্রাটের এই আচরণ তাঁদের কাছে ঠিক যেন বোধগম্য হচ্ছিল না। তাঁরা হতবুদ্ধির মতো দাঁড়িয়ে রইলেন সবাই। ভাবলেন, ‘দেখি সম্রাট এই কাপড় দিয়ে কী করেন? সম্রাট ওঁদের সকলকে এবার পাশের ঘরে ডেকে নিয়ে গেলেন। তারপর একটি খাটের বিছানার ওপর সটান শুয়ে পড়ে বললেন, “ওই কাপড়ের টুকরোটা দিয়ে আমার আপাদমস্তক ঢেকে দাও। যেন কোনওদিক বাদ না পড়ে। যদি পারো তবেই জানব তোমাদের বুদ্ধির দৌড় কতদূর। 

তাদের ডেকে এনে যেন বোকা বানাবার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু উপায় নেই, সম্রাটের হুকুম। যেটি অসম্ভব সেইটিই যেন সম্রাট তাঁদের দিয়ে করাতে চান। দুহাত মাত্র কাপড়ের টুকরো দিয়ে কি অত বড় দেহটা ঢাকা যায়? এ কোন দেশি কথা? আমরা কোনওদিনও এমন অসম্ভব কথা শুনিনি।’ বললেন কেউ কেউ। 
তবু প্রত্যেক মন্ত্রী একে একে এগিয়ে এসে ওই কাপড়ের টুকরো নিয়ে টেনেটুনে সম্রাটকে ঢাকবার চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু যা হওয়ার তাই হল। কেউই এই সামান্য কাপড়ের টুকরোতে সম্রাটের দেহ ঢাকতে পারলেন না। যে যার মাথা থেকে যত রকমের বুদ্ধি বের করলেন তাতে কিছুতেই কিছু হল না। মনে মনে সকলে সম্রাটের ওপর রাগ করলেন। এ তো অসম্ভব ব্যাপার। এদিকে টানতে গেলে ওদিকে কুলোয় না ; গলা পর্যন্ত ঢাকতে গেলে হাঁটু পর্যন্ত খোলা থাকে। মন্ত্রীরা একেবারে নাস্তানাবুদ। তাঁদের কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ল। ওঁরা মনে করলেন, সম্রাট অপমান করার জন্যই এই পন্থা বেছে নিয়েছেন। 

অবশেষে ওঁরা সম্পূর্ণ অক্ষমতা জানিয়ে হয়রান হয়ে এক সময় সকলে বসে পড়লেন। বললেন, ‘মহারাজ এরকম অসম্ভব কাজ কেউ কোনওদিন করতে পারবে না। একমাত্র পরীরা পারে হুজুর।
তৎক্ষণাৎ সম্রাট বীরবলকে খবর পাঠালেন। ছুটতে ছুটতে বীরবল এসে হাজির। ব্যাপারটা বীরবলকে বুঝিয়ে দেওয়া হল। বীরবল খাটের দিকে এগিয়ে এসে বললেন, এ আর এমন কী, এ তো খুব সোজা কথা! যে কেউই এ কাজ অনায়াসেই করতে পারবে। আমি মনে করেছিলাম বোধহয় কিছু এমন কঠিন সমস্যা উপস্থিত হয়েছে। এখনই না গেলেই নয়, আমি বিরাট একটা কাজ করছিলাম হুজুরের সাম্রাজ্যের জন্য, এমন সময়...।’

সবাই বীরবলের দিকে উৎসুক হয়ে চেয়ে রইলেন। ভাবতে থাকলেন, ‘দেখি বীরবলের কতদূর বিদ্যা-বুদ্ধি। বীরবল নিশ্চয়ই পরী নয়,মানুষ। মানুষ কখনও দুই হাত কাপড় দিয়ে ওই বিরাট শরীরকে কোনওমতেই ঢাকতে পারবে না। অপমান হবেই হবে। দেখি কী করে ঢাকে সে সম্রাটকে।’ 

সকলের সামনেই বীরবল সম্রাটের পা দুখানা হাঁটু পর্যন্ত মুড়ে, মাথাটা গলার দিকে ঝুঁকিয়ে দিলেন। তারপর সেই কাপড়ের টুকরোটা ছড়িয়ে সম্রাটের সর্বাঙ্গ ঢেকে দিয়ে বললেন, ‘এখন ঠিক হয়েছে। দেখে নাও তোমরা সকলে ঠিকঠাক
হল কিনা! - মন্ত্রীরা স্তব্ধ, বিমূঢ় হতবাক। এ কৌশল এর আগে কারও মাথায় আসেনি। কিন্তু আমরা যদি ওই বুদ্ধিটা করতাম তবে সফল হতাম। সম্রাট তাহলে আমাদের বুদ্ধির দৌড় বুঝতে পারতেন। আমরা একেবারে হেরে ভূত হয়ে গেলাম। সত্যিই বীরবলকে বুদ্ধিমান বলতেই হবে।
তবে সম্রাট একটু প্রতিবাদ জানালেন। বললেন, কিন্তু আমার হাঁটু পর্যন্ত মুড়ে দিতে কে বললে? তোমাকে আমি এ-কথা তো আগে বলিনি বীরবল।’
বীরবল বললেন, ‘বুঝতে পাচ্ছি সম্রাট, এটা আপনারও আগে মনে হয়নি, ও বেচারিদের আর দোষ কী? কিন্তু একটা প্রবাদ চলতি আছে জানেন তো হুজুর? যতটুকু লম্বা চাদর, ঠিক ততটুকু পা সকলের ছড়ানো উচিত! আর এতটুকুও বেশি বা কম যেন না হয় হুজুর।
বাদশা মুগ্ধ, অন্য মন্ত্রীরা অপমানে মুখ নত করে রইলেন। ওঁরা সেদিন এমন অপমানিত হলেন যে, বীরবলকে আর কোনওদিন ঘাঁটাতে সাহস হয়নি তাদের।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য