দ্বিগবিজয়ী পন্ডিত - বাংলাদেশের লোককাহিনী

     এক দিগবিজয়ী পণ্ডিত। মহাপণ্ডিত । অনুস্বর বিসর্গভরা বড় বড় কথা তার মগজের মধ্যে গিজগিজ করিতেছে। সেই পণ্ডিত যে দেশে যান, সেই দেশের পন্ডিতদের তর্ক  করিতে ডাকেন। তাঁর তর্কের শর্ত এই, যে তার সঙ্গে হারিবে, পণ্ডিত মহাশয় তার টিকি কাটিয়া লইবেন । আর পণ্ডিত মহাশয় যদি হারেন, তবে যে তাকে হারাইবে, সে তার টিকি কাটিয়া লইবে ।
     কাশী, কাঞ্চি, কনোজ, সমস্ত দেশের পণ্ডিতসমাজকে হারাইয়া তাহাদের মাথা টিকি-শূন্য করিয়া অবশেষে পণ্ডিত মহাশয় নবদ্বীপে আসিলেন। সেখানে বহু বড় বড় পণ্ডিত ছিল, তাহার সঙ্গে তর্কে হারিয়া সকলের টিকি কাটা গেল । এবার সমস্ত দেশ জয় করিয়া তিনি দেশে ফিরিতেছিলেন । এমন সময় খবর পাইলেন কি চাই, পূর্ববঙ্গে বিক্রমপুর নামে একটা গ্রাম আছে। সেখানে অনেক বড় বড় পণ্ডিত। তাহাদের না হারাইতে পারিলে তাহার দিগবিজয় সম্পূর্ণ হইবে না।
     নবদ্বীপ হইতে নৌকা করিয়া শিষ্য-সেবক সঙ্গে পণ্ডিত মহাশয় বিক্রমপুর রওয়ানা হইলেন। তাহার আগে-পিছে আট-দশখানা নৌকা ভরা টিকি বোঝাই । এতদিন যেখানে যত পণ্ডিতের টিকি কাটিয়াছেন, সব বস্তায় পুরিয়া সঙ্গে আনিয়াছেন।
     দুই তিনখানা নৌকায় পণ্ডিতের শিষ্যেরা বসিয়া বসিয়া বিক্রমপুরের পণ্ডিতদের টিকি কাটিবার আশায় কাচিতে ধার দিতেছে,ঘচা ঘচ্চং– ঘচা ঘচ্চং।
     এই দিগবিজয়ী পণ্ডিতের নৌকা যখন বিক্রমপুরের ঘাটে আসিয়া ভিড়িল তখন সেখানকার পণ্ডিতসমাজের মধ্যে হায়! হায়! রব পড়িয়া গেল ।
     বিক্রমপুরের পণ্ডিতদের বড় বড় টিকি। কারো দশ হাতী টিকি, কারো বিশ হাতী টিকি, কারো বা চল্লিশ হাতী টিকি।
     সেই দিগ্‌বিজয়ী পণ্ডিতের সঙ্গে তাহদের একে একে তর্কযুক্ত আরম্ভ হইল। প্রথম দশ হাতী পণ্ডিতের টিকি কাটা গেল, তারপর বিশ হাতীর, তারপর ত্রিশ হাতীর, তারপর চল্লিশ হাতী পণ্ডিতের পালা । চল্লিশ হাতী পণ্ডিত টিকিতে ভালমতো সরিষার তৈল মালিশ করিয়া সেই দিগবিজয়ীর সঙ্গে তর্কযুদ্ধে আগমন করিলেন। কিন্তু দিগ্‌বিজয়ী পণ্ডিতের একটি প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পারিলেন না। তখন পণ্ডিতের শিষ্যেরা কাচি আগাইয়া ঘচা ঘচ্চং করিয়া সেই চল্লিশ হাতী পণ্ডিতের টিকি কাটিতে প্রস্তুত হইল ।
     পণ্ডিত অনেক কাকুতি মিনতি করিয়া বলিলেন, “তোমরা আজিকার দিনটা সবুর কর । কালকে আমার টিকি কাটিও। আজ আশি বছর ধরিয়া কত সরিষার তৈল মালিশ করিয়া এই টিকি বড় করিয়াছি। নিমন্ত্রণ সভায় কত রসগোল্লা সন্দেশ এই টিকির সঙ্গে বাঁধিয়া লইয়া বাড়ি আসিয়াছি। আজকের রাতটা টিকিটাকে ভালমতো যত্ন করিয়া লই । কাটিতে হয় ত কাল কাটিও।” দিগবিজয়ী পণ্ডিতের শিষ্যেরা এই কথায় রাজি হইল ।
     চল্লিশ হাতী পণ্ডিত বাড়িতে আসিয়া আপনার জনদের কাছে তার পরাজয়ের সকল কথা বলিলেন । বাড়ির সকলে মিলিয়া পণ্ডিতের এই চল্লিশ হাতী টিকি ধরিয়া সুর করিয়া কাঁদিতে লাগিল । কাল সকালে এই টিকি কাটা যাইবে । ইহাতে কি পণ্ডিত মহাশয়ের যে-সে ক্ষতি হইবে ? দেশে নিয়ম ছিল, প্রত্যেক নিমন্ত্রণে ভূরিভোজনের পরে যে পণ্ডিতের যত হাত টিকি, সে ততটা করিয়া রসগোল্লা আর পানতোয়া বাড়িতে লইয়া আসিতে পারিবে। কাল যদি এই টিকি কাটা যায়, তবে নিমন্ত্রণ বাড়ি হইতে ভবিষ্যতে আর কিছুই আসিবে না। পণ্ডিতের বউ বিনাইয়া বিনাইয়া কান্দে, পন্ডিতের ছেলেমেয়েরা হাউমাউ করিয়া কান্দে।
     বাড়িতে ছিল একটি নমঃশূদ্র চাকর । সে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “আপনারা এরূপ কান্নাকাটি করিতেছেন কেন ?" পণ্ডিত মহাশয় তাহার সকল দুঃখের কাহিনী বর্ণনা করিয়া বলিলেন, “কাল হইতে আর আমি তোমাকে রাখিতে পারিব না । টিকি যদি কাটা যায় আমার আর আয় থাকিবে না। কি করিয়া তোমাকে বেতন দিব ?” 
     নমঃশূদ্র চাকরটি সমস্ত শুনিয়া বলিল, “আপনি যদি অনুমতি দেন, আমি একবার এই দিগবিজয়ী পণ্ডিতের সঙ্গে যাইয়া বিচার করিয়া আসিতে পারি। আপনি শুধু আপনার পৈতাগাছা আমাকে দিবেন।” 
     পণ্ডিত মহাশয় দীর্ঘনিশ্বাস লইয়া বলিলেন, “এত বড় বড় পণ্ডিত হারিয়া আসিল, আর তুমি যাইবে তাহার সঙ্গে তর্ক করিতে?” 
     চাকরটি বলিল, “আপনি আমাকে শুধু একগাছা পৈতা দেন। আমি হারিলে ত আপনাদের কোনো ক্ষতি নাই। যদি জিতি তাহা হইলে সকলেরই ভাল।” 
     পণ্ডিতের বউ বলিলেন, “দাও একে একগাছা পৈতা । পচা শামুকেও তো পা কাটে। দেখি ও কি করে।” 
    পরের দিন সকালবেলা পৈতা গলায় ঝুলাইয়া, চান্দিতে পাট দিয়া হাত পঞ্চাশেক একটি নকল টিকি লাগাইয়া, তাহাতে হাড়িপাতিলের কালি লাগাইয়া চাকরটি দিগবিজয়ী পণ্ডিতের সামনে যাইয়া উপস্থিত হইল ।
     দিগবিজয়ী পন্ডিত তাচ্ছিল্যের সহিত বলিলেন, “হাতি ঘোড়া হল তল, মশা বলে কত জল। এত এত পণ্ডিত আমার সঙ্গে পারিল না, আর তুমি ছেলেমানুষ আসিয়াছ বিচার করিতে। মানে মানে বাড়ি চলিয়া যাও।”
     চাকর বলিল, “অল্প বয়স বলিয়া আমাকে হেলা করিবেন না। এতটুকুন আগুনের ফুলকিতে সারা গ্রাম পুড়িয়া যায়। এতটুকু কাটাটা ফুটিলে হাতিও পা পিছড়াইয়া পড়িয়া যায়, এতটুকুন বড়শি দিয়া কত বড় বড় মাছ ধরিয়া আনে।”

     দিগ্বজয়ী বলিলেন, “ছোকরা! তুমি ত ডেঁপো হইয়া উঠিয়াছ । আচ্ছা, আমাকে প্রশ্ন কর।’
     ছোকরা চাকর বলিল, “আপনিই আগে আমাকে প্রশ্ন করুন।”

     দিগবিজয়ী পণ্ডিত তখন জিজ্ঞাসা করিলেন, “বল ত তোমার কত চাটাই ?” 
     চাকরটি পাল্টা জবাব দিয়া বলিল, “আপনার কত চাটাই তাই আগে বলুন।” 
     দিগবিজয়ী উত্তর করিলেন, “আমার একশ চাটাই ।” 
     চাকর বলিল, “আমার পাঁচশ চাটাই।”
     দিগবিজয়ী তখন একশত চাটাইর উপর বসিলেন। চাকর বসিল তার চাইতে উচু জায়গায় পাচশত চাটাইর উপর।
     দিগবিজয়ী এবার চাকরকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আমাকে প্রশ্ন কর ।” 
     চাকর বলিল, “আপনিই আগে আমাকে প্রশ্ন করুন।” 
     দিগ্‌বিজয়ী জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘বল ত লাউয়া ফলং মানে কি ?” 
     চাকর তখন পাঁচশ চাটাইর উপর হইতে লাফ দিয়া পড়িয়া দিগবিজয়ীর টিকি ধরিয়া বলিল, “আরে মূর্খ! আগেই লাউয়া ফলং কিরে। প্রথমে বীজ রোপণং করন্তি, তার পরে অঙ্কুর হইতে গাছং হন্তি, গাছ জাংলাং বান্তি, গাছে ফুলং হন্তি তার পরে ত লাউয়া ফলং। অর্থাৎ কিনা, প্রথমে বীজ রোপণ করিতে হইবে। তারপর বীজ হইতে অঙ্কুর জন্মিবে, তাহা হইতে গাছ, গাছ আবার জাংলা বাহিলে তাহা হইতে ফুল ধরিবে, এই ফুল হইতে লাউ ফল ধরিবে ।” 
     এতবড় দিগবিজয়ী পণ্ডিত ছোকরা চাকরের কাছে হারিয়া গেল। ছোকরা তখন তার টিকিটি কাটিয়া লাফাইতে লাফাইতে বাড়ি আসিল । 
     পরের দিন বিক্রমপুরে সকলে মিলিয়া দিগবিজয়ী পন্ডিতের সেই টিকিগাছা লইয়া রাস্তায় রাস্তায় নগর সংকীর্তন করিয়া বেড়াইল । 
     টিকিশুন্য দিগবিজয়ী পণ্ডিত লজ্জায় দেশে ফিরিয়া গেল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য