লোভের শাস্তি

এক জেলে আর জেলেনী। তারা বড় গরীব। জেলে খালে বিলে মাছ ধরে, সে মাছ বিক্রী করে যা পায়, তাতেই তার দিন চলে। কোন দিন অন্য জেলেদের সঙ্গে নৌকা করে নদীতে যায়, সাগরেও যায়। তিনচারদিন পরে ফিরে আসে। মাছগুলি পথেই বিক্রি হয়ে যায়। তাতে বেশ দু’পয়সা হয়। কিন্তু তা মাসের মধ্যে দু’দিন মাত্র। এই দু’এক দিনের আয়েই সংসার কিছু স্বচ্ছল হয়। জেলেনীর মুখে হাসি ফোটে। জেলেকে দু’একখানা শাড়ী বা দু’একখানা রুপোর গয়না, কিনে দিতে বলে।

জেলে যা পারে কিনে দেয়। কিন্তু জেলেনীর মন ভরে না। স্ত্রীর জন্য জেলের মনে সুখ নেই, শান্তি নেই। তবুও সে ভূতের মতো খাটে। শীত নেই, গ্রীষ্ম নেই, নৌকায় নৌকায় ফিরে, কিংবা জাল কাঁধে করে এখানে ওখানে মাছ ধরে।
তাতে আর কি হবে? যে-দুঃখ, সে দুঃখ। যদি তার একখানা নিজের নৌকা থাকত, তা হলে একাই মাছ ধরত। বিক্রি করে বেশী পয়সাও পেত, ভাল করে খেতে পেত, ভালো করে থাকতে পেত।

কিন্তু নৌকা কিনতে অনেক টাকার দরকার। এতগুলি টাকা কোন দিনই একসঙ্গে সে পাবে না। এই নৌকাও হবে না। মনের দুঃখে  একদিন রাতে জেলে জাল কাঁধে করে বের হল। কারু সঙ্গে আর সে যাবে না। বেশ মাছ পায় তো ভাল। তা নইলে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে ডুবে মরবে। যে জীবনে কেবল কষ্ট সে জীবন  রেখে লাভ কি?

ভোর বেলা। রাস্তায় কেউ নেই। কেবল গাছে গাছে পাখিদের কিচির মিচির। চলতে চলতে জেলে এসে দাঁড়াল নদীর ধারে। কোন দিকে প্রথম জাল ফেলবে, এই মনে ভাবছে। প্রথম ক্ষেপে জালে যাদি কোন মাছ না পড়ে, তবে সারাদিন সে আর কিছুই পাবে না। জেলে চারদিকে তাকাচ্ছে আর ভাবছে।

এমনই সময় একটা গাংচিল কেবলই ঘুরপাক খাচ্ছে নদীর পূর্ব-দক্ষিণ কোণে। জেলে বুঝল গাঙচিলটা মাছের খোঁজে আছে। গাঙচিলরা জানে নদীর কোথায় মাছ তাকে। জেলে সেদিকে এগিয়ে গেল। গাংচিলটা উড়তে উড়তে হঠাৎ ছোঁ মেরে জলের ভেতর থেকে একটা মাছ ঠোঁটে করে আবার উপরে উঠে গেল। জেলেও সঙ্গে সঙ্গে সেখানে জাল ফেলেল। তারপর জাল টেনে তুলে দেখল, জালে একটা বড় মাছ। এতবড় মাছ সে জীবনে ধরে নি। তাড়াতাড়ি জালটা ডাঙ্গায় তুলল। কিন্তু মাছটাকে যেই ধরবে অমনি সে বলে উঠল, ভাই আমাকে ছেড়ে দাও, আমি তোমার উপকার করব। কাল তুমি আবার এখানে এসো।

জেলে মাছটাকে জলে ছেড়ে দিল। নিমেষের মধ্যে সে জলেল ভিতর ঢুকে গেল।

জেলে তাড়াতাড়ি বাড়ী এসে জেলেনীকে সব কথা বলল। জেলেনী শুনে বলল, আচ্ছা বোকা লোক ত। এত যে সে মাছ নয়। এ নিশ্চয়ই মৎসরূপী দেবতা, তুমি কিছু চাইলে না কেন?
জেলে বলল, মাছ আবার কথা বলে! কখনো দেখিনি, শুনিওনি। আমি একেবারে অবাক। কোন খাত জিজ্ঞাসা করবার আর সময়ও পেলাম না। তবে আমাকে আবার যেতে বলেছে।

জেলেনী শুনে মহাখুশী। সে জেলেকে বলল, দেখ আমাদের একটা শোবার ঘর নেই। তুমি মা ছের কাছে একটা ঘর চেয়ে নিও।
জেলে জেলেনীর কথায় সায় দিল না। সে কি আবার হয় নাকি! এমনি এমনি ঘর পাওয়া যাবে! মাটি ফুঁড়ে একটা ঘর উঠতে পারে? নিজের কোন চেষ্টা করতে হবে না। কোন পরিশ্রম করতে হবে না! আপনি আপনি একটা ঘর হয়ে যাবে!

জেলেনী বলল, তুমি চেয়েই দেখ না। যে মাছ কথা বলতে পারে, সে মাছ জাদুও জানে। যাদুতে কি না হয়।
জেলে আর কি করে। পরদিন আবার সকালবেলা নদীর ধারে গেল। জেলেকে দেখতে পেয়েই মাছটা কাছে এসে বলল, কি ভাই, কি চাই।

জেলে বলল, জেলেনী একটা ঘর চায়।
মাছ বলল, তাই হবে। তুমি চলে যাও।
জেলে বাড়ী ফিরে দেখে অবাক কান্ড। একটি সুন্দর ঘর।
দোরে জেলেনী হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। জেলেকে দেখে জেলেনী বলল, কেমন আমি বলিনি? এই দেখ কেমন সুন্দর ঘর। এস ভিতরে এস।

জেলে ভিতরে ঢুকে আরও অবাক হলো। একখানা শোবার ঘর, একটা বৈঠকখানা আর একটা রান্নাঘর। পিছনে একটি ছোট্ট বাগান। বাগানে নানা রকমের ফুলের গাছ। কয়েকটা মিষ্টি ফলের গাছ।

জেলেও খুশী হলো। এমন বাড়ীতে বাস করতে পারবে জীবনেও সে ভাবেনি।
দিন যায়। মাস যায়। বছর গেল। জেলেনী আবার উসখুস করতে লাগল। এত ছোটবাড়ী আর ভাল লাগে না। শহের গিয়ে সে দেখে এসেছে বড় বড় পাকা বাড়ী, বাড়ীর সঙ্গে বড় বাগান বাড়ীর ভিতর বড় উঠান। এমন বাড়ী না হলে বাস করে কি সুখ! একদিন জেলেনী জেলেকে বলে ফেলেল কথাটা।

জেলে বলল, এত বেশ ভাল বাড়ী। ছিলুম ভাঙা ঘরে। জল পড়ত। এখন বেশ তো আরামে আছি। আমি মাছের কাছে আর কিছু চাইতে পারব না।

জেলের কথা শুনে জেলেনী ত রেগে আগুন, বলল এমনি পেলে কোন জিনিস কে না নেয়? তোমার মত বোকা আর দেখিনি। পৃথিবীতে যারা বোকা তারাই দুঃখে মরে। তুমি যাও।

জেলে আর কি করে। ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল নদীর দিকে। আবার দেখা পেল সেই মাছের।

জেলের কাছাকাছি এসে মাছটা বলল, কি ভাই, আবার কি চাই?
জেলের নিজের চাইবার কোন ইচ্ছা ছিল না। সে বলল, জেলেনী চায় একটা বড় পাকা বাড়ী।

বেশ তাই হবে-- এই বলে জলের ভিতর চলে গেল।
জেলে তাড়াতাড়ি ফিরে দেখে এক মস্ত বাড়ি। বাাড়ির মধ্যে অনেকগুলো ঘর। চমৎকার করে ঘরগুলো সাজানো। ঘর ভর্তি চেয়ার, টেবিল, খাট, পালঙ্ক। অনেক চাকরবাকর, গোয়ালভরা গরু। মস্ত বড় বাগান। বাগানে ফনেক ফুলের গাছ, ফলের গাছ। বাড়েীর পিছনে মস্ত বড় পুকুর। পুকুরে অনেক মাছ। চারধারে বাঁধানো ঘাট। সবই ছবির মত সুন্দর।

জেলে খুশী হল। জীবনে আর কি চাই। বাকী জীবনটা বেশ আরামেই কাটাব।

জেলেল কথা শেুনে জেলেনী হেসে বলর। শুধু একটা বড় বাড়ী থেকে কি লাভ। জমিদার না হলে সুখ নেই। হাজার হাজার বিঘা জমি থাকবে। থাকবে প্রজা, লোকলস্কর, পাইক-বরকন্দাজ, নায়েব-গোমস্তা। আদায়-ওয়াশিল হবে, ভারে ভারে ঘি আসবে, দুধ আসবে, আসবে মিষ্টান্ন।

জেলেনীর তাই সাধ। জেলে মনে মনে রাগ করে। কিন্তু জেলেনীর মুখের উপর কিছু বলতে পারে না।
যাই হোক, মাছের দয়ায় হল জমিদারী।
জমিদারী পেয়েও জেলেনী খুশী হল না।

একদিন রাত্রের কথা। জেলে ও জেলেনী শুয়ে আছে। জেলের ঘুম এসেছে। জেলেনী হঠাৎ জেগে উঠে জেলেকে বলে, শোন। আমার একটা কথা মনে পড়েছে। জমিদার হয়েও দেখলুম। কি এমন সুখ! এবার এক রাজ্যের রাজা হতে হবে। আমাদের রাজত্ব চাই।

জেলে শুনে ত অবাক। জেলেনী বলে কি? রাজা আর রাজত্ব। জেলে হেসে উঠল। না, জেলেনীর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তা নইলে এমন কথা বেল কখনও! জেলে ঘুমাবার চেষ্টা করল। কিন্তু জেলেনী ঘুমুতে দেবে কেন? সে বলল, কাল সকালে গিয়েই মাছের কাছে রাজ্য চেয়ে নেবে।

জেলে বলল, মাছ কি তা দিতে পারবে? রাজ্য নিয়ে কি করব? এই তো বেশ আছি। ছিলুম ভাঙা ঘরে, খেতে পেতুম না। পেয়ে গেলুম জমিদারি। আর কিছু চেয়োনা জেলেনী।

জেলেনী শোনার মানুষ নয়। বলল, তুমি আর একবার যাও। গিয়েই দেখ না। যে জমিদারী দিতে পারে, মে সম্রাজ্যও দিতে পারে।

জেলে আর কি করে। ভয়ে ভয়ে এগোতে লাগল নদীর দিকে। নদীর ধারে গিয়েই মাছের সঙ্গে দেখা।

মাছ জিজ্ঞেস করল, এবার কি চাই। জেলে অনেক সঙ্কেচ করে বলল, আমি কিছু চাই না। জেলেনীর ইচ্ছা,সে একটা সাম্রাজ্যের রাণী হবে।
মাছ বলল, তোমার জেলেনীর লোভ অনেক। তাকে যতই কিছু দেই না কেন। তার মন কখনই ভরবে না। তাই আমি তোমার সমস্ত কিছু কেড়ে নিলাম। তুমি আবার আগের মতো যাবে।

জেলে বাড়ি ফিরে এসে দেখে, কোথায় রাজসিংহাসন, কোথায সিপাহী, শাস্ত্রী, মণি, মাণিক্য আর সোনা-রূপা। কোথাও কিছু নেই। সব যেন স্বপ্নের মতো উড়ে গিয়েছে। পড়ে রয়েছে তাদের সেই পুরনো, ভাঙা কুড়ে ঘর।
আর কুঁড়ের মধ্যে ছেঁড়া কাপড় পরে মাথা নিচু করে বসে আছে জেলেনী।

জেলে চুপ করে পাশে এসে দাঁড়ালো। আর ধীরে ধরে বলল, দেখলেতো, অতি লোভ ভাল নয়।

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য