ছোটো জলকন্যার কথা-- ৩য় অংশ

হায়, তার কথা বলার সাধ্য ছিল না। তখন রাজপুত্র তার হাত ধরে রাজবাড়ির ভিতরে নিয়ে গেল। পা ফেলতেই মনে হল যেন শান দেওয়া তলোয়ারের উপরে হাঁটছে ; খুশি হয়েই সে ব্যথা বইল। রাজকুমারী হেঁটে চলল, শরীর যেন বাতাসের মতো হাল্কা, চলা-ফেলার কী সুললিত ছন্দ। 
রাজবাড়িতে পৌছলে পর তাকে দামী দামী মসলিন আর রেশম পরান হল। তার মতো রূপসী সেখানে কেউ ছিল না, কিন্তু সে কথাও কইতে পারত না, গানও গাইতে পারত না। রেশম আর সোনার কিংখাবের পোশাক পরে ক্রীতদাসীরা রাজা, রানী, রাজপুত্রের সামনে গান গাইল। একজনের গলা বড়ো মিষ্টি।
তার গান শুনে রাজপুত্ৰ হাততালি দিয়ে তারিফ করল। রাজকুমারীর সে কী দুঃখ, ওর নিজের গলার স্থর যে আরো বেশি মধুর ছিল। সে ভাবল, ‘হায়, উনি যদি জানতেন ওঁর জন্যেই আমি চিরকালের মতো আমার গলার হরটি দিয়ে দিয়েছি।” 

ক্রীতদাসীরা নাচতে শুরু করল। তখন রূপসী রাজকন্যাও উঠে এসে সুন্দর সাদা দুই বাহু তুলে নাচ ধরল। সে কি নাচ ! এতটুকু নড়লেই দেহের সুষমা, চলনের লাবণ্য উপচিয়ে পড়ে। যে দেখে সে চোখ ফেরাতে পারে না। ক্রীতদাসীদের মধুর গানের চেয়েও রাজকন্যার দুই চোখের নীরব ভাষা তাদের হৃদয়ের মৰ্মমূলে গিয়ে পৌছল। সবাই মুগ্ধ হল, বিশেষ করে রাজপুত্র। সে বলল, “এ আমার বড়ো আদরের কুড়িয়ে পাওয়া ধন।” 

বারেবারে রাজকুমারী নাচ দেখাল, প্রতি পদক্ষেপে সে কি অসহ বেদনা ! শেষে রাজপুত্র বলল, “তুমি সদাই আমার কাছে থেকে।” সেই ব্যবস্থাই হল। রাজপুত্রের নিজের মহলে, তার শোবার ঘরের লাগোয়া ঘরে, মখমলের গদি বিছিয়ে

রাজকুমারীর শোবার জায়গা হল। রাজপুত্র তার জন্যে পুরুষদের মতো পোশাক করাল, তাই পরে সে তার সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে বেড়াবে বলে। সুগন্ধে বনভূমি ম-ম করত, সবুজ শ্যামল গাছের ডালপালা তাদের গায়ে স্পর্শ করত, নতুন পাতার আড়ালে পাখিরা আনন্দে গান গাইত। রাজপুত্রের সঙ্গে জলকন্যা খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠত, কচি পায়ে রক্ত ঝরত, রাজকুমারী হাসরতা আর ভালোবাসার ধন রাজপুত্রের পায়ে পায়ে পাহাড়-চুড়োয় গিয়ে উঠত। সেখান থেকে দেখতে পেত নীচে মেঘেরা লুকোচুরি খেলছে, পাখির ঝাঁক ভিন দেশে উড়ে যাচ্ছে। রাতে যখন রাজবাড়ির সকলে ঘুমিয়ে থাকত, রাজকুমারী ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসত, শ্বেত পাথরের সিঁড়ি বেয়ে নেমে, অগাধ জলে পা ডুবিয়ে শীতল করতে চাইত। তখন সাগরতল-বাসী তার সেই-সব প্রিয়জনদের কথা মনে পড়ত। 

একদিন সে সাগরের জলে পা ধুচ্ছে, এমন সময় একসঙ্গে হাত ধরাধরি করে, তার দিদিরা সবাই গান গাইতে গাইতে উঠে এল । সে গান বড়ো করুণ। ছোটো জলকন্যা হাতছানি দিয়ে তাদের কাছে ডাকল। তাকে দেখেই তারা চিনল, কত দুঃখের কথাই-না তাকে বলল, তার অভাবে তার বাপের বাড়ির সবাই কত কাতর। তার পর থেকে দিদিরা রোজ রাতে তাকে দেখতে আসত। একদিন বুড়ি ঠাকুমা এলেন, কত কাল তিনি উপরের জগৎ দেখেন নি। মাথায় মুকুট পরে, তাদের বাবা জলরাজ নিজে এলেন একদিন তাকে দেখতে। কিন্তু তাদের বয়স হয়েছে, ডাঙার কাছে কেউ এলেন না, ছোটো রাজকুমারীর সঙ্গে কথা বলা হল না। 

ছোটো রাজকুমারীর উপর রাজপুত্রের টান দিনে দিনে বাড়তে লাগল। কিন্তু রাজকুমারীকে তার মনে হত মিষ্টি একটি 

ছোটো মেয়ে, তাকে বিয়ে করার কথা স্বপ্নেও কখনো মনে হয় নি। কিন্তু বিয়ে না হলে তো সে অমর আত্মা পাবে না, বিয়ে না হলে তাকে যে এক মুঠো ফেনা হয়ে সমুদ্রের ঢেউয়ের মাথায় ভেসে বেড়াতে হবে! রাজপুত্র তাকে আদর করে, যখন সুন্দর কপালে চুমো খেত, জলকন্যার চোখ দুটি জিজ্ঞাসা করত, ‘তুমি কি আমাকে সবার চেয়ে বেশি ভালোবাস ? রাজপুত্ৰ বলত, “হ্যাঁ, তোমার মতো ভালো আর কেউ নেই, তোমাকেই সব চেয়ে বেশি ভালোবাসি। তুমিও আমাকে কত ভালোবাস। তোমাকে দেখে আমার আরেকটি মেয়ের কথা মনে পড়ে, তাকে একবার মাত্র দেখেছি, আর হয়তো দেখা হবে না। জাহাজে ছিলাম হঠাৎ ঝড় উঠে জাহাজ ডুবি হল। ঢেউগুলো আমাকে নিয়ে তীরে আছড়ে ফেলল পবিত্র এক মন্দিরের সামনে। সেখানে কয়েকজন মেয়ে দিনরাত সাধন-ভজন নিয়ে থাকে। ওদের মধ্যে যে সবার ছোটো সে আমাকে সাগর তীরে দেখতে পেয়ে, আমার প্রাণ বাঁচাল। একটিবার মাত্র তাকে দেখেছি, কিন্তু তার মুখখানি আমার মনের মধ্যে গেঁথে আছে, তাকে ছাড়া আর কাউকে আমি ভালোবাসতে পারব না। তবে সে তো মন্দিরে উৎসর্গ করা। তুমি তার মতোই দেখতে। মনে যাতে সাস্তুনা পাই তাই তোমাকে পেলাম, তোমাকে কখনো কাছ-ছাড়া করব না।” 

বুক-ভাঙা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে জলকন্যা ভাবল, ‘হায়, উনি জানেনও না যে আমিই ওঁর প্রাণ বাঁচিয়েছিলাম।" একদিন সভাসদরা বলাবলি করতে লাগল, “পাশের রাজ্যের রাজার মেয়ের সঙ্গে আমাদের রাজপুত্রের বিয়ে হবে। তাই ঐ চমৎকার জাহাজ সাজান হচ্ছে। সবাই জানে রাজপুত্র বিদেশে বেড়াতে

যাচ্ছে, কিন্তু আসলে রাজকন্যাকে দেখতে যাচ্ছে। এ ধরনের কথা শুনলে ছোটো জলকন্যার হাসি পেত ; আর কেউ না জানুক সে তে রাজপুত্রের মনের কথা জানত। 

একদিন রাজপুত্র বলল, “আমাকে যেতেই হবে ; গিয়ে সেই সুন্দরী রাজকন্যাকে দেখে আসতে হবে। মা-বাবার বড়ো সাধ । অবিশ্যি তাই বলে সে মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে আনতে কেউ আমাকে বাধ্য করতে পারবে না। তাকে ভালোবাসা আমার পক্ষে অসম্ভব, তার তো আর তোমার মতো মন্দিরের সেই রূপসীর সঙ্গে সাদৃশ্য থাকতে পারে না। বিয়ে যদি করতেই হয়, ওরে আমার কুড়িয়ে-পাওয়া মুখ-চোরা ধন, চোখ যার কথা বলে, তার চেয়ে বরং তোমাকেই আমার বেশি পছন্দ ! 

এই বলে রাজপুত্র তাকে চুমে খেয়ে, চুলে হাত বুলিয়ে, বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করল। আর জলকন্যার মনের মধ্যে ফুটে উঠল মানব-জন্মের সুন্দর আর অনন্ত আনন্দের মধুর এক ছবি। চমৎকার সুসজ্জিত জাহাজে করে ওরা পাশের রাজ্যের রাজার কাছে যাচ্ছে ; দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, এমন সময় রাজপুত্র বলল, “ও আমার মিষ্টি মেয়ে, মুখে যার কথা নেই, তুমি সাগর দেখে ভয় পাবে না তো ?” তার পর রাজপুত্র তাকে সমুদ্রের ঝড়ের কথা বলল, সাগর-জল তখন কেমন খ্যাপা হয়ে ওঠে, গভীর জলের মাছদের কথা বলল, ডুবুরীরা সমুদ্রের তলায় কি অদ্ভুত সব জিনিস দেখতে পায়, সে কথা বলল। জলকন্য শুধু একটু হাসল। অগাধ সাগরের তলার কথা সে যেমন জানে, ডাঙার মানুষদের ছেলেমেয়েরা কি করেই-বা জানবে ? 

রাতে চারদিকে চাঁদের আলো ফুটফুট করত, জাহাজের সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন, পাটাতনে একা বসে ছোটো রাজকুমারী জলের নীচে চেয়ে দেখত। জাহাজের খোল যে ফেনার রেখা একে যাচ্ছিল, ওর মনে হচ্ছিল তার ভিতর দিয়ে যেন বাবার প্রাসাদ, ঠাকুমার রুপোলি মুকুট দেখতে পাচ্ছে। তার পর দেখল যেন দিদিরা জলের উপরে ভেসে উঠে ওর দিকে হাত বাড়াচ্ছে মুখে তাদের কী করুণা ! ছোটো রাজকুমারী তাদের দিকে মাথা নেড়ে, হেসে, জানাতে চাইল যে সে যেমনটি চেয়েছিল সব ঠিক তেমনি হবে। ঠিক সেই সময় জাহাজের ছোকরা চাকর এসে দেখা দিল, আর দিদিরা এমনি হঠাৎ ঝাপ দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল যে, সে ভাবল বুঝি ঢেউয়ের মাথায় যা দেখল সে শুধু ফেনা ছাড়া আর কিছু নয়। 

পরদিন সকালে রাজার জমকাল রাজধানীর বন্দরে এসে জাহাজ পৌছল। কেউ ঘণ্টা বাজাল ; কেউ শিঙায় ফুঁ দিল ; পতাকা উড়িয়ে, তলোয়ারের ঝলক দিয়ে, সেনাদল শহরের মাঝখান দিয়ে মিছিল করে চলল। মহা ধুমধাম হল, রোজরোজ নতুন ধরনের উৎসব, নাচ-গান, ভোজের পর ভোজ । তবে রাজকন্যা তখনো শহরে এসে পৌছয় নি। অনেক দূরে কোনো আশ্রমে তাকে পাঠান হয়েছিল লেখা-পড়া আর রাজ-বংশের যোগ্য নানা বিদ্যা শিখতে। অবশেষে একদিন সে রাজবাড়িতে ফিরে এল। তার সঙ্গে দেখা হবামাত্র রাজপুত্র বলে উঠল, “এ যে সে-ই ! যখন মরার মতো সমুদ্রের ধারে পড়েছিলাম, এ-ই তো আমার প্রাণ বাঁচিয়েছিল ?” রাজকন্যার মুখ রাঙা হয়ে উঠল । রাজপুত্র তাকে আলিঙ্গন করল। 

কুড়িয়ে-পাওয়া বোবা মেয়েকে রাজপুত্র বলল, “আজ আমার কত সুখ! যা কখনো আশা করি নি, শেষে তাই হল। আমার সুখে তুমিও সুখী হও, আমাকে যারা ঘিরে থাকে, তাদের মধ্যে কেউ আমাকে তোমার মতো ভালোবাসে না।” বুক ভরা 

নীরব বেদনা নিয়ে জলকন্যা রাজপুত্রের হাতে চুমে খেল । মন্দিরের ঘণ্টা আবার বেজে উঠল, বর-কনে পরস্পরের হাতে হাত দিয়ে পবিত্র মন্ত্র উচ্চারণ করল ; তাদের বিয়ে হয়ে গেল । রেশম আর সোনালি জরির পোশাক পরে, বিয়ের কনের লুটান আঁচলের কোণা ধরে, তার পিছনে ছোটো জলকন্যা দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু তার কানে সেই সুগম্ভীর বাজনা পৌছয় নি, তার চোখ দুটিও সেই পবিত্র অনুষ্ঠানের কিছুই দেখতে পায় নি। তার কেবলই মনে হচ্ছিল এবার জীবন শেষ হয়ে গেল, ইহলোক পরলোক দুই-ই খোয়া গেল। সেদিনই সন্ধ্যায় বরকনে জাহাজে উঠল ; কামান ছোড়া হল, বাতাসে পতাকা উড়ল, পাটাতনের মাঝখানে বেগুনি আর সোনালি কিংখাবের চমৎকার চাদোয়া তোলা, তার তলায় কী জমকাল, কী নরম, কী আরামের সব কুরশি-কেদারা। এইখানে রাজপুত্র আর রাজকন্যা রাত কাটাবে। অনুকূল বাতাসে পাল ভরে উঠল, নীল জলের উপর দিয়ে ধীরে ধীরে জাহাজ ভেসে চলল। 

যেই অন্ধকার নামল, রঙিন বাতি ঝোলান হল, পাটাতনে নাচ-গান শুরু হল । ছোটো জলকন্যার মনে পড়ে গেল, প্রথমবার জলের উপরে উঠে এই দৃশ্যই সে দেখেছিল । আজকের উৎসবও তেমনি জমকাল। তাকে আজ নাচে যোগ দিতে হল, পাখির মতো হাল্কাভাবে জাহাজের কাঠের মেঝের উপর সে যেন ভেসে বেড়াতে লাগল। সবাই তার প্রশংসা করল, এমন অপূর্ব ললিত ভঙ্গিতে আগে কখনো সে নাচে নি। ছোটো-ছোটো পা দুটিতে সে কী নিদারুণ যন্ত্রণা, কিন্তু আর সে বোধ ছিল না, হৃদয়ের বেদনা তার শত গুণ বেশি। যার জন্য ঘরবাড়ি প্রিয়জন ছেড়ে এসেছে, আজ সন্ধ্যায় এই তার সঙ্গে শেষ দেখা। এরই জন্য তার অমন সুন্দর কণ্ঠ  গেছে, এরই জন্য রোজ কি অসহ বেদনাই-না সয়েছে, অথচ সে ঘূণাক্ষরে কিছু টের পায় নি। ভালোবাসার মানুষটি যে বাতাসে নিশ্বাস ফেলে, আজ সন্ধ্যার পর আর সে বাতাস দিয়ে সে বুক ভরবে না। আর কোনো সন্ধ্যায় ঘন নীল সমুদ্র দেখবে না, তারা ভরা আকাশ দেখবে না। এর পর শুধু অসীম রজনী, আর সে কিছু ভাববেও না, স্বপ্নও দেখবে না। জাহাজে সে কী আনন্দ ! বুক ভরা মরণের চিন্তা নিয়ে, জলকন্যা সকলের সঙ্গে মাঝরাতের পর অবধি হাসল, নাচল । তার পর রাজপুত্র তার রূপসী কনেকে চুমো খেয়ে, সুন্দর করে সাজান শিবিরে শুতে গেল ।

চারদিক নিস্তব্ধ ; হাল ধরে মাঝি একলা দাঁড়িয়ে। শুভ্র বাহুতে ভর দিয়ে ছোটো জলকন্যা ভোরের অপেক্ষায় পুর্ব দিকে চেয়ে রইল। সে জানত যে প্রথম সূর্যের আলো দেখা গেলেই, সে ফেনা হয়ে যাবে। দেখলে দিদিরা জল থেকে ভেসে উঠেছে। মুখগুলি তাদের মরার মতো সাদা, লম্বা চুল আর পিঠে লুটোচ্ছে না, সব ছোটো করে কাটা।

তারা বলল, “চুলগুলো জাদুকরীকে দিয়ে এসেছি, যাতে সে তোমাকে মরণের হাত থেকে বাঁচাতে আমাদের সাহায্য করে। এই নাও ছুরি। সূর্য ওঠার আগে রাজপুত্রের বুকে বসিয়ে দাও। ওর গরম রক্ত তোমার পায়ে পড়লেই পা দুটি আবার লম্বা মাছের ল্যাজ হয়ে যাবে, তুমিও আবার জলকন্যা হয়ে যাবে, সমুদ্রের ফেনা হয়ে যাবার আগে তিনশো বছর বাঁচবে। তাড়াতাড়ি কর । সূর্য ওঠার আগে হয় তাকে, নয় তোমাকে মরতে হবে। আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সূর্য উঠবে, তার পর আর তোমার গতি নেই! এই বলে গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে তারা অদৃশ্য হয়ে গেল।

যেখানে রাজপুত্র আর রাজকন্যা ঘুমিয়ে ছিল, জলকন্যা তার বেগুনি পরদা সরাল। তার পর বুকে পড়ে রাজপুত্রের কপালে চুমো খেল, আকাশের দিকে চেয়ে দেখল ভোরের আলো ক্রমে ফুটে উঠছে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে রাজপুত্র তার কনের নাম উচ্চারণ করল, তাকে ছাড়া স্বপ্নেও আর কারও চিন্তা নেই! হতভাগিনী জলকন্যার হাতের ছুরি কাঁপতে লাগল। হঠাৎ সেটিকে ছুড়ে জলে ফেলে দিয়ে আর একবার ভালোবাসার মানুষটিকে দেখল, চোখের দৃষ্টি ক্রমে ঝাপসা হয়ে আসছিল। তার পর জাহাজ থেকে ঝাঁপ দিল । বুঝতে পারল শরীরটা আস্তে আস্তে গলে গিয়ে ফেনা হয়ে যাচ্ছে ; জল থেকে সূর্য উঠল, কোমল গরম কিরণগুলি জলকন্যার গায়ে পড়ল, সে যে মরে যাচ্ছে সে কথা প্রায় টেরই পাচ্ছিল না। তখনো অপূর্ব গৌরবময় সূর্য দেখতে পাচ্ছিল। মাথার উপর হাজার হাজার জলের মতো স্বচ্ছ সুন্দর ওরা কারা ভেসে বেড়াচ্ছে ? বাতাসে তৈরি তাদের কি মধুর গলার স্বর, মন শান্তিতে ভরে যায়। ও তাদের ভালো করে দেখতে পাচ্ছিল না ; ডাঙার মানুষদের তাদের স্বর শুনবারও সাধ্য নেই। ওরা এত হাল্কা যে ডানা ছাড়াই চারদিকে ভেসে বেড়াচ্ছিল ছোটো জলকন্যা চেয়ে দেখল ওর নিজেরও তাদের মতে হাল্কা দেহ হয়েছে, সমুদ্রের ফেনার উপর থেকে ধীরে ধীরে সে কেমন আকাশে ভেসে উঠছে ! 

ছোটো জলকন্যা বলল, “ওরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ?” ওদেরই মতো মধুর তার স্বর। কে একজন উত্তর দিল, “তুমি কি বাতাসের মেয়েদের কথা বলছ ? জলকন্যাদের অমর আত্মা থাকে না, মানুষের ছেলের ভালোবাসা পেলে তবেই সেই স্বৰ্গীয় গুণটি লাভ করে।
মানুষের সঙ্গে মিলন হলে, তবে সে অমর হয়। বাতাসের মেয়েদেরও অমর আত্মা থাকে না, কিন্তু ভালো কাজ করলে
তারা অমর হয়। গরম দেশের শুকনো হাওয়ায় মানুষরা অবসন্ন হয়ে পড়ে, আমরা সেখানে যাই ; আমাদের শীতল নিশ্বাসে তারা সুুস্থ হয়। আমরা বাতাসে ছড়িয়ে থাকি ; ফুলের সুগন্ধ দিয়ে বাতাসকে মধুর করে রাখি, সমস্ত পৃথিবীতে আনন্দ আর স্বাস্থ্য ছড়াই। তিনশো বছর এভাবে কাটালে আমরা অমর হই, মানুষরা যে সীমাহীন আনন্দ ভোগ করে, তার ভাগ পাই।

“আর তুমি, দুঃখিনী জলকন্যা, মনের বাসনা পূর্ণ করতে গিয়ে কতনা দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেছ, তাই তুমি বাতাসের অপার্থিব জগতে আসতে পেরেছ । তিনশো বছর ভালো কাজ করলে, তুমিও অমর আত্মা লাভ করবে।” স্বচ্ছ বাহু দুটি জলকন্যা সূর্যের দিকে তুলে ধরল, জীবনে এই প্রথম তার চোখের পাতা জলে ভিজে এল ।

এদিকে জাহাজে সকলে জেগে উঠে উৎসবের আনন্দে মেতেছে। জলকন্যা রাজপুত্রকে আর রূপসী রাজকন্যাকে দেখতে পেল। ওরা ওকে খুঁজে পায় নি। মনের দুঃখে ফেনায় ভরা জলের দিকে ওরা চেয়েছিল, যেন বুঝতে পেরেছিল ও জলে ঝাঁপ দিয়েছে। অদৃশ্যভাবে রাজপুত্রের কপালে একটি চুমো খেয়ে, জলকন্যা জাহাজের মাথার উপরকার শান্ত গোলাপি মেঘের অনেক উপরে উড়ে চলে গেল। “তিনশো বছর পরে আমরা স্বৰ্গলোকে পৌছব।” এক বোন কানে-কানে বলল, “তারও আগে পৌছান যায়। যেখানেই মানুষের ঘরে ছেলেমেয়ে আছে, আমরা সেখানে যাই ; কেউ আমাদের দেখতে পায় না। যদি কোথাও দেখি লক্ষী ছেলেমেয়ে মা-বাবাকে সুখী করে তাদের ভালোবাসার যোগ্য হয়ে উঠছে, আমাদের তিনশো বছরের মেয়াদ থেকে এক বছর কমে যায়। যদি দেখি বেয়াড় দুষ্ট, ছেলেমেয়ে, আমরা করুণভাবে কাঁদি আর এক-এক ফোঁটা চোখের জলে আমাদের মেয়াদ একদিন করে বেড়ে যায়।”

~সমাপ্ত~

[--হ্যান্স অ্যান্ডারসন]

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য