সমাজ সেবা মাইকি জয়! -- সুচিত্রা ভট্টাচার্য

অফিস ছুটির পর ফাইলপত্র গুছিয়ে উঠব উঠব করছিলেন বিপুল সেনাপতি, এমন সময়ে টেবিলের সামনে কালোবরণের আবির্ভাব,—‘স্যার, একটা কথা ছিল যে।’ 
‘বলে ফ্যালো।’ 
আপনাকে পরশুদিন এক জায়গায় যেতে হবে।’ 
“আমাকে? কোথায়?” 
‘আমাদের পাড়ায়। ক্লাব থেকে আমরা একটা সমাজসেবার আয়োজন করেছি। আপনাকে প্রধান অতিথি হতে হবে।’ শব্দের র-ফলা কদাচিৎ ব্যবহার করে কালোবরণ, কানে খচ্‌খচ্‌ বাজে। তবু মনে মনে বেশ পুলকিতই হলেন বিপুলবাবু।
পেশায় খুদে অফিসার হলেও সাহিত্য জগতে ইদানীং বেশ নাম হয়েছে তাঁর। লেখকদের আড্ডায় মাঝে মাঝে ডাক পড়ে, ছোটখাটো সাহিত্যসভায় স্বরচিত গল্পও পাঠ করেছেন বারকয়েক। পাঠক মহলে তিনি এখনও তেমন দুর্দান্ত জনপ্রিয় নন বটে, তবে মোটামুটি তার নাম এখন জানে অনেকে। অবশ্য এমন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ তাঁর জীবনে এই প্রথম।

সঙ্গে সঙ্গেই কিন্তু কাছাখোলা হয়ে রাজি হয়ে গেলেন না বিপুলবাবু। এতে দর কমে যায়। কালোবরণও তাকে হ্যাংলা ভাবতে পারে। 
কপালে চিন্তার ভাঁজ ফুটিয়ে বিপুলবাবু বলেন, ‘পরশুদিন মানে, রোববার? ওই দিন একটু লেখালিখি নিয়ে বসব ভাবছিলাম।” 
‘সরস্বতীর সাধনা তো জীবনভর করতে পারবেন স্যার। এমন পোগ্গাম আর দুটি পাবেন না।’ 
‘কী কী প্রোগ্রাম হবে? 
‘গেলেই দেখতে পাবেন, আগে থেকে ভাঙব কেন? 
বিপুলবাবুর সামান্য অস্বস্তি হল। বক্তৃতা-টকৃতা দিতে তিনি পিছপা নন, কিন্তু অনুষ্ঠানের ধরন জানতে পারলে স্পিচটা ভালো করে তৈরি করে নিয়ে যাওয়া যায়। থাক গে, চটজলদি মুখে মুখেই নয় কিছু বানিয়ে ফেলবেন। 

কালোবরণ হাসি হাসি মুখে বলল, “কোনও ওজর আপত্তি শুনছি না স্যার। যেতে আপনাকে হবেই। আমি বড় মুখ করে সকলকে বলেছি, একখানা সাহিত্যিক ধরে আনব। পল্টু গতবার একটা ফুটবল প্লেয়ার এনেছিল। ঝন্টু সাহা। মোহনবাগানের ব্যাকে খেলে। আমি এবার সাহিত্যিক হাজির করে ডাট ভেঙে দেব।’ 

‘খেলোয়াড়ের জায়গায় সাহিত্যিক? তোদের চলবে তো?”

চলবে মানে ? দৌড়বে। সাহিত্যিকরা খেলোয়াড়ের চেয়ে কম কীসে ? তারা বল ছোটায়, আপনারা কলম ছোটান। আর আপনি তো সাক্ষাৎ সরস্বতীর বরপুত্র। 

টিংটিঙে রোগা বিপুল সেনাপতির বাইশ ইঞ্চি বুকের ছাতি বেলুনের মতো ফুলে উঠল। কালোবরণের ওপর একটু একটু শ্রদ্ধা জাগছে। এই অফিসের পিওন কালোবরণ পাডুই অতি সার্থকনামা ছেলে। গায়ের রং মিশমিশে কালো। অফিসে অনেকেই তামাশা করে বলে কালোবরণের ঘাম কলমে ভরে নিলে তা দিয়ে নাকি দিব্যি লেখা যায়। কথাও একটু বেশিই বলে কালোবরণ। কাজে-কর্মেও তেমন মন নেই। সারাদিন উড়ু উড়ু মেজাজে এ দপ্তর ও দপ্তর চরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু একটা গুণ তো আছে, ছোকরা গুণীর মর্যাদা বোঝে। 

খুশি খুশি মুখে বিপুলবাবু বললেন, ঠিক আছে, ঠিক আছে। অত করে যখন বলছিস, যাব’খন। তা আর কে কে আসছে?” 
‘সে লম্বা লিস্ট। ডাক্তার, পুলিশ, সাংবাদিক.তবে আপনি সবার মাথায়। পোধান অতিথি বলে কথা।” 
‘প্রেসিডেন্ট কে হচ্ছেন?’ 
অমরজীবন মজুমদার। আমাদের পাড়ার সব চেয়ে পোবিন মানুষ। গত বছর তার শতবার্ষিকী হল। দেখবেন, একশো এক বছর বয়সেও তার সমাজসেবায় কী উৎসাহ! 
‘বেশ বেশ।..কখন যেতে হবে?’ ।

সকাল ন’টায়। আমিই আপনাকে গিয়ে নিয়ে আসব। বাড়ি থেকে। ’ 
হাওয়ায় ফুরফুর ভেসে ভেসে বাড়ি ফিরলেন বিপুলবাবু। বিপুলের স্ত্রী তটিনী দেবী সর্বদাই সাহিত্যিক স্বামীর গৌরবে ডগমগ থাকেন, তিনি তো শুনে মহা আহ্লাদিত, ‘এই শুরু হল, বুঝলে! এবার দাখো না কত জায়গা থেকে তোমার ডাক আসে। দেশ এবার তোমায় চিনতে পারবে।’ 
‘বলছ ? আগামী দিনের কথা ভেবে বিপুলবাবুর গায়ের রোঁয়া খাড়া হয়ে উঠল। 

‘হ্যা গো হ্যা, বলছি। সঙ্গে সঙ্গে এও বলছি, প্রতিটি অনুষ্ঠানের জন্য আলাদা আলাদা ভাষণ লিখে রাখ। দূর্গাপূজা, কালীপুজো সরস্বতীপুজো, শীতলাপুজো, কার্তিকপুজো, গণেশপূজো, রবীন্দ্রজয়ন্তী, নজরুল জয়ন্তী, নববর্ষ, স্বাধীনতা দিবস, স্কুলের পুরস্কার বিতরণী, হরিসভা...

তটিনী ফিরিস্তি দিয়েই চলেছেন। বিপুলবাবু অধৈর্যভাবে বললেন, “সে নয় রেডি রাখা যাবে। এখন বলো তো দেখি, পরশুদিন কী পরে যাওয়া যায় ? 
ধুতি আর সিল্কের পাঞ্জাবি। 
‘আমার আবার সিলকের পাঞ্জাবি কোথায়? সবই তো আদ্দির।” 
‘বাঃ রে। তোমার বাবারটা আলমারিতে পড়ে আছে না?
‘ওটা কি আমার গায়ে হবে? বাবা কত লম্বা-চওড়া ছিলেন।’
তা হোক। নয় একটু ঢলঢলই করবে। সিলকের পাঞ্জাবি ছাড়া প্রধান অতিথি মানায় ?
‘বটেই তো। তবু..’
‘নো তবু। আমি যা বলছি তাই হবে। আজই আমি ওটা বার করে ইন্ত্রি করিয়ে রাখছি। চন্দনকাঠের বোতাম লাগিয়ে দেব, দেখবে কী ভুরভুর গন্ধ ছাড়বে।’
বারো বছরের মিলি হাঁ করে বাবা-মার কথা গিলছিল। কথা শেষ হল কি হল না, তিড়িং-বিড়িং লাফাতে লাফাতে ছুটেছে বন্ধুদের কাছে। বাবার খবরটা এক্ষুনি শোনাবে সকলকে। তটিনীও আর দাঁড়ালেন না। এত বড় সংবাদটা এখনই প্রতিবেশীদের না জানালে তারও যে পেটের ভাত হজম হবে না। শুনতে শুনতে পাড়ার লোক ঈর্ষায় জুলে-পুড়ে মরবে, তবেই না সুখ! 

রবিবার সকাল। ঠিক কাঁটায় কাঁটায় ন’টায় দরজার ভ্যাঁ পো-ভা-পো। প্রতিবেশীদের উকি ঝুঁকির মধ্যে দিয়ে বীরদর্পে গাড়িতে উঠলেন বিপুল সেনাপতি।
ড্রাইভারের সঙ্গে একাই এসেছে কালোবরণ। গাড়ি ছুটতেই তারও মুখ ছোটা শুরু হল, ‘গোড়াতেই আপনাকে একটা কথা বলে রাখি স্যার। ওখানে গিয়ে কিন্তু কারুর সঙ্গে বেশি বাতচিৎ করবেন না ? 
বিপুলবাবু ঈষৎ অবাক, ‘কেন বলো তো?” 
‘বাঃ রে! আপনি এখন ভি আই পি না? যার-তার সঙ্গে কথা বলবেন কেন? আপনি আপনার গ্যাবিটি নিয়ে থাকবেন ? আবার একটা র-ফলা বাদ। যাক গে। বিপুলবাবু মনে মনে ক্ষমা করে দিলেন কালোবরণকে। 
বললেন, ‘সে তো বটেই। সে তো বটেই।’ 

`আর হ্যাঁ, যেটুকু করতে বলা হবে, সেটুকুই করবেন। তার বেশিও নয়, কমও নয়।’ 
“মানে ??
‘মানেটা তাহলে খুলেই বলি স্যার। আমাদের একতা সঙ্ঘের দুটো দল আছে। একদল এবার চেয়েছিল গানের শিল্পী আনতে, আমরা তাতে বাগড়া দিয়েছি। বলেছি, একটা সাহিত্যিক আনলে একতা সঙ্ঘের অনেক পেস্টিজ বাড়বে। এখন ওরা জোট পাকাচ্ছে কী করে আমাদের বেইজ্জৎ করা যায়। তাই বলছিলাম আর কী...’ 
একতা সঙেঘর দলাদলি! বিপুলবাবু প্রমাদ গুনলেন। শেষ পর্যন্ত কোনও ফ্যাসাদে পড়তে হবে না তো? কালোবরণের বিপক্ষে যদি কোনও ষণ্ডাগুণ্ডা থাকে..? 
গলি ছেড়ে বড় রাস্তায় পড়েই হঠাৎ তীর বেগে ছুটেছে গাড়ি। রাস্তায় আজ তেমন ভিড় নেই বটে, তবে ভারী বিপজ্জনকভাবে লোকজনকে পাশ কাটাচ্ছে ড্রাইভার। প্রবল বেগে একবার মোড় ঘুরল, রেরে শব্দ উঠল রাস্তায়। 

আতঙ্কে কালোবরণের হাত খামচে ধরলেন বিপুলবাবু, ভাই কালো, ওকে একটু আস্তে চালাতে বলা যায় না? 

একতা সঙ্ঘের ঝগড়া-বিবাদের কথা ভুলে কালোবরণ হাহা করে হেসে উঠল, "জটাদা স্লো চালাতে পারে না স্যার। আশির কম স্পিড হলেই জটাদা স্টিয়ারিং-এ ঘুমিয়ে পড়ে। 
সব্বনাশ! অ্যাক্সিডেন্ট হবে যে!” 
হবে কী? হয় তো। এই তো গত সপ্তাহে একটা মারুতি গাড়িকে গুড়ো গুড়ো করে দিল। 
জটা নামক দাড়িগোফ-আলা লোকটা সঙ্গে সঙ্গে স্টিয়ারিং ছেড়ে পিছনে ঘাড় ঘুরিয়েছে। হাসল মৃদু, অভিনন্দন গ্রহণ করার ভঙ্গিতে মাথা নেওয়াল। 
বুকটা হিম হয়ে গেল বিপুলবাবুর। 
কালোবরণ বুঝি টের পেয়েছে, আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল, “কিচ্চু ভাববেন না স্যার, জটাদার গাড়ির প্যাসেঞ্জাররা তেমন একটা মরে না। এই তো সেবার মিনিবাস চালাতে গিয়ে বিজ টপকে পড়ল বাসসুদ্ধ। ক'টা টেঁসেছে? দুটো বুড়ো, আর বাসের হেল্পার। মোট ছিল সাইতিশজন, বাকি সবাই দিব্যি হাসপাতালে ঘুরে বাড়ি চলে গেল।’

জটার গম্ভীর স্বর শোনা গেল, আমি কিন্তু হাসপাতালেও যাইনি।” 
‘তুমি ওস্তাদ লোক, আগেই ডাইভারের গেট খুলে ঝাপ কেটেছিলে।’ 
র-এর অনুপস্থিতি এবার আর বিপুলবাবুর কানেই ঢুকল না। একটা বিড়বিড় ধ্বনি মুখ থেকে বেরিয়ে এল, “জেনেশুনেও এমন ড্রাইভারকে রাখে কে?’ 
‘রাখে না তো!’ কালোবরণের সপ্রতিভ জবাব, জটাদা তো এখন বেকার। মধুদের গ্যারেজে গাড়িটা পড়েছিল, জটাদা চালিয়ে নিয়ে চলে এল।’ 
বিপুলবাবু চোখ বুজে ফেললেন। ইষ্টনাম জপ করছেন। ভালোয় ভালোয় এখন এ গাড়ি থেকে নামতে পারলে হয়। 
গাড়ি অবশ্য মোটামুটি সুস্থ শরীরেই পৌঁছোল। পথে শুধু একটা ঠেলাকে ধাক্কা দিয়ে হঠিয়ে দেওয়া ছাড়া আর তেমন কিছু ঘটনা ঘটেনি। 
কালোবরণ হাত ধরে গাড়ি থেকে নামাল বিপুলবাবুকে। কানে কানে বলল, যা বললাম মনে আছে তো স্যার? বিপুলবাবুর এখনও ঘোর কাটেনি। কোনওমতে ঘাড় হেলালেন, আছে। 
সামনেই খোলা মাঠে ছোটখাটো স্টেজ বাঁধা হয়েছে। পাশে একটা প্যান্ডেলও। স্টেজের ওপর ভয়ানক ব্যস্ত ভঙ্গিতে

ঘোরাফেরা করেছে কয়েকটি যুবক, একজন মাইক হাতে হ্যালো হ্যালো করছে। বিপুলবাবুকে মাঠে পাতা চেয়ারে বসিয়ে দিল কালোবরণ। ছেলেটাকে গিয়ে কী বলতেই মাইকে ঘোষণা শুরু হয়ে গেছে, আমাদের প্রধান অতিথি মহান সাহিত্যিক বিপুল সেনাপতি এই মাত্র আমাদের মধ্যে উপস্থিত হয়েছেন। আপনারা দলে দলে আসন গ্রহণ করুন, এক্ষুনি আমাদের অনুষ্ঠান শুরু হবে।’
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই এক ঝাঁক কুচো-কাচা শ্যামাপোকার মতো কোথেকে উড়ে এসেছে। ঝপাঝপ দখল করে নিল সামনের শতরঞ্চি। বয়স্ক লোকরাও আসছেন একে একে। হেলতে-দুলতে গল্প করতে করতে। মিনিট দশেকের মধ্যেই চেয়ার প্রায় পরিপূর্ণ। দু-একজন এসে যেচে বিপুলবাবুর সঙ্গে আলাপ করে গেল।
ক্রমশ তাজা হয়ে উঠছিলেন বিপুল সেনাপতি। হারানো উদ্যম ফিরে পাচ্ছিলেন। বসেছেন কায়দা করে। মুখে একটা ব্যক্তিত্বমাখানো হাসি ধরে রেখে।
ফের ঘোষণা, “এইবার আমরা সভাপতি আর প্রধান অতিথিকে বরণ করে অনুষ্ঠান শুরু করতে চলেছি। আজকের প্রথম অনুষ্ঠান, স্থানীয় গরিবদের বস্ত্রহরণ। আমদের প্রধান অতিথি সাহিত্যিক বিপুল সেনাপতি নিজের হাতে গরিবদের বস্ত্রহরণ করবেন।’

মৃদু গুঞ্জন উঠেছে একটা। বিপুলবাবুর হাসিটা তুবড়ে গেল। ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছেন এদিক-ওদিকে। কালোবরণকে দেখতে পেয়ে ডাকলেন, ‘অ্যাই কালো, কী বলছে এসব? আমি গরিবদের বস্ত্রহরণ করব??
‘করবেনই তো। আপনি নিজের হাতে গরিব-দুঃখীদের বস্ত বিলোবেন।”
‘ও’। বিপুলবাবু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন, তাহলে বস্ত্রবিতরণ বলো, বস্ত্রহরণ বলছ কেন ??
‘ওই হল।’ কালোবরণ কথাটাকে আমলই দিল না, ঘণ্টাদা ওরকম একটু ভুলভাল অ্যালাউন্স করে।’
অ্যালাউন্স নয় কালো, অ্যানাউন্স। বলতে গিয়েও বিপুলবাবু থমকে গেলেন। ঘোষক ঘণ্টাদা, কালোবরণদের একতা সঙ্ঘের সম্পাদক, নেমে এসেছে তার কাছে। জোড়হাত করে দাঁড়াল, তাহলে আসুন স্যার। আমরা রেডি।’
ঘণ্টার চেহারাটি বেশ হৃষ্টপুষ্ট। একতা সঙ্ঘের সম্পাদক না হয়ে কুস্তিগীরও হতে পারত। তার পিছু পিছু অনুগতের মতো মঞ্চে উঠছিলেন বিপুলবাবু, এক লাঠি ঠকঠক বৃদ্ধকে দেখে দাঁড়িয়ে গেলেন। পুরো দ’ হয়ে যাওয়া দেহ, পরনে ধোপদুরস্ত ধুতি পাঞ্জাবি, সর্বাঙ্গ কাঁপছে থরথর। কালোবরণ এসে হাত ধরল বৃদ্ধের সাহায্য করছে মঞ্চে উঠতে। ইনিই তবে অমরজীবন ?

মঞ্চে বসতেই উড়ে আসা মন্তব্য শুনতে পেলেন বিপুলবাবু, ‘দুটোই দু-নম্বরি চিজ এনেছে রে। একটা ক্যাংলাকার্তিক, একটা অষ্টবক্র, এদের কোনও গ্ল্যামার আছে? 
এরাই কি কালোবরণের বিরোধী পক্ষ? ভয়ে ভয়ে বিপুলবাবু নিজের ছোটখাটো শীর্ণ চেহারাটাকে দেখে নিলেন একবার। ছুটে পালানো শ্রেয় হবে। মাঠের সব দিকেই গলি-ঘুঁজি আছে, কোনও একটা দিয়ে যদি বেরিয়ে পড়তে পারেন... 

দুটি বাচ্চা বাচ্চা মেয়ে এসে অমরজীবন আর বিপুলকে পুষ্পস্তবক দিয়ে গেল। কলাবতী পাতার বাঁধনে চারগাছি রজনীগন্ধা, একজোড়া গোলাপ | 

পাশে বসা অমরজীবনের মাথা অবিরাম নড়ে চলেছে। মৃদু অস্বস্তি হচ্ছিল বিপুলবাবুর, তবু ভাব জমানোর চেষ্টা করলেন। হাসি মুখে বললেন, আপনার নামটি কিন্তু সার্থক। আমার জীবনে দেখা আপনিই প্রথম শতায়ু।’ 

গোল-গোল চশমা পরা বৃদ্ধের মুখখানা হাসিতে ভরে গেল, হ্যাঁ হ্যাঁ, ছেলেপুলেরা আমায় বলেছে। তুমিই তাহলে সেই সাহিত্যিক ?’ 

বিপুলবাবুর ধন্দ লাগল। তার কথাটা কি শুনতে পেলেন না অমরজীবন? লজ্জা লজ্জা মুখ করে বললেন, সাহিত্যিক মানে...ওই আর কী...একটু-আধটু লিখে থাকি।”

তাই নাকি? তবে যে ওরা বলল তুমি একটু-আধটু লেখো টেখো?” 
‘হ্যাঁ, লিখি তো। গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ...’ 
তাই বলো। আমি ভাবলাম তুমিই লেখো।' 
এ যে একেবারে বদ্ধ কালা! বিপুলবাবু মুখ হাসিহাসি রেখেই চোখ অন্য দিকে ফিরিয়ে নিলেন। 
ঘণ্টা আবার মাইকে এসেছে। গলা ঝেড়ে বলল, সভাপতি আর প্রধান অতিথি বরণ শেষ। এবার গরিব দুঃখীরা চুপচাপ লাইনে দাঁড়ান। এক এক করে আসুন, এবং বিপুলবাবুর হাত থেকে বস্ত্র নিয়ে যান।’ 
তিন-চারজন মুশকো জোওয়ান ইয়া বড় বড় গোটাকয়েক বোঁচকা এনে রাখল স্টেজে। খুলতেই বিপুলবাবুর চক্ষু চড়কগাছ। এ তো সব কম্বল! 

ফিসফিস করে ঘণ্টাকে জিগ্যেস করলেন, ‘এই বৈশাখ মাসে কম্বল দেবে তোমরা ?? 
ঘণ্টা ভুরু কুঁচকোল, ‘কেন, কম্বল কি বস্ত্র নয়? শীতবস্ত্র। 
‘শীতবস্ত্র? 
‘ওই হল। এখন পেতে শোবে, ঠান্ডায় গায়ে জড়াবে। ওরা গত বছর ধুতি শাড়ি দিয়েছিল, এগুলো তার থেকে অনেক বেশি ওজনদার।’ 
একের-পর-এক দরিদ্র মানুষ উঠেছে মঞ্চে। 
কম্বলগুলো সত্যিই বেশ ভারী, তুলতে বিপুলবাবুর গলদঘর্ম দশা। একটা করে দিচ্ছেন, আর চটাস চটাস হাততালি পড়ছে। গোটা কুড়ি দেওয়ার পর বিপুলবাবুর জিভ বেরিয়ে গেল। রীতিমতো হাঁপাচ্ছেন। তবু থামার উপায় নেই, অনবরত লোক আসছে। ছিয়াত্তরখানা কম্বল দান করার পর বিপুলবাবু যখন মুক্তি পেলেন, তখন শরীরের সমস্ত শক্তি উবে গেছে। দরদর ঘামছেন। পাঞ্জাবির পকেট থেকে রুমাল বার করে মুখ মুছছেন, ঘাড় গলা মুছছেন। 

আবার মাইকে ঘণ্টাধ্বনি, আমাদের অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব শেষ। এখন দ্বিতীয় পর্ব। এবার আমাদের এই সুন্দর পাগলাবাবার মাঠটিতে স্বহস্তে বৃক্ষচ্ছেদন করবেন সাহিত্যিক শ্ৰী বিপুল সেনাপতি।’ 

বিপুলবাবু স্তম্ভিত। তাকে গাছ কাটতে হবে এখন? এও কি সমাজসেবা ? এই মাঠে গাছই বা কই? তাহলে কি ঘাস... ? ঘাসকে কি বৃক্ষ বলা যায়? বাঁশও তো এক ধরনের ঘাস, তাকে তো বংশবৃক্ষ বলে। কম্বলগুলো নয় একাই বিলিয়েছেন, গোটা মাঠের ঘাস কি তিনি একা হাতে কাটতে পারবেন? 

সত্যি সত্যি খুরপি আর নিড়ানি এসে গেছে স্টেজে। ঘণ্টা পিছনে এসে দাঁড়াল। বিপুলবাবু অসহায় চোখে তাকালেন, ‘সত্যিই কি আমাকে ঘাস কাটতে হবে? ভাই? এত নরম গলায় বিপুলবাবু নিজের ভাইকেও ডাকেননি কখনও। ঘণ্টা কী গলল ? মুখে হাসি দেখা যায় যেন ? 

ঘণ্টা দাঁত বার করে বলল, ছি! ছি! ঘাস কাটা কি আপনার কাজ? ওই যে চারাগাছগুলো রাখা আছে, আপনি ওগুলো পুঁতবেন। 
অর্থাৎ বৃক্ষচ্ছেদন নয়, বৃক্ষরোপণ। 
বিপুলবাবুর ধড়ে প্রাণ এল। আরে তাই তো, আগে চোখে পড়েনি মঞ্চের কোণে কয়েকটা চারগাছ রাখা আছে। গোড়ায় মাটি লাগানো। কৃষ্ণচূড়া, আম, নিম, সপ্তপণী.. 
বিপুল উৎসাহে বিপুলবাবু খুরপি, নিড়ানি হাতে উঠে পড়লেন। তুমুল জয়ধ্বনির মাঝে নেমে পড়েছেন মঞ্চ থেকে। মাঠের ধারে ধারে জায়গা চিহ্নিত করাই ছিল, একটা একটা করে লাগাচ্ছেন মাটিতে। গাছ পোতা সাঙ্গ হতে ঘণ্টাখানেক লেগে এল। এগারোটা বাজে, ঝাঁঝাঁ রোদুরে চামড়া ঝলসে যাচ্ছে বিপুলবাবুর। তবু ভিড়ের মাঝে মুখে হাসিটাকে ধরে রেখেছেন। হঠাৎ কোথেকে আবার কালোবরণের উদয়। হাতে কোল্ড ড্রিঙ্কসের বোতল। 
তড়বড় করে বলল, “এটা খেয়ে নিন স্যার, শরীর জুড়োবে।’ 
বিপুলবাবু ক্লান্ত। জিগ্যেস করলেন, কখন ছাড়া পাব কালোবরণ ? 
তাড়া কীসের স্যার? আর একটা পোগ্রাম বাকি, শেষ হলেই আমি নিজে সশরীরে আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসব।' 
সশরীরে মানে ? অশরীরেও পৌছে দেওয়া যায় নাকি? কালোবরণের কথার মাত্রায় মোটামুটি অভ্যস্ত বিপুলবাবু টু শব্দটি না করে ফিরলেন মঞ্চে । 
ঘণ্টা এবার ঢংঢং বেজে উঠল, আমরা এখন অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি। যে ভাবে আমাদের একের-পরএক কাজ সাফল্যমণ্ডিত হল, সে জন্য সাহিত্যিক বিপুল সেনাপতিকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। ধন্যবাদ জানাই পল্লীবাসীকে, যারা উপস্থিত থেকে আমাদের উৎসাহ দিচ্ছেন। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, একতা সঙ্ঘ এভাবে প্রতি বছরই সমাজসেবার কাজ করে আসছে। আপনারা নিশ্চয়ই এও জানেন, আমরা কথা কম, কাজ বেশি এই নীতিতে বিশ্বাসী। তাই আমরা দুটি কথা নিবেদন করব...’ 

ঝাড়া চল্লিশ মিনিট বক্তৃতা দিয়ে গেল ঘণ্টা। নিজেদের কর্মতালিকা পেশ করল, আগামী অভিপ্রায় জানাল...। মাঝে মাঝেই কথা হারিয়ে ফেলছে, পকেট থেকে কাগজ বার করে দেখে নিচ্ছে তাড়াতাড়ি। বক্তৃতা যখন থামল, কুচো-কাঁচারা তখন সাফ। 
অমরজীবন পাশে ঢুলছেন। বিপুলবাবুরও ঝিমুনি এসে গিয়েছিল, ঘণ্টার ডাকে চট্‌কা ভাঙল, এবার যে উঠতে হয় স্যার। শেষ কাজ করতে হবে।’

‘কী কাজ ভাই?’ 
বাঃ রে! এতক্ষণ ধরে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কী বলছিলাম? আপনি আসার আগে থেকেই তো কাজটা শুরু হয়ে গেছে, এখনও চলছে। এবার আপনাকে সার্টিফিকেটগুলো সই করতে হবে।’ 
বিপুলবাবু কিছুই বুঝতে পারলেন না। ঘণ্টা বিউগল্‌ হয়ে বেজে উঠল, ‘রক্তদান শিবির চলছে স্যার। ওই প্যান্ডেলের ভেতরে।’ 
বাহ, এটা তো সত্যিই মহৎ কাজ! রক্তদানের থেকে বড় পুণ্য আর কী আছে? কালোবরণ তাঁকে ধোঁয়ায় রেখেছিল কেন? আশ্চর্য, স্টেথো গলায় ঝুলিয়ে ডাক্তার প্যান্ডেলটায় ঢুকছে, লোকে কবজি চেপে চেপে বেরিয়ে আসছে, অথচ বিপুলবাবু ব্যাপারটা নজরই করেননি। নাহ, মাথাটা আজ সত্যিই ভোঁতা হয়ে গেছে। গাড়িতে ওই জটাই গুলিয়ে দিয়েছে সব। 

সভা প্রায় ফাঁকা। গুটি কয়েক লোক শুধু বসে আছে চেয়ারে, নিজেদের মধ্যে গুলতানি চলছে। ক্লান্তি দূরে ঠেলে তাদের পাশ দিয়ে প্যান্ডেলে ঢুকলেন বিপুলবাবু। সার সার চারটে ক্যাম্পখাট পাতা রয়েছে প্যান্ডেলে। রক্তদাতা এখন একজনও নেই, খা খা করছে শিবির। চেয়ার, টেবিলে ব্লাড ব্যাংকের লোক গোছগাছ সারছে। একটা ছোট্ট টেবিলে সার্টিফিকেটের স্তুপ। শূন্য একটা ক্যাম্প-খাটে বসে কাজ শুরু করলেন বিপুলবাবু! ঘণ্টা তাকে বসিয়ে দিয়েই ভোকাট্টা, বিপুলবাবু সার্টিফিকেটে সই করে চলেছেন তো করেই চলেছেন। 

হঠাৎই বাইরে কীসের যেন গণ্ডগোল। কালোবরণের গলা না? কার সঙ্গে চেঁচামিচি করছে কালোবরণ ? হাতাহাতি মারামারিও চলছে যেন ? সর্বনাশ, যা আশঙ্কা করেছিলেন, সেটাই কি ঘটল ? উঠে গিয়ে একবার দেখবেন কি বিপুলবাবু? 
শিবিরের দরজা অবধি পৌছোতে পারলেন না বিপুলবাবু, তার আগেই ইয়া তাগড়াই চেহারার দুটো ছেলে পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছে। একজন কোমরে হাত রেখে বিপুলবাবুর আপাদমস্তক জরিপ করল, অন্য জনের দিকে তাকিয়ে বলল, “এইটাই তো কালোর সাহিত্যিকটা, না? তালু শুকিয়ে কাঠ, তবু বিপুলবাবু সাহস হারালেন না। গলায় তেজ এনে বললেন, ‘হ্যা, আমিই বিপুল সেনাপতি। 
‘কোন যুদ্ধের সেনাপতি, বাপ? গায়ে একখানা আলখাল্লা চাপিয়ে কোন রণক্ষেত্রে আসা হয়েছে? 
কী অপমানকর ভাষা! নয় পাঞ্জাবিটা একটু ঢোলাই হয়েছে বিপুলবাবুর, নয় ঝুল একটু বেশিই লম্বা, নয় তিনি একটু বেশিই রোগা-সোগা, তা বলে এমন মশকরা?

স্বর যথাসম্ভব গম্ভীর রেখে বিপুলবাবু বললেন, ‘কে তোমরা? কী চাও?’ 
“আমরা কালোর ওপর প্রতিশোধ নিতে চাই। আমরা আপনার রক্ত চাই।’ শেষ বাক্যটিতেই বিপুলবাবুর দাপট উধাও। তোতলাতে শুরু করেছেন, 'কা-কা-কা...লোর ওপর প্রতিশোধ নেবে নাও। আ-আ-মার ওপর কেন ?? 
‘কালো-ঘণ্টার হিসেব পরে হবে। ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ না করে শুয়ে পড়ুন তো দেখি। কথার ধাক্কাতেই ক্যাম্পখাটে গড়িয়ে পড়ে গেলেন বিপুলবাবু। এক তাগড়াই-এর ইশারামাত্র দুই ব্লাড ব্যাঙ্কের কর্মী ভয়ে ভয়ে এগিয়ে এল। 

তাগড়াই হুঙ্কার ছুড়ল, নিন রক্ত। স্টার্ট করুন।’ 
ব্লাড ব্যাংকের এক কর্মী মিনমিন করে বলল, ‘এর রক্ত কি নেওয়া যাবে? 
কেন যাবে না?? 
‘এর শরীরে কি রক্ত আছে। হাফ লিটার কি বেরোবে? 
‘দেখুন টেনে যতটা হয়। এই সাহিত্যিকের জন্যই আজ আমাদের বিহঙ্গ রায়কে পাওয়া হল না।’ 
অপর তাগড়াই বলল, সাহিত্যিক হয়েছেন, সমাজসেবা করতে এসেছেন, শরীর থেকে একটু রক্ত ঝরাবেন না? জানেন, ঝন্টু সাহা গত বছর দু-বোতল রক্ত দিয়েছিল!” 

বিপুলবাবুর মুহুর্তের জন্য মনে হল ডাক ছেড়ে কেঁদে ওঠেন। রক্তে তাঁর ভয়। সুঁচেও। মরে গেলেও কখনও তিনি ইঞ্জেকশান নেন না। আজ এমন অবস্থায় পড়তে হবে জানলে...। পুলিশ কোথায় গেল, পুলিশ? খবরের কাগজের লোকরাই বা এক্ষুনি আসে না কেন? 

প্যাঁট করে হাতে কী ফুটে গেল। মুহুর্তের জন্য পিঁপড়ে কামড়ানোর অনুভূতি, কিন্তু তার পরে আর কষ্ট নেই। মুদিত নয়নে রক্তদান করছেন বিপুল সেনাপতি।

বাইরে হট্টগোল বাড়ছে। আরও বাড়ছে। কারা যেন জোর করে ঢুকতে চাইছে শিবিরে, দুই তাগড়াই প্রবল বিক্রমে আটকাচ্ছে তাদের। সমস্বরে কারা স্লোগান দিয়ে উঠল, ‘সমাজসেবা মাই কি জয়! 

বিপুল সেনাপতিও অস্ফুটে বললেন, ‘জয়!


[-- সুচিত্রা ভট্টাচার্য]

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য