কে আগে শূলে যাইবে - বাংলাদেশের লোককাহিনী

     গুরু-শিষ্য নানা দেশে ঘুরিয়া বেড়ায় । ঘুরিতে ঘুরিতে তাহারা এক নূতন দেশে আসিল। গুরু শিষ্যকে চার আনা পয়সা দিয়া বাজার করিতে পাঠাইল । 
     কিছুক্ষণ পরে মুটের মাথায় এক প্রকাণ্ড বোঝা চাপাইয়া শিষ্য আসিয়া উপস্থিত। সেই বোঝার মধ্যে চাল, ডাল, ঘি, তেল, মাছ, মাংস, সন্দেশ, রসগোল্লা আরও কত কি! 
গুরু আশ্চর্য হইয়া শিষ্যকে জিজ্ঞাসা করিল! “মাত্র চার আনার বাজার করিতে দিয়াছিলাম, এত জিনিস কি করিয়া কিনিলে।”
     শিষ্য উত্তর করিল, “গুরু ঠাকুর। বলিব কি? এদেশের সব জিনিসের দামই দু’পয়সা করিয়া সের। দুধের দামও দু’পয়সা সের, আবার ঘি, মাখন, সন্দেশ, রসগোল্লার দামও দু’পয়সা সের। সঙ্গে যে মুটে আনিলাম তাকেও মাত্র দু’পয়সা দিতে হইবে।” 
     গুরু বলিল, “শিগগীর রান্না কর।" রান্না হইলে খাইয়া-দাইয়া গুরু শিষ্যকে হুকুম করিল, “তাড়াতাড়ি কাপড় বোঁচকা বাঁধ। এখন এদেশ ছাড়িয়া যাইতে হইবে।” শিষ্য অবাক হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কেন গুরু ঠাকুর" গুরু ঠাকুর বলিল, “যে দেশে সব জিনিসের এক দর সেখানে পণ্ডিত-মুর্খে কোনো তফাৎ নাই। চল, এদেশ ছাড়িয়া এখনই চলিয়া যাই।”
     শিষ্য উত্তর করিল, “এমন সোনার দেশ আর কোথায়ও পাওয়া যাইবে না। সব জিনিসের দাম এত সস্তা। আপনি যাইবেন তো যান। আমি এদেশ ছাড়িয়া কেথায়ও যাইব না। এখানে কিছুদিন সন্দেশ,
     রসগোল্লা খাইয়া শরীরটা একটু তাজা করিয়া লই। আপনার কাপড় বোঁচকা বহিতে বহিতে শরীর আমার কাহিল হইয়া পড়িয়াছে। আর আমি আপনার সঙ্গে থাকিব না।" 
     গুরু কত করিয়া বুঝাইল। কিন্তু গুরুর সঙ্গে গেলে শিষ্যের কি লাভ ? এমন সস্তা সন্দেশ, রসগোল্লার দেশ ছাড়িয়া সে স্বর্গেও যাইবে না । 
     অগত্যা গুরু একাই চলিয়া গেল। শিষ্য রোজ বাজার করিয়া ঘি, দুধ, মাছ, মাংস, সন্দেশ, রসগোল্লা খায়। অল্পদিনেই তাহার শরীর বেশ নাদুস-নুদুস হইয়া উঠিল। 
     এদিকে হইয়াছে কি? সেই দেশের এক চোর গেরস্ত বাড়িতে চুরি করিতে যাইয়া দেয়াল চাপা পড়িয়া মারা গেল। চোরের বউ রাজার কাছে যাইয়া নালিশ করিল, “রাজা মহাশয়! অমুকের বাড়ির দেয়াল চাপা পড়িয়া আমার স্বামী মারা গিয়াছে। আপনি ইহার বিচার করুন।" 
     রাজা তখন সেই গেরস্তকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। গেরস্ত আসিলে রাজা বলিলেন, “তোমার দেয়াল চাপা পড়িয়া চোর মারা গিয়াছে। আমি তোমাকে শূলে যাওয়ার হুকুম দিলাম।” শূল হইল চোখা একটি লোহার ডাণ্ডা। তাহার উপরে যাইয়া গেরস্তকে বসিতে হইবে। সুতরাং শূলে বসিলেই গেরস্তের মৃত্যু হইবে। 
     রাজার হুকুম শুনিয়া গেরস্ত তো ভয়ে কাঁপিয়া অস্তির। সে জোড়হাত করিয়া বলিল, “মহারাজ! দেয়াল চাপা পড়িয়া যে চোর মরিয়াছে ইহা আমার দোষ নয়। যে রাজমিস্ত্রি আমার দেয়াল গড়িয়াছিল তাহারই অপরাধ। কারণ সে শক্ত করিয়া দেয়াল গড়ে নাই।" 
     রাজা বলিলেন, “এ কথা সত্য। তবে ডাক দাও সেই রাজমিস্ত্রিকে। " 
     রাজমিস্ত্রি আসিলে রাজা রাগিয়া মাগিয়া তাহাকে বলিলেন, “দেখ রে রাজমিস্ত্রি! তুমি বড়ই অপরাধ করিয়াছ। এই গেরস্তের দেয়াল তুমি শক্ত করিয়া গাঁথ নাই। তাই গেরস্তের বাড়ি চুরি করিতে আসিয়া চোর দেয়ালে চাপা পড়িয়া মারা গিয়াছে। তুমি একটি লোকের মৃত্যুর কারণ হইয়াছ। আমি তাই তোমাকে শূলে চড়িয়া মরার হুকুম দিলাম।" 
     ভয়ে কাঁপিতে কাঁপিতে রাজমিস্ত্রি উত্তর করিল, “মহারাজ, আমার কোনো কসুর নাই। যে জোগানদার আমার কাদা ছেনিয়া দিয়াছিল তাহারই অপরাধ। সে ঠিকমতো কাদা ছেনিয়া দেয় নাই বলিয়া দেয়াল মজবুত হয় নাই।" 
     রাজা বলিলো, “ডাক সেই যোগানদারকে।" রাজার হুকুমে যোগানদার আসিয়া রাজার সামনে খাড়া হইল। রাজা তখন বলিলেন, “দেখ রে যোগানদার! তুমি মস্ত অপরাধ করিয়াছ। ভালোমতো কাদা ছেনিয়া দেও নাই বলিয়া রাজমিস্ত্রি শক্ত করিয়া দেয়াল গাঁথিতে পারে নাই। সেই দেয়াল চাপা পড়িয়া চোর মারা গিয়াছে। আমি তোমাকে শূলে চড়িয়া মরার হুকুম দিলাম।” 
     ভয়ে তো যোগানদার কাঁপিতে লাগিল। বেচারী যোগানদার কাজ করিয়া সামান্যই বেতন পায়। তাহা দিয়া নিজেই বা খাইবে কি আর ছেলেমেয়েদেরই বা খাওয়াইবে কি। না খাইয়া খাইয়া তাহার শরীর কাঠের মতো শুকনো ঠনঠনে। তাহাকে দেখিয়া মন্ত্রী বলিলেন, “মহারাজ! এই লোকটির শরীর শুকনো শোলার মতো। একে শূলের উপর বসাইয়া দিলে শূলের মাথায়ই আটকাইয়া থাকিবে ।" 
     রাজা তখন বলিলেন, "হাকিম নড়ে তবু হুকুম নড়ে না। আমি যখন আদেশ দিয়াছি তা পালন করিতেই হইবে দেখ, রাজ্যের কোথায় বেশ মোটা-সোটা লোক আছে। তাহাকে আনিয়াই শূলে দাও ।" রাজার সেপাইরা এ-পাড়ায় ও-পাড়ায় ঘুরিতে ঘুরিতে সেই শিষ্যকে খুঁজিয়া পাইল। মাসখানেক ইচ্ছামতো ঘি, দুধ, মাখন খাইয়া তাহার শরীর তেল চকচকে হইয়াছে। 
     রাজার পাইকেরা তাহাকে ধরিয়া আনিয়া শূলের কাছে লইয়া গেল। সেখানে হাজার হাজার লোক জমা হইয়াছে। রাজা, রাজার মন্ত্রী, কোটাল, কোটাল-পুত্ৰ সকলেই আসিয়াছেন। 

     কিছুদিন এদিক ওদিক ঘুরিয়া গুরু ভাবিল, শিষ্যটিকে ফেলিয়া আসিলাম । যাই দেখিয়া আসি সে কি হালে আছে। এক জায়গায় বহুলোক জড় হইয়াছে দেখিয়া গুরুও সেখানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। দেখিয়া গুরু অবাক হইলেন, তার শিষ্যকে শূলে চড়াইবার বন্দোবস্ত হইতেছে। তিন চারজন লোক শূলের চোখা লোহার কাঠির উপর সরবী কলা, ঘি আর মাখন মাখাইতেছে। শিষ্যকে শূলের উপর  বসাইয়া দিলেই চড়াত করিয়া সেই চোখ লোহার কাঠি তাহার নাড়ীভুড়ি ছিদ্র করিয়া শরীরের মধ্যে বিধিয়া যাইবে। গুরু ঠাকুর ভাবিতে লাগিলেন, "আহা! এই শিষ্যটি বহুদিন তাহার কাপড়-বোঁচকা বহিয়া বেড়াইয়াছে। আজ বিপদের কালে তাহাকে কোনোই সাহায্য করিতে পারিব না?” 
     মনে মনে একটি ফন্দি করিয়া গুরু ঠাকুর সমস্ত লোকের ভিড় ঠেলিয়া সেই শূলের কাছে যাইয়া উপস্থিত হইল ; “তোমরা সর! সর! এই লোকটির বদলে আমি শূলে চড়িব।" রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি শূলে চড়িতে চাও কেন?” গুরু ঠাকুর বলিল, “আজ বসু পূবে। চান সূরুজ ডুবে । এমন সময় যে শূলে চড়িয়া মরিবে, সে এই দেশের রাজা হইয়া জন্মগ্রহণ করিবে। মহারাজ! দয়া করুণ। এই লোকটির বদলে আমাকে শূলে যাইতে দিন।" 
     রাজা বললেন, আমি রাজা বাঁচিয়া থাকিতে তুমি শূলে চড়িয়া মরিয়া আবার এদেশের রাজা হইয়া জন্মিবে? তা কখনও হইবে না। আমিই শূলে চড়িব।" তখন মন্ত্রী বলেন, “না মহারাজ। আমি শূলে চড়িব।" গুরু ঠাকুর বলেন, “না না, আমি শূলে চড়িব।" তারপর রাজা বলেন, "আমি", মন্ত্রী বলেন, আমি', গুরু ঠাকুর বলেন, আমি। 
     প্রায় আধঘন্টাতক উপস্থিত লোকেরা শুধু আমি, আমি শুনিতে লাগিল। তখন রাজা ধমক দিয়া সকলকে সরাইয়া দিয়া নিজেই যাইয়া শূলের উপর চড়িয়া বসিলেন। গুরু ঠাকুর শিষ্যকে সঙ্গে করিয়া তাড়াতাড়ি সে দেশ ছাড়িয়া নিজের দেশে ফিরিয়া আসিল ।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য