সেই ইঁদুরটি --জয়া মিত্র

যারা সকলকে ভালবাসে, সকলের দুঃখেই যাদের কান্না পায়, তাদের কথা মনে করতে গেলে গান্ধীজি কিংবা বুদ্ধদেবের চেয়েও আগে আমার মনে পড়ে আমাদের রমাদির কথা। রমাদি এত শান্ত যে, ওর চোখ দুটাে পর্যন্ত শান্ত, আর সেই চোখের তলায় { কোথায় যেন একটা পুটলিতে জল জমা থাকে, একটু নাড়লেচাড়লেই বেরিয়ে পড়বে। সেই ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি, পাড়ার যত ; নেড়ি কুকুর, লোম উঠে যাওয়া বেড়াল এরাই রমাদির চেলা, কোনও কাজে গেটের বাইরে বেরোলে সেই কুকুর বেড়ালরা হাজির হয়ে সঙ্গে -সঙ্গে চলতে থাকবে আর রমাদি তাদের সকলকে নাম ধরে ডেকে ডেকে খোঁজখবর নেবে, “ও কালটু, তোর পা-টা তো একটু সেরেছে মনে হয়, খোঁড়াচ্ছিস না তো আর—ছি ছি ছাপকি, তোর কানটা যে ছিড়ে একেবারে ঝুলে পড়েছে। দুপুরে আসিস, দই লাগিয়ে দেব, বলিহারি বাপু, একটু মিলমিশ করে থাকতে পারিস না! তোরা কী রে! ও কালী, তোর বাচ্চারা কই রে...” .
এই চলতেই থাকবে পুরো রাস্তাটা ধরে। পাও চলবে আর মুখও চলবে। গায়ে মশা বসলে সেটাকে মারে না রমাদি, ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয়। কোনওদিন কোনও খাবারে পিঁপড়ে ধরে গেলে রমাদির দুশ্চিন্তার শেষ থাকে না গরম করতে বসানোর আগে সবক’টা পিঁপড়েকে বার  করা হয়েছে তো? একটাও নেই তো যে, ডুবে মরবে বা গরমে মরে যাবে? রমাদির ওপর দয়া করে একটা ইঁদুর একবার আত্মহত্যা করেছিল।

রমাদির দিদিমা নাকি আমার মাকে বড় করেছিলেন। তাঁকে আমি দু-একবার দেখেছি। তখন তিনি খুব বুড়ো হয়ে গেছেন। ছেলের কাছে থাকেন। আর মাঝেসাঝে কখনও রমাদিকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের বাড়ি আসতেন মাকে দেখতে। মাকে বলতেন, খুকি। আমি তখন স্কুলে পড়তাম, যা হাসি পেত! মা যদি খুকি হন আমি তবে কী! আমাকে কিন্তু বলতেন দিদি। যা হোক এরকম উলটোপালটা ডাক ছাড়াও আরও কত কিছু যে আনতেন—চিঁড়ের মোয়া, তিলের নাডু, দারুণ খেতে কুলের আচার, আরও কত কী! মাঝে মাঝেই দেখতাম মায়ের পুরনো শাড়ি নিয়ে যেতেন, আর পরের বার কাঁথা বানিয়ে আনতেন। 

আমাদের বাড়িতে রমাদির দিদিমার করে দেওয়া অনেক কাথা আছে। তো একবার সেই দিদা রমাদিকে একটা ছোট বাক্সসুদ্ধ নিয়ে এসে আমাদের বাড়িতেই রেখে গেলেন। মা-বাবার সঙ্গে কী কথা হয়েছিল জানি না। বাবা বলেছিলেন, রমাদিকে ইস্কুলে ভর্তি করার কথা, ও কিছুতেই গেল না। আমাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিল শাড়িপরা মেয়েরা ইস্কুলে নীচের ক্লাসে যায় কি না। শেষে দুপুরের দিকে মায়ের কাছে বসে বসে পড়া শিখত। রমাদিদের বাড়ি থেকে ইস্কুল নাকি অনেক দূরে। দুঘণ্টা তিনঘণ্টা হেঁটে কি ইস্কুলে যেতে পারে মানুষ। 

রমাদি আমাদের বাড়িতে থাকায় আমারও বেশ ভাল লাগছিল। ও দারুণ ভাল গাছে চড়তে পারে। আমগাছে, কৃষ্ণচূড়ার গাছে তো বটেই, পেয়ারাগাছের সরু ডালগুলোতে পা দিয়ে দিয়ে এমন উঁচুতে উঠে যেত যে, আমার গা শিরশির করত। আমি একটু-আধটু গাছে চড়িনি এমন নয়, কিন্তু উঁচুতে উঠতে ভয় করত তার আগে পর্যন্ত। রমাদিকে দেখে দেখে আমারও সাহস বাড়ল। ভীষণ ভাল সাঁতারও কাটত ও। একবার বাবা, মা রমেনকাকু-জয়ন্তীকাকিমা ওঁদের মেয়ে ডালু, আমি আর রমাদি পিকনিকে গিয়েছিলাম। বাবারা যখন ওদিকে ব্রিজ খেলছেন আমি, ডালু আর রমাদি ঘুরতে ঘুরতে একটা মস্তবড় পুকুরের পাড়ে পৌছে গেলাম। এদিকটা কালো টলটলে জল আর দূরে, ও পাড়ের দিকে কিছু গোলাপি পদ্মফুল ফুটে আছে। কী যে সুন্দর দেখতে! ডালু নাকি আগে কোনওদিন পুকুরে ফুটে থাকা পদ্মফুল দেখেইনি! কেবল ফুলওয়ালিদের কাছ থেকে কিনে আনা পদ্মই দেখেছে। এসব শুনতে শুনতে হঠাৎ দেখি রমাদি সিঁড়ি দিয়ে নেমে সোজা জলে নেমে পড়েছে। আমরা ভয় পেয়ে গেছি। দু’জনেই ডাকছি,"ও রমাদি, এত বড় পুকুর—তুমি ঠিক ডুবে যাবে। শিগগির উঠে এসো।” 

রমাদির ওঠার কোনও লক্ষণই নেই। নিশ্চিন্ত মনে বলল, “এর তিনগুণ বড় পুকুর আমি এপার ওপার করতে পারি। ডুবব কী গো, জানো না সাঁতার একবার শিখলে সে লোক ইচ্ছে করলেও ডুবে মরতে পারে না? তোমার চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকো, আমি এই এলাম ...” 

দেখতে-না-দেখতেই তরতর করে জল কেটে রমাদি কতদূর চলে গেছে। আমাদের বুকের মধ্যে ধকধক করছে ভয়ে। আর যখন ফিরে এল হাতে একগোছা পদ্মফুল। কী সুন্দর তার গন্ধ! অবশ্য ডঁটিগুলো সাঙঘাতিক খরখরে। মা বললেন, ওকে নাকি বলে মৃণাল। বাব্বাঃ, ফুলের ডাঁটিটার আবার একটা আলাদা নাম! কিন্তু সেসব বলাবলি তো পরে, তার আগে তো মায়ের সেই বিষম বকাঝকা—যত রমাদিকে, তত আমাদের, কিন্তু ফুলগুলোর জন্য যে খুব খুশি হয়েছে সেটা বোঝাই যাচ্ছিল। 
এরকমই দিব্যি কাটছিল দিন। গোলমাল যে এক-আধটা হত না এমনও নয়! 
আমাদের ভুলুয়া তো দেশি কুকুর, মালির ছেলের পোষা ছিল। মালি যখন ওর ছেলেকে দেশের বাড়িতে রেখে এল, ভুলুয়া তখন আমাদেরই কুকুর হয়ে গেল। যদিও আমাদের আশপাশে বিশেষ ঘেঁষত না ও গেটের দিকে মোরামের ওপর শুয়ে থাকত প্রায় সারা দিন। কেবল কোনওরকমে কোনও বিড়াল যদি বাগান কিংবা বাড়ির ত্রিসীমানার মধ্যে ঢুকেছে তা হলে ভুলুয়া এমন জোরে ছুটে গিয়ে তাকে তাড়া লাগাবে যে, বলার নয়। কিন্তু বসেই শাস্তশিষ্ট ভুলুয়া মহা-ফুর্তিবাজ হয়ে উঠল রমাদি আসবার পর। রমাদি ওর সঙ্গে কথা বলে, ওর গলা চুলকে দেয়, ওকে লাঠি কি খবরের কাগজ কুড়িয়ে আনতে শেখায়। 

এর মধ্যে একদিন সন্ধেবেলা বাবার এক পেশেন্ট, তিনি অবশ্য তখন সম্পূর্ণ ভাল হয়ে উঠেছেন, নিজের স্ত্রীকে নিয়ে আমাদের বাড়ি বেড়াতে এলেন। স্ত্রী বেশ নামকরা রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়িকা। গেটের সামনে যখন গাড়িটা দঁড়িয়েছে, ভুলুয়া যে কোথায় ছিল আমরা কেউ লক্ষ্য করিনি। কিন্তু ওঁরা ভেতরে ঢুকেছেন, বাবা আর মা বারান্দা থেকে নেমে এক দু’পা অতিথিদের দিকে এগিয়েছেন সবে, আসুন আসুন’ গোছের কী একটা বলতে বলতে, ভুলুয়া হঠাৎ কোথা থেকে যেন তীরবেগে ছুটে এসে ভদ্রমহিলার গায়ে ঝাপিয়ে পড়েছে। কামড়াতে মোটেই নয়, আসলে খুব খুশি হয়ে স্বাগত জানাতেই হয়তো, কিন্তু ফলাফলটা হল ভয়ঙ্কর। ভদ্রমহিলা সাঙ্ঘাতিক, মানে মা যাকে বলেন চিলচিৎকার, তাই করে টাল সামলাতে না পেরে হুড়মুড় করে পড়ে গেলেন। খানিক আগে মালি বাগানে আর রাস্তায় জল দিয়েছিল, ওঁর দুর্দান্ত কাথাস্টিচের শাড়ি মোরামের কাদায় যা-তা হয়ে গেল, হাত থেকে সন্দেশের বাক্স ছিটকে পড়ে গিয়েছে দেখে ভুলুয়া সেটা প্রবল শোঁকাশুঁকি করছে আর লেজ নাড়াচ্ছে। ইতিমধ্যে মা আর ভদ্রমহিলার স্বামী ওঁকে কোনওরকমে ধরে তুলেছেন, বাবা চাপা গলায় ‘ভুলুয়া রাস্কেল’ বলছেন, আমি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে হাসি চেপে যতদূর সম্ভব গম্ভীর মুখ করে আছি। রমাদি ভেতরে রান্নাঘরে বা কোথাও, সে এসবের কিছুই জানে না। মহিলা কোনওমতেই বাড়ির ভেতরে ঢুকলেন না। ব্যথা তো পেয়েইছেন, খুশি যে হননি তাও বোঝা যাচ্ছে, মায়েদের ওপর ভর দিয়ে কোনওরকম করে একেবারে গাড়িতে গিয়ে বসলেন। ওখানে দাঁড়িয়েই দু-চারটে দুঃখপ্রকাশের কথা বলেটলে শেষ হল। ওঁরা তো চলে গেলেন, বাবা বারান্দায় এসে উঠলেন, মুখ লাল। আমরা সকলে জানি বাবা খুব আদব-কায়দা মানে এটিকেট মেনে চলেন। আমার খুব ভয় করছে যদি বাবা রমাদিকে বকেন, ওর আহ্বাদে ভুলুয়ার বাড় বেড়েছে বলে আবার ভুলুয়ার জন্যও ভয় করছে, মার খাবে বলে। দেখা গেল, দুটো ভয়ের কোনওটাই বিশেষ ফলল না। রমাদিকে বাবা কিছু বলেননি, চাপাগলায় রেগে-রেগে মাকে যেন কী বলতে থাকলেন। আর ভুলুয়া ইংরেজি বোঝে কিনা জানি না কিন্তু রাস্কেল শুনে সেই যে লুকোল তারপর বাবা অনেক ডাকাডাকি করার পরও মনে হল, আমাদের বাড়িতে ভুলুয়া বলে কোনও জিনিসই নেই। 

আর পরদিন সকালে খবরের কাগজটা মুখে করে এন বাবার দিকে এমন হাসি-হাসি মুখে তাকালে যেন ও একটা দেবদূত, অন্যায় কাজ, দোষ কাজ কাকে বলে জানেই না। 

যদিও তারপর থেকে দুপুর শেষ হলে চেনে বাঁধা থাকতে হয় ভুলুয়াকে। আমাদের রাত্রির খাওয়া হয়ে গেলে তবে ওকে ছাড়া হয়। এরই মধ্যে আমার পার্ট-টু পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়ে গেছে, যাদবপুরে একটা সিটও জুটে গেছে এম.এসসি-র জন্য। কলকাতার ফ্ল্যাটটা কেনাই হয়েছিল পড়শোনা করবার সময়ে আমার দরকার হবে—এই কথা বলে। অথচ এখন কিনা সেই থাকা নিয়েই এক মহাফ্যাচাং শুরু হয়ে গেল। মায়ের অসম্ভব চিন্তা, আমি নাকি এক কিছুতেই থাকতে পারব না, এদিকে এটাও জানাই কথা যে, মায়ের পক্ষে

আসানসোলের সংসার ছেড়ে বাইরে গিয়ে থাকা সম্ভব নয়। তা ছাড়া মা ওরকম বদ্ধ জায়গায় থাকতেও পারেন না। বাবা একবার আমার দিকে হয়ে বলছেন, “থাকতে না পারার কী আছে, বিদেশে তো ওর বয়সী মেয়েরা হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে রোজ দেড়শো কিলোমিটার দূরে চাকরি করতে যাচ্ছে!” যাচ্ছে কি না কে জানে! কিন্তু বাবা জোর দিয়ে বললে বিশ্বাস হয়! কিন্তু হলে কী হবে? যেই মা বলে ওঠেন, “তুমি থামো তো—একটা মেয়ে, তার ওপরও একটু মায়ামমতা নেই, হুজুগ তুললেই হল।” 
অমনই বাবা মায়ের পার্টি হয়ে যান আর বলতে থাকেন, “তুমি তো বলছ, একা একদিনও থাকেনি কোথাও, কোনও মানে হয়! তা হলে উপায়টা কী, সেটা বলো!” ত

খন মা বললেন, “হস্টেলের ব্যবস্থা করা যায় কি না, যতদিন না যায় সোনামাসির বাড়িতেই না হয়—’ 

এবার আমি রেগে গেলাম, যাদবপুরে মেয়েদের হস্টেল আছে কিনা আমি জানি না। থাকলেও সেখানে মোটেই যাব না। সোনামাসির বাড়ি! প্রশ্নই ওঠে না—সেটা লেকটাউনে। তা ছাড়া এসব আমি করতেই বা যাব কেন, যখন নিজেদের একটা সাজানো গোছানো বাড়ি আছে কলকাতায়! 

রেগে মাকে বললাম, “এম.এসসি পড়বই না। এক্ষুনি বিয়ে দিয়ে দাও, একটা অচেনা লোকের সঙ্গে যেখানে হোক চলে যাব।” এইসবের পর শেষে ঠিক হল, আপাতত আমি আর রমাদি যাব কলকাতায়। বাড়িতেই থাকব। অসম্ভব সাবধানে থাকব। বাবা ফ্ল্যাটের দরোয়ানকে বলে আসবেন আমাদের দোকান-বাজার করে দেওয়ার জন্য। রমাদি সারাদিন দরজা ভেতর থেকে লক করে রাখবে। বেল বাজালে আই হোল দিয়ে আমাকে দেখতে পেলে তবেই খুলবে। আমরা যে দুজনে বাড়িতে এক-একা থাকি, এ-কথা কাউকে কখনও ভুলেও বলব না। একমাত্র ভূমিকম্প বা আগুন লেগে যাওয়া ছাড়া আর কোনও কারণেই রাত্রে কোলাপসিবল গেট খুলব না। একদিন পর পর বাড়িতে ফোন করব। এরকম আরও প্রায় একশো চল্লিশটা। প্রথম দু’ মাসে বাবা দু’বার আর মা একবার এসেছিলেন। গত এক বছরে আমরা এখানে বেশ জমিয়ে বসেছি। বাবা-মাও আশ্বস্ত হয়েছেন। ঠিক এরকম সময়েই সেই বিপদটা এল। যেমন বরাবর হয় আর কী! সবচেয়ে শান্তির সময়েই বিপত্তি ঘটে। চোর, ঠকবাজ, ডাকাত, দোকানদার, দুষ্টু লোক ইত্যাদি যাবতীয় বাইরের বিপদ সম্পর্কে বাবা-মা অনেকবার সাবধান করে দিয়েছিলেন। কিন্তু ঘরের ভেতরে যে এরকম ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটতে পারে সে-কথার বিন্দুমাত্র ধারণাও আমাদের ছিল না। ইঁ—দু—র! 

প্রথম একদিন দেখলাম রান্নাঘরের বিনটা থেকে খাওয়ার পর ফেলে দেওয়া কুটিমুটি, পলিথিন প্যাকেট মেঝেয় এদিকে ওদিকে ছিটনো! তার পরদিন রাত্রে গ্যাসের পাশে রাখা প্রায় খালি হয়ে আসা জ্যামের শিশিটা পড়ে ভাঙবার শব্দে আমি আর রমাদি ঘুম থেকে একেবারে লাফিয়ে উঠেছি। রান্নাঘরে আলো জেলে দেখা গেল মেঝেতে ভাঙা শিশির কাচ, কিন্তু আর কিছু নেই কোথাও। আমি তো প্রথমে হতভম্ব হয়ে রইলাম, এর মানে কী! রান্নাঘরের জানলা যেমনকার তেমনই বন্ধ, দরজাও আমরাই খুলে ঢুকেছি। তারপর রমাদিই প্রথমে বলল, “আমার মনে হচ্ছে ইঁদুর।” 

ইঁদুর! এই তিনতলার ওপরে! এই সম্ভাবনাটার কথা আমার মাথায় একেবারেই আসেনি। কিন্তু রমাদি বলছে, “আমি ইদুরের গন্ধ পাচ্ছি!” ঢুকবে কোথা দিয়ে! দুজনেরই চোখ গিয়েছে ওয়াশবেসিনের জল যাওয়ার নালিটার দিকে। কী একটা যেন সেটার মুখে চাপা দিয়ে তখনকার মতো আমরা আবার শুতে গেলাম। রমাদি ওর বিছানা থেকে গল্প বলতে লাগল, গায়ের দিকে নাকি মেঠো ইঁদুর থাকে। খেতের আলে বড়-বড় গর্ত বানিয়ে তার মধ্যে থাকে আর প্রায়ই নাকি ইঁদুরের বানানো গর্তের মধ্যে থাকে সাপ। সাপ তো আর নিজে গর্ত বানাতে পারে না! শুনতে-শুনতে কখন যে ঘুমিয়েছি কে জানে। স্বপ্ন দেখছি আসানসোলের বাড়ির রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে মা যেন কী একটা বলছেন আর কোথা থেকে রান্নাঘরের পাশে এসে পড়েছে একটা খেত, সেখান দিয়ে ট্রেন যাচ্ছে, ট্রেন ভর্তি ইঁদুর, মস্ত বড়-বড়—তারপরই দেখি ঘরের ভেতরে রোদ এসে পড়েছে। রান্নাঘরে রমাদি মেঝে থেকে কীসব তুলছিল। আমি ভুলে গিয়েছিলাম, মনে পড়ল কালকের ভাঙা জ্যামের শিশির কথা। তারপর দেখি, কাচ নয় কেবল, পাউরুটির গুড়োও । আধখাওয়া পাউরুটি রান্নাঘরের ছাদের দিকে তাকিয়ে মেঝেয় পড়ে কাঁদছে।

“এটা আবার কখন হল!”

“আসলে যখন আমরা নালির মুখ চাপা দিয়েছি না তখন ও ভেতরেই কোথাও লুকিয়ে ছিল।” 
“তারপর ?” 
“সকালে নালির মুখ খুলতেই কোথা দিয়ে এসে সুট করে ঢুকে পড়ল।” 
“কিন্তু এল কোথা দিয়ে বলো তো?” 
“ও মা, ইঁদুরের কি আবার আসার জায়গার হিসেব আছে নাকি? দাখো গিয়ে। নীচতলার কোনও ঘরে নিশ্চয়ই ইঁদুর হয়েছে—নালির ভেতর দিয়ে, কানিস দিয়ে, জলের পাইপ বেয়ে, ওরা তো কাপড় মেলার তার ধরেও চলে আসতে পারে।’ 
“তা হলে কী হবে রমাদি?” 
“হবে আর কী! একটু চোখে-চোখে রাখতে হবে যাতে ঘরে কোথাও ঢুকে বসে থাকতে না পারে। 

দেখা গেল, রমাদি কুকুরদের চিনতে পারে হয়তো, কিন্তু ইঁদুরদের চেনে না। কিংবা এই ইঁদুরটা রমাদির চেনা ইঁদুরদের মতো নয়, অতি বিচ্ছু। মোটের ওপর তার আসা-যাওয়া চলতেই লাগল। রান্নাঘরের নালিতে জাল বসানোর ব্যবস্থা করেও তাকে ঠেকানো গেল না, বরং রান্নাঘর ছাড়িয়ে মাঝেমাঝেই তাকে দেখা যেতে লাগল লিভিং রুমের এপাশে-ওপাশে—কখনও বসার জায়গার কিনার দিয়ে দেওয়াল ঘেষে দৌড় লাগাচ্ছে। সবসময়েই প্রায় হাত দুটো মুখের সামনে জড়ো করা, চকচকে কালো পুতির মতো চোখ আর খুব হাসি-হাসি মুখ। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, আমরা যখন চেঁচামেচি করি, তেড়ে যাই, ইঁদুরটা বেশ মজা পায়। দৌড়ে পালায় কিন্তু একটু দূরে গিয়ে আবার ঘুরে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। ইঁদুরদের দেখতে যত ছোট তাদের কাজকর্ম তেমন মোটেই নয়, সাঙঘাতিক সব কাণ্ড হতে লাগল বাড়িতে। পাউরুটি, বিস্কুট, মানে যেসব খাবার জিনিস ফ্রিজে ভরা সম্ভব নয়, সেগুলো আমরা কৌটোয় শক্ত করে বন্ধ করে রাখতে লাগলাম। তিন-চারদিনের পরই দেখি অত সুন্দর শাদা ধপধপে, জাহাজের ছবিওলা ব্রেডবক্সের লাল ঢাকাটার একটা পাশ কেটে গর্ত করে দিয়েছে। একবার মা এসে অন্য জিনিসপত্রের সঙ্গে এটাও কিনে রেখে গিয়েছিলেন। খুব রাগ হল আমার। এরকম পাজি একটা জানোয়ারের সঙ্গে এক বাড়িতে বাস করা অসম্ভব। ক্লাসের দু-একজন বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম ইঁদুরের ব্যাপারে কী জানে ওরা। পারমিতা মিকি মাউসের উৎপত্তি, মিকিকে কীরকম ভালবাসে বাচ্চা বুড়ো সবাই, মহা উৎসাহে সেইসব বোঝাতে লেগেছিল। এক ধমক দিয়ে ওকে থামালাম, ‘মিকি মাউস! জ্যান্ত ইঁদুর সম্পর্কে জানিস কিছু তুই! ধারণা করতে পারবি ওইটুকু প্রাণী কী-কী জিনিস কাটে দাঁত দিয়ে।” 

পদ্মনাভ বলল, ইঁদুররা নাকি সমস্তক্ষণই দাঁত দিয়ে কিছু না কিছু কাটতেই থাকে, তার মানে এই নয় যে, তার সবকিছু ওরা খায়। 

“খায় না তো কামড়ায় কেন?” 
“ওদের দাঁতের একটা ব্যাপার আছে। ওদের দাঁত খুব তাড়াতাড়ি বাড়ে, সবসময়ে কিছুর সঙ্গে না ঘষলে দাঁত ওদের মাথা ফুটাে করে বেরিয়ে যাবে। ওদের কাছে এটা বাঁচা-মরার ব্যাপার, বুঝলি?” কোনও মানে হয়! এদের জিজ্ঞেস করাই ভুল হয়েছে। নীচে দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলাম, ইদুর হয়েছে ঘরে, কী করব? সে তৎক্ষণাৎ বলল। ইদুর-মারা বিষ দিয়ে দিতে। 
“বিষ দেব! সেটা আবার যেন একটু কেমন লাগে। তা ছাড়া রমাদি!”

সুতরাং ওই চলতে লাগল সারাক্ষণ, হুস হুস হ্যাট হ্যাট আর সন্ত্রস্ত হয়ে থাকা। ইনঅগনিক কেমিষ্ট্রির একটা মোটা বইয়ের পেছনটা কুটিকুটি করে ফেলল। লীলা মজুমদারের ঠাকুমার ঠিকুজি’। যদি বড়সড় কেউ হত, হাতে ধরা যায়, পিটিয়ে শেষ করতাম। রমাদিও দিনরাত তাড়া দিয়ে দিয়ে অস্থির। ইউনিভার্সিটি থেকে রোজ ভয়ে ভয়ে ফিরি, নতুন আবার কী হল ভেবে। কিন্তু যেদিন পরতে গিয়ে কামিজের হাতাটার অর্ধেকটা কুটিকুটি, ওর ওপর আমার আর কোনও মায়ামমতা রইল না। তক্ষুনি নীচে গিয়ে দারোয়ানকে পয়সা দিলাম একদম দু’প্যাকেট বিষ নিয়ে আসতে। আজকেই আমি ওর মজা দেখাচ্ছি। ইস, দারোয়ান যেদিন বলেছিল সেদিনই যদি শুনতাম, আমার এত সুন্দর সুটটার এই দশা হত না। রাগে আমার চোখে জল এসে গিয়েছে। দারোয়ান বলে দিল আটার সঙ্গে একটু ঘি দিয়ে ওষুধটা মাখতে, তা হলে গন্ধে চটপট খেবে নেবে। আর যে মাখবে সে ভাল করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নেবে। বাবা-মায়ের কথা শুনে শুনে ওরও আমার সম্পর্কে একটু গার্জেন-গার্জেন ভাব। 

অত মন শক্ত করলে কী হবে, ঘণ্টাকয়েক পরে রাত্রে খেতে বসে রমাদির শুকনো মুখটা দেখে আমারও কেমন লাগল। ও বেচারা আমাকে বারণও করছে না, ভাবটা যেন ও ইঁদুরটারই দলের লোক, ইঁদুরটার দোষের খানিকটা দায় ওরই, তা ছাড়া, আমাকে তো হাত দিতে দেবে না জানাই কথা। তার মানে বিষটা ওকেই মাখতে হবে খাবারের সঙ্গে। সারাটা সন্ধে একটা ঝাঁটা নিয়ে প্রায় যুদ্ধ হয়েছে শয়তানটাকে তাড়া দিয়ে বার করে দেওয়ার। কিন্তু তার নাগাল পাবে তবে তো! খেতে বসে আজ আর কোনও কথাই হল না। শেষে খেয়ে উঠে আমিই বললাম, “রমাদি, ছেড়ে দাও, বিষটিষ দিতে হবে না।” রমাদির মুখটা যেন একবার স্বস্তিতে ভরে গেল, আমাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বলে উঠল, “দাঁড়াও না, কালকেই একটা কল কিনে আনব। বাছাধনকে ধরে একেবারে পাড়ার বাইরে নিয়ে ফেলে আসব।” 

কাজেই আবার দারোয়ান। রোজকার দোকান-বাজার আমরা নিজেরাই করি, কিন্তু ইঁদুর-ধরা কল যে কোথায় পাওয়া যাবে সে আমরা জানব কী করে? - কল এল। একটা ছোট কাঠের বাক্স, তার দেওয়ালগুলো সরু সরু শিক লাগানো। একপাশে ছোট একটা দরজার মতো, ওপরদিকে টেনে তুলতে হয়। তাতে একটা সরু টোয়াইনের সুতো, তার ডগায় একটা ছোট্ট হুক। হুকটায় খাবার গেথে বাক্সর মধ্যে ঝুলিয়ে রাখতে হয়, হুকটার একটু ধাক্কা লাগলেই ঝুপ করে গেটটা বন্ধ হয়ে যাবে। একটুকরো মাখন-পাউরুটি হুকে লাগিয়ে রেখে আমাদের অপেক্ষা করা শুরু হল। সদর দরজার পেছনে যেখানে জুতোর শেলফ সেখানে রাখা হয়েছে বাক্সটা। ইদুরটা বাংলা কথাবার্তা বোঝে কি না বা ইঁদুর ধরা কল সম্পর্কে কিছু জানে কি না জানি না। কিন্তু সত্যি-সত্যি সেটাকে আর দেখা গেল না। একদিন দুদিন তিনদিন। পাউরুটি যেমনকার তেমনই ঝুলছে, ঘরেদোরে কোথাও তাকে দেখা যাচ্ছে না, এমনকী রান্নাঘরের বিনটায় পর্যন্ত নাড়ানাড়ির কোনও চিহ্ন নেই। পালিয়েছে তা হলে! রমাদির ধারণা ও বুঝতে পেরেছে আর খুব অপমান হয়েছে। তাই হোক বাবাঃ, আমরা তো বেঁচেছি। গরমের ছুটি প্রায় এসে পড়েছে, আমার তো চিন্তা হচ্ছিল যে ফিরে এসে বাড়িতে কেবল কাগজকুচি, কাপড়কুচি, কাঠকুচি ছাড়া আর পাব না কিছু।

ঠিক চারদিন আমরা স্বস্তিতে ছিলাম আর তার আগে একদিন চিন্তায়। ছ’দিনের দিন বিকেলে চায়ের কাপটা নিয়ে আরাম করে বসেছি দু’জনে, বইয়ের তাকের মাথা থেকে কী একটা নীচে মেঝেয় পড়ল। 

ইদুরটা! 

ব্যস, শুরু হয়ে গেছে আবার! কিন্তু এতদিন ও ছিল কোথায়! বুক শেলফের মাথায় ছিল না, ওখানটা আমি অনেকবার দেখেছি, রান্নাঘরে, জামাকাপড়ে—কোথাওই তো, পদ্মনাভের মতে যা ওর জীবনমরণের প্রশ্ন তার কোনও চিহ্ন দেখিনি! ছুটির আর এক সপ্তাহ মাত্র বাকি। বাড়ি যাওয়ার আনন্দ অর্ধেক কমে গেল ওর অধীনে সব বইপত্র রান্নাঘর রেখে যাওয়ার চিন্তায়। চাল রাখবার ঢাকাওয়ালা প্লাস্টিকের বালতিটাও কেটেছে। রান্নাঘরের বন্ধ দরজার তলা দিয়ে আমার কড়ে আঙুলটাও ঢোকানো মুশকিল, তার ভেতর দিয়ে কী করে যে আসা-যাওয়া করে! 

পরদিন আমি ঠিক করে নিলাম, রমাদিকে কিছু বলারও দরকার নেই। ও ঘুমোলে রাত্রে আস্তে আস্তে রান্নাঘরে গিয়ে একটা প্যাকেট খুলে কালো কালো গুড়োমতো জিনিসটাকে পাউরুটি আর গুড়ো দুধের সঙ্গে ভাল করে মাখলাম, পাঁচটা ছোট ছোট বল তৈরি করে রান্নাঘরে বিনের পাশে, এদিক-ওদিক রাখলাম। খুব ভাল করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে এসে শুলাম। 

মনের অস্বস্তিতেই বোধ হয় খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেছে। ভাল করে রোদ আসেনি ঘরে। ঘড়িতে দেখি সাড়ে পাঁচটা। রমাদি চোখের ওপর হাতচাপা দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। পা টিপে টিপে রান্নাঘরের দিকে গেলাম। নিজেকে কী রকম ঘাতক-ঘাতক মনে হচ্ছে। ও মা! পাঁচটা গুলি ঠিক যেমন ছিল তেমনই পড়ে আছে মেঝেয়। একটিও খায়নি শয়তানটা! কাগজ দিয়ে তুলে বিনের মধ্যে ফেললাম সেগুলোকে। আজ রাতে আবার দেব, দেখি ক’দিন না খায়! 

খানিক পরে রামাদি উঠে আমাকে দেখে অবাক! “ঘুম হয়নি! এত সকাল সকাল উঠে পড়েছ!” “না, ঘুমিয়েছি, গরম লাগছিল বলে উঠে পড়লাম।” মিথ্যে কথা বললাম রমাদিকে। সকালের চা খাওয়া শেষ করে আমি বইপত্র নিয়ে বসেছি, রামাদি ঘর ঝাট দিচ্ছে। হঠাৎ জুতোর শেলফের কাছ থেকে একেবারে চেঁচিয়ে উঠেছে। “ও দিদি, দিদি গো, শিগগির এসো।” জুতোর শেলফের কোনা থেকে নীচে পড়ে আছে বিষের প্যাকেটটা, একটু কালো গুড়ো পড়ে আছে মেঝেয়, আর তার পাশে মরে পড়ে আছে ইঁদুর।

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য