নাকের বদলে নরুন পাইলাম - বাংলাদেশের লোককাহিনী

     এক শেয়াল পেটের জ্বালায় অস্থির। বেগুন ক্ষেতে ঢুকিয়া বেগুন খাইতে লাগিল। খাইতে খাইতে হঠাৎ একটি বেগুন কাটা শেয়ালের নাকে বিঁধিয়া গেল। শেয়াল এধারে নাক ঘুরায় ওধারে নাক ঘুরায়, বেগুন কাটা খোলে না। জিভ দিয়া নাকের আগা চাটিতে গেল, কিন্তু জিভ নাক পর্যন্ত যায় না। সামনের দু'পা দিয়া নাকের কাটা খুলিতে গেল। কিন্তু বেগুন কাটা এত সরু যে পায়ের নলি দিয়া ধরা যায় না। কাঁটার ব্যথায় হাচ্য হাচ্য করিতে করিতে শেয়ালের দুই চোখ দিয়া পানি আসিল । 
অবশেষে শেয়াল নাপিতের বাড়ি আসিল । 

নাপিত ভাই! নাপিত ভাই! বাড়ি আছ নি ? 
বেগুন কাটা নাকে ফুটছে করব এখন কি ? 

     নাপিত বড় ভালো মানুষ। সে নরুনটি হাতে লইয়া শেয়ালের নাক হইতে কাঁটাটি খসাইতে হঠাৎ নরুনের আগা লাগিয়া শেয়ালের নাকের খানিকটা কাটিয়া ফেলিল। শেয়াল তো হুক্কা হুয়া করিয়া রাগিয়া মাগিয়া অস্থির। “ওরে নাপতে, শিগগীর আমার নাক জোড়া দিয়া দে। নইলে তোকে মজাটা দেখাব।" 
     নাপিত হাতজোড় করিয়া বলিল, “মাফ কর ভাই। তোমার কাঁটা তুলিতে হঠাৎ নরুনটা নাকে লাগিয়াছে। আমি তো আগে জানিতে পারি নাই।"
     শেয়াল বলিল, “মাফ করিতে পারি, যাদি তোর নুরনটা আমাকে দিস।”
     নাপিত আর কি করে। নরুনটা শেয়ালকে দিল। নরুনটা মুখে লইয়া শেয়াল চলিল এপাড়া হইতে আর এক পাড়া কুমার বাড়ির ধার দিয়া ।
     কুমার বলিল— 
“শেয়াল মামা! শেয়াল মামা! 
মুখে ওটা কি একটুখানি দাঁড়াও দেখি 
পরখ করে নি।"

     শেয়াল দাঁড়াইয়া বলিল, "ওটা নরুন, নাকের বদলে পাইয়াছি।" কুমার বলিল, “দেখি দেখি, কেমন নরুন " কুমারের হাতে নরুন দিতেই নরুনটা মাটিতে পড়িয়া ভাঙ্গিয়া গেল।
     শেয়াল তখন রাগিয়া মাগিয়া বলিল, “ওরে কুমার! লক্ষ্মীছাড়া, আমার নরুনটা ভাঙ্গিয়া দিলি! শিগগীর জোড়া দিয়া দে। নইলে রাত্রে আসিয়া তোর হাড়ি-পাতিল সব ভাঙ্গিয়া দিয়া যাইব ।"
     সে গ্রামে কোনো কামার নাই, কি করিয়া সে ভাঙ্গা নরুন জোড়া লাগাইবে? জোড়হাতে কুমার বলিল, “আমাকে মাফ কর ভাই। নইলে গরীব প্রাণে মারা যাই।"
     শেয়াল বলিল, “তবে দে, নরুনের বদলে একটা হাঁড়ি দে। তাহাই লইয়া তোকে মাফ করিয়া যাই।"
     কুমার খুশী হইয়া শেয়ালকে একটি হাঁড়ি দিল। হাঁড়ি মাথায় লইয়া শেয়াল সে গ্রাম ছাড়িয়া আর এক গ্রাম ছাড়াইয়া এক মাঠের মধ্যে যাইয়া পড়িল। তখন বেশ রাত্র হইয়াছে।
     এক বরযাত্রীর দল যাইতেছিল পটকা বাজি জ্বালাইয়া। তাহারই একটি বাজি লাগিয়া শেয়ালের মুখের হাঁড়ি গেল ভাঙ্গিয়া।
     বাজি পোড়াইয়া আমার হাড়িটি ভাঙ্গিয়াছ। শিগগীর জোড়া দিয়া দাও।
    নইলে রাত্রে তোমাদের পাড়ায় ঢুকিয়া মোরগ-মুরগী চুরি করিয়া আনিব। তরমুজ-বাঙ্গী আর খাইতে হবে না। দাঁত দিয়া কামড়াইয়া একাকার করিয়া দিব।"
     পাল্কী হইতে বর নামিয়া আসিয়া জোড়হাতে বলিল, “এবারের মতো মাফ কর ভাই।" 
    শেয়াল বলিল, “মাফ করিতে পারি যদি তোমার কনেটিকে আমায় দিয়া দাও " বর কি তার বিবাহ করা কনেকে সহজে দিতে চায়! বরযাত্রীরা সকলে বলিল, “শেয়ালের কথা না রাখিলে সে যাইয়া আমাদের খেত-খোলা নষ্ট করিবে। মোরগ-মুরগী ধরিয়া লইবে । সে তো কম লোকসান হইবে না। তার চাইতে কনেটিকেই দিয়া যাও।”
     অগত্যা বর কনেটিকে শেয়ালের হাতে দিল। কনে পাইয়া খুশী হইয়া নাচিতে নাচিতে শেয়াল এক ঢুলীর বাড়ি গেল।

 “ঢুলী ভাই! এসো এসো ঢোলে ঢোকর দিয়া 
আজকের শুভদিনে মুই শেয়ালের বিয়া।" 

     ঢুলী বলিল, “আমার তো একটা মাত্র ঢোল। বিবাহের সময় তো ঢোল-ডগর, সানাই, কাড়া-নাকড়া কত বাজাইতে হয়। বলো তো আমার দলের লোকদের খবর দেই।" 
     শেয়াল বলিল, “বেশ! তোমাদের দলের যে কয়জন আছে সকলকে খবর দিতে যাও। আমার কনেটি তোমাদের এখানে থাকিল। আমি এদিকে পুরুত ডাক দিতে যাই। সে আসিয়াই তো বিবাহের মন্ত্র পড়াইবে।” ঢুলী-বউ কুটনা কুটিতেছিল। কনেটি বটির সামনে বসিয়া ঝিমাইতেছিল। ঝিমাইতে ঝিমাইতে হঠাৎ ধারাল বটির উপর পড়িয়া বউটি কাটিয়া চৌচির হইয়া গেল। পরের বউ এমন করিয়া মারা পড়িল । ভয়ে ঢুলী-বউ কনেটিকে টানিয়া লইয়া খড়-গাদায় লুকাইয়া রাখিল । পুরুত লইয়া শেয়াল আসিয়া দেখে কনে নাই। সে তেড়িয়া মেড়িয়া ঢুলী-বউকে বলে, “শিগগীর আমার কনে আনিয়া দাও। নইলে দেখাইব মজা ।" 
     জোড়হাত করিয়া কাঁদিয়া কাটিয়া ঢুলী-বউ বলে, “আমাকে মাফ করিয়া দাও।” 
     শেয়াল উত্তর করিল, “মাফ করিতে পারি। যদি আমার কনের বদলে তোমাদের ঢোলটা দাও ।" 
     ঢুলী-বউ তাহাদের ঢোলটা শেয়ালকে দিয়া খুনে দায় হইতে বাঁচিল । 
     ঢোলটি গলায় ঝুলাইয়া মনের খুশীতে শেয়াল বড় তালগাছটার মাথায় উঠিয়া নাচে আর গান করে--

তাক ধুমা ধুম ধুম। 
বেগুন খেতে ফুটল নাকে বেগুন কাঁটা যম 
তাক ধুমা ধুম ধুম। 
কাঁটা তুলতে কাটল নাক ব্যথা নয় তার কম 
তাক ধুম ধুম ধুম। 
নাকের বদলে নরুন পেলাম 
তাক ধুমা ধুম ধুম। 
নরুনের বদলে হাড়ি পেলাম 
তাক ধুমা ধুম ধুম। 
হাড়ির বদলে কনে পেলাম 
তাক ধুমা ধুম ধুম। 
কনের বদলে ঢোল পেয়েছি 
তাক ধুম ধুম ধুম।

গান গাহিতে গাহিতে আর নাচিতে নাচিতে শেয়াল দিয়াছে এক লাফ আর মাটিতে পড়িয়া চিৎপটাং !
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য