টুনটুনির বুদ্ধি - বাংলাদেশের লোককাহিনী

     টুনটুনি আর টুনটুনা একসঙ্গে ত আছে । সেদিন টুনটুনি টুনটুনাকে বলে, “দেখ টুনটুনা! আমার যে বড্ড পিঠা খাইতে ইচ্ছা করিতেছে।” 
     টুনটুনা বলে, “পিঠা তৈরি করিতে চাউল লাগে, ঢেঁকি লাগে হাঁড়ি-পাতিল লাগে, কাঠ লাগে আরও কত কি লাগে। এসব আমরা কোথায় পাইব ?” 
     টুনটুনি বলে, “চল, আমরা গেরস্তের বাড়ি হইতে আগে চাউল টুকাইয়া আনি । তারপর আর সব জিনিসের কথা চিন্তা করা যাইবে।” 
     টুনটুনি আর টুনটুনা ফুরুৎফুরুৎ করিয়া উড়িয়া এ বাড়ি যায় ও বাড়ি যায় । ছেলেরা এখানে সেখানে কত চাউল ছড়াইয়া ফেলে। সেই চাউল ওরা টুকাইয়া লইয়া আসে। 
     তখন টুনটুনা বলে, “চাউলের ত জোগাড় হইল। এবার চাইল ভানিয়া গুঁড়া করিব কেমন করিয়া?”
     টুনটুনা তখন করিল কি ? যাইয়া দেখে, গেরস্তের বউ ও-ঘর হইতে টেকিঘরে যাইতেছে । সে উঠানে একঘটি পানি ঢালিয়া দিয়া তার পথ পিছল করিয়া দিয়া আসিল । গেরস্তের বউ সেই পথ দিয়া যাইতে আছাড় খাইয়া পড়িল । 
     টুনটুনা এই অবসরে ঢেঁকি ঘরে যাইয়া ঠেঁকি ঘরে যাইয়া লোটে চাউল ভরিয়া ধাপুর ধোপর পার । অল্পক্ষণের মধ্যে চাউল গুড়া করিয়া তাহারা বাসায় ফিরিল।
     কিন্তু পিঠা বানাইতে ত খাপরার দরকার । খাপরা তারা কোথায় পাইবে ? এক কুমার, হাড়ি-পাতিল মাথায় করিয়া বাজারে যাইতেছিল। টুনটুনি করিল কি ? তার পথের সামনে এক বদনা পানি ঢালিয়া সেই পথ পিছল করিয়া দিয়া আসিল । কুমার সেই পথ দিয়া যাইতেছে আমনি ধপাস করিয়া আছাড় খাইয়া পড়িয়া গেল। মাথার হাঁড়ি-পাতিল মুড়মুড় করিয়া ভাঙিয়া গেল । মনের ইচ্ছামতো টুনটুনি সেখান হইতে খাপরা টুকাইয়া আনিল ।
     পিঠা বানানোর গুড়া হইল, খাপরা হইল ; কিন্তু কাঠ পাইবে কোথায় ? টুনটুনি আর টুনটুনা এ জঙ্গল ছাড়িয়া ও জঙ্গল পার হইয়া জনমানুষের সাড়া মেলে না, এমন এক বিজাবন জঙ্গলে যাইয়া উপস্থিত হইল। সেখানে যাইয়া তারা দেখে গাছের উপর কত মরা ডাল শুকাইয়া খড়ি হইয়া আছে। টুনটুনি আর টুনটুনা এ ডাল ভাঙে মড়র মড়র, ও ডাল ভাঙে কড়র কড়র, সে ডাল ভাঙে চড়র চড়র। এমন সময় এক সিংহ, “হালুম মালুম খেলুম।” বলিয়া ডাক ছাড়ে, “এই বনে লাকড়ি ভাঙে কারা?”

ভয়ে টুনটুনি জড়সড়
কাঁপিতে কাঁপিতে টুনটুনা পড় পড়।

     সিংহ আবার গর্জন করিয়া বলে, “এই বনে লাকড়ি ভাঙে কারা ?”
     টুনটুনি আর টুনটুনা অনেক সাহস করিয়া বলে—

“আমি টুনটুনি মামা! 
আমি টুনটুনা মামা!

     তোমাকে দাওয়াত করিতে আসিয়াছি । আজ আমাদের বাড়িতে চিতই পিঠা করিব কিনা, তাই তোমাকে বিকালে
আমাদের বাড়ি যাইতে হইবে।” 
     একগাল হাসিয়া সিংহমামা বলে, “বেশ ভাগনে! বেশ । বেশ ভাগনী! বেশ! তোমাদের দাওয়াত কি না রাখিয়া পারা যায় ?
     আমি ঠিক সময়ে যাইয়া হাজির হইব ।”
    সাহস পাইয়া টুনটুনি বলে, “তা মামা! আমরা ত খুব ছোট, কয়টা লাকড়ি আর ঠোঁটে করিয়া লাইয়া যাইতে পারিব!”

     সিংহ আর একটু হাসিয়া বলিল, “তবে দাড়া, আমি পিঠে করিয়া তোদের লাকড়ি দিয়া আসিতেছি।” এদিকে থাবা মারিয়া, ওদিকে থাবা মারিয়া মড়মড় করিয়া অনেক লাকড়ি ভাঙিয়া সিংহ পিঠে বোঝাই করিল। টুনটুনি আর টুনটুনা আগে আগে পথ দেখাইয়া চলিল। টুনটুনিদের বাসার সামনে আসিয়া দুডুম করিয়া পিঠের বোঝা নামাইয়া সিংহ চলিয়া গেল। যাইবার সময় বলিয়া গেল, “আজ ঠিক বিকাল হইলে আমি পিঠা খাইতে আসিব ।”
     টুনটুনি আর টুনটুনা পিঠা বানায়। একখানা বানায় টুনটুনি খায়, আর একখানা বানায় টুনটুনা খায় । খাইতে খাইতে খাইতে তারা সকল পিঠা খাইয়া ফেলিল ।
     তখন টুনটুনি বলে, “দেখ টুনটুনা! সব পিঠা ত আমরাই খাইয়া ফেলিলাম। এদিকে সিংহ মামা আসিলে কি খাইতে দিব?”
     দুইজনে মিলিয়া অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া তাহারা করিল কি ? মাঠ হইতে শুকনা গোবর আনিয়া এক প্রকাণ্ড ভুরী বানাইল । তার উপরে একখানা পিঠা সাজাইয়া সমস্ত গোবর ঢাকিয়া ফেলিল । তারপর দুইজনে চাউলের হাড়ির মধ্যে লুকাইয়া সিংহমামার আসার অপেক্ষা করিতে লাগিল ।
     সিংহ আসিয়া পিঠার ভূরী দেখিয়া বড়ই খুশি । পিঠার ভুরীর চারদিকে সে ঘোরে, একখানা পিঠা তুলিয়া মুখে দেয়— আর নাচিয়া নাচিয়া গান গায়—

“টুনটুনিরে পাইতাম,
ঘাড়ে করে নাচতাম।” 

     এইভাবে খাইতে খাইতে উপরের পিঠাগুলি সব ফুরাইয়া গেল। তারপর একখানা গোবরের পিঠা মুখে দিয়া ওয়াক ওয়াক করিয়া ফেলিয়া দিল । তখন সিংহ মহাশয় তর্জন গর্জন করিয়া উঠিল,—

টুনটুনিরে পাইতাম,
ঘাড় মটকায়ে খাইতাম । 
টুনটুনারে পাইতাম, 
ঘাড় মটকায়ে খাইতাম।”

     চাউলের হাড়ির মধ্যে থাকিয়া টুনটুনা বলে, “টুনটুনিরে। আমার বড়ই হ্যাঁচ্চো পাইতেছে।”
     টুনটুনি বলে, “টুনটুনা সর্বনাশ করিলি! হ্যাঁচ্চো দিলেই সিংহ টের পাইবে । আর টের পাইলে আমাদের কি আর আস্ত রাখিবে!”

এমন সময় সিংহ গর্জন করিয়া বলিতেছে, 

“টুনটুনারে পাইতাম,
ঘাড় মটকায়ে খাইতাম । 
টুনটুনিরে পাইতাম, 
ঘাড় মটকায়ে খাইতাম।” 

     কিন্তু টুনটুনা বলে, “টুনটুনিরে! আমি যে আর থাকিতে পারিতেছি না। আমার এমন হ্যাঁচ্চো পাইয়াছে।” টুনটুনি তার বুকে মাথায় পাখা ঘষে, পিঠে লেজে ঠোঁট ঘষে, “টুনটুনারে! আর একটু থামিয়া থাক।” 
     কিন্তু বলিলে কি হইবে। আকাশ ফাটাইয়া টুনটুনা শব্দ করিল, “হ্যাঁচ্চো।” সেই শব্দের জোরে চাউলের হাড়ি ভাঙিয়া ফটট্টাস, আর ভয়ে লেজ গুটাইয়া সিংহ মশায় দে চম্পট ।

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য