পটলার বন ভ্রমন-- শেষ অংশ

ভূধর জানে কিসের ব্যবসার কথা বলছে ভজনলাল। ভূধর বলে, কই আর চলছে। হাতির দাঁত, বাঘের চামড়ার বহুৎ ডিমান্ড! মাল মিলছে না!
ভজনলাল এককালে ছিল বনের চোরাশিকারি। যেমন সাহস আর তেমনি তার অব্যর্থ লক্ষ্য। অতীতে বহু শিকার করেছে রাজা-জমিদারদের জন্য। পরে শিকার নিষিদ্ধ হতে সে চোরা কাঠের কাজ আর চোরাশিকার করছে তার লোকজন দিয়ে। মন্দিরের পূজারী সেজে থাকে। মাঝে মাঝে শোনা যায় ধর্মের ভাষণের সঙ্গে লুকিয়ে সংগ্রহ করা হাতির দাঁত, বাঘের চামড়ার ব্যবসার কথা। সারা বনে তার চ্যালারা এ কাজ করে। আর ভজন মহারাজ মাঝে মাঝে শহরে গিয়ে সব লেনদেন সেরে আসে। ভূধরও তার খরিদার।
ভজনলাল বলে, এখন বনবিভাগ ভি বহুৎ হুশিয়ার হয়ে গেছে। আর নিখিলবাবু, ওই রিটায়ার্ড ডি. এফ. ও ভি লোকজন নিয়ে বনে ঘুরছে। কামকাজ করা মুশকিল হয়ে গেছে।
ভূধর জানে ভজনের এসব কথা বলার কারণ, সেও চায় আরও টাকা।
ভূধর বলে, টাকা ভালোই পাবে ভজন ওসব মাল আমার চাই।
টাকাও বেশ কিছু আগাম দিয়ে বের হয়ে আসে ভূধর।
পটলা-হোঁৎকা এসেছে মন্দিরের বাইরে। টর্চের আলো জ্বলে ওঠে। ভূধর আর ভজন বাইরে এসেছে। ভূধর টর্চের আলো জ্বেলেছে। ওপাশে ঝোপের আড়ালে পটলা আর হোঁৎকা।একফালি আলোয় ওরা দেখছে ভজনলালকে। ওর মুখটা দেখেই হোঁৎকা চমকে ওঠে। সেই মুখখানাকে তারা ভোলেনি।
হোঁৎকা বলে-পটলা, লোকটারে দেখছিস? সেই ট্রেনের দেখা মহারাজ না? ওই তো আমাগোর পাঁচ হাজার টাকার ব্যাগও লইছে।
পটলাও দেখে লোকটাকে। এই বনের ধারে বিরাট মন্দির করে সাধু সেজে বসে আছে। আর দু'নম্বর ধান্দাই করে এখানে। নাহলে এই ভূধরবাবুরা এখানে আসবে কেন?
ভজন ভিতরে চলে গেছে। জিপটা তখন একটু দূরে বনের ধারে। একটা নালার জন্য গাড়ি আনতে পারেনি মন্দিরের কাছে অবধি। ভূধর আসছে অন্ধকারে জিপের দিকে। চারদিকে গাছ-গাছালির ঘন সমাবেশ। এদিকে ঝর্নার জলধারা নীচে একটা জলাশয়ের সৃষ্টি করেছে। বনের জন্তু-জানোয়ার এখানে জল খেতে আসে। চারদিক থমথমে। শুধু গাছ-গাছালির শনশন শব্দ ওঠে। তারাগুলো জ্বলছে।
হঠাৎ গাছের ওদিকে শব্দটা শুনে ভূধর থমকে দাঁড়াল। টর্চের আলো দিয়ে চারদিকটা দেখছে। ঝোপটা নড়ে ওঠে। যেন ডোরাকাটা একটা কী দেখেছে সে। আর এক লহমাও দাঁড়িয়ে থাকেনি সে। ভূধর সামনের মহুয়া গাছটার একটা ডাল ধরে প্রাণপণে লাফ দিয়ে গাছে ওঠে। তারপরই অস্ফুট কণ্ঠে চিৎকার শুরু করে-বাঘ-বাঘ-বাঘ
ভারী দেহটা ডালে দুলছে আর ঝুলন্ত মূর্তিটা চিৎকার করছে, বাঘ-বাঘ
পটলা-হোঁৎকা ভূধরকে এড়াবার জন্যই ঝোপের আড়ালে গা-ঢাকা দিয়েছে। তারাও ভাবেনি যে তাদের ডালপালা নড়ার শব্দ শুনে ভূধরবাবু এমনি একটা কাণ্ড করবে।
ঝোপের ভিতর থেকে দেখছে পটলা-হোঁৎকা। হাসিও পায় ভূধরের কাণ্ড দেখে। হঠাৎ আর একটা টর্চের আলো এসে পড়ে। ভূধরের টর্চ তো নীচে। পটলারা দেখে আর একজন বয়স্ক লোক হাতে টর্চ আর রাইফেল নিয়ে আসছেন। হাক পাড়েন তিনি, ভূধরবাবু-অ্যাই ভূধরবাবু। বাঘ নয়, আমি। মিঃরায় নীচে আসুন।

এবার ওঁর কণ্ঠস্বর শুনে আর টর্চের আলো দেখে ভূধরবাবু কোনোরকমে হাত, হাঁটু সব ছিড়ে গাছ থেকে নীচে নেমে আসে। ভূধর গাছ থেকে নেমে সামনে ভদ্রলোককে দেখে যেন আশ্বস্ত হয়ে যায়। থতমত খেয়ে বলে-রায় সাহেব, আপনি? একটু মায়ের মন্দিরে এসেছিলাম।

আর বাঘ মনে করে গাছে চড়ে গেছিলেন? তাও নিচু ডালে বাঘ তো অনায়াসেই ধরতে পারত আপনাকে এভাবে রাতের বেলা
বনে ঘুরবেন না। চলুন
ওরা বের হয়ে যায়। এবার ঝোপ থেকে পটলা-হোঁৎকাও বের হয়ে বাংলোয় ফিরে আসে। পটলা বলে-ভূধরবাবুও জোচ্চোর মহারাজের কাছে যায়। নিশ্চয়ই ওরা বনের মধ্যে দু’নম্বর অনেক কাজই করে। তবে ওই মিঃ রায়কে তো চিনলাম না! ওর খোজ নিতে হবে।

পরদিন এখানের হাট। বনের মধ্যে আজ যেন সাড়া পড়ে যায়। সকাল থেকে বন অফিসের সামনে মাঠের মধ্যে  ট্রাকে করে দোকানদাররা এসে তাদের বেসাতি সাজাচ্ছে। কয়েকটা মুদির দোকান। রয়েছে সস্তা ধুতি, গামছা, গেঞ্জি। কেউ এনেছে টুকটাক মনিহারি জিনিস। বনের মধ্যে দু’চারজন আদিবাসী বস্তি থেকে ছেলেমায়েরা সেজে গুজে মাদল নিয়ে গানের আসরও বসায়। আর সাধারণ লোক কেউ কুমড়ো, বেগুন নিয়ে বসেছে। এই হাটই তাদের মিলনক্ষেত্র। আজ বনবিভাগের ছুটি। পটলা-হোঁৎকাও বের হয়েছে বাংলো থেকে। হাটে আসার পথে একটা বাগানঘেরা বাড়িতে একটা পুকুরে পদ্মফুল দেখে থমকে দাঁড়ায়। বাগানে একটা বকুল গাছের নীচে বসে আছেন কাল রাতের দেখা সেই ভদ্রলোক। গত রাতে তাঁর পরনে ছিল প্যান্ট-শার্ট-হান্টার শু, হাতে রাইফেল। আজ লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি। পটলা-হোঁৎকাকে দেখে তিনি চাইলেন। শুধোন, কী চাই? এসো ভিতরে এসো।

ওরা দুজনে ভিতরে যায়। পটলা বলে, আপনার বাগান দেখছিলাম। কী সুন্দর বাগান সবুজ গাছ-গাছালি, কত ফুল! এই বনের

হাসেন মিঃ রায়-হাঁ, আমি আর শহরে ফিরে যাইনি রিটায়ার করার পর এখানেই রয়েছি। বনকে ভালোবাসি। এই বন, বনের প্রাণীদের বাঁচিয়ে রাখতে চাই। তবে মানুষই নিজের লোভ আর হীন স্বার্থের জন্যই এসব শেষ করবে:
পটলা-হোঁৎকার পরনে এখন নিজেদের পোশাক। বয়-বেয়ারার পোশাক ছেড়েই বের হয়েছে। মিঃ রায় বলেন, চলো ভিতরে চলো। চা খাবে তো বনে বেড়াতে এসেছ বুঝি!
পটলা বলে-তাই বলতে পারেন
হোঁৎকা বলে-ও পটলা, আমি শিবাজী, ডাক নাম হোঁৎকা কলকাতা থনে আইতাছি।
রায়সাহেব বলেন-তোমরা ও ঘরে গিয়ে বসো। আমি আসছি। এখানে কথা বলারও লোক নেই। তবু তোমাদের সঙ্গে কথা বলা যাবে।
ওদিকের ঘরের দরজা খুলে দিয়ে নিজে বাড়ির ভিতরে চলে গেলেন।
দরজা ঠেলে ঘরে ঢোকে পটলা আর হোৎকা। ঘরের জানলাগুলো প্রায়ই বন্ধ ফাঁকফোকর দিয়ে একটু আলোর আভাস আসছে মাত্র। পটলা-হোঁৎকা ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়ায়। ঘরের মেঝেতে বসে আছে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। মিঃ রায়ই ঘরে ঢুকে ব্যাপারটা দেখে বুঝতে পেরে বলেন, ওগুলো জ্যান্ত নয়, মরা।

পাশের জানালাটা খুলে দিতে এবার দিনের আলো ঘরে এসে ঢোকে। এবার দেখা যায় বিশাল ঘরটাকে। ওদিকে একটা দাঁতালো হাতির দাঁত সমেত মাথা। হরিণের শিং। মিঃ রায় বলেন, ওসব অতীতের দুস্কর্মের চিহ্ন। এখন ওদের বাঁচাতে চাই।-ডুইংরুমের আলমারিতে রয়েছে বেশ কিছু বই। আর পাশের আলমারিতে রয়েছে তিন-চারটে রাইফেল। মিঃ রায় বলেন, তখন এসব কিনেছিলাম।

মিঃ রায় এর মধ্যে আলমারি থেকে সঞ্চয়িতা বের করে বৃক্ষবন্দনা কবিতাটা শোনান। বলেন, এই অরণ্যকে মানুষ শেষ করে দিতে চাইছে। এ হতে দিতে পারি না। তাই বনে বনে রাতেও ঘুরি। কিন্তু চেষ্টা করেও চোরাশিকার বন্ধকরতে পারছি না।
এসে পড়েন মিঃ মিত্র। তরুণ রেঞ্জ অফিসার। মিঃ রায় বলেন, মিত্র, এসো। এরা কলকাতার ছাত্র। বনে এসেছে। এদের বনের কথাই বলছিলাম।
মিত্র বলেন-খবর আসছে বনের গভীরে চোরা কাটাই চলছে। কালই দুটো বড় সেগুন গাছ পাচার হয়ে গেছে আর শুনলাম ছোট ফুলিয়াতে দুটো দাঁতাল হাতিও মারা পড়েছে। এসব কি বন্ধ হবে না, সাহেব?
মিঃ রায় বলেন- বনে কড়া পাহারা বসাও। সব ট্রাকের দিকে নজরদারি বাড়াও বনের কাঠের কারবারি যারা আছে তাদের দিকেও নজর রাখো। এসব কাজে ওদের হাত নিশ্চয়ই আছে। তাদের হাতে-নাতে ধরতেই হবে। তারা বনের শত্ৰু, মানুষের শত্রু।
পটলা-হোঁৎকা সব শোনে। বলে পটলা, আমরা আজ আসি, স্যার। হাটে যেতে হবে।
মিঃ রায় বলেন-ঠিক আছে। চলে এসো মাঝে মাঝে। তবু কথা বলা যাবে। একাই থাকি তো!
ওরা বেরিয়ে আসে। হোঁৎকা বলে, ওই কাঠ চোর আর চোরাশিকারিদের লইয়া এরা বিপদে পড়ছে। হালারা এমন সুন্দর বন শ্যাষ কইর‌্যা দিবে। কিছু করনের লাগব।
বনের পথ দিয়ে হাঁটছে ওরা। হঠাৎ জিপের শব্দ শুনে এরা বনের ভিতর আড়াল হয়ে যায়। দেখা যায় হাট থেকে ফিরছে ভূধর তার জিপ নিয়ে। আর রয়েছে সেই ভজন মহারাজ। পিছনের সিটে দু-তিনজন ভীষণ-দর্শন লোক। জিপটা চলে গেল বনের দিকে।
হোঁৎকা বলে, দেখলি, ভূধর নির্ধাৎ কিছু একটা করবেই ওর মতলব সুবিধার নয়। চল গিয়া কই মিঃ মিত্রকে।
মিঃ মিত্র অফিসেই ছিলেন। বনবিভাগের অফিসে টাঙানো রয়েছে সারা বনের একটা বড় ম্যাপ। মিত্র হঠাৎ এদের দেখে চাইলেন। একটু আগেই তিনি ওদের মিঃ রায়ের ওখানে দেখেছেন। তাই এদের দেখে বলেন- এসো-এসো হঠাৎ এদিকে?
পটলা বলে-দেখলাম ভূধর তার জিপে মন্দিরের পূজারীকে নিয়ে বনের ভিতর চলে গেল।
মিঃ মিত্র বলেন-সেকি আজ তো বন কাটাই বন্ধ
হোৎকা বলে-এদের মতলব নিশ্চয়ই খারাপ!
মিঃ মিত্র বলেন-আমি দেখছি। আর তোমরা তো বনবাংলোতেই আছ ওর উপর একটু নজর রাখো! সব খবর আমাদের জানাবে!
পটলা-হোঁৎকা ফিরেছে বাংলোয় যথারীতি ভূধরের পাত্তা নেই। দুপুরে নাকি সে ফিরবে না কীসব জরুরি কাজ আছে পটলা-হোঁৎকাও নিশ্চিন্ত হয়। এর মধ্যে মানসীও রান্নার কাজ এগিয়ে রেখেছেন। এরা হাট থেকে আনাজপত্র, ডিম, মুরগি এনে রান্নার কাজে হাত লাগায়।
অজয়বাবু বলেন, ভূধর বন দেখাবে বলে নিয়ে এসে দিনরাত নিজের কাজ নিয়েই বাস্ত।
মানসী বলেন-আর বন-বাদাড় দেখে কাজ নেই ঘরে ফিরে চলো! ভূধর থাকে থাকুক তার কাজ নিয়ে। এর চেয়ে পুরীতে গেলে ভালো হত-তা না ওর পাল্লায় পড়ে এলে এই বনবাসে
ভূধরের উপর এরা যে খুশি নন তা বুঝেছে পটলা-হোঁৎকা।
দুপুরে বাংলো নিঝ্ঝুম। অজয়বাবু মানসী খাওয়ার পর ঘুমাচ্ছেন ওঁদের ঘরে। পটলা-হোঁৎকা ভূধরের ঘরের জানালা খুলে দেখে।

একটা রড সহজেই খোলা যায়। ওরা সেই রডটা খুলে সাবধানে ঘরে ঢোকে। এ ঘরেই ভূধর তার জিনিসপত্র রেখেছে। টেবিলে ডায়েরি, হিসেবের খাতা ছড়ানো। বিছানা এলোমেলো। জামাকাপড় যত্রতত্র ছড়ানো। এ ঘরে ভূধর কাউকে ঢুকতে দেয় না। ওর বিছানা তুলতেই দেখে গদির নিচে একটা বন্দুক আর একটা কাগজের বাক্সে বেশ কিছু বুলেট ও রয়েছে। অথচ বনবিভাগের পারমিটে লেখা আছে কেউ বন্দুক নিয়ে বনে ঢুকতে পারবে না।
হোঁৎকা বলে, কার্তুজগুলান লই চল বন্দুকেও যেন গুলি না থাকে
পটলা ওই ডায়েরি-নোটবইগুলো হাতিয়ে নিয়ে কার্তুজগুলোও তুলে নেয়। তারপর এদিক-ওদিক দেখে, না কেউ কোথাও নেই-ওরা জানলা দিয়ে বের হয়ে এসে আবার রডটা যথাস্থানে লাগিয়ে দেয়।
পটলার গোয়ান্দাগিরির কিছু অভিজ্ঞতা আছে। বহু গোয়েন্দা গল্প সে পড়েছে। আর ওর এক কাকা গোয়েন্দা বিভাগের পদস্থ অফিসারও। 
পটলা এবার ভূধরের কাগজের মধ্যে একটা বনের ম্যাপ আর তার কিছুটা অংশ লাল মার্ক করা দেখে। আর হিসাবের খাতায় বেশ কিছু মোটা অঙ্কের টাকা আর ভজনলালকে দেওয়া বেশ কিছু টাকার হিসাব দেখে। তাছাড়াও বেশ কিছু নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর দেখে। আর দেখা যায় একটা দানপত্রের খসড়া। সেটা পড়ে পটলা বলে, দাখ, ভূধরবাবুর মতলব। হোঁৎকাও পড়ে কাগজপত্রগুলো। তাতে লেখা আছে যে, অজয় সেন নাকি স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে তাঁর বালিগঞ্জের বাড়ি-ব্যবসা, সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি শ্ৰীভূধর বিশ্বাসকে দানপত্র করে দিয়েছেন।
হোঁৎকা বলে-এডা কী রে! মাসিমারে ফাসাইবার মতলব!
পটলা বলে-এর বিহিত করতেই হবে। এসব কাগজপত্র এখানে রাখা ঠিক হবে না। ঠিক জায়গায় জমা করে দিয়ে আসতে হবে চল।
নিখিল রায় দুপুরে ঘুমোন না। বইপত্র নিয়েই থাকেন। হঠাৎ এসময় পটলা-হোঁৎকাকে দেখে খুশিই হন। পটলা এসে ওর থলে থেকে সব কাগজপত্র বের করে নিখিলবাবুকে দেখায়। কাগজপত্র দেখে মিঃ রায় চমকে ওঠেন।
আমার সন্দেহ তাহলে মিথ্যে হয়নি। ওই ছেলেটা এতদিন ধরে এখানে এসে এইসব করছে। খুব উপকার করেছ তোমরা এতে অনেক কাজ হবে। আমি এখুনি ডেকে পাঠাচ্ছি ফরেস্ট পুলিশকে। তবে তোমরাও সাবধানে থেকো। যদি গোলমাল বোঝ আমাকে খবর দেবে।
বিকেল নামছে। ভূধরের সকাল থেকে কোনো খবর নেই। বিকেলের চা এনেছে হোঁৎকা। মানসী-অজয়বাবু চা খাচ্ছেন। মানসী ওদের জন্যও টেবিলে চা দিয়ে বলেন, তোমরাও খাও।
এটা অবশ্য ভূধরের চোখে পড়লে ভূধর চটেই যেত। এখন সে নেই। এবার পটালাই দানপত্রের দলিলটা মাসিমার হাতে দিয়ে বলে, কাগজটা আবর্জনার মধ্যে পড়েছিল। হাতে পড়তে নিয়ে এলাম। ছোট সাহেবের দরকারি কাগজ নয় তো!
মানসী কাগজটা দেখে চমকে ওঠেন তার স্বামী যে তাঁকে না জানিয়ে এতবড় সিদ্ধান্ত নেবেন তা ভাবতেও পারেননি। মানসী কাগজটা অজয়বাবুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেন, পড়ে দ্যাখো! তখনই বলেছিলাম ওর মতলব ভালো নয়! এই বনে এনে আমাদের চরম সর্বনাশই করতে চায়।
অজয়বাবু কাগজটা পড়ে চোখ বড় বড় করে বলেন, এটা পেলে কোথায়?
পটলা বলে-ওসব আবর্জনার মধ্যে পড়েছিল!
অজয়বাবু বলেন-না-না, এসব বাজে কথা! এসব কাজ কেন করতে যাবে ভূধর?

ভূধর আজ লোকজন নিয়ে বনে এসেছে। আজ রবিবার। বনে কাটাই হয় না। নির্জন বন। ভজনের লোকরা অবশ্য দিনের বেলায় শিকার কম করে। রাতের অন্ধকারেই তাদের সুবিধা বেশি। এরমধ্যে ভূধর দুটো গাছ কেটে ফেলেছে। লরিও এসে গেছে। এবার টুকরো করে লরিতে তোলার পালা। গাছগুলোকে বোঝাই করে আজই পাচার করতে হবে। লাখ টাকার মাল। হঠাৎ বনের মধ্যে স্তব্ধ তা ভেদ করে গাড়ির শব্দ শুনে চাইল ভূধর ও জানে আজ বনবাবুরা হাটেই থাকবে। এদিকে কেউ আসবে না। হঠাৎ গাড়ির আওয়াজে চমকে ওঠে। নিমেষের মধ্যে এরাও লরিতে মাল তুলে নিয়ে পালায়। সব মাল তোলাও হয়নি। বেগতিক দেখে ভূধরও জিপ নিয়ে কেটে পড়ে।
মিঃ মিত্র আজ খবরটা নিখিলবাবুর কাছ থেকে পেয়েছেন। ওই ম্যাপ-ডায়েরিতেই লেখা ছিল জায়গার কথা। মিঃ রায়ের কাছে খবর পেয়েছিলেন ভূধরবাবু বনে গেছেন। আর সেটা যাচাই করার জন্যই মিঃ মিত্র নিজে এসেছেন বনবাংলোতে। আর সেখানে ভূধরবাবুকে না দেখতে পেয়েই ফোর্স নিয়ে বনের ভিতর যান। কিন্তু গিয়ে দেখেন কাটা গাছটার গুড়িও পড়ে আছে আসামিরা ফেরার। মিত্র বলেন, ইস, হাত ফসকে বের হয়ে গেল ব্যাটারা। একটাকেও ধরা গেল না!
তবে ধরা না গেলেও যারা এসব করে এসেছে এতদিন বিনা বাধায়, তারাও এবার বুঝেছে যে তাদেরও এবার প্রবল বাধার সামনে পড়তে হবে।
ভূধর কোনোমতে সেদিন তার লোকজন নিয়ে পালিয়ে বেঁচেছে। অনেক টাকাই তার লোকসান হয়েছে। বনবিভাগ সব গাছই সিজ করেছে। ভূধরও ভাবছে কী করে বনবিভাগের লোক এসব খবর পেল। তাকে এবার অনা কাজটাও সারতে হবে।
আজ বেশ জ্বালাভরা মন নিয়েই ফিরেছে ভূধর বনবাংলোয়। এতদিন ধরে সে এই বনে তার দাপট চালিয়ে এসেছে লুঠতরাজ করেছে। আজ সে প্রথম বাধা পেল। বেশ বুঝেছে এই বাধা আরও বাড়বে। তাই তার ভবিষ্যতের ব্যবস্থাও তাকে করতে হবে।
ঘরে ঢুকে প্রথমে তেমন কিছু টের পায়নি ভূধর। সে তার কর্মপন্থা ঠিক করে ফেলেছে। রাতের খাওয়া-দাওয়ার পর বাংলো নিস্তব্ধতায় ঢেকে যায়। পটলা-হোঁৎকা আউট হাউসে এসে শোবার ব্যবস্থা করছে।
হঠাৎ বাংলো থেকে মানসীদেবী-অজয়বাবুর কণ্ঠস্বর ছাপিয়ে শোনা যায় ভূধরের কণ্ঠস্বর। ভূধর বলে, আমার কথা শুনতেই হবে
রাতে ভূধর সেই দানপত্রের আসল কপিটা এনে অজয়বাবুকে বলে, এটাতে সই করে দিন। অজয়বাবু চমকে ওঠেন। মানসীও দেখেছেন কাগজটা! বলেন, তা কী করে হবে?
তাই হবে! আমি যা বলছি তাই করুন। এতে সই না করলে এই বন থেকে বের হতেই পারবেন না! দুজনকে মেরে লাশ গভীর জঙ্গলে ফেলে দেব। কেউ জানতেও পারবে না!
ভূধর আজ তার আসল স্বরূপটা দেখায়। এরা বিপন্ন।
মানসীই বলেন, ঠিক আছে। তুমি ছাড়া আমাদের আর কেই-ই বা আছে! তোমাকেই সব লিখে দেব। আজ রাত হয়েছে, বুড়ো মানুষটাকে শান্তিতে ঘুমাতে দাও। কাল সকালেই সই করবেন।
ভূধর বলে-ঠিক দেবেন তো?
দেব। নিশ্চয়ই দেব।
ভূধর কী ভেবে বলে-ঠিক আছে, তাই হবে। তবে যা করার কালকেই করতে হবে।
চলে যায় ভূধর নিজের ঘরে। বাইরে থেকে সব শুনেছে পটলারা।

হোঁৎকা বলে, কেস তো জনডিস রে!
পটলা বলে-একটা কিছু করতেই হবে? ওই শয়তানকে উচিত শিক্ষাই দিতে হবে।
অজয়বাবুও এবার ভাবনায় পড়েছেন। ভাবছেন কী করা যায়। হঠাৎ আবছা অন্ধকারে কাকে আসতে দেখে চাইলেন মানসী। তারা-জ্বলা আলোয় পটলা-হোঁৎকাকে আসতে দেখে মানসী বলেন, তোমরা?
পটলা ইশারায় ওঁকে বারান্দায় নিয়ে গিয়ে বলে, আমরা সব শুনেছি মাসিমা! আপনারা কোনো চিন্তা করবেন না। আর একটু রাত হোক। তারপর যা করার করব! এই রাতেই বাংলো থেকে পালাতে হবে। আপনারা তৈরি থাকুন।

ভূধরের আজ সারাদিন খুব ধকল গেছে, তাই বিছানায় পড়তেই তার দু'চোখে ঘুম নামে। নাক ডাকতেও শুরু করে। পটলারা এবার ঘরের দরজায় বাইরে থেকে শিকল তুলে দিয়ে অজয়বাবুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ে বাংলো থেকে।
সেই রাতেই পটলারা অজয়বাবু আর মানসীদেবীকে নিয়ে আসে নিখিল রায়ের বাংলোতে। নিখিলবাবুর সঙ্গে পটলাদের আগেই কথা হয়েছিল। সেইমতো তিনি দরজা খুলে ওদের ভিতরে ডেকে নেন। দেখছেন নিখিলবাবু, অজয় মানসীদেবীকে।
মানসী বলেন-ওই ভূধরের দলবল ভালো নয়, ও যে এতবড় শয়তান তা ভাবিনি।
রাত বাড়ছে। পটলা বলে, আমাদের বাংলোয় ফিরতে হবে।
নিখিলবাবু বলেন-সাবধানে যাবে। আর ভূধরের উপর নজর রাখবে। এদিকে যা করার আমি করছি।
পটলা-হোঁৎকা রাতেই বাংলোর আউট হাউসে ফিরে আসে সকালে মিঃ মিত্র রায়বাবুর বাংলোয় এসে সব শুনে অবাক হন। রায়বাবু সেই ডায়েরি-কাগজপত্র মিত্রকে দেন। মিঃ মিত্র সব দেখে অবাক হয়ে বলেন, অনেক প্রমাণই হাতে পেয়েছি। ওরা যে এমনি ডেরা গেড়েছে তা জানতাম না। আমি এখুনি ফোর্স ডাকছি।
ভোরবেলাতেই মিঃ মিত্র ফোর্স নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।
ভূধরের আজ ঘুম ভাঙে একটু দেরিতেই চোখ খুলে আশপাশের পরিবেশটা বুঝতে পেরেই সে চমকে ওঠে। দেখে সে তার ঘরে নয়, ঘুমোচ্ছিল লক-আপের মধ্যেই। পাশে ভজনলাল আর তার দলের কিছু লোক। লাফ দিয়ে ওঠে ভূধর-একি আমি এখানে কেন?
এবার দেখা যায় মিঃ মিত্রকে। মিঃ মিত্র বলেন, আমরাই আপনাকে এখানে এনেছি ভূধরবাবু! আপনার দলবল সমেত। সব প্রমাণই আমাদের হাতে এসে গেছে। দিনের পর দিন যে চোরা কাটাই-পোচিং-এর কাজ করেছেন তার শাস্তি আপনাকে পেতেই হবে।
থানাতেই আনা হয়েছে মন্দির থেকে উদ্ধার করা হাতির দাঁত, বাঘের চামড়া, হরিণের শিং। যার বাজারদর কয়েক লাখ টাকা।
অজয়বাবুও এসব দেখে অবাক। তিনি ভাবতেই পারেননি যে তাঁর ভালোমানুষিক সুযোগ নিয়ে ভূধর এসব কাজ করত। তারও চরম সর্বনাশ করতে চেয়েছিল। তিনিও এবার নিশ্চিন্ত হন। ওরা ফিরে আসে বনবাংলোতে। আজ তিনি পটলা-হোঁৎকার প্রতি কৃতজ্ঞ।
আমি, গোবরা, ফটিক তখন বড়বিল স্টেশনে নেমেছি। পটলাদের এখানে থাকার কথা। কিন্তু তাদের পাত্তা নেই। আমরাও ভাবনায় পড়ি। এর মধ্যে পিসেমশাইও এসে গেছেন আমাদের নিতে। তিনি পটলা-হোঁৎকাকে না দেখতে পেয়ে বলেন, তোদের পঞ্চ পাণ্ডবের বাকি দুজন কইরে?
এবার আমি ভয়ে সমস্ত ঘটনা পিসেমশাইকে জানাই। পিসেমশাই সব শুনে চমকে ওঠেন, সেকি ওরা একসপ্তাহ আগেই থলকোবাদ বাংলোয়।
আমি বলি-আমরাও যাব।
আমরা পিসেমশাইকে নিয়ে বাংলোয় পৌঁছেছি। পটলা-হোঁৎকা তখন চঙ্গু-মঙ্গুর বেশে চা সার্ভ করছে। পিসেমশাই তখন ওদের দেখে চিৎকার করেন, কি রে, পটলা-হোঁৎকা, তোরা এখানে চা খাওয়াচ্ছিস! আর আমরা কত চিন্তা করছি
অজয়বাবু অবাক হয়ে বলেন-ওরা চক্ষু-মঙ্গু! আপনি ভুল করছেন!
এবার মানসীই সব কথা বলেন অজয়বাবুকে। অজয়বাবু এবং আমরাও অবাক হই সব শোনার পর। পটলা যে এরকম একটা কাণ্ড করতে পারে আমাদের ধারণাই ছিল না।
অজয়বাবু বলেন-তোমার যে এত বড় বাড়ির ছেলে তা লুকিয়ে ঠিক করোনি। অযথা তোমাদের দিয়ে বইয়-বেয়ারার কাজ করালাম।
হোঁৎকা বলে-কইয়া দিলে এমন অ্যাডভেঞ্চার আর হইত না!
আমরাও গর্বিত হই পটলার এরকম দুঃসাহসিক কাজে। সত্যিই বনভ্রমন ওদের সার্থক হয়েছে।
সেই রাতটা আমরাও বাংলোতে থেকে পরদিন ফিরে এলাম পিসেমশাই-এর বাড়িতে।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য