পান্তা বুড়ী - বাংলাদেশের লোককাহিনী

     পান্তা বুড়ী রোজ পাতিল ভরিয়া ভাত রাঁধে। তার কতকটা খায়, আর কতকটায় পানি ঢালিয়া পান্তা করিয়া রাখে। পানির ঠাণ্ডায় ভাত পচিয়া যায় না। রোজ সকালে উঠিয়া সে সেই পান্তা ভাত খায়। 
এর চোর টের পাইয়া রাত্রে বুড়ী ঘুমাইলে ঘরে ঢুকিয়া তাহার পান্তা খাইয়া যায়। বুড়ী সকালে উঠিয়া সোরগোল করে। চোরের চৌদ্দ পুরুষ ধরিয়া গাল দেয়। শুনিয়া চোর মনে মনে হাসে। রাতের বেলা বুড়ী ঘুমাইলেই সে আবার ঘরে ঢুকিয়া আগের মতোই তাহার পান্তা ভাত খাইয়া যায়। কাঁহাতক আর সহ্য করা যায়। 
     বুড়ী সকালে উঠিয়া রাজার বাড়ি চলিল নালিশ করিতে। যাইতে যাইতে বুড়ী দেখিতে পাইল পথের উপর একটি সিঙ্গীমাছ নড়িতেছে। সে বুড়ীকে বলিল, “বুড়ীমা, আমাকে পুকুরে ছাড়িয়া দিয়া যাও। এখানে থাকিলে আমি মরিব।” বুড়ীর বড়ই দয়া হইল। সে মাছটি উঠাইয়া পুকুরে ছাড়িয়া দিল। 
     তারপর হনহন করিয়া সে পথে যাইতে লাগিল। খানিক যাইয়া দেখিতে পাইল পথের মধ্যে একখানা ছুরি পড়িয়া আছে। ছুরিখানা বুড়ীকে বলিল, “বুড়ীমা, এই পথ দিয়া কত লোক যাইবে, অসাবধানে কেহ আমার উপর পা ফেলিলে পা কাটিয়া যাইবে। আমাকে ওই কাঁটা গাছের মধ্যে ফেলিয়া যাও।"
     বুড়ী ছুরিখানা হাতে লইয়া কাটাগাছের মধ্যে ফেলিয়া দিল । 
আরও খানিক যাইতে বুড়ী দেখিতে পাইল একটি গাই লতাপাতার মধ্যে জড়াইয়া আছে। গাইটি বলিল, “বুড়ীমা, আমি লতাপাতার মধ্যে জড়াইয়া আছি। আমাকে ছাড়াইয়া দাও।” 
     শুনিয়া বুড়ীর দয়া হইল ; সে দুই হাতে লতাপাতা ছিড়িয়া দিল। গাইটি খুশী হইয়া এদিকে ওদিকে ঘুরিয়া ঘাস খাইতে লাগিল। 
     আরও খানিক যাইতে পথের ধারের একটি বেলগাছ বুড়ীকে ডাকিয়া বলিল, “বুড়ীমা, একটু শুনিয়া যাও।” 
বুড়ী থামিয়া বলিল, “কি বলিবে বাছা! শিগগীর বল। আমি রাজার বাড়ি যাইব । রাজসভা ভাঙ্গিল বলিয়া। শিগগীর বল কি বলিবে।" 
     বেলগাছ বলিল, আমার চারিধারে এত আগাছা জন্মিয়াছে যে, আমি ভালো করিয়া দম্ লইতে পারিতেছি না। আর মাটির ভিতরে যা কিছু রস আছে, আগাছারা খাইয়া ফেলে। আমার জন্য কিছু থাকে না। দিনে দিনে আমি শুকাইয়া যাইতেছি।" 
     শুনিয়া বুড়ীর দয়া হইল। সে বহু কষ্টে বেলগাছের চারিধারের আগাছাগুলি টানিয়া উপড়াইয়া ফেলিল। বেলগাছ ভালো করিয়া নিঃশ্বাস লইয়া বুড়ীকে দোয়া করিতে লাগিল। সেখান হইতে বুড়ী আরও তাড়াতাড়ি পথ চলিতে লাগিল। 
     রাজসভা তখন ভাঙ্গে ভাঙ্গে। বুড়ী আগাইয়া যাইয়া বলিল, “এক বিচার চোর রাত্রে আসিয়া রোজ আমার পান্তাভাত খাইয়া যায়, তুমি ইহার বিচার কর ।" 
     রাজা বলিল, “তুমি যদি চোর ধরিয়া আনিতে পার, আমি তাহার বিচার করিতে পারি। কে তোমার পান্তাভাত খাইয়াছে না জানিয়া কাহার উপর বিচার করিব ?" 
     রাগিয়া-মাগিয়া বুড়ী বলিল, “তবে তুমি কেমন রাজা হে? চোর ধরিতে পার না ? তোমার আশীগণ্ডা পাহারাদার কি নাকে সর্ষের তেল দিয়া ঘুমায়? তাহারা থাকিতে আমার বাড়িতে কেমন করিয়া চোর ঢোকে?"
     রাজাকে গাল পাড়িতে পাড়িতে বুড়ী বাড়ি চলিল। বেলগাছের কাছে আসিলে,  বেলগাছ জিজ্ঞাসা করিল, “বুড়ীমা ! বড় যে বেজার হইয়া ফিরিয়া চলিয়াছ, খবর কি ?"
    বুড়ি উত্তর করিল,“এক চোর আসিয়া রোজ আমার পান্তাভাত খাইয়া যায়। রাজার কাছে গিয়াছিলাম বিচার চাহিতে । রাজা বিচার করিল না ।"
     বেলগাছ বলিল, “আমার একটি বেল লইয়া যাও, রাত্রে চুলার মধ্যে পোড়া দিয়া রাখিও।" একটি বেল ঝোলার মধ্যে পুরিয়া হনহন করিয়া বুড়ী পথ চলিতে লাগিল। 
     খানিক যাইতে গাই জিজ্ঞাসা করিল, “বুড়ীমা, বড় যে বেজার হইয়া চলিয়াছ!" 
    বুড়ি বলিল,  “এক চোর আসিয়া রোজ আমার পান্তাভাত খাইয়া যায়। রাজার কাছে গিয়াছিলাম বিচার চাহিতে । রাজা বিচার করিল না ।"এ কাছে এর বিচার চাহিয়াছিলাম। রাজা বিচার করিল না।" 
     গাই বলিল, “আমার একনাদা গোবর লইয়া যাও। তোমার দরজার সামনে রাখিয়া দিও।" 
     কলাপাতায় করিয়া একনাদা গোবর লইয়া বুড়ী আবার পথ চলিতে লাগিল । 
     খানিক যাইতে ঝোপের ভিতর হইতে ছুরি জিজ্ঞাসা করিল, “বুড়ীমা, তোমার মুখখানি যে বড় বেজার বেজার ?" 
     বুড়ী বলিল, “এক চোর আসিয়া রোজ রাতে আমার পান্তাভাত খাইয়া যায়। রাজার কাছে গিয়াছিলাম বিচার চাহিতে । রাজা বিচার করিল না। 
     ছুরি বলিল, “বুড়ীমা! আমাকে লইয়া যাও। গোবর গাদার মধ্যে আমাকে লুকাইয়া রাখিও।" 
     বুড়ী ছুরিখানা ঝোলার মধ্যে লইয়া আবার পথ চলিতে লাগিল। 
     আরোও খানিক যাইতে পুকুরের ভিতর হইকে সিঙ্গীমাছ বলিল, “বুড়ীমা মুখখানা যে বেজার বেজার ?" 
     বুড়ী তাহাকে সব কিছু খুলিয়া কহিল। 
     সিঙ্গীমাছ বলিল, “বুড়ীমা! আমাকে লইয়া যাও। আমাকে তোমার পান্তাভাতের হাঁড়িতে রাখিয়া দিও।" 
     বুড়ী সিঙ্গমাছটি তাহার ঝোলার মধ্যে পুরিয়া লইল। দুপুরের বেলা তখন গড়াইয়া পড়িয়াছে। এত পথ চলিয়া ক্ষুধায়      বুড়ীর পেটে আগুন জ্বলিতেছে। সে আরও জোরে জোরে পথ চলিতে লাগিল।
     বাড়ি আসিয়া বুড়ী এক পাতিল ভাত রাধিয়া কতক খাইল আর কতক সেই হাড়ির মধ্যে রাখিয়া পানি ঢালিয়া পান্তাভাত করিল। পানি সমেত সেই পান্তাভাতের মধ্যে সিঙ্গীমাছটিকে ছাড়িয়া দিল। তারপর দরজার সামনে গোবর নাদা রাখিয়া তাহার ভিতরে ছুরিখানা লুকাইয়া রখিল । বেলটি আখার মধ্যে পোড়া দিয়া কাঁথা-কাপড় মুড়ি দিয়া বুড়ী নাক ডাকাইয়া ঘুমাইতে লাগিল।
     এদিকে রাত্রে চোর আসিয়া যেই পান্তাভাতের হাড়িতে হাত দিয়াছে, অমনি সিঙ্গীমাছ তাহার হাতে কাটা ফুটাইয়াছে। ব্যথার জ্বালায় চোর লাফ দিয়া পালাইবে আর গোবর নাদায় পা পিছলাইয়া পড়িয়া গিয়াছে। গোবর নাদায় পড়িয়া যাইতেই ছুরিতে লাগিয়া পা কাটিয়া গেল! পায়ের আঘাতে গোবর ছিটিয়া চোখে মুখে আসিয়া লাগিল। চোর সামনে পুকুরে হাত পা ধুইয়া ভাবিল, বুড়ীর আখার উপর যাইয়া হাত-পা গরম করিয়া লই। যেই সে আখার উপর হাতপা গরম করিতে গিয়াছে, অমনি বেলটি ফাটিয়া চোরের চোখে-মুখে লাগিয়া ফোস্কা করিয়া দিয়াছে।
     বেল ফাটার শব্দ পাইয়া বুড়ী “কে রে! কে রে!” করিয়া জাগিয়া উঠিল। চোর তখন দে দৌড়।
     সেই হইতে চোর আর বুড়ীর ত্রিসীমানায় আসে না। মজা করিয়া বুড়ী পান্তাভাত খায় আর সারাদিন বসিয়া ছেড়া কাঁথায় জোড়াতালি দেয়।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য