বার্বেলিয়া -- সুচিত্রা ভট্টাচার্য

সকাল সকাল বাজার সেরে দিয়েই কাগজ-কলম নিয়ে বসে পড়েছিল অবনী। কাল রাত থেকে একটা কবিতার লাইন ফরফর উড়ছে মাথায়, এক্ষুনি কায়দা করে বেঁধে ফেলতে হবে। এক্ষুনি। তা কবিতা বাঁধা কি সহজ কাজ! দাদার টাই বাঁধার চেয়েও কঠিন। দুটো লাইন যাও বা ধরা দেয়, তৃতীয় লাইন পিছলে পিছলে যায়। কলম চিবোতে চিবোতে অবনীর দাঁত ব্যথা হওয়ার জোগাড়! এ
মন সময় রিনির আবির্ভাব, কাকামণি, তোমার সঙ্গে দুজন দেখা করতে এসেছেন। 
‘কে রে?” চিনি না। তোমার কোনও কবি-বন্ধুটন্ধু হবেন বোধ হয়।’ 

নির্ঘাত তপেশ আর দীপাঞ্জন। পরশু কফিহাউসে তার ঠিকানা নিয়েছিল, আজই হানা দিয়েছে তার কবিতার পিন্ডি চটকাতে। অবনী সেদিন চারখানা কবিতা শুনিয়েছিল, আজ নিশ্চয়ই আটখানা শুনতে হবে। তপস্যার সময়ে এ ব্যাঘাত
ভালো লাগে!
দাঁত কিড়মিড় করতে করতে ড্রয়িংরুমে এল অবনী। এসেই অবাক। দুটাে সম্পূর্ণ অচেনা ছেলে, অবনীরই সময়বয়সি প্রায়, ঘরের মধ্যিখানে সানগ্লাস পরে দাঁড়িয়ে। অন্ধ নাকি! হাতে লাঠি নেই তো!
অবনী গলাখাকারি দিয়ে বলল, বলুন।
দুজনে একসঙ্গে সানগ্লাস খুলল। অনেকটা তলোয়ার খোলার মতো করে। কোরাসে বলল, “আমরা এসেছি।”
কে রে বাবা। গুপ্তঘাতক নাকি। কবিদের অনেক চোরাশক্র থাকে। তরুণ কবিদের তো আরও বেশি। বিশেষত যাদের অবনীর মতো বাজারে সবেমাত্র দুটো বই বেরিয়েছে। আজকাল চারদিকে কোটি কোটি কবি, যাদের কবিতার বই বেরোয়নি তারাই হিংসেয় জুলেপুরে মরে। এইজন্যই কি তপেশরা তার ঠিকানা নিয়েছিল!
অবনী একটু ভিতু গলায় বলল, ‘কোথেকে এসেছেন? কেন এসেছেন ??
‘বাঁটুলপুর। অপেক্ষাকৃত লম্বা-চওড়া ছেলেটি বুক ফুলিয়ে দাঁড়াল। সানগ্লাস নাচাতে নাচাতে বলল, আমরা আপনাকে সেখানে নিয়ে যেতে চাই।’
‘কেন ??
আপনাকে সংবর্ধনা দেব।’
‘কী দেবেন?” নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না অবনী। 
রোগা ছেলেটি বলল, সংবর্ধনা। মানে মালা, মানপত্র, আরও অনেক কিছু।” 
অবনী ধপ করে সোফায় বসে পড়ল। এ ধরনের সংবাদকে কী বলে! বিনা মেঘে বজ্রপাত ! না, না, বোধ হয় বিনা মেঘে রামধনু। ছেলে দুটো অন্য কোনও বিখ্যাত লেখক-কবির সঙ্গে তাকে গুলিয়ে ফেলেনি তো! 
ক্রমে ব্যাপারটা খোলসা হল। দুই আগন্তুক নামতা পড়ার মতো করে জানাল সব। উত্তর চব্বিশ পরগনার বাঁটুলপুরের সেভেন বুলেটস ক্লাব প্রতি বছর তরুণ প্রতিভাদের সংবর্ধনা দেয়। এ বছর তারা অবনীকে বেছেছে। আগামী রবিবার বিকেলে অনুষ্ঠান, সকাল দশটার মধ্যেই তারা নিতে আসবে অবনীকে, দুপুরে তাদের ওখানেই নাকি ঢালাও খাওয়াদাওয়ার আয়োজন। 
অবনী যেন ফুরফুর করে হাওয়ায় উড়ছিল। খুশির ঝোঁকে ভেতরে গিয়ে বউদিকে তিন কাপ চা পাঠাতে বলে এল। তারপর গ্রাম্ভারি মুখে সোফায় হেলান দিয়ে বসে বলল, তা আমি যাচ্ছি কীভাবে ? 
রোগা ছেলেটি বলে উঠল, “সেটা তো আমাদের ভাবনা। ঠিক দশটায় আপনার দরজায় গাড়ি লেগে যাবে।’

সকালে আজ কার মুখ দেখে উঠেছে অবনী! রিনির? ভাইঝিকে আজই আইসক্রিম খাওয়াতে হবে। দাদা-বউদি খুব ঠাট্টা করেন অবনীকে নয়ে, ‘কপিবর’ বলে খ্যাপান, তাঁরা এখন দেখুন অবনী মোটেই ফ্যালনা নয়। আজ দরজায় গাড়ি আসছে, কাল গেটে এরোপ্লেন দাঁড়িয়ে থাকবে। সাঁ প্যারিস। সাঁ লন্ডন। সাঁ নিউ ইয়র্ক। নোবেল প্রাইজটা যেন কোথায় দেয় ? স্টকহলম না?
ছেলে দুটো চলে যাওয়ার পর সত্যিই কদিন যেন আকাশে বিচরণ করল অবনী, মাটিতে আর পা পড়ে না। ছাব্বিশ ইঞ্চি বুকের ছাতি একত্রিশ ইঞ্চি হয়ে গেছে, বন্ধুদের আসরে তুবড়ি ছোটাচ্ছে, দাদা-বউদি পর্যন্ত অবনীর অহঙ্কারের দাপটে গুটিয়ে কেঁচো। বউদি তো বলেই ফেললেন, “তোমাকে আমরা চিনতে পারিনি অবনী।’ দাদা বললেন, ‘ওর প্রতিভা থাকবে না! কার ভাই দেখতে হবে তো। রিনি তো আগাগোড়াই উত্তেজনায় ফুটছে। যেন তার কাকামণি নয়, তাকেই সংবর্ধনা দিচ্ছে বঁটুলপুর।
রবিবার এসে গেল। কাকভোরে ঘুম থেকে উঠে দাদার ইলেকট্রিক শেভারে দাড়ি কামিয়ে নিল অবনী, বউদির কাঁচি দিয়ে গোঁফ ছাঁটল নিখুঁত করে। আজকাল আর উশকো-খুশকো কবিদের যুগ নেই, এমনভাবে সাজতে হবে যাতে কবি কবিও দেখায়, আবার চেহারায় একটা চেকনাইও থাকে। ঝাড়া

পয়তাল্লিশ মিনিট শ্যাম্পু সাবান মেখে শাওয়ারের নীচে দাড়িয়ে রইল অবনী। কতবার যে চুলে চিরুনি চালাল। চুল ফোলা ফোলা থাকবে, অথচ উড়বে না, এমন করে সেট করা কি মুখের কথা! শেষে ব্যাকব্রাশটাই পছন্দ হল। নিজেকে কেমন অচেনা অচেনা লাগছে। তা লাগুক, জীবনের একটা স্মরণীয় দিন বলে কথা। ধোপভাঙা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে, কাঁধে শান্তিনিকেতনি ঝোলা ব্যাগটি নিয়ে, বউদির পারফিউম গায়ে ছড়িয়ে অবনী যখন পূর্ণ সাজে প্রস্তুত, তখন ঘড়িতে ঠিক দশটা বাজতে পাঁচ । 
গাড়ি এল দশটা দশে। পনেরোটা মিনিট যে কী টেনশানে কেটেছে অবনীর! গাড়ি দেখে যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। যাক, সেদিন তা হলে সে দিবাস্বপ্ন দেখেনি! সত্যিই চলেছে বাঁটুলপুর! অন্য দুটো ছেলে এসেছে আজ। দুজনেরই বেশ হৃষ্টপুষ্ট চেহারা। একজনের পোশাক দারুণ রংচঙে, অন্যজনের কোমরে ইয়া চওড়া বেল্ট। গাড়িটার চেহারাও মন্দ নয়। একটু পুরোনো মডেলের বটে, সিটও কেমন এবড়োখেবড়ো, স্টার্ট নিতে গিয়ে বালিগঞ্জ ছাড়িয়ে ইস্টার্ন বাইপাসে পড়তেই ঝাঁকি দিয়ে পক্ষিরাজ হয়ে গেল গাড়িখানা। 

ছুটছে গাড়ি। দুই হৃষ্টপুষ্টের মাঝখানে বসেছে অবনী। একটু কুঁকড়ে মুকড়ে। ড্রাইভারের পাশের সিট খালি। অবনী ভাবল বলে, একজন সামনে গিয়ে বসুন না। কেমন বাধো বাধো ঠেকল। হয়তো সংবর্ধনা দিতে গেলে এভাবেই নিয়ে যেতে হয়।
চুপচাপ না থেকে কথা শুরু করল অবনী, এতটা পথ আমরা একসঙ্গে যাব, আমাদের মধ্যে তো আলাপ-পরিচয় হওয়া উচিত। বলেই ডান পাশে ফিরল, আপনার নামটা কী ভাই ?
চওড়া বেল্ট তরতর জবাব দিল, “আমাদের আসল নাম বাতিল হয়ে গেছে। আমরা ক্লাবের নামে পরিচয় দিই। আমি গুলি। আর ও হল গিয়ে ছররা।
‘কেমনধারা নাম?”
বা রে, আমরা সেভেন বুলেটুস ক্লাবের ছেলে না! আগের দিন এসেছিল টোটা আর কার্তুজ। আরও তিনজন আছে। শেল, গোলা আর তোপ |’
‘বাহ, বেশ মজার ব্যাপার তো!’
‘এটা আপনার মজা মনে হল? আমাদের ক্লাবের উদ্দেশ্য জানেন? শিল্প, সাহিত্য, গান, বাজনা, অভিনয়, খেলাধুলো, সমাজসেবা—সাতটা দিকে বুলেটের মতো আমরা ছুটে যেতে চাই। আমাদের ক্লাবের প্রেসিডেন্ট শস্ত্রপাণি সেন, আর সেক্রেটারি ধনুর্ধারী ধর আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে  তরুণ প্রতিভাকে সম্মান জানিয়ে আমরা সমাজের উন্নতি করতে পারি।’ 
নামগুলো একটু বেশি বিপজ্জনক কী! চম্বলের ডাকাতদের কোনও ব্রাঞ্চ নয় তো এরা! হলেই বা কী। অবনীর মতো এক ক্ষীণজীবি কবিকে নিয়ে কী আর করবে! ঝোলা থেকে একটা লবঙ্গ বের করে অবনী মুখে পুরল। বউদি দিয়ে দিয়েছেন। যদি বক্তৃতা দিতে হয়, লবঙ্গ খেয়ে গলা গরম হবে। 
একটা প্রশ্ন ক'দিন ধরেই মনে ঘুরছে। প্রশ্নটা করেই ফেলল অবনী, আচ্ছা, ভাই, চার দিকে এত কবি থাকতে আমাকেই আপনারা তরুণ প্রতিভা হিসেবে শনাক্ত করলেন কীভাবে? 
‘কেন, আপনাকে টোটা-কার্তুজরা বলেনি?’ 
না তো।” 
‘সিম্পল মেথড। বইয়ের ক্যাটালগ দেখে আপনাকে পছন্দ করেছি।’ 
‘মানে ?”
 বইমেলার সব স্টল থেকে বইয়ের ক্যাটালগ এনেছিলেন, ওগুলো ঘাটতে ঘাটতেই আপনার নামটা মনে ধরে গেল।’ অবনীর গলায় লবঙ্গ আটকে গেল। কাশতে কাশতে বলল, ঠিক বুঝলাম না। নামে কী আছে?

নামেই তো সব। এমন লোককে আমরা ডাকতে চাই যাতে গোটা বাঁটুলপুর বলে, হ্যাঁ, লোকটার নাম আছে বটে। ছররার গলা দিয়ে উত্তর ছিটকোচ্ছে, আগেরবার রঘু দে বলে এক গল্পলেখককে সংবর্ধনা দিয়েছিলাম, সবাই নাক সিটকেছিল। এবার সব্বার মুখ সেলাই হয়ে যাবে। কোথায় রঘু দে, কোথায় অবনীন্দ্রনাথ বাগচী!’
অনেকটা নিভে গেল অবনী, তবে পুরোটা নয়। মনে মনে ভাগলপুরবাসী বাবা-মাকে প্রণাম জানাতে ভুলল না। নাম তারা একটা রেখেছিলেন বটে! এমন ওজনদার নাম এখন ক'জনের থাকে! কলেজের বন্ধুরা খুব টিটকিরি মেরে বলত, অবনীন্দ্রনাথ নাম নিয়ে তুই ছেলেবেলায় কী করে হামা টানতিস রে! মুখ থুবড়ে পড়ে যেতিস না! তা যাই হোক, সেই নামের জোরেই না... !
অবনী ফের প্রশ্ন ছুড়ল, আমি যে তরুণ তা আপনারা জানলেন কী করে? সত্তর বছরের বুড়োও তো হতে পারতাম! ঠিকানাই বা পেলেন কোথেকে?
হা হা হা হা। গুলি হাসিতে দশ দিক ঝাঁঝরা করে দিল, “সেভেন বুলেটুস সব খবর জোগাড় করে নেয়। বাঁটুলপুর থেকে মাত্র দশ মাইল দূরে একজনকে পাওয়া গেছে যিনি কবিতাও পড়েন। তিনিই আপনার বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। ঠিকানাও।”
অবনী আর-একটু নিভল। বুকের ছাতি আবার কমে কমে ছাব্বিশ। ঘাড় ঝুলিয়ে বসে আছে। বাঁটুলপুরে কবিতার জনপ্রিয়তা দেখে সে রীতিমতো চিন্তিত। যাকগে, দাদা-বউদি, রিনি কিংবা বন্ধুরা তো এ সব জানছে না, তারা দেখবে ফলক মানপত্র মেডেল এইসব। ঢোক গিলে অবনী জিগ্যেস করল, ‘আজ কী হবে ওখানে ? 
‘মুরগি।’ ছররা ঝটিতি জবাব দিল। 
অবনীর মুখ থেকে লবঙ্গটা ঠিকরে বেরিয়ে গেল। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মুরগি হবে এ কেমন কথা? তাকে কি মুরগি হতে হবে? স্কুলে অঙ্কের ক্লাসে শীতল-সার বাজখাই গলায় হাক পাড়তেন, অবনী, তুই গুণটাও পারিসনি। মুরগি হ। অমনি সুড়ুত করে হাইবেঞ্চের নীচে মাথা গলিয়ে দিত অবনী। তবে সেখানে শুধু ক্লাসের বন্ধুরা থাকত। আজ যদি রাশি রাশি অপরিচিত জনতার সামনে...! 
ম্ৰিয়মাণ গলায় অবনী বলল, মুরগি হওয়াটা কি খুব জরুরি? ছররা সন্দিগ্ধ চোখে তাকাল, মুরগিতে আপনার আপত্তি আছে? তা হলে তো পাঠার কথা ভাবতে হয়। ওখানে একরকম ঠিক হয়ে আছে...’
অবনীর হাত ঘামতে শুরু করল। পাঠা হওয়া আবার কীরকম রে বাবা ? চার পায়ে হাঁটতে হবে? ম্যাম্যা ডাকতে হবে? স্টেজে সেটা খুব দৃষ্টিকটু দেখাবে না? এত সুন্দর করে পাজামা কেচে মাড় দিয়ে ইস্ত্রি করে দিয়েছেন বউদি, হাঁটুর কাছটা নোংরা হয়ে যাবে! জিনস পরে এলেই হত! 
গুলি মাথা চুলকোচ্ছে, ‘প্রবলেমে ফেলে দিলেন দাদা। আমাদের ওখানে পাঠা রোজ কাটা হয় না, তাই মুরগির ব্যবস্থাই করেছিলাম। যাক, আপনি অতিথি মানুষ...’ 
"ও, আপনারা খাওয়ার কথা বলছেন! অবনী একটা দুমণি হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। তড়িঘড়ি বলে উঠল, 'না, না, পাঠা আবার কেন? মুরগিই আমার বেশ চলে।’ 
‘বাঁচালেন। আর কী মেনু শুনবেন? 
“শোনাই যাক। অবনী নড়েচড়ে বসল। 
রুই মাছের পয়োধি, কই মাছের গঙ্গা যমুনা, বিরহীর রসগোল্লা, রানাঘাটের ল্যাংচা...’ 
সহসা খাদ্যতালিকার সঙ্গে তাল রেখে চকাম চকাম শব্দ শুরু করেছে গাড়িটা। যেন খুশিতে লাফাচ্ছে। বাইপাস ছাড়িয়ে ভি আই পি-তে পড়ে গেছে বহুক্ষণ, দমদম প্রায় এসে গেল। অবনী সিটে মাথা রাখল, বাঁটুলপুর আর কতক্ষণ ভাই? 
‘এই তো এসে গেলাম। ছোকরা ড্রাইভার ঘাড় ঘোরাল, সামনে মধ্যমগ্রাম, তারপর বারাসাত, তারপর আরও আধঘণ্টাটাক গেলে গাদামারা হাট, সেখান থেকে ডাইনে বিশ মিনিট গেলেই বাঁটুলপুর।

মোট কতক্ষণ লাগবে মগজে ঢুকল না অবনীর, তবু বুঝদারের মতো মাথা নাড়ল। যে প্রশ্নটা বেলাইনে চলে গেছে, তাতেই ফিরল আবার। বলল, আপনাদের অনুষ্ঠানে আজ কী কী হচ্ছে?’ 
যা যা হয়। প্রথমে উদ্বোধনী সংগীত, তারপর আপনাদের বরণ...” 
‘আমাদের মানে ? আমি ছাড়া আরও কেউ আছেন নাকি?’ 
‘একজনকে দিলে কি পড়তায় পোষায়! গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস করছে এমন ভঙ্গিতে গুলি বলল, আপনি ছাড়া আছে দীপালি ভট্টাচার্য।’ 
‘কোনও তরুণ মহিলা কবি নাকি! নামটা তো একদম না-শোনা! অবনী কৌতুহলী হল, ক’দিন ধরে কবিতা লিখছেন ভদ্রমহিলা?” 
ছররা চোখ বেঁকিয়ে তাকাল, মহিলা কেন হবেন? উনি পুরুষ। দীপালিবাবু একজন নবীন বডি বিল্ডার। মিস্টার বেঙ্গল প্রতিযোগিতায় উনি এবার দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছেন। পুরো নাম দীপালিবরণ ভট্টাচার্য।’ উত্তরের ধাক্কাটা এবার অবনীকে সামলাতে হল না, গাড়িটাই তিড়িং-বিড়িং লাফাতে শুরু করেছে। যেন কেউ কাতুকুতু দিচ্ছে পক্ষিরাজকে। বিশ-পঞ্চাশ গজ এগিয়ে প্রকাণ্ড এক অট্ট লাফ ছাড়ল, তারপরেই নীরব। নিথর।

গুলি আর ছররা যেন প্রস্তুতই ছিল। দরজা খুলে ছিটকে নেমে গেছে। অবনী কিছু বোঝার আগেই ঠেলতে শুরু করেছে গাড়ি। দু-পা, সাত পা, বিশ পা, চল্লিশ পা। গাড়ির ইঞ্জিন কিছুতেই আর শব্দ করে না। ড্রাইভার দু-পায়ে প্রাণপণে ক্লাচ অ্যাক্সিলেটার চেপে চলেছে, তবু কোনও সাড়া নেই। 
অবনী শঙ্কিত স্বরে বলল, ‘গাড়ি কি স্টার্ট হবে না?’ 
`হতে পারে। ড্রাইভারের চোখ সামনের কাচে স্থির, আর একটু জোর লাগানো দরকার।’ বলা উচিত নয় জেনেও বলে ফেলল অবনী, ‘আমি ঠেললে কি কাজ হবে? 
আপনি!’ ড্রাইভার ঘাড় ঘুরিয়ে অবনীর একচল্লিশ কেজির চেহারাটাকে অবজ্ঞাভরে জরিপ করল, “দেখুন চেষ্টা করে।’ 

কিমাশ্চর্যম! অবনী হাত ছোয়াতেই গাড়ি গর্জন করে উঠেছে। সঙ্গে সঙ্গে গুলি আর ছররা তীরবেগে উঠে গেছে গাড়িতে। অবনীর পাঞ্জাবিতে একরাশ কালো ধোয়া ছড়িয়ে দিয়ে নিমেষে হুশ করে গাড়ি বেরিয়ে গেল। অবনী পাগলের মতো চেচাচ্ছে, রোককে রক্‌কে। গাড়ি আর থামে না। হাঁচোড়পাচোড় করে ছুটছে অবনী, গাড়ি থামেই না। হাত-পাঁচেক পিছিয়ে এল। গুলি আর ছররা গাড়ি থেকে নেমে একযোগে ডাকছে, আসুন দাদা, আসুন দাদা।’ 
প্রায় টলতে টলতে দৌড়চ্ছে অবনী। গাড়ির কাছে পৌঁছে নেতিয়ে পড়ল। ধরাধরি করে তাকে গাড়িতে তুলেছে গুলি আর ছররা। সিটে বসে জিভ বেরিয়ে গেল অবনীর। কোনওরকমে বলল, ‘একটু জল!”

বাঁটুলপুর পৌছোতে দেড়টা বেজে গেল। বীরনগর থেকে দীপালিবরণ এসে গেছে অনেকক্ষণ, অবনীর জন্যই অপেক্ষা করছিল সবাই। অবনী গাড়ি থেকে নামতেই সোজা ব্ৰজধ্বজবাবুর বাড়ি নিয়ে যাওয়া হল তাকে, সেখানেই আজ দুপুরে থাকাখাওয়ার আয়োজন।
পাত পাতাই ছিল, ভোজন শুরু হল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। এলাহি বন্দোবস্ত। প্রতিটি আইটেমই অতি সুস্বাদু, কোনটা ছেড়ে কোনটা যে খায় অবনী! পথের ধকলে খিদেও পেয়েছে জব্বর, যেন বিশটা ছুঁচো ডন মারছে পেনে, বিনা বাক্যব্যয়ে খেয়ে চলেছে অবনী। ব্রজধ্বজবাবু নিজে দাঁড়িয়ে খাওয়ার তদারকি করছেন, শস্ত্রপাণি আর ধনুর্ধারীবাবু নির্দেশ দিচ্ছেন, সাত বুলেট ক্ষিপ্ৰ গতিতে পরিবেশন করছে। দীপালি বেশ সাত্ত্বিক ধরনের ছেলে, পরিমিত আহার পছন্দ করে, কোনও মাছ, কোনও মিষ্টি সে এক ডজনের বেশি খায় না। মাংসও একেবারে মেপেজুপে এক কেজি। সেও আজ উপরোধে পড়ে দেড়া খেয়ে ফেলল, অবনী তো খাবেই। নাঃ, বাঁটুলপুর গুণীর সমাদর করতে জানে! 

খাওয়াদাওয়ার পর একটু ভয় ভয় করছিল অবনীর। পেটের মধ্যে যেন কী হয় কী হয় ভাব। ব্যাগ ঘেটে একটা হজমের বড়ি খুঁজল অবনী। নেই। তাড়াহুড়োয় নিতে ভুলে গেছে। মনের জোর আনতে দীপালির সঙ্গে আলাপ জমানোর চেষ্টা করল অবনী। তাদের জন্য একতলার একটা ঘর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, পরিপাটি করে পাতা রয়েছে বিছানা। দুই অতিথি খাওয়াদাওয়ার পর খানিক জিরোবে গড়াবে। সেখানেই শুরু হল পরিচয়ের পালা। অবনী খাটে আধশোয়া হয়ে জিগ্যেস করল, আপনি কবে থেকে দেহচর্চা শুরু করেছেন?’ 
পাঁচ ফুট দুইঞ্চি হাইটের চওড়া কাঁধ, কোমর সরু দীপালি শবাসনে ছিল। সিলিংয়ের দিকে চোখ রেখেই মিহিগলায় বলল, বারো বছর বয়স থেকে। 
আপনার কাব্যচর্চা কবে থেকে শুরু ?’ ‘আমারও বারো বছর বয়স থেকে। আমি যখন সেভেনে পড়ি তখন প্রথম কবিতা লিখেছিলাম। 
‘বাহ, বাহ, আমাদের দুজনের তো খুব মিল! কবিতা গঠন আর দেহ গঠন দুটোই তো শিল্প, কী বলেন? 
‘তা বটে, তা বটে।’ 
দীপালি জুলজুল তাকাল, আমিও মাঝে মাঝে কবিতা লিখি। শুনবেন একটা ?” 
“শোনান। অবনীর বেশ মজা লাগল। জীবনে অনেক কবির মুখ থেকে কবিতা শুনতে হয়েছে, বডি বিল্ডারের স্বরচিত কবিতা শোনার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। 
দীপালিও ভারী উৎসাহ পেয়েছে। দু-পা জোড়া করে সোজা ওপরে তুলে দিল, পরক্ষণেই স্প্রিং-দেওয়া পুতুলের মতো ঝাং করে উঠে বসেছে। গম্ভীর স্বরে বলল, ‘একটু আধুনিক কিন্তু। 
অবনী টান টান হল, আমিও আধুনিক। শুরু করুন।’ 
পলকের জন্য চোখ বুজল দীপালি। চ্যাপটা চিনাম্যানের মতো মুখখানা একটু তেবড়ে গেল ভাবে। চোখ বুজেই গড়গড় করে বলতে লাগলঃ

‘আহা কী জোছনাময়ী রাতি,
আকাশে উড়িছে একঝাঁক হাতি। 
হলুদ বন, সবুজ বাঘ 
ঘাস খাচ্ছে। খাক, খাক। 
পরে চুপকি দিয়ে ছুপে নিলেই চলবে।’ 

পটাং করে চোখ খুলল দীপালি, “কেমন লাগল ?’ 
কদমছাঁট দীপালিবরণকে সত্যি বলার সাহস পেল না অবনী। জিভ তালুতে ঠেকিয়ে বলল, মন্দ কী।’ 
দীপালি পূরক করার ভঙ্গিতে শ্বাস টানল। মাথা দোলাতে দোলাতে বলল, "এ তো হল বন্য প্রাণী নিয়ে। গৃহপালিত জীব নিয়েও আমার একখানা আছে।’ বলেই শুরু করেছেঃ 

‘বিড়ালের দাঁতে কুকুরের বিষ,
রুপোলি ময়না করে হিসহিস । 
জালায় গোরু, খোঁটায় মাছ 
সবাই তোরা সুখে বাঁচ। 
আমি আসি, তারপর তোদের হচ্ছে।” 

দীপালি খোঁচা মারল অবনীর পেটে, কী, এটা কেমন?’ 
অবনী নয়, অবনীর পেটের ভেতরে মুরগিটা ককিয়ে উঠল, ‘ভালোই তো। মন্দ কী।’ 
‘আমার সব পাঁচ লাইনের। শরীর নিয়ে ব্যস্ত থাকি তো, তাই বিশেষ সময় পাই না। তবে আরও আছে আমার। পরিবেশের ওপর। একটা চারতলা বাড়ির ওপর। যোগব্যায়ামের ওপর। বলতে বলতে হাত মুঠো করে লম্বা বাড়িয়ে দিল দীপালি, কাঁধ থেকে মুঠো দোলাচ্ছে সাপের মতো, আমার কথা তো অনেক হল, আপনার কথা বলুন। শরীর চর্চাটর্চা করা হয়?’ 

অবণী ভরসা করে বলতে পারল না, কলেজে পড়ার সময়ে একবার যোগব্যায়ামের সাধ জেগেছিল প্ৰাণে। পদ্মাসন দিয়ে গোড়াপত্তন করেই বিপত্তি। প্যাংলা প্যাংলা দু-পা এমন সেটে গেল, যেন দরজায় খিল পড়ে গেছে। দাদা-বউদি দুজনে মিলে চিমটি কেটে কেটে পা ছাড়ালেন।

অবনী হাসি হাসি মুখে বলল, আমিই বা সময় পাই কোথায়! সাহিত্যের সাধনাতেই আমার গোটা দিনটা কেটে যায়।’ হুম। তবে শরীরচর্চাটাও একটু করলে পারতেন। দীপালি ঘাড় নাড়ল, যাকগে, যাক। আপনি তা হলে আমার আরও কয়েকটা কবিতাই শুনুন। অবনী মনে-মনে আঁতকে উঠল। মিউ মিউ করে বলল, ‘একটু গড়িয়ে নিলে হয় না? বিকেলে অত বড় একটা অনুষ্ঠান আছে...’
আপনি গড়ান, আমি একটু জায়গাটা চক্কর দিয়ে আসি। দুপুরের খাওয়াটা আমায় পাঁচটার মধ্যে হজম করতে হবে।’ দীপালি বেরিয়ে যেতেই শরীর ছেড়ে এল অবনীর। দু-মিনিটেই নাক ডাকতে শুরু করেছে। ফররর, ফররর। ঘুম ভাঙল একটা চাপা ক্যালব্যাল শব্দে। চোখ খুলতেই অবনী দেখল একপাল বাচ্চা খালি গায়ে ভিড় করেছে জানলায়, লোহার শিকে হুমড়ি খেয়ে দেখছে তাকে। 
একটা বাচ্চা চিৎকার করে উঠল, অ্যাই তাকিয়েছে, তাকিয়েছে।’ 
অবনী ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। 
সঙ্গে সঙ্গে আর-একটা বাচ্চা চেঁচিয়ে উঠেছে, ‘অ্যাই নড়েছে, নড়েছে।’ 
একজন বলল, ওটা কবি?’ 
আর একজন বলল, না রে, ওটা মিস্টার বেঙ্গল। সমবেত কণ্ঠে হাসির রোল উঠল। 
প্রচণ্ড অপমানিত বোধ করল অবনী। এবার হয়তো বাচ্চাগুলো গরাদের ওপার থেকে ছোলা ছুড়বে। হয়তো সুর করে বলবে, এই অবনী কলা খাবি? জয় জগন্নাথ দেখতে যাবি?’ 
অবনী হেকে উঠল, “এই, হ্যাট হ্যাট।’ 
ছেলের পাল ভোঁ-দৌড় লাগিয়েছে। একটু তফাতে গিয়ে ঝুপ দাঁড়িয়ে পড়ল। আবার গুটি গুটি জানলার দিকে আসছে। অবনী যে এখন কী করে! কোণের টেবিলে একটা পেপারওয়েট রাখা আছে, ছুড়ে মারবে? না কি ভেজিয়ে দেবে জানলা? কিছুই করতে হল না। ত্রাণকর্তারা এসে গেছে। গোলা আর শেল তাকে নিতে উপস্থিত। দীপালি একডজন ডাব খেয়ে মঞ্চে চলে গেছে। অবনীকে যেতে হবে। 
সেভেন বুলেটস ক্লাবের সামনের মাঠে অনুষ্ঠান। মাঝারি মাপের মঞ্চ বাধা হয়েছে, তিনদিক খোলা, মাথার ওপরেও ঢাকা নেই কোনও। ফাল্গুন মাস, দখিনা বাতাস বইছে, ঠান্ডা লাগার ভয় নেই। মঞ্চের সামনেই শতরঞ্চি পাতা হয়েছে,

গুটিপনেরো বাচ্চা গড়াগড়ি খাচ্ছে সেখানে। শতরঞ্চির পেছনে সারি সারি চেয়ার অর্ধেক ভরতি হয়েছে, এখনও লোক আসা বাকি। মঞ্চের পেছনে বড় ফেস্টুনে লেখা, গুণিজন সংবর্ধনা। সামনে দুটো ইয়া ইয়া লাইট ফোকাস মারছে। মঞ্চে প্রকাণ্ড টেবিল, দুপাশে দু-খানা ফুলদানিতে রজনীগন্ধা। টেবিল ঘিরে চারটে চেয়ার, দুপাশে বসেছেন শস্ত্রপাণি আর ধনুর্ধারী, মাঝখানে অবনী আর দীপালির স্থান। 
অনুষ্ঠান শুরু হল। মাইকের সামনে দাঁড়িয়েছে তোপ। গুমগুমে স্বরে ঘোষণা করল, ‘প্রথমে উদ্বোধনী সংগীত।’ একটি বছর তেরোর মেয়ে স্টেজে উঠেছে। পরনে শাড়ি, লুটোচ্ছে। হারমোনিয়াম টেনে ভীষণ সরু গলায় গান ধরল, ‘এ কোন সকাল আলোর চেয়ে অন্ধকার...’

 অবনী পাশে বসা ধনুর্ধারীবাবুকে ফিসফিস করে জিগ্যেস করল, “এই গানটা কি ঠিক হচ্ছে?’ 
ধনুর্ধারীবাবুর লিকলিকে শরীর সামান্য হেলল। চাপা স্বরে বললেন, ‘কেন, ভুল গাইছে? 
না, তা নয়। তবে শুরুতেই অন্ধকার কি ভালো? তা ছাড়া এখন তো সকালও নয়!’ 
‘এখনও অবধি ও একটা গানই তুলেছে। ধনুর্ধারীবাবুর গলা আরও নেমেছে, ‘ওটি আমার মেয়ে। গলাটা কেমন? ভারী সুরেলা না?
অবনী চুপ হয়ে গেল। পাশে বসে থাকা দীপালির মুখে ভাবান্তর নেই। সামনে গান হচ্ছে, না ফুটবল ম্যাচ হচ্ছে, তার মুখ দেখে বোঝে কার সাধ্যি! দীপালি বসেছে ভারী জবরদস্ত ভঙ্গিতে। দু-হাত আড়াআড়িভাবে বুকে আটকানো, কাঁধ স্থির, চোখ অচঞ্চল, মাথা সোজা। শস্ত্রপাণিবাবু চোখ বুজে মাথা দোলাচ্ছেন।
গান শেষ হল। আবার তোপধ্বনি, ‘এবার গুণী বরণ।’
কোথা থেকে যেন হারমোনিয়াম বেজে উঠল, সঙ্গে তবলা। লালপাড় সাদা শাড়ি পরা তিনটি কিশোরী স্টেজে উঠে পড়ল। টেবিলের সামনের অপরিসর জায়গাটায় ঘুরে ঘুরে নাচছে, ‘কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আসো...’
এতক্ষণে অবনীর মন ভরে গেল। একটু যেন লজ্জা লজ্জাও লাগছিল। সত্যিই তা হলে তার ধরাধামে আসাটা মহৎ ব্যাপার! বাঁটুলপুরই তাকে চিনল প্রথম!
আবার তোপ মাইকে এসেছে, ‘এবার পুষ্পস্তবক প্রদান ও মাল্যদান ?
পাঁচ-ছ বছরের দুটো পুঁচকে মেয়ে, একজনের আবার ন্যাড়া মাথায় গোলাপি রিবন বাধা, অবনী আর দীপালিকে মালা পরিয়ে দিল, হাতে তুলে দিল ফুলের তোড়া। করতালি বেজে উঠল।

‘এবার সভাপতির ভাষণ।’ শস্ত্রপাণিবাবু বক্তৃতা দিতে উঠলেন। অবনী আর দীপালিকে একটু ছুয়েই চলে গেলেন বাঁটুলপুরের জন্ম-ইতিহাসে। একটার পর একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝালেন কেন বাঁটুলপুরের নাম ফণীমনসা বা তেঁতুলগঞ্জ হয়নি। কীভাবে তৈরি হয়েছে বলতে বলতে চোখে জল এসে গেল তাঁর। 
এর মধ্যে স্টেজে দুটো রঙিন কাগজে মোড়া বাক্স এসে গেছে। ধনুর্ধারীবাবু অবনীর কানের কাছে মুখ নিয়ে এলেন, আপনার জন্য শব্দকোষ। তিন ভলিউম। বজ্ৰধ্বজবাবু নিজে হাতে কিনে এনেছেন। ঘড়ি ধরে ঠিক আধ ঘণ্টা পর শস্ত্রপাণিবাবুর বক্তৃতা শেষ হল। ততক্ষণে সামনের সারির বাচ্চারা ঘুমিয়ে কাদা। এবার ধনুর্ধারীবাবুর মাইকে যাওয়ার পালা। তিনিও সময় নিলেন পাক্কা আধ ঘণ্টা। অবনী দীপালির নাম একবার করেই তিনি চলে গেলেন সেভেন বুলেটসের কর্মকাণ্ডে। যেমন চোখা তাঁর ভাষা, তেমনই তার ভাষণের দাপট। তার তীক্ষ স্বর যখন নীরব হল, তখন বাচ্চারা আবার চোখ রগড়াতে রগড়াতে উঠে বসেছে। 
তোপ আবার ঘোষণায় এল, ‘এবার সংবর্ধনা জ্ঞাপন।” অবনী আর দীপালি দুজনের গলাতেই মেডেল পরালেন শস্ত্রপাণিবাবু। দুজনের হাতে রঙিন বাক্স তুলে দিলেন ধনুর্ধারীবাবু। অবনী নিজের বাক্সটা নিয়ে বসে পড়ল। বেশ ভারী ভারী ঠেকছে। হবেই তো। তিন ভলিউম শব্দকোষ বলে কথা! 

‘এবার আমরা দীপালিবাবুকে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করছি।’ দীপালি উঠে দাঁড়িয়ে পটপট করে জামা খুলে ফেলল। দুহাত ছড়িয়ে বুক ফোলাতে ফোলাতে এগিয়ে গেল স্টেজের একদম সামনে। হাতের গুলি ফুলিয়ে বলল, আমার শরীরই আমার হয়ে কথা বলবে।’ 
ঘন ঘন হাততালি পড়ছে। দীপালি শরীরের নানান পেশি দেখিয়ে চলেছে। একটু কাত হয়ে এক হাঁটু গেড়ে বাইসেপ দেখাল। ট্রাইসেপ। এবার উলটো দিকে ঘুরে পুনরাবৃত্তি করছে। অবনী তাকিয়ে আছে সবিস্ময়ে। টিং-টিং মাসল নাচিয়ে চলেছে দীপালি। ডান হাত, বা হাত, ডান পা, বা পা। এবার সমতল পেটটাকে পুরো খাদে নামিয়ে দিয়েছে। খাদে নেমে যাওয়া পেটে ঢেউ তুলছে। ঢেউ, না হিল্লোল ? হাততালিতে ভেঙে পড়ল গোটা মাঠ। 
এবার অবনীবাবু আপনাদের সামনে আসবেন। 
দীপালির খেলা দেখে সব গুলিয়ে গেছে অবনীর। ঠকঠক হাঁটু কাঁপছে, গলা শুকিয়ে কাঠ। ঝোলা ব্যাগে একটা বক্তৃতা লেখা ছিল, ব্যাগটা ভুল করে বজ্ৰধ্বজবাবুর ঘরেই ফেলে এসেছে। নিয়ে আসতে বলবে ব্যাগটা? সময় নেই, তোপ আবার ডাকছে অবনীকে। কী বলবে? নিজের কবিতা শুনিয়ে দেবে? 
দুরু দুরু বুকে মাইকের সামনে দাঁড়াল অবনী। হায় রে, একটা কবিতাও মনে আসছে না। চোখ বুজে মনে করার চেষ্টা করল প্রাণপণে। ওফ, চোখের সামনে শুধু বাইসেপ ট্রাইসেপ নাচছে, দীপালির পেট হিল্লোল তুলছে। কবিতারা সব গেল কোথায়! 

মাইক ধরে ভেবলুর মতো দাঁড়িয়ে আছে অবনী। দর্শকদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে। তোপ পাশ থেকে বলল, কিছু বলুন। বাঁটুলপুরের লোকরা সাঙঘাতিক, কিছু না বললে চামড়া ছাড়িয়ে নেবে।’ অবনীর আরও গুলিয়ে গেল সব। হঠাৎই কোথেকে একটা কবিতার লাইন উড়ে এল মাথায়। নিজের নয়, রবি ঠাকুরের। সেই স্কুলে পড়ার সময়ে মুখস্থ করেছিল। গোটা মস্তিষ্ক তল্লাশ করেও আর কোনও দ্বিতীয় কবিতার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। অবনী মরিয়া হয়ে শুরু করে ফেলল, “দেবতামন্দির মাঝে ভকত প্রবীণ, জপিতেছে জপমালা বসি নিশিদিন...’ পুরো কবিতাটা শেষ করে ঠকঠক কঁপিছে অবনী। এই বুঝি জুতো ছুড়ল দশর্করা। পৈতৃক প্রাণ যায় যায়। 
এ কী কাণ্ড! হাততালি পড়ছে যে ! অবিরাম করতালিতে মুখরিত গোটা বাঁটুলপুর। তোপ হাসিমাখা মুখে মাইকের সামনে এল, এতক্ষণ আপনাদের স্বরচিত কবিতা পাঠ করে শোনালেন কবি অবনীন্দ্রনাথ বাগচী।’

গভীর রাতে সুদৃশ্য বাক্স নিয়ে বাড়ি ঢুকল অবনী। সেভেন বুলেটুসের গাড়ি রাতে স্টার্ট নেয় না, বাসেই ফিরেছে। দাদা-বউদি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। রিনি অন্যদিন এত রাতে ঘুমিয়ে পড়ে, আজ সেও জেগে আছে। বাক্সটা দেখেই রিনি উচ্ছসিত। কী পেলে গো কাকামণি?” 
অবনী ক্লান্ত গলায় বলল, শব্দকোষ। বউদি বললেন, ‘বাহ, এত সুন্দর উপহার। তুমি কতদিন কিনবে কিনবে করছিলে। এবার তোমার কবিতা লেখার খুব সুবিধে হবে।’ 
তা হবে। অবনী বলল অস্ফুটে। মনে মনে বলল, কবিগুরুর কবিতাও যেখানে নিজের কবিতা বলে চালিয়ে দেওয়া যায়, সেখানে আর কবিতা লিখে কী লাভ! রিনি বাক্সটা খুলে ফেলেছে। চেঁচিয়ে উঠল, ‘ওমা, এ তো বই নয়! হি হি হি হি। এ দুটো কী গো কাকামণি? বাপ রে, কী ভারী!’ 
অবনীও হা। শব্দকোষ কোথায়, এ যে ছোট্ট ছোট্ট দুটো বার্বেল! একদম মিনি সাইজ! নিৰ্ঘাত দীপালির সঙ্গে বাক্স অদলবদল হয়ে গেছে। সে বেচারার কপালে শব্দকোষ পড়ল! তা ভালো, শব্দকোষ দেখে দেখে দীপালিই নয় লিখুক কবিতা।
অবনীর সব দুঃখ ঘুচে গেল। মুচকি হেসে বলল, ওটার নাম বার্বেলিয়া। এ এক অন্য ধরনের শব্দকোষ। সত্যিই আমার কাজে লাগবে।’
অবনী কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছে। এখন নিয়মিত বার্বেলিয়া ভাজে। ছোট্ট ছোট্ট সুপুরির মতো দুটো গুলিও ফুটেছে তার হাতে। সকাল-বিকেলে চাকরির চেষ্টা করছে খুব। শিগগিরই পেয়ে যাবে।

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য